ধৌলা কুঁয়া

এমনিতেই ধৌলা কুঁয়া নিয়ে গল্পের শেষ নেই। ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত কাহিনিটি যদি বিশ্বাস করা যায় তবে বলা হয় যে জলের কূপটি দ্বিতীয় শাহ আলম নামে এক সম্রাট তৈরি করেছিলেন। তিনি ১৭৬১ থেকে ১৮০৬ পর্যন্ত সময়সীমায় শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিতাভ রায়

    দিল্লির বাসিন্দারা তো বটেই দিল্লির বাইরের মানুষও ধৌলা কুঁয়া নামের সঙ্গে পরিচিত। কারণ ধৌলা কুঁয়ার যানজট মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার খবর হয়। আর যাঁরা এই পথের নিত্যযাত্রী বা অবরেসবরে ধৌলা কুঁয়া দিয়ে যাতায়াত করেন তাঁরা তো হাড়ে হাড়ে টের পান যানজট কারে কয়।

    খাতায়-কলমে ধৌলা কুঁয়া পাঁচটি রাস্তার সঙ্গমস্থল। গত দুই দশকে ধৌলা কুঁয়ায় এতগুলি ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, গ্রেড সেপারেটর ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে যে পুরো এলাকাটা ভাল করে বুঝে ওঠা যানজটের থেকেও বেশি জটিল। শুধুই রাস্তার বিষয় হলেও না হয় একটা কথা ছিল। এখন তার ওপর যুক্ত হয়েছে একজোড়া মেট্রোর লাইন। নতুন দিল্লি রেলস্টেশন থেকে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের তিন নম্বর টার্মিনাল বা চলতি কথায় টি থ্রি পর্যন্ত যাতায়াত করা এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস লাইনের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ধৌলা কুঁয়া। তার উপর দিয়ে চলে দিল্লি মেট্রোর পিঙ্ক লাইনের ট্রেন। সবমিলিয়ে আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থার সমস্ত উপাদানের একটা চূড়ান্ত কাটাকুটি খেলার আদর্শ উদাহরণ এখনকার ধৌলা কুঁয়া।

    কুয়াশার চাদরে জড়ানো শীতের সকাল বা লু ঝলসানো গ্রীষ্মের দুপুর, ধৌলা কুঁয়া সবসময়ই ব্যস্ত। লাখে লাখে গাড়ি আর ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ। এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস লাইনের স্টেশনের দোরগোড়ায় আবার বাসস্ট্যান্ড। দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তের বাস এখানে এসে থামে এবং যাত্রীদের নামা-ওঠার পর নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যায়। হরিয়ানা রাজ্য সরকারের অনেকগুলি বাস এখান থেকেই যাত্রা শুরু এবং শেষ করে। আলওয়ার হয়ে জয়পুর যাওয়ার রাজস্থান সরকারের বাসগুলো ইন্ডিয়া গেটের পাশে অবস্থিত বিকানির হাউস থেকে রওনা দিলেও ধৌলা কুঁয়ায় এসে দীর্ঘ বিরতি দেয়। এইটুকু পথ পরিক্রমায় কী করে যে বাসগুলো এত হাঁপিয়ে ওঠে বলা মুশকিল। তবে রাজস্থানগামী বুদ্ধিমান যাত্রীরা সরাসরি ধৌলা কুঁয়ায় হাজির হন। শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকেই হোক না কেন যাতায়াত সহজ। হাতে সময় পাওয়া যায়। আর ভাড়াও পাঁচ-দশ টাকা কম।

    এখানেই শেষ নয়। দু’পা দূরে রয়েছে দিল্লির সার্কুলার রেলের সর্দার প্যাটেল মার্গ স্টেশন। ট্রেনের নির্ধারিত সময়ে সেখান থেকেও অনেক যাত্রী ধৌলা কুঁয়ায় পৌঁছে যান। ধৌলা কুঁয়ার নিকটতম প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি পাঁচতারা হোটেল। ভারত সফরের সময় বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা এই হোটেলগুলোয় থাকতে পছন্দ করেন। এছাড়া এইসব হোটেলে নিত্যদিনই হাজারো অতিথির আনাগোনা। কাজেই গাড়ির শেষ নেই। অতিথিসেবায় নিযুক্ত কর্মীরা গাড়িতে না হলেও অন্য যেভাবেই কর্মস্থলে আসুন না কেন মূলত সেই ধৌলা কুঁয়া হয়েই আসতে হয়।

    প্রায় লাগোয়া এলাকা চাণক্যপুরী। অভিজাত মহল্লা। বড় বড় দেশের দূতাবাসের সমাহার। সব কর্মচারী তো আর বিদেশি নন। তাঁদেরও অনেককেই ধৌলা কুঁয়া পেরিয়ে আসতে হয়। কাছাকাছির মধ্যে রয়েছে শ্রীভেঙ্কটেশ্বর কলেজ, আত্মারাম সনাতনধর্ম কলেজ এবং মৈত্রেয়ী কলেজসহ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাস। এয়ারফোর্স স্কুল, আর্মি পাবলিক স্কুল, স্প্রিংডেলস স্কুল সবই তো সম্প্রসারিত ধৌলা কুঁয়া এলাকার অংশ। সুব্রত পার্কের এয়ারফোর্স অডিটোরিয়াম, দ্য আর্মি গল্ফ কোর্সই বা কতদূর! প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীন অভিজাত হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রও ধৌলা কুঁয়ার প্রতিবেশী। একেবারে ভৌগোলিক বিচারে দিল্লি ছাউনি বা ক্যান্টনমেন্ট আর দিল্লি শহরের সীমানা আক্ষরিক অর্থে নির্ধারণ করে ধৌলা কুঁয়া।

    নানান রকমের এত শত যানবাহন, লক্ষ লক্ষ মানুষের নিত্যদিনের পদচারণায় হারিয়ে যায় সত্যিকারের ধৌলা কুঁয়া। এখানে কেউ যেন দু’দণ্ড জিরোবার জন্য আসে না। সকলের একটাই চিন্তা কী করে কত তাড়াতাড়ি ধৌলা কুঁয়া পেরিয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছনো যায়। গাড়িতে বসে থাকলে মনে হয় আর কতক্ষণ এই যানজটে ফেঁসে থাকতে হবে। তার থেকেও বড় সমস্যা সড়কফলক বা রোড সাইনেজ। একবার ভুল করলে কত কিলোমিটার যে বাড়তি চক্কর কাটতে হবে কে জানে। বাসের জন্য অপেক্ষা করলে সবসময় মনে হয় ঠিক জায়গায় অপেক্ষা করছি তো? নির্ধারিত বাস এখানেই থামবে কি না সে এক চিন্তার বিষয়। মেট্রোর অবিশ্যি অত ঝামেলা নেই। সে এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস লাইন হোক বা পিঙ্ক লাইন। ঝকঝকে স্টেশনের বোর্ডে সোজাসাপ্টা লেখা এবং দিকনির্দেশ। আর পদচারী! বেচারি। সবসময় দুশ্চিন্তা, এই বুঝি ঘাড়ের উপর গাড়ি এসে আছড়ে পড়ল।

    তবুও যদি সময় সুযোগ এবং ইচ্ছে থাকে তবে একবার ধৌলা কুঁয়ার খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। এখানে আবার এক জটিল প্রশ্ন। ধৌলা কুঁয়া মানে কী? সাদা রঙের কুয়ো? না কী যে কুয়োর জলের রং সাদা? ঘরে বসে নেটে ঘেঁটে এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা না করে সরাসরি একবার সরেজমিনে দেখে এলেই হয়। এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস মেট্রোর ধৌলা কুঁয়া স্টেশনের পাশে রয়েছে এক বিরাট আকারের পেট্রোল পাম্প। স্টেশন আর পেট্রোল পাম্পের মাঝে বাঁদিকে চলে গেছে এক সরু রাস্তা। সেই রাস্তার মোড়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক সড়কফলকে লেখা আছে, ডিডিএ ঝিল পার্ক। রেলিং ঘেরা পার্কে নিশ্চিন্তে প্রবেশ করা যায়। আপত্তি জানানোর কেউ নেই। আর আইনত প্রবেশ নিষিদ্ধ নয়। পার্কের ভেতরে গেলেই বাঁ দিকে শুধু রেলিং নয় রীতিমতো লোহার জাল ঘেরা একটা কুয়ো নজরে আসবে। পাথরের তৈরি কুয়োর পাড়। তবে সাদা পাথর নয়। কুয়োর পাড়ে রাখা দড়ি বালতি দেখে বোঝা যায় কোনও এককালে কুয়ো থেকে জল তোলা হত। এবং সেই জলের রং নাকি সাদা। কাজেই ধৌলা কুঁয়া। হবেও বা!

    নিঃসন্দেহে এটি একটি খুব পুরানো কূপ। ডিডিএ অর্থাৎ দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যারা ঝিল পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছে তারা নাকি কোনও এক সময় পাম্প বসিয়ে এই কুয়োর জল তুলে পার্কের বাগানে জলসেচ করত।

    এমনিতেই ধৌলা কুঁয়া নিয়ে গল্পের শেষ নেই। ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত কাহিনিটি যদি বিশ্বাস করা যায় তবে বলা হয় যে জলের কূপটি দ্বিতীয় শাহ আলম নামে এক সম্রাট তৈরি করেছিলেন। তিনি ১৭৬১ থেকে ১৮০৬ পর্যন্ত সময়সীমায় শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর শাসনাধীন এলাকার ভৌগোলিক আয়তন ছিল খুবই ছোট এবং তিনি দিল্লির এই অঞ্চল থেকেই শাসন করতেন। বলা হয়, দৃঢ়চেতা দ্বিতীয় শাহ আলম দুঃসাহসিক কাজ পছন্দ করতেন। এই কারণেই তিনি নিয়মিত তাঁর রাজ্য ঘুরে বেড়াতেন। যে রাজ্যের সীমানা লালকেল্লা থেকে পালাম অঞ্চল পর্যন্ত নির্ধারিত সেখানে নিয়মিত চক্কর লাগানো কী আর এমন কঠিন কাজ! জনশ্রুতি, তাঁর সাম্রাজ্যকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা হত সুলতানত-ই-শাহ-ই-আলম, আজ দিল্লি তা পালাম (অর্থাৎ, তাঁর রাজ্য দিল্লিতে শুরু হয়ে পালামে শেষ হয়)। তবে তিনি উচ্চ ঘর, মোঘলরাজের বংশধর। আন্দাজ করা হয় তাঁর আমলেই ধৌলা কুঁয়া তৈরি হয়।

    এখনকার ঝিল পার্ক বাস্তবে একটি অবহেলিত উদ্যান। ছায়াঘেরা নির্জন বাগানটি পিকনিকের জন্য আদর্শ জায়গা। আবহাওয়া মনোরম থাকলে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে ভালই লাগে। ক্লান্তি দূর করার জন্য নিশ্চিন্তে গাছের তলায় বসে অবসর যাপন করা যায়। তবুও সারাদিনে ক’জনই বা আসে!

    ডিডিএ ঝিল পার্কের মালিক। কিন্তু ধৌলা কুঁয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। প্রাচীন কুয়োটিকে আবার সক্রিয় করে তোলা তো দূরের কথা ধৌলা কুঁয়া সম্পর্কে কোনও প্রচারও হয় না।

    নথিতে লেখা না থাকলেও স্থানীয় বিশ্বাস অনুসারে ধৌলা কুঁয়ার অবস্থান অন্যত্র। ধৌলা কুঁয়া থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার এক্সপ্রেসওয়ে যা আদতে ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের অংশ, তার দু’পাশের বেশিরভাগ জমিতেই সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তর আবাসন অবস্থিত। তার মধ্যেই কোথাও কোথাও ছোট ছোট কয়েকটি মহল্লায় বসবাস করেন একদল স্থানীয় মানুষ যাঁরা কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানকার বাসিন্দা। সরকারি বিধি অনুসারে তাঁদের উৎখাত করা নিষিদ্ধ। তাঁদের বিশ্বাস আসল ধৌলা কুঁয়া নাকি এক্সপ্রেসওয়ের ধারে কোনও এক বসতিহীন ঝোপঝাড়ের মধ্যে অবস্থিত। এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস মেট্রোর ১৮৪ নম্বর স্তম্ভের কাছাকাছি অবস্থিত পিরবাবা মাজারের পিছনে যে জঙ্গলাকীর্ণ উপল উপচানো জমি রয়েছে তার মধ্যেই নাকি ধৌলা কুঁয়ার প্রকৃত অবস্থান। সত্যিমিথ্যা নিরসনের দায়িত্ব পালন করবেন ইতিহাসবিশারদ।

    বছরের একটি দিন ভাল করে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার লগ্নে কুয়াশার চাদর জড়ানো ওই পথে এগিয়ে চলেন একদল মহিলা। পরনে পরিষ্কার শাড়ি। হয়তো বা একেবারেই আনকোরা। হাতে ফুলের ডালি। ডালিতে ফুলের পাশে রাখা থাকে ধূপকাঠি, প্রদীপ, দিয়াশলাই এবং ছোট্ট এক বাটিতে চন্দন ও সিঁদুর। এবড়োখেবড়ো পাথর এড়িয়ে ঝোপঝাড় পেরিয়ে নিশ্চিন্তে এগিয়ে চলে প্রমিলাবাহিনী। তাঁদের অনুসরণ করলে দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট পাথরঘেরা গহ্বরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা এক অচেনা সুরে একযোগে কিছু বলতে শুরু করেন। পাথরের রং মোটেও শ্বেতশুভ্র নয়। তারপর পাথরের গায়ে এঁকে দেন চন্দন ও সিঁদুরের ফোঁটা। জ্বালানো হয় প্রদীপ ও ধূপকাঠি। সবশেষে ফুলের মালা গহ্বরে নিক্ষেপ করে শুরু হয় ফেরত যাত্রা। গহ্বরের ভেতরে জল আছে কিনা এবং তার রং সাদা কিনা বলা মুশকিল। ফুলের স্তূপ তো সবকিছু ঢেকে দিয়েছে। বছরে শুধু এই একটি দিনই এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। দিনটি হল বসন্ত পঞ্চমী।

    শুধুমাত্র প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ধৌলা কুঁয়ার হিত কামনায় বছরের পর বছর এই ব্রত পালন করা হচ্ছে। কবে থেকে? কেউ জানে না। বছরের অন্য কোনওদিন পাথরঘেরা গহ্বর খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবুও এইভাবেই সাধারণ মানুষের মনের মাঝে বেঁচে থাকা বিশ্বাস সম্বল করেই এগিয়ে চলে ভারতবর্ষ। ইতিহাসের নথি যুক্তি তর্ক বিশ্লেষণ সবকিছুই যেখানে হারিয়ে যায়।

    (অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)

    চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

    লা জবাব দেহলি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More