মালচা মহল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অমিতাভ রায়

মাদার তেরেসা ক্রিসেন্ট। রাষ্ট্রপতি ভবনের চৌহদ্দির পিছনের পাঁচিলের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মাদার তেরেসার নামাঙ্কিত এই সড়ক। চব্বিশ ঘণ্টা এখানে বহমান গাড়ির স্রোত। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা। এয়ারপোর্ট এবং গুরগাঁও যাওয়ার সবচেয়ে সরল পথ। কাজেই সারাদিন বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য যানবাহনের যাতায়াত। চলতে চলতে আচমকা এসে যায় এক তিন রাস্তার মোড়। সারাদিন এখানে যান নিয়ন্ত্রণ করে লাল বাতি সবুজ আলো। আর এই মোড়েই রাষ্ট্রপতি ভবনের পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এগারো মূর্তি। ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর অনবদ্য ভাস্কর্য। এগারোজন স্বাধীনতাসংগ্রামী সারিবদ্ধভাবে চলতে চলতে হঠাৎ যেন মর্মরমূর্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন। সবুজ আলো জ্বলে উঠতেই এপাশ থেকে আসা বেশিরভাগ গাড়ি ডানদিকে ঘুরে যায়। আর ওপাশ থেকে আসা বেশিরভাগই ঘোরে বাঁদিকে। তারপর দু’পক্ষই একজোট হয়ে শুরু করে এয়ারপোর্ট অথবা গুরগাঁওর দিকের সফর। রাস্তাটার নাম সরদার প্যাটেল মার্গ।

প্রশস্ত পথের বাঁদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারের অতিথি নিবাস। তারপর বাঁদিকে মালচা মার্গ পেরিয়ে গেলেই শুরু হয়ে যাবে শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকা চাণক্যপুরী। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের দপ্তর এবং আবাসন। সেই দিক থেকে দেখলে চাণক্যপুরীর পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করছে সরদার প্যাটেল মার্গ। আর ডানদিকে চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে আছে সবুজ অরণ্য। সরদার প্যাটেল মার্গ লাগোয়া ঘন সবুজের মধ্যে থেকে একফালি এলাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে বুদ্ধ জয়ন্তী পার্ক। অরণ্যের আরেক টুকরোকে সাজিয়েগুছিয়ে বানানো হয়েছে ভগবান মহাবীর বনস্থলী। আর দূরে একেবারে পশ্চিম দিকের অংশ পুসা হিলস ফরেস্ট নামে পরিচিত। অরণ্যের বাদবাকি অংশে পদচারণা নিষিদ্ধ। তারকাঁটা ঘেরা সংরক্ষিত এলাকা। সরকারি নাম সাদার্ন রিজ ফরেস্ট। এর মধ্যে রয়েছে দিল্লি আর্থ স্টেশন। ইসরো নিয়ন্ত্রিত একটি পরীক্ষাগার। আর অরণ্যভূমির মাটির নীচে অনেক গভীরে বয়ে চলেছে এয়ারপোর্ট মেট্রোর লাইন।

নতুন দিল্লিতে দেশের রাজধানী স্থাপনের সময় রাইসিনা পাহাড় ঘিরে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলি গ্রামকে অধিগ্রহণ করতে হয়। মালচা, কুশক, টোডাপুর, আলীগঞ্জ, পিলঞ্জী, জয়সিংপুরা, রাইসিনা প্রভৃতি গ্রামের জমির ওপর গড়ে ওঠে তখনকার ভাইসরয়েস হাউস অর্থাৎ এখনকার রাষ্ট্রপতি ভবন এবং তার আশপাশের সরকারি ভবন-আবাসন। এই অভিজাত মহল্লায় এখনও টিকে আছে কুশক গ্রামের স্মৃতি জড়িত কুশক মার্গ। জোড় বাগ, লোদী কলোনি এলাকার একটি পাড়ার নাম আলীগঞ্জ। রাইসিনা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত রাইসিনা গ্রামের এক প্রান্তে স্থাপিত হয় রাইসিনা বেঙ্গলি স্কুল। এখনও স্কুল প্রাঙ্গণ মূল রাস্তার থেকে অনেকটাই উঁচুতে অবস্থিত। ১৯৬০-এর দশকেও স্কুলের পিছনে পাহাড়ের অস্তিত্ব টিকে ছিল। টোডাপুর এখন গ্রামীণ চরিত্র পাল্টিয়ে শহুরে পাড়া হলেও নাম বদলায়নি। আর মালচা মার্গ তো চাণক্যপুরীর অন্যতম প্রবেশপথ। সরদার প্যাটেল মার্গের পাঁচতারা হোটেলগুলোর পাশেই রয়েছে মালচা এনক্লেভ নামের অভিজাত ও মহার্ঘ আবাসন।

সাদার্ন রিজ ফরেস্টের মধ্যে অবস্থিত দিল্লি আর্থ স্টেশনের চৌহদ্দির কাছেই রয়েছে এক প্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। মালচা মহল। প্রাসাদ পর্যন্ত যাওয়াটাই অসম্ভব। জং ধরা সিংদরজার গায়ে ততোধিক জীর্ণ নোটিশ পড়লেই বুক থেকে এক পরত রক্ত উবে যায়। একটু ঠাহর করে নোটিশটি পড়লে দেখা যায়, তাতে লেখা রয়েছে— ‘প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত, শিকারী কুকুর থেকে সাবধান: অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশকারীদের গুলি করা হবে’। এই সতর্কবার্তা পড়ার পরে সাহস করে দরজা পেরিয়ে ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে যেতে পারে।

অভিজাত দিল্লিতে আজও দাঁড়িয়ে থাকা মালচা মহল তৈরি হয়েছিল ১৩২৫-এ ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে। প্রায় সাতশো বছরের পুরনো কাঠামো। এটি ছিল তাঁর শিকারকুঠি। পরে এটি ‘মালচা মহল’ বা ‘বিস্তদারি মহল’ নামে পরিচিত হয়। মোঘল বাদশাহদের শিকারগাহ্ হিসেবে প্রাসাদটি ব্যবহৃত হত। মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ দিকে প্রাদেশিক শাসকরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম অযোধ্যার নবাব-বংশ। মালচা মহল ছিল তাঁদেরই সম্পত্তি। ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধিতে না যাওয়া ভারতের বেশিরভাগ দেশীয় রাজপরিবারের পরিণতি ছিল করুণ ও ভয়াবহ। অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে কলকাতায় নির্বাসিত হয়ে জীবনযাপন করতে হয়। তাঁর বিশাল পরিবার টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল কলকাতা-সহ সারা দেশে। সেই বিচ্ছিন্ন পরিবারের একটি শাখার স্বঘোষিত উত্তরাধিকারী ছিলেন বেগম ওয়ালিয়ৎ। তাঁর দাবি ছিল, তিনি লখনউয়ের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের প্রপৌত্রী। আযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন সিংহাসনচ্যুত হন, তখন এই জঙ্গল-ঘেরা আবাসটি তাঁর নাতনিকে থাকার জন্য নাকি দেওয়া হয়েছিল। নবাবের যাবতীয় সম্পত্তিই ইংরেজ কোম্পানি বাজেয়াপ্ত করেছিল। বিনিময়ে এই প্রাসাদটি তাঁর বংশধরদের দিয়ে দেওয়া হয়। ব্রিটিশদের সঙ্গে মামলা চলাকালীনই নবাবের বংশধররা এই প্রাসাদে চলে আসেন। প্রাসাদটি তখনই প্রায় হানাবাড়ির চেহারা নিয়েছে। জঙ্গলে আকীর্ণ প্রাসাদটি তখন সাপ-খোপের আখড়া।

১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি নিজেদের হারানো সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার দাবিতে বেগম ওয়ালিয়ৎ আবির্ভূত হন। ছেলে, মেয়ে, বেশ কয়েকটি কুকুর ও কয়েকজন পরিচারক নিয়ে দিল্লি রেলস্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগারে থাকতে শুরু করেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে বসবাসের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্য কোথাও যেতে রাজি হননি। দশ বছরেরও বেশি সময় তাঁরা অস্থায়ীভাবে দিল্লি স্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগারে বসবাস করেন। শেষে বহু টানাপড়েনের পরে ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর পদক্ষেপে বেগম ওয়ালিয়ৎ মালচা মহলে থাকার অনুমতি পান। ১৯৮৫ সালের মে মাসে বেগম ওয়ালিয়ৎ তাঁর ছেলে, মেয়ে ও পোষ্য কুকুরদের‌ নিয়ে মালচা মহলে এসে ওঠেন যা কোনও এক সময়ে অযোধ্যার নবাব বংশেরই ছিল বলে বেগম ওয়ালিয়ৎ দাবি করতেন।

এই প্রাসাদের পরিচিতি মোটেই ‘ভূতুড়ে’ হিসেবে নয়। ভগ্নপ্রায় মালচা মহল ঘিরে অনেক আগে থেকেই গুপ্তধনের গুজব রটেছিল। বেগম ওয়ালিয়ৎ থাকার সময় থেকে তা আরও তীব্র হয়। বাড়তে থাকল হানাদারদের উপদ্রব। বেশ কয়েকটি পোষা কুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়। ঘন গাছপালায় ঘেরা মালচা মহলে ওয়ালিয়ৎ বেগম ও তাঁর সন্তানদের জীবন ছিল রহস্যাবৃত। কীভাবে সংসার চলত, কেউ জানেন না। শোনা যায়, বিদেশ থেকে সামান্য সাহায্য আসত।

১৯৯৩ সালে বেগম ওয়ালিয়তের মৃত্যু হয়। তিনি নাকি হিরের গুঁড়ো খেয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ নেই। মায়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি দুই ভাই বোন। তাঁরা মায়ের মরদেহ স্টাডি টেবলে সাজিয়ে রেখেছিলেন। বেগমের মৃত্যুর পর থেকে মালচা মহলে চোরের আনাগোনা বাড়তে থাকে। এখানে গুপ্তধন রয়েছে— এই গুজব ছড়িয়ে যায়। মায়ের মৃত্যুর পর রাজকীয় পরিবারের এই দুই রহস্যময় সন্তান মৃত্যু ছাড়া কারওরই প্রতীক্ষা করতেন না। আলি ও সাকিনা বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তাঁরা প্রাসাদের জানালা-দরজাও বন্ধ করে দেন। নিজেদের সুরক্ষার জন্য বন্দুকের লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। এবং উপরে উল্লিখিত নোটিশটি টাঙিয়ে রাখেন। মৃত্যুর দশ দিন পরে সমাধিস্থ করা হয় বেগমকে। তাঁর কবরেও গুপ্তধনের খোঁজে দুষ্কৃতীরা হানা দিয়েছিল। ততদিনে বিল জমা না দেওয়ায় মালচা মহল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুৎহীন মালচা মহলে থাকতেন ‘প্রিন্সেস’ সাকিনা এবং ‘প্রিন্স’ আলি রাজা। অতীতের দোর্দণ্ডপ্রতাপ অযোধ্যার নবাবের বংশধররা তীব্র অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবন কাটাতেন।

২০১৩ সালে মারা যান সাকিনা। তার চার বছর পরে আলি রাজা। সোফার ওপরে পড়েছিল তাঁর নিথর দেহ। পুলিশ এসে উদ্ধার করেছিল। কবে মারা গিয়েছিলেন, স্পষ্ট নয়। তবে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা নস্যাৎ করেছিল পুলিশ। ওয়াকফ বোর্ডের সাহায্যে নামমাত্রভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল অওয়ধের নবাবি বংশের উত্তরসূরিকে। ভগ্নপ্রায় মালচা মহলে ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল কিছু তামা আর পোর্সেলিনের বাসন, ছেঁড়া কাগজ, পুরনো ফটোগ্রাফ আর অনটনের চিহ্ন।

আজও ‘রহস্যময়’, ‘ভৌতিক’ এবং ‘গুপ্তধনের আধার’ পরিচয় ছেড়ে বেরোতে পারেনি মালচা মহল। আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছে সেই ইতিহাস, যা বলছে, এখানেই দারিদ্রে তিলে তিলে শেষ হয়ে গিয়েছেন এমন তিন জন যাঁদের দাবি ছিল তাঁদের পূর্বপুরুষরা এক সময় ছিলেন উত্তর ভারতের বড় অংশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

রাষ্ট্রপতির আবাস রাইসিনা হিলস-এর কাছেই এই প্রাসাদের অবস্থান। চারপাশে বেড়ে উঠেছে আধুনিক দিল্লি। কিন্তু এরই মাঝখানে এই রহস্যময় অস্তিত্ব নিয়ে থেকে গিয়েছে ভগ্নপ্রায় মালচা মহল। আর ক্রমাগত পল্লবিত হয়েছে গুজব, কাহিনি, কিংবদন্তি।

(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)

চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

লা জবাব দেহলি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More