আটাকামা মরুভূমিতে পাওয়া ছ’ইঞ্চি লম্বা কঙ্কালটি কার! রহস্য এখনও অমীমাংসিত!

আটাকামা মরুভূমিতে পাওয়া গিয়েছিল বলে, হাতের পাতায় ধরে যাওয়া ছোট্ট কঙ্কালটির নাম 'আটা'।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    উত্তর চিলির আটাকামা মরুভূমির মধ্যে আছে এক পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে শহর ‘লা নোরিয়া’। অনুমতি নিয়ে পর্যটকেরা সেখানে যান শহরটি ঘুরে দেখার জন্য। ২০০৩ সালে পর্যটকদের সঙ্গে গাইড হিসেবে লা নোরিয়াতে গিয়েছিলেন ব্যবসায়ী অস্কার মুনোজ। শহরটির পরিত্যক্ত বাড়িগুলির ভিতরে ঘোরাফেরার সময়, ধুলোর আস্তরণে ঢাকা ছোট্ট একটি চামড়ার ব্যাগ পেয়েছিলেন। ব্যাগের ভেতর কাপড় মোড়া কিছু রাখা ছিল। কাপড়ের আবরণ সরাতেই চমকে উঠেছিলেন মুনোজ। ব্যাগটির ভেতর শুয়ে ছিল মাত্র পাঁচ ছ,ইঞ্চি লম্বা একটি কঙ্কাল। এত ছোট ও এত ভয়ঙ্কর কঙ্কাল মুনোজ এর আগে দেখেননি।

    কঙ্কালটির খুলি শঙ্কুর মত লম্বা, চোয়ালদুটো সামনে এগিয়ে এসেছে। চোখের কোটর দুটির আকৃতি অস্বাভাবিক। শিরদাঁড়াটি বাঁকা। কঙ্কালটি অতি ক্ষুদ্র হলেও, নিঁখুত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল আটাকামা মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে। কঙ্কালটির প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে বোঝা যাচ্ছিল। কঙ্কালটির গায়ে তখনও লেগেছিল শুকিয়ে যাওয়া কিছু মাংসপেশী। কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা দেখা মুনোজ, কঙ্কালটির মাথার আকৃতি থেকে ধরে নিয়েছিলেন এটি ভিনগ্রহের জীব বা এলিয়েনের কঙ্কাল।

    লা নোরিয়া, এখানেই পাওয়া গিয়েছিল রহস্যময় কঙ্কালটিকে।

    রহস্যময় কঙ্কালটিকে চোরাবাজারে বিপুল দামে বেচে দিয়েছিলেন মুনোজ

    বিভিন্ন হাত ঘুরে কঙ্কালটি চিলি থেকে চলে এসেছিল স্পেনে। ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের বিষয়ে আগ্রহী বার্সিলোনার ব্যবসায়ী র‍্যামন নাভিয়া-অসোরিও, উচ্চমূল্যে কিনে নিয়েছিলেন কঙ্কালটিকে। আটাকামা মরুভূমিতে পাওয়া গিয়েছিল বলে, হাতের পাতায় ধরে যাওয়া ছোট্ট কঙ্কালটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘আটা’।

    ক্ষুদ্র কঙ্কালটির খবর চলে এসেছিল আমেরিকার ভার্জিনিয়ায়। ডঃ স্টিভেন গ্রিরের কাছে। ডঃ গ্রির ছিলেন ‘দ্য ডিসক্লোজার প্রজেক্ট’ নামে একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। যে সংস্থাটির কাজ হল ভিনগ্রহবাসীদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা। ডঃ গ্রির যোগাযোগ করেছিলেন আটা’র মালিক অসোরিওর সঙ্গে। কঙ্কালটির ডিএনএ পরীক্ষা করার অনুমতি চেয়েছিলেন। ২০১২ সালে, ডঃ স্টিভেন গ্রিরকে কঙ্কালটির এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছিলেন অসোরিও।

    এই সেই রহস্যময় ‘আটাকামা স্কেলিটন’।

    আটা’র কথা জানতে পেরেছিল বিশ্ব

    এর ঠিক পরের বছরেই মুক্তি পেয়েছিল, ডঃ স্টিভেন গ্রিরের গবেষণা নিয়ে তৈরি বিখ্যাত ও বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘সিরিয়াস'((Sirius)। সেই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছিলেন ‘আটাকামা স্কেলিটন’ বা আটা’র কথা। তথ্যচিত্রের একটি লাইন উল্কাগতিতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল। লাইনটি হলো ‘ উই আর নট অ্যালোন”। এর অর্থ, মহাবিশ্বে আমরা একা নই। এই মহাবিশ্বেই ছড়িয়ে আছে ‘আটা’রা। শুধু আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না।

    গত একশো বছর ধরে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে পৃথিবীবাসীদের কৌতূহল ও উন্মাদনা এমনিতেই চুড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। বর্তমান পৃথিবীর প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন মানুষ, এই ভিনগ্রহবাসীদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। সেই উন্মাদনার আগুনে ঘৃতাহূতি দিয়েছিল ‘সিরিয়াস’ তথ্যচিত্রটি।

    ‘সিরিয়াস’ তথ্যচিত্র থেকেই আটা’র খোঁজ পেয়েছিল বিশ্ব।

    রহস্যময় কঙ্কালটির খবর এসেছিল বিজ্ঞানী নোলানের কাছে

    আটাকামার রহস্যময় কঙ্কাল ‘আটা’র খবর, এক বন্ধুর মাধ্যমে এসেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘জিন’ বিশেষজ্ঞ ডঃ গ্যারি নোলানের কাছে। একটি ছবি পাঠিয়ে বন্ধুটি বলেছিলেন, ‘সিরিয়াস’ তথ্যচিত্রে  দেখতে পাওয়া যাবে ‘আটাকামা হিউম্যানয়েড’ আটা’কে। যে এসেছিল মহাকাশ থেকে। ডঃ নোলান যোগাযোগ করেছিলেন ছবির পরিচালকের সঙ্গে। পরিচালককে জানিয়েছিলেন, তিনিও কঙ্কালটির ডিএনএ পরীক্ষা করতে চান।

    শুরু হয়েছিল আটাকে নিয়ে ডঃ নোলানের টিমের পরীক্ষানিরীক্ষা। নেতৃত্বে ছিলেন ডঃ নোলান, সঙ্গে ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির বায়ো-ইনফরমেটিক্সের গবেষক ডঃ সঞ্চিতা ভট্টাচার্য্য ও কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট অতুল বুটে। রহস্যময় কঙ্কালটির ‘ডিএনএ’ পরীক্ষার পর, গবেষণা সংক্রান্ত প্রাথমিক একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল বিখ্যাত ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে। পরে ২০১৮ সালে, যেটি বিশদভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘জিনোম রিসার্চ’ ম্যাগাজিনে।

    বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান

    ‘আটা’ কোনও ভিনগ্রহবাসীর কঙ্কাল নয়

    এলিয়েন হওয়ার সম্ভাবনায় জল ঢেলে গবেষকেরা বলেছিলেন, ‘আটা’ হলো মানুষের স্ত্রী ভ্রুণের কঙ্কাল। ভ্রুণটি হয় মায়ের পেটে, নয়তো সময়ের আগে জন্ম নিয়ে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা গিয়েছিল। আগে অনুমান করা হয়েছিল প্রায় ছ’ইঞ্চি লম্বা কঙ্কালটির বয়েস দু’হাজার বছর। গবেষকদের মতে কঙ্কালটি ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো। কঙ্কালটির ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ’ পরীক্ষা করে জানা গিয়েছিল ‘আটা’ চিলিরই সন্তান। তবে তার ডিএনএ-এর মধ্যে ইউরোপীয়ান পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য আছে।

    গবেষকেরা আটার ৬৪ টি জিনের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন।  অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল এমন সাতটি জিনে, যেগুলি মানুষের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ভ্রুণটির খুলি, মেরুদণ্ড, কোলাজেন, অস্থিসন্ধি, পাঁজর ও ধমনীতে অস্বাভাবিক বিকৃতি ছিল। ১২টির জায়গায় ১০টি পাঁজর ছিল। বামন হয়েই জন্ম নিতে চলেছিল ভ্রুণটি।

    জিনের অস্বাভাবিকতা ছাড়াও একটি বিরল জিনগত রোগ ছিল আটার। সময়ের চেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছিল ‘আটা’। অস্থির বৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে মাত্র ১৫ সপ্তাহের ভ্রুণ হলেও, তার হাড় ছিল ছ’বছরের ছেলের মতো শক্তপোক্ত। বিজ্ঞানীদের রায়, আটার গঠনগত বিকৃতির পিছনে আছে জিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন। আটাকামা মরুভূমির পরিবেশ হয়ত জিনগুলির এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী।

    বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিজ্ঞানীরাই

    ওটাগো ইউনিভার্সিটির বায়ো-আর্কিওলজিস্ট প্রফেসর সিয়ান হ্যালক্রো, ডঃ নোলানের দলের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রফেসর হ্যালক্রো বলেছিলেন, লেখকের ( ডঃ নোলান) বক্তব্যে সত্যতা নেই। ‘আটা’ নামের ছোট্ট মানব কঙ্কালটির গঠনের ক্ষেত্রে কোনও অস্বাভাবিকতার নমুনা তাঁরা খুঁজে পাননি। যে সমস্ত গঠনগত অস্বাভাবিকতার কথা ডঃ নোলান বলেছেন, তা স্বাভাবিক ভ্রুণের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। প্রফেসর হ্যালক্রো, জিনের পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

    কিছু বিজ্ঞানী বলেছিলেন, আটার জিনের অস্বাভাবিকতাই যে আটার কঙ্কালের বিকৃতির জন্য দায়ী, এই সিদ্ধান্তে আসা এখনই উচিত নয়। কারণ বিজ্ঞানীদের কাছে আটার পিতা মাতা বা আত্মীয়দের কোনও তথ্য নেই। যদি আটার পিতামাতাকে খুঁজে পাওয়া যেত, তাহলে বোঝা যেত আটার জিন ও শরীরের অস্বাভাবিকতা, তার পিতা মাতার ও নিকট আত্মীয়দের শরীরেও ছিল কিনা। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ র‍্যালফ ল্যাচম্যান জানিয়েছিলেন, কঙ্কালের সঙ্গে কোনও অস্থিসংক্রান্ত রোগের কোনও সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞানীদের মধ্যে তুমুল মতবিরোধ, ‘আটাকামা স্কেলিটন’ রহস্যটিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।

    বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘গল্প শেষ’, এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা বলছেন ‘সবে শুরু’

    বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পাওয়ার পরও এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা তাঁদের তত্ত্বে এখনও কায়েম আছেন। ইন্ধন যুগিয়েছেন ‘দ্য ডিসক্লোজার প্রজেক্ট’-এর ডঃ স্টিভেন গ্রিরও। তিনি বলেছেন, আমরা জানিনা এটা কী, তবে এটা সম্ভবত কোনও মানুষের বিকৃত হওয়া কঙ্কাল নয়। এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা তুলেছেন নানান প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তরগুলি তাঁরা এখনো পাননি বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে।

    এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা জানতে চেয়েছেন,

    ভ্রুণের কঙ্কালটি ৪০-৫০ বছরের পুরোনো হলে, তার পিতামাতা নয়তো নিকট আত্মীয় স্বজনের এখনও বেঁচে থাকার কথা। তাদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি কেন? আটা’র আত্মীয়রা নিশ্চয়ই আটা’র মৃত্যুর খবর জানতেন। কারণ তাকে যত্ন করে মুড়ে, একটি ব্যাগে রাখা হয়ে ছিল। আটাকে নিয়ে সারা বিশ্ব তোলপাড় হয়ে যাওয়ার পরও তাঁরা কেন এগিয়ে আসেননি। এগিয়ে এলে তো বিজ্ঞানীরা তাঁদের লুফে নিতেন। কোটিপতি হয়ে যেতেন আটা’র আত্মীয়রা। আসলে আটার আত্মীয়রা পৃথিবীর বাসিন্দা নয়, তারা থাকে মহাকাশে।

    ● আটার জিন বলছে আটারা চিলির আদি বাসিন্দা, তাহলে আটার মধ্যে থাকা জিনগত অস্বাভাবিকতা, চিলির কোনও না কোনও মানুষ বা মানুষের ভ্রুণের মধ্যে পাওয়া উচিত ছিল। এখনও পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি কেন?

    ● যদি আটা মানুষই হয়, একমাত্র তার ছোট্ট শরীরেই এতগুলি জিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছিল কেন?

    ● আটার  জিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনগুলি বিজ্ঞানীদের কাছেও ছিল নতুন। এর অর্থ পৃথিবীর কোনও মানুষের জিনে এই সমস্ত অস্বাভাবিক পরিবর্তন এর আগে পাওয়া যায়নি। এই তথ্য কি প্রমাণ করছে না আটা ভিনগ্রহের জীব?

    ● বিজ্ঞানীরা আটাকে নিয়ে একমত হতে পারেননি কেন?

    ● আটার সঙ্গে কল্পিত এলিয়েনের চেহারার এত মিল কেন?

    ● মানুষের ১৫ সপ্তাহের স্বাভাবিক ভ্রুণের কঙ্কালের সঙ্গে আটার মিল পাওয়া যায় না কেন?

    ● আটা যদি মানুষের ভ্রুণ হয়, লা নোরিয়ায় বিশাল একটি সমাধিক্ষেত্র থাকা সত্বেও তাকে কবর দেওয়া হয়নি কেন।

    বিজ্ঞানীরা তাঁদের সিদ্ধান্ত জানানো সত্ত্বেও, এরকম শতশত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা। তাই আটার আসল পরিচয় জানতে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। অন্যদিকে আটার মালিকানা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে স্পেন ও চিলির মধ্যে।

    আটাকে নিয়ে বিজ্ঞানী ও এলিয়েন সন্ধানীদের দড়ি টানাটানি খেলায় ক্ষুব্ধ চিলি সরকারও। আটাকে ঘরে ফেরাতে চায় চিলি। কিন্তু আটার বর্তমান মালিক র‍্যামন নাভিয়া-অসোরিওর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই আটাকে চিলিতে পাঠানোর। ছোট্ট আটা তাঁর কাছে সোনার খনি। ফলে পৃথিবীর আলো না দেখা ছোট্ট আটা আজও বন্দি হয়ে আছে ভিনদেশে। হয়ত ভিনগ্রহে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More