এশিয়ার প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট, যাঁকে নিতে হয়েছিল মালির পেশা

জীবন নাটকের চিত্রনাট্যটা নিজেদের ইচ্ছেমতো সাজিয়েছিল বিভিন্ন দেশ। দেশগুলির মধ্যে ছিল তাঁর মাতৃভূমি চিনও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের অন্তিম জীবন সুখের ছিল না। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে মসনদচ্যুত করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের গ্যারেজে, মুঘল সম্রাটকে শুতে হত পাটের দড়ির খাটিয়ায়। চরম দুঃখকষ্টের মধ্যে কিছুকাল কাটানোর পর, রেঙ্গুনেই প্রয়াত হয়েছিলেন বাহাদুর শাহ জাফর।

    বাহাদুর শাহ জাফরের কথা জানা থাকলেও, আমরা অনেকেই জানি না এশিয়ার আরেক প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের কথা। তিনি হলেন চিনের শক্তিশালী কুইং সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট পুয়ি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাঁর জীবন ছিল পুতুলনাচের পুতুলের মতো অপরের হাতের সুতোয় বাঁধা। যাঁর জীবনের বেশিরভাগ কেটেছিল প্রাসাদে গৃহবন্দি হয়ে। কখনও বিদেশে নির্বাসিত হয়ে। কখনও বা দেশের কারাগারের দণ্ডিত কয়েদি হয়ে।

    সম্রাটের পোশাকে শিশু পুয়ি

    মাত্র দুই বছর বয়েসে সিংহাসনে বসেছিলেন পুয়ি

    কুইং সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী ডোয়াগার সিক্সি, ৪৭ বছর দেশ চালানোর পর, ১৯০৮ সালে, চিনের সম্রাটের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন যুবরাজ চানের দুই বছরের ছেলে পুয়িকে। কিন্তু পুয়ি সিংহাসনে বসার মাত্র চার বছরের মধ্যে কুইং সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। রাজতন্ত্র চলে গিয়ে চিনে এসেছিল প্রজাতন্ত্র। সান ইয়াত সেনের নেতৃত্বে। তবে, সিংহাসন চলে যাওয়ার পরেও শিশু সম্রাট পুয়িকে ‘সম্রাট’ উপাধিটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল চিনের অন্তবর্তী সরকার। তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল কুইং সম্রাটদের প্রাসাদেই। সেখানে শিশু সম্রাট পুয়ির দেখভাল করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল বেশ কিছু খোজা প্রহরী ও কর্মী।

    সম্রাটের প্রাসাদে সম্রাটের আরামেই ছিলেন শিশু সম্রাট। তাঁর সঙ্গে খেলার জন্য প্রাসাদে রাখা হয়েছিল অভিজাত পরিবারের শিশুদের। রোজ দুপুর ও রাতে তাঁকে চল্লিশ পদের রাজকীয় আহার দেওয়া হত। জন্ম থেকে বিলাসব্যসনে থেকে অভ্যস্ত শিশু সম্রাট পুই বুঝতেই পারেননি, সব কিছু পেলেও তিনি হারিয়েছেন স্বাধীনতা। পুয়ির জীবনীকার এডওয়ার্ড বের লিখেছিলেন, এই প্রাসাদই ছিল পুয়ির জীবনের প্রথম কারাগার।

    চিনের শেষ সম্রাট পুয়ি

    পুয়ি যা চাইতেন, সঙ্গে সঙ্গে তা এনে দেওয়া হত। তবে প্রাসাদের বাইরে তাঁর ঘোরাফেরার ওপর ছিল নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু পুয়ির ইচ্ছে করত, প্রাচীরের বাইরের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে টগবগে আরবী ঘোড়া ছোটাতে। সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল। প্রাসাদেই চলত তাঁর পড়াশুনা থেকে খেলাধূলা। নিজের নামটা একদম পছন্দ করতেন না পুয়ি। তাই নিজের নাম রেখেছিলেন ‘হেনরি’। ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম হেনরির ভীষণ ভক্ত ছিলেন পুয়ি। যিনি ১৫০৯ থেকে ১৫৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের রাজা ছিলেন। যাঁকে বলা হতো,’ফাদার অফ রয়াল নেভি।” ব্রিটিশ নৌবহরকে যিনি তাঁর সময়ে বিশ্বের সেরা নৌবহর হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। হেনরিকে নিয়ে লেখা বই পেলেই পড়তেন পুয়ি।

    সম্রাট পুয়ির যখন বয়েস ষোল বছর, নারী এসেছিল তাঁর জীবনে। তাঁকে চারটি মেয়ের ছবি দেখানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে থেকে একজনকে স্ত্রী ও একজনকে উপপত্নী হিসেবে বেছে নিতে বলা হয়েছিল। আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা ছিল না কুয়িং সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের। যিনি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিলেন, ছ’বছর বয়েস থেকে তাঁকে আসলে সোনার খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। খাঁচাবন্দি কাকাতুয়ার মতো কুয়িং সম্রাটদের প্রাসাদে তিনি কাটিয়ে ফেলেছেন এক দশক। সেই খাঁচাবন্দি কাকাতুয়া, যে রোজ সকাল বিকাল দামি ফল খেতে পায়। কিন্তু নীল আকাশে উড়তে পারে না।

    তৈলচিত্রে পুয়ি

    মিলেছিল মুক্তি, অন্য কারাগারের যাওয়ার জন্যে

    বন্দি সম্রাটের কথা জানতে পেরে নড়েচড়ে বসেছিল আন্তর্জাতিক মহল। শুরু হয়েছিল পুয়িকে মুক্ত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ফল মিলেছিল। ১৯২৪ সালে পুয়িকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তিয়েনৎসিনে। এলাকাটি ছিল জাপানের দখলে। উনিশ বছরের সদ্য যুবক সম্রাট পুয়িকে সাদরে গ্রহণ করেছিল জাপান। পিছনে ছক ছিল অন্য। কিছুদিনের মধ্যেই চিনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দাবার অন্যতম ঘুঁটি হিসাবে পুয়িকে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল জাপান।

    ১৯৩২ সালে জাপান দখল করে নিয়েছিল মাঞ্চুরিয়া। স্থাপন করেছিল ‘মাঞ্চুকুয়ো’ নামে একটি স্বাধীনরাষ্ট্র। ‘ডাটং’ উপাধি দিয়ে পুয়িকে সেই মাঞ্চুকুয়ো রাষ্ট্রের প্রধান করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ‘মাঞ্চুকুয়ো’ শাসন করেছিলেন ‘কুইং’ সম্রাট থেকে ‘কাংগটে’ সম্রাট হয়ে যাওয়া পুয়ি। সামান্য ক্ষমতাও তাঁর হাতে ছিল না। সেই তেরো বছর পুয়ির কেটেছিল জাপানের হাতের পুতুল হয়ে।

    পুয়ি যখন জাপানের হাতের পুতুল

    ১৯৩৭ সালে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আট বছর সমানে সমানে চলার পর, ১৯৪৫ সাল নাগাদ, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি জাপানের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করেছিল। চিনা সেনারা দ্রুত এগিয়ে আসতে শুরু করেছিল ‘মাঞ্চুকুয়ো’ রাষ্ট্রের দিকে। ৩৯ বছরের পুয়ি ‘মাঞ্চুকুয়ো’ থেকে জাপানে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল জাপান। জাপানের সম্রাট হিরোহিতো জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বেতার ভাষণে জাপানের আত্মসমর্পণের কথা ঘোষণা করে ছিলেন।

    সম্রাট পুয়ি পড়ে গিয়েছিলেন বিপদে। চিনের রোষ থেকে বাঁচতে, জাপানের দেওয়া উপাধি ত্যাগ করে, তাঁর শাসনাধীন ‘মাঞ্চুকুয়ো’ রাষ্ট্রকে চিনের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন সম্রাট পুয়ি। তবুও বিপদের সম্ভাবনা আঁচ করে সম্রাট পুয়ি ‘মাঞ্চুরিয়া’ থেকে কোরিয়ায় পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত সেনার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন মুকদেন বিমানবন্দরে। বিশেষ বিমানে তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সাইবেরিয়ায়। রাখা হয়েছিল বন্দিশিবিরে।

    রাশিয়ার কারাগারে পুয়ি

    জেগে উঠেছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চিন

    ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর মাও জে দং-এর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন ( People’s Republic of China) প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। একবছর পর সম্রাট পুয়িকে চিনের কমিউনিস্ট শাসকদের হাতে সমর্পণ করেছিল রাশিয়া। সম্রাট পুয়ি নিশ্চিত ছিলেন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। কিন্তু তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে, লিয়াওনিং প্রদেশের কারাগারে যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। নিজের দেশের কারাগারে, চিনের শেষ সম্রাটের পরিচয় ছিল ‘৯৮১ নম্বর’ কয়েদি। সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন সম্রাট পুয়ি। তাই সম্রাটকে সব্জি বাগানের কাজ দেওয়া হয়েছিল।

    জেলে সহবন্দিরা হাসতেন সম্রাটকে দেখে। ৪৪ বছর বয়েসেও, পুয়ি নিজে নিজে জুতো পরতে পারতেন না। বিছানা পাততে ও তুলতে পারতেন না। কী করে আঙুল দিয়ে দাঁত মাজতে হয় জানতেন না। তাই পদে পদে তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করতে হত। কোনও উত্তর দিতেন না পুয়ি। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে বাঁচতেন জনসমুদ্রে। ধীরে ধীরে পুয়ি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ জীবনযাপনে। নিজের জামাকাপড় নিজে কাচতে শিখেছিলেন। জামা কাপড়ের একটা দাগ ওঠাতে প্রচুর সময় লাগিয়ে দিতেন। যতক্ষণ দাগটা না উঠত ততক্ষণ ঘষেই যেতেন। এর জন্য অনেক সময় কাপড় ছিঁড়ে যেত। ছেঁড়া হলেও, দাগহীন জামাকাপড়ই পরতেন চিনের শেষ সম্রাট।

    নিজের জুতো নিজে সেলাই করছেন সম্রাট পুয়ি।

    কমিউনিজমে দীক্ষিত হয়েছিলেন সম্রাট

    বন্দি হিসেবে কারাগারে আসার পর, সম্রাটের মতাদর্শের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাঁকে কমিউনিজমে দীক্ষিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু হয়েছিল। জেলের ভেতর নিয়মিত আলোচনা সভা হত। সেই সভায় সকল বন্দিকে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতে হত। আলোচনা সভায় হাজির থাকতেন পুয়ি। গালে হাত দিয়ে চুপচাপ শুনতেন বক্তাদের বক্তব্য। একদিন চিনের শাসকদের মনে হয়েছিল সম্রাট পুয়ি সত্যিই কমিউনিজমকে ভালোবেসে ফেলেছেন এবং তিনি চিনের অনুগত নাগরিক হয়ে উঠেছেন। সম্রাট পুয়িকে ক্ষমা করে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ততদিনে কারাগারের অন্তরালে পুয়ি কাটিয়ে ফেলেছিলেন  প্রায় দশ বছর।

    মুক্তির পর চিনের মহাপরাক্রমশালী কুইং সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট পেয়েছিলেন, বেজিংয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের সহকারি মালির চাকরি। ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৬১ সালের মার্চ পর্যন্ত মালি হিসাবে কাজ করেছিলেন। আরও দু’জন মালির সঙ্গে পুয়ি থাকতেন একটি অতিসাধারণ ডর্মিটরিতে। বিদেশি অতিথিরা, সম্রাটকে দেখতে চাইলে, তাঁকে সাধারণ পোশাকে অতিথিদের সামনে হাজির করা হত। শত জোড়া কৌতুহলী চোখের সামনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন চিনের শেষ সম্রাট।

    বামে মাঞ্চুকুয়োর সম্রাটের পোশাকে পুয়ি, ডানদিকে সহকারী মালি পুয়ি।

    কিডনির ক্যানসার তাঁকে চিরমুক্তি দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালে চলে গিয়েছিলেন সম্রাট পুয়ি, ৬১ বছর বয়েসে। শোনা যায় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সম্রাট পুয়ি, কিছুদিন রাস্তার ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সময়ে নাকি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কিছুটা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার সময়, তিনি পথিকদের বলতেন,“আমি পুয়ি, চিনের শেষ সম্রাট। আমি পথ চিনি না।তোমরা আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দেবে?”

    সত্যিইতো, এ জীবনে শুরুতেই তো চলার পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন কুইং সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট পুয়ি। সেই হারিয়ে যাওয়া পথ আর কখনই  খুঁজে পাননি। কারণ তাঁর জীবন নাটকের চিত্রনাট্যটা নিজেদের ইচ্ছেমতো সাজিয়েছিল বিভিন্ন দেশ। দেশগুলির মধ্যে ছিল তাঁর মাতৃভূমি চিনও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More