অসুররাজ মহিষাসুর, জন্ম থেকে মৃত্যুমুহূর্ত পর্যন্ত মায়াবী কুয়াশায় ঢাকা ছিল যাঁর জীবন

মহিষরূপী রাজকন্যা শ্যামলার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছিলেন মহিষাসুর। তাঁর মা শ্যামলা মহিষ ছিলেন বলে মহিষাসুরও মহিষের রূপ ধারণ করতে পারতেন।

২,৪৩১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

তপস্যা শুরু করেছিলেন রম্ভাসুর

অসুরকুলপতি দানুর বংশধর ছিলেন অসুররাজ রম্ভাসুর। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে অসুরদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে ভাই করম্ভাসুরের সঙ্গে তপস্যা শুরু করেছিলেন। অগ্নিদেবকে তুষ্ট করার জন্য সুবিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে তার ভেতরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে তপস্যা করছিলেন রম্ভাসুর। সাগরের জলে ডুবে বরুণদেবকে তুষ্ট করার জন্য তপস্যা শুরু করেছিলেন ভাই করম্ভাসুর। হাজার হাজার বছর ধরে এই তপস্যা চলার পর উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন দেবতারা। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন তপস্যায় সফল হতে চলেছেন অসুরদ্বয় এবং ত্রিলোকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।

এগিয়ে এসেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রম্ভা-করম্ভা অসুরদ্বয়কে হত্যা করে তাঁদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জয়ের স্বপ্ন চুরমার করে দেবেন। কুমিরের কলেবর ধারণ করে দেবরাজ ইন্দ্র জলের গভীরে গিয়ে তপস্যারত করম্ভাসুরকে বধ করেছিলেন। এরপর অগ্রসর হয়েছিলেন রম্ভাসুরকে বধ করার জন্য। কিন্তু রম্ভাসুরকে বধ করার মুহূর্তে ভক্তকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং অগ্নিদেব। রক্ষা করেছিলেন রম্ভাসু্রের জীবন।

রম্ভাসুরের তপস্যায় তুষ্ট অগ্নিদেব বর চাইতে বলেছিলেন রম্ভাসুরকে। অগ্নিদেবের কাছে রম্ভাসুর চেয়েছিলেন অদ্ভুত দু’টি বর। একমাত্র মৃত মানুষ ছাড়া রম্ভাসুরকে যেন কেউ বধ করতে না পারে এবং রম্ভাসুরের এমন এক পুত্র-সন্তান চাই যাকে দেবতা, মানুষ বা পশু কেউ বধ করতে পারবেনা। একনিষ্ঠ ভক্তকে তার ইপ্সিত বরই প্রদান করে প্রস্থান করেছিলেন অগ্নিদেব। অগ্নিদেবের আশীর্বাদধন্য রম্ভাসুর হয়ে উঠেছিলেন অতীব শক্তিশালী। অকাতরে শুরু করেছিলেন জীবহত্যা।

শাপভ্রষ্ট রাজকন্যা শ্যামলার প্রেমে পড়েছিলেন রম্ভাসুর

একদিন রম্ভাসুর গভীর অরণ্যের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় এক স্ত্রী মহিষের দেখা পেয়েছিলেন। অলৌকিক ক্ষমতাধারী রম্ভাসুর জানতে পেরেছিলেন স্ত্রী মহিষটি আসলে পশুরূপ ধারণ করা এক রাজকন্যা, নাম তাঁর শ্যামলা। যিনি অভিশাপের কারণে মহিষ হয়ে গিয়েছিলেন। অসুররূপ ছেড়ে মহিষের রূপ ধারণ করে রম্ভাসুর নেমে গিয়েছিলেন জলাশয়ে। মহিষরূপী শ্যামলার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন মহিষরূপী রম্ভাসুর। মিলনের ফলে গর্ভবতী হয়েছিলেন শ্যামলা।

মহিষরূপ ধারণ করেই মহিষরূপী শ্যামলার সঙ্গে বসবাস করছিলেন রম্ভাসুর। গর্ভাবস্থাতেই শ্যামলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল অরণ্যে বাস করা আর একটি পুরুষ মহিষ। মহিষরূপী রম্ভাসুরের সঙ্গে ওই পুরুষ মহিষটির ভয়ানক লড়াই হয়। রম্ভাসুর অসুররূপ ত্যাগ করে মহিষের রূপ ধারণ করেছিলেন, তাই অগ্নিদেবের বর তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি। পুরুষ মহিষটির সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন রম্ভাসুর। (মতান্তরে ইন্দ্র বজ্রের সাহায্যে বধ করেছিলেন রম্ভাসুরকে এবং এই রম্ভাসুরের পুনর্জন্ম হয়েছিল রক্তবীজ নামক অসুর হিসেবে।)

জন্ম নিয়েছিলেন ত্রিভুবন কাঁপানো মহিষাসুর

রম্ভাসুরের মৃত্যুর পর, মহিষরূপী রাজকন্যা শ্যামলার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছিলেন মহিষাসুর। তাঁর মা শ্যামলা মহিষ ছিলেন বলে মহিষাসুরও মহিষের রূপ ধারণ করতে পারতেন। এছাড়াও বিপদের মুহূর্তে বা প্রয়োজনে অন্য পশুর রূপ ধারণ করার সহজাত ক্ষমতা ছিল রম্ভাপুত্রের। জন্মের পর খুব বেশি দিন মা’কে পাননি মহিষাসুর। পুত্রের জন্মের কিছুদিন পরেই মা শ্যামলার মৃত্যু হয়েছিল।

অসুররাজ রম্ভাসুরের আত্মীয়েরা রাজপুত্র মহিষাসুরকে লালনপালন করতে শুরু করেছিলেন। পিতৃমাতৃহীন মহিষাসুর হয়ে উঠেছিলেন লাগামছাড়া ও দুর্বিনীত।তার ওপর রম্ভাসুরের আত্মীয়েরা মহিষাসুরকে বলেছিলেন মহিষাসু্রের মধ্যে ত্রিলোকবিজয়ী হওয়ার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। বালক মহিষাসুরের মধ্যেও ধীরে ধীরে ধারণা হতে শুরু করেছিল সে অপরাজেয়।সেই বালক বয়সেই অসম্ভব অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল মহিষাসুর।

যুবক হওয়ার পর মহিষাসুর তাঁর এক বয়স্ক আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সারাজীবন ধরে আমাকে বলে এসেছ, আমার মধ্যে ত্রিলোকবিজয়ী হওয়ার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। সেই স্বপ্ন বাল্যকাল থেকেই দেখতে শুরু করেছি আমি। এখন আমি যুবক, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।” বয়স্ক আত্মীয়টি স্মিত হেসে মহিষাসুরকে জানিয়েছিলেন তাঁর পিতা অসুররাজ রম্ভাসুরের তপস্যার কথা। বয়স্ক আত্মীয়টি মহিষাসুরকে বুঝিয়েছিলেন ত্রিলোক জয় করতে গেলে মহিষাসুরকে অমরত্ব লাভ করতে হবে। এর জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মার আরাধনা করতে হবে। কঠোর তপস্যায় ব্রহ্মা তুষ্ট হলে মিলবে অমরত্ব। মহিষাসুরের করায়ত্ত হবে ত্রিলোক।

তপস্যা শুরু করেছিলেন রম্ভাপুত্র মহিষাসুর

গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছিলেন মহিষাসুর। বিপদসঙ্কুল অরণ্যে একটি গাছের তলায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে শুরু করেছিলেন কঠোর তপস্যা। কেটে গিয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী। দীর্ঘ উপবাসে থাকা মহিষাসুরের দৈহিক শক্তি কমার বদলে অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। মহিষাসুরের শরীর থেকে নির্গত তেজ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। মহিষাসুরের তেজ অনুভব করেছিলেন ধ্যানমগ্ন ব্রহ্মাও। ভক্তের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট ব্রহ্মা দেখা দিয়েছিলেন মহিষাসুরকে, বলেছিলেন, “আমি তোমার তপস্যায় তুষ্ট, আমার কাছে তুমি কী বর আশা কর?”

ব্রহ্মার পদতলে লুটিয়ে পড়ে মহিষাসুর চেয়েছিলেন অমরত্বের বর। উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। তিনি জানতেন নৃশংস মহিষাসুরকে অমরত্বের বর দেওয়ার পরিণতি কী হতে পারে! তাই ব্রহ্মা বলেছিলেন, “আমি তোমায় অমরত্বের বর প্রদান করতে পারিনা। তবে তুমি আমার কাছে সেই বর চাইতে পার, যে বর পেলে দেবতা, মানুষ ও পশু তোমায় হত্যা করতে পারবে না। একমাত্র কোনও নারীই তোমাকে বধ করতে পারবে।” ব্রহ্মার কথা শুনে মনে মনে হেসেছিলেন অগ্নিদেবের বরে জন্ম নেওয়া মহিষাসুর। এককথায় সেই বর নিতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। মহিষাসুর ভেবেছিলেন, কোনও নারীর পক্ষে তাঁর মতো অমিতশক্তিশালী অসুরকে বধ করা সম্ভব নয়। তাই এই বর পাওয়া মানেই অমরত্ব লাভ করা। উল্লসিত মহিষাসুরকে দেখে স্মিত হেসেছিলেন অন্তর্যামী ব্রহ্মা। ভক্ত মহিষাসুরকে বর দিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন ব্রহ্মলোকে।

অসুররাজ মহিষাসুরের অত্যাচারে কেঁপে উঠেছিল স্বর্গ মর্ত্য পাতাল

অরণ্য থেকে প্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুর। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল জুড়ে অসুর সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা করেছিলেন। শুরু করেছিলেন নির্মম অত্যাচার ও অকাতরে নরহত্যা। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল ধরাধামে। অগ্নি ও ব্রহ্মার বরে বলীয়ান মহিষাসুরের হাত থেকে পরিত্রাণ পাননি সাধুসন্তরাও।

কালিকাপুরাণ থেকে জানা যায়, একদিন মহিষাসুর ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঋষি কাত্যায়ন তখন এক বিশেষ যজ্ঞ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যজ্ঞে আহুতি দেওয়ার জন্য নানান খাদ্যবস্তু রাখা ছিল যজ্ঞস্থলে। পাপাত্মা মহিষাসুর এক লাস্যময়ী রমণীর রূপ ধারণ করে প্রবেশ করেছিলেন যজ্ঞস্থলে। ঋষি কাত্যায়নের এক শিষ্যকে যৌন আবেদনে বশ করে যজ্ঞের জন্য রাখা সকল খাদ্যবস্তু ভক্ষণ করে নিয়েছিলেন।

সেসময় সহসা যজ্ঞস্থলে প্রবেশ করেছিলেন ঋষি কাত্যায়ন। তিনি চিনে ফেলেছিলেন নারীরূপী মহিষাসুরকে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলেছিলেন, “পাপিষ্ঠ, নারীর ভেক ধরে আমার শিষ্যের মন কলুষিত করেছিস। আমার যজ্ঞ পণ্ড করেছিস। এই লগ্নে আমি অভিশাপ দিলাম, তোর মৃত্যুরও কারণ হবে এক নারী।” ঋষি কাত্যায়নের কথা শুনে বিশ্ব কাঁপিয়ে হেসে উঠেছিল মহিষাসুর।

এর পর, দূরাচারী মহিষাসুর মর্ত্যকে রক্তসাগরে ভাসিয়ে, যুদ্ধে দেবতাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দখল করে নিয়েছিলেন স্বর্গ। ভীতসন্ত্রস্ত দেবতারা গিয়েছিলেন ব্রহ্মার কাছে। দেবরাজ ইন্দ্র ও বরুণদেব ব্রহ্মার পদতলে বসে বলেছিলেন,” রক্ষা করুন দেব। একমাত্র আপনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। কারণ, আপনার বরেই মহিষাসুর আজ অবধ্য ও সর্বশক্তিমান। দেবকুলের বিনাশ আসন্ন”

পদ্মযোনি ব্রহ্মা দেবতাদের জানিয়েছিলেন, মহিষাসুরকে সর্বশক্তিমান হওয়ার বর দিতে চাননি তিনি। কিন্তু অমরত্বের বদলে অন্য বরটি দেওয়া ছাড়া তাঁর কাছে অন্য কোনও উপায় ছিল না। এরপর ব্রহ্মা ও দেবী সরস্বতী দেবতাদের নিয়ে গিয়েছিলেন বৈকুণ্ঠলোকে। ব্রহ্মা জানতেন সেই মুহূর্তে মহিষাসুরকে নিয়েই বৈকুণ্ঠে গভীর আলোচনায় মগ্ন আছেন দেবাদিদেব মহাদেব ও বৈকুণ্ঠনাথ শ্রীবিষ্ণু।

জন্ম নিয়েছিলেন দেবী কাত্যায়নী

বৈকুণ্ঠধামে পৌঁছে দেবতারা দেখেছিলেন দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গে আলোচনারত শ্রীবিষ্ণুকে। পাশে বসেছিলেন দেবী পার্বতী ও দেবী লক্ষ্মী। মহাদেব ও শ্রীবিষ্ণুকে মহিষাসুরের ভয়াবহ অত্যাচার ও স্বর্গ দখলের কথা জানিয়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। ইন্দ্রের কথা শেষ হওয়া মাত্র সারা বৈকুণ্ঠ জুড়ে ভাসতে শুরু করেছিল সুরেলা অথচ কঠোর এক নারী কণ্ঠ, “আমার প্রিয় পুত্রকন্যাগণ, প্রজাপতি ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর অপরাজেয়। তাই অশুভশক্তিকে বিনাশের জন্য একই দেহে বিলীন হয়ে যাবেন তিন দেবী। আমিই পুনরায় জন্ম নেব এক রণরঙ্গিনী দেবী রূপে। সকল দেবতার সর্বপ্রকার তেজ একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হবে মহাশক্তি। সেই মহাশক্তিপুঞ্জ প্রবেশ করবে রণরঙ্গিনী দেবীর শরীরে। তোমরা তোমাদের অস্ত্র সেই দেবীকে প্রদান কোরো। তিনিই বিনাশ করবেন মহিষাসুরকে।”

মহাদেবীর মহাবাণী শুনে স্মিত হাসি ফুটে উঠেছিল দেবী পার্বতী, দেবী সরস্বতী ও দেবী লক্ষ্মীর মুখে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও বাকি দেবতাদের দেহ থেকে নির্গত হয়েছিল চোখধাঁধানো তেজরাশি। ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে মহাদেবীর তিন অবতার, পার্বতী, সরস্বতী ও লক্ষ্মী এক নব-কলেবরে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। সেই নব কলেবরে প্রবেশ করেছিল দেবকুলের তেজপুঞ্জ। আবির্ভূতা হয়েছিলেন দেবী কাত্যায়নী।

যাঁর শরীর থেকে একই সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছিল বিনাশের ভয়াবহতা ও সীমাহীন লাবণ্য। দেবীর সর্বাঙ্গ থেকে নির্গত জ্যোতির তীব্রতা এতই বেশি ছিল, যে দেবতারাও দেবীর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলেন না। মহাদেবীর মতোই সুরেলা ও কঠোর কণ্ঠে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন দেবী, “আমি ঋষি কাত্যায়নের কন্যা দেবী কাত্যায়নী। আমিই মহাদেবীর অবতার দুর্গা রূপে অশুভকে বিনাশ করার জন্য জন্ম নিয়েছি।”

উপস্থিত দেবতারা সাষ্টাঙ্গে দেবী কাত্যায়নীকে প্রণাম জানিয়েছিলেন। তার পর মহাদেবীর কথামত তাঁরা দেবীকে রণসাজে সজ্জিত করেছিলেন তাঁদের অস্ত্র দিয়ে। দেবী দুর্গার হাতে শ্রীবিষ্ণু তুলে দিয়েছিলেন ১০৮ টি ধার যুক্ত শাণিত সুদর্শন চক্র। ব্রহ্মা দিয়েছিলেন কমণ্ডলু, অক্ষমালা ও পদ্ম। মহাদেব তুলে দিয়েছিলেন তাঁর ত্রিকাল দণ্ড বা ত্রিশূল। এরপর দেবতারা একে একে দিয়েছিলেন তাঁদের অস্ত্র। দেবীর বাহন হিসেবে গিরিরাজ হিমালয় দিয়েছিলেন এক ভয়াল ভয়ঙ্কর সিংহ।

রণহুঙ্কার দিয়েছিলেন দেবী সর্বাসুরবিনাশা

সেই রণহুঙ্কারে কেঁপে উঠেছিল ত্রিলোক। আকাশ ছুঁয়েছিল সাগরের উত্তাল ঢেউ। প্রবল ভূমিকম্পে থর থর করে কেঁপে উঠেছিল পৃথিবী। ভয়াবহ বেগে বইতে শুরু করেছিল ধুলোর ঝড়। মহিষাসুরের কানে পৌঁছেছিল দেবীর রণহুঙ্কার। কয়েক মুহূর্তের জন্য বুঝি বুকের রক্ত জল হয়ে গিয়েছিল মহিষাসুরের। শব্দের উৎস খুঁজতে তিনি প্রাসাদের বাইরে এসেছিলেন। দূরে দৃষ্টি ভাসিয়ে মহিষাসুর দেখেছিলেন, রণসাজে সজ্জিতা এক অতীব সুন্দরী নারী সিংহের পিঠে চড়ে এগিয়ে আসছেন তাঁরই প্রাসাদের দিকে। মহিষাসুরের মনে পড়েছিল ব্রহ্মার বরের কথা। এই কী সেই নারী! মহিষাসুরকে হত্যা করতে শেষে দেবতারা এই লাবণ্যময়ী নারীকে পাঠিয়েছেন!

মহিষাসুরের কানে ভেসে এসেছিল দেবীর বজ্রকণ্ঠ, “পাপিষ্ঠ মহিষাসুর, তুমি নারীর হাতে মরতে চেয়েছিলে। আমিই সেই নারী।” তাচ্ছিল্যের হাসিতে ধরাধাম কাঁপিয়ে দেবীর দর্পচূর্ণ করার জন্য মহিষাসুর পাঠিয়েছিলেন অসুরবাহিনীকে। সামান্য নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি মহিষাসুর। কিন্তু দেবী দশভুজা দশ হাতে অসুরবাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন। এক সময় সমস্ত অসুরসেনা হারিয়ে দিশেহারা ও বাকরুদ্ধ মহিষাসুর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে রণহুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন।

মহিষাসুর ধারণ করেছিলেন ভয়ঙ্কর এক মহিষের রূপ

সেই মহিষের ক্ষুরের আঘাতে উড়তে থাকা ধুলোয় অন্ধকার নেমে এসেছিল বিশ্বে। মহিষরূপী মহিষাসুর ভয়াবহ গতিতে ছুটে এসে শিং দিয়ে আক্রমণ করেছিলেন দেবী দুর্গাকে। দেবী দুর্গা মহিষের কণ্ঠ লক্ষ্য করে ফাঁস ছুঁড়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে মহিষ থেকে হাতিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন মহিষাসুর। শূঁড় দিয়ে সিংহের পায়ে টান মেরে দেবী দুর্গাকে মাটিতে ফেলে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। দেবী দুর্গার খড়্গ নেমে এসেছিল হাতির শূঁড়ে। রক্ত ঝরতে শুরু করেছিল হাতির শূঁড় থেকে। তখন মহিষাসুর ধরেছিলেন সিংহের রূপ। এভাবে ক্রমাগত রূপ বদলে টানা ন’দিন যুদ্ধ চালিয়েছিলেন মহিষাসুর।

এসে গিয়েছিল যুদ্ধের দশম দিন। দশম দিনেও যতরকম ভাবে সম্ভব ততরকম ভাবে দেবীকে নাকাল করার চেষ্টা করে চলেছিলেন মহিষাসুর। প্রবল পরাক্রান্তা সর্বাস্ত্রধারিণী দুর্গাও একের পর এক অস্ত্র নিক্ষেপ করে চলেছিলেন। দশম দিনে সিংহ থেকে আবার মহিষরূপ ধারণ করেছিলেন মহিষাসুর। কিন্তু যুদ্ধ করতে করতে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন তিনি। মনে প্রশ্ন জাগছিল, কীভাবে এক সামান্য নারীর পক্ষে যুদ্ধের সকল কৌশল জানা সম্ভব! কীভাবে মহিষাসুরের উদ্দেশ্য আগে থেকে জেনে ফেলছেন এই নারী! মহিষাসুর অনুভব করেছিলেন, এই নারী এখনও তাঁর পূর্ণশক্তিতে লড়াই শুরু করেননি। পূর্ণশক্তিতে লড়াই শুরু করলে, যুদ্ধ একদিনেই শেষ হয়ে যেত।

এসে গিয়েছিল অন্তিম মুহূর্ত

দেবীকে বিভ্রান্ত করার জন্য দেবী দুর্গার খুব কাছে চলে এসেছিলেন মহিষরূপী মহিষাসুর। দেবী দুর্গার খড়্গ নেমে এসেছিল মহিষের ঘাড়ে। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল মহিষের মাথা। অসুররূপ ধারণ করে মহিষের গলা দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন মহিষাসুর। পুনরায় রূপ বদল করার জন্য দূরে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মহিষের গলা দিয়ে মহিষাসুরের পুরো শরীর বের করার আগেই দেবী দুর্গা ত্রিলোক কাঁপানো রণহুঙ্কার দিয়ে সিংহের পিঠ থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শূলবিদ্ধ করেছিলেন মহিষাসুরকে। মায়াবী মহিষাসুরের মায়াজাল ছিন্ন করে দেবী দুর্গা বধ করেছিলেন অশুভশক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে।

মৃত্যুকালে মহিষাসুর দেবীকে বলেছিলেন, দেবীর হাতে মৃত্যুবরণ করার জন্য তাঁর কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু তাঁর অন্তিম ইচ্ছা, দেবীর পূজার সময় দেবীর পদতলে যেন মহিষাসুরের ঠাঁই হয়। মৃত্যুপথযাত্রী মহিষাসুরের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করে দেবী মহিষাসুরকে বলেছিলেন, ” আমার উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী ও দুর্গা রূপের পূজা করার সময় তুমিও দেবতা, মানুষ ও অসুরদের পূজা পাবে।” পরম শান্তিতে চোখ বুজেছিলেন প্রবলপরাক্রমশালী মহিষাসুর। বসুন্ধরাকে ঘিরে ফেলা শুভশক্তির জ্যোতির্পুঞ্জে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন দেবী দুর্গা।

সূত্র: মার্কণ্ডেয় চণ্ডী, দেবী ভাগবত ও কালিকাপুরাণ

আরও পড়ুন: শুম্ভ-নিশুম্ভের বিনাশ করেছিলেন মা দুর্গা, দেবী কৌশিকীর রূপ ধারণ করে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More