ঘানার ‘ফ্যান্টাসি কফিন’, দুঃখ ভুলিয়ে মৃত্যুকে করে তোলে আনন্দমুখর

ঘানার মানুষগুলি শান্তিপ্রিয়, আমুদে ও বর্ণময় চরিত্রের।বর্ণময় তাদের জীবনযাত্রাও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্র ঘানা। ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ঘানা ছিল একটি ব্রিটিশ উপনিবেশ। সেই সময় ঘানার নাম ছিল ‘গোল্ড কোস্ট’। একসময় পরিচিত দেশটিকে বিশ্ব চিনত সোনার অফুরন্ত উৎস বলে। সেটা অবশ্য কয়েকশো বছর আগের কথা। ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা সোনার খোঁজে ঢুঁ মারতেন এই দেশের আনাচ কানাচে। তাঁরাই এই অঞ্চলটির নাম  দিয়েছিলেন গোল্ডকোস্ট। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছিল গোল্ড কোস্ট। তার পরেই নতুন নামকরণ হয়েছিল দেশটির। মধ্যযুগে নাইজার নদীর তীরে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য ‘ঘানা’-র নামানুসারে দেশটির নতুন নাম হয়েছিল ‘ঘানা’।

    ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটিতে একশোরও বেশি জাতিগোষ্ঠী বাস করেন। কিন্তু, আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলির মত এখানে কোনও রক্তক্ষয়ী জাতি-দাঙ্গা দেখা যায় না। ঘানার মানুষগুলি শান্তিপ্রিয়, আমুদে ও বর্ণময় চরিত্রের। তাঁদের বর্ণময় জীবন যাত্রার মতোই, বর্ণময় এখানকার মানুষের শেষযাত্রাও। প্রিয়জনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় জাঁকজমকের সঙ্গে। দুঃখ ছাপিয়ে মৃত্যু হয়ে ওঠে আনন্দ উৎসব। প্রিয়জনকে হাসিমুখে বিদায় দিতে চান ঘানার মানুষেরা। যাতে মানুষটির পারলৌকিক জীবন আনন্দময় হয়।

    শেষযাত্রাকে স্মরণীয় ও বর্ণময় করে রাখতে ঘানার বাসিন্দারা বানান আজব নকশার কফিন। যা ‘ফ্যান্টাসি কফিন’ নামে ঘানায় পরিচিত। এই কফিনগুলির নির্মাণশৈলীতে রয়েছে বৈচিত্র্য। কখনও দোকান থেকে, কখনও কারিগর ডেকে মৃত প্রিয়জনের জন্য কফিন বানিয়ে নেওয়া হয়। কফিনের বহিরঙ্গে সদ্য মৃত মানুষটির স্বপ্ন, আবেগ, পছন্দ, সামাজিক মর্যাদা ও জীবনযাত্রা ফুটে ওঠে। কফিনটিকে এক ঝলক দেখেই বলে দেওয়া যাবে, কফিনে কে শুয়ে আছেন। বা কফিনে শোয়া মানুষটির শখ কী ছিল।

    ঘানার  প্রায় প্রত্যেকটি এলাকায় পাওয়া যাবে ‘ফ্যান্টাসি কফিন’-এর দোকান। কফিন নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের সঙ্গে ‘কিউই’ শব্দটি থাকবেই। কারণ সেথ কেইন কিউই নামে এক কফিন নির্মাতা সর্বপ্রথম এ ধরনের আজব কফিন বানিয়েছিলেন। ফ্যান্টাসি কফিন বানানোর কারখানাগুলিকে আগে থেকে অর্ডার দিলে, ক্রেতার চাহিদা মতো কফিন বানিয়ে দেয় তারা। অবশ্যই সময় দিতে হবে ২-৪ দিন। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রিয়জনের পার্থিব শরীর রাখা থাকে মরদেহ সংরক্ষণকারী সংস্থাগুলির ফ্রিজারে।

    উপরের ছবিটি গাড়ির আদলে তৈরি একটি কফিনের। গাড়ির নম্বর প্লেটে লেখা আছে মৃত ব্যক্তির নাম। তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই কফিনটি জন নামে মৃত ব্যক্তিকে বহন করার জন্য বানানো হয়েছিল। তাঁর গাড়ির শখ ছিল, বা ছিল গাড়ির ব্যবসা। ‘ফ্যান্টাসি কফিন’  বানানোর সময় কারিগরদের মাথায় রাখতে হয় মৃতের উচ্চতা ও ওজন। তবে অভিজ্ঞ কারিগররা মৃত ব্যক্তির ছবি দেখেই সঠিক মাপের কফিন বানিয়ে দেন। এসব কফিন বানাতে সাধারণত ৫০০-১০০০ ডলারের মতো খরচ হয়। ফল ঘানার গরিব পরিবারগুলির পক্ষে ফ্যান্টাসি কফিন কেনা প্রায় অসম্ভব পড়ে। সে ক্ষেত্রে পাড়াপড়শিরাই এগিয়ে আসেন। ফ্যান্টাসি কফিন কিনে দেন চাঁদা তুলে। দায়িত্ব নেন শেষকৃত্যের।

    মৃত প্রিয়জনের জন্য ফ্যান্টাসি কফিন ছাড়া, নতুন পোশাক কেনা হয় শেষযাত্রার জন্য। সবার জন্য ঢালাও খাদ্য, পানীয়, নাচ গানের ব্যবস্থা থাকে। শেষকৃত্যের জন্য ধার্য করা থাকে নির্দিষ্ট দিন। যে দিনেই মৃত্যু হোক না কেন, বৃহস্পতিবার কফিন মৃত ব্যক্তির বাড়িতে আনা হয়। শুক্রবার দেহ নিয়ে আসা হয় মরদেহ সংরক্ষণকারী সংস্থা থেকে। শনিবার হয় শেষকৃত্য। রবিবার গির্জায় প্রার্থনা হয় মৃত ব্যক্তির জন্য। শেষকৃত্যের জন্য কত খরচ হল, তা হিসাব করে উদ্বৃত্ত টাকা গরিবদের দান করা হয় সোমবার ।

    এবার দেখুন কিছু বিশেষ মানুষের জন্য বিশেষ ধরনের কফিনের ছবি

    জুতোর দোকানের মালিকের কফিন।
    এটি যার কফিন সেই মানুষটি খেতেন এই সিগারেট।
    মৎস্যজীবীর কফিন
    ঝাল লাল লঙ্কার আদলে কফিন, মানুষটি খুবই রাগী ছিলেন বোঝা যায়।
    মাইক্রোফোনের আদলে তৈরি করা হচ্ছে কোনও কণ্ঠশিল্পীর কফিন।
    ফোটোগ্রাফারের কফিন

    ঘানার ফ্যান্টাসি কফিন শুধু ঘানাতেই নয়, ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আফ্রিকার অনান্য দেশ, এমনকি পশ্চিমী দেশগুলিতেও। গত এক দশক ধরে বিশ্বের প্রায় ২০টির দেশের অসংখ্য ক্রেতা ঘানার বিভিন্ন কফিন কারখানা থেকে এসব ফ্যান্টাসি কফিন বানিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এমনকি আজও বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা ঘানায় আসেন এইসব ফ্যান্টাসি কফিন বানানোর কাজ শেখার জন্য। দেশগুলির মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ডেনমার্ক,ইতালি, জার্মানির মতো উন্নত দেশও। এভাবেই ঘানার ফ্যান্টাসি কফিন শিল্প, মৃত্যুর ভয়াবহতা কমিয়ে দিয়ে মৃত্যুকে বর্ণময় করে চলেছে যুগের পর যুগ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More