বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

রমাপদ চৌধুরীর বলা একটি গল্প

সমর মিত্র

ষাট সত্তর বছর আগেকার কথা। এক ভদ্রলোকের স্ত্রী আর ছোট্ট একটি ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার। কলকাতায় ভাড়া বাড়িতে থাকেন। মোটামুটি ভালো চাকরি করেন। তাঁর  ধরুন বর্ধমান জেলারই কাটোয়ার কাছে একটি গাঁয়ে বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে বাবা-মা ছিলেন। কিন্তু এখন মৃত। কিছু জমি জায়গা আছে, পুকুর আছে, আর  আশে পাশে আছে কিছু আত্মীয় পরিজন। ভদ্রলোকের বছরে একবার করে গ্রামে আসা চাই-ই। কারণ ছোটবেলাটা তাঁর গ্রামেই কেটেছে তো! তাঁর স্ত্রীরও গাঁয়ে আসতে ভালোই লাগে। আর মেয়েটি তো গাঁয়ে আসার কথা শুনলেই নাচতে থাকে। এইটুকু বলেই আমি একটু থামি। কারণটা বলছি।
এটা আমার গল্প নয়। এটা আমাকে বলেছিলেন বিশিষ্ট লেখক রমাপদবাবু, প্রয়াত রমাপদ চৌধুরী।  যিনি গত বছর ঠিক এই দিনে অর্থাৎ ৩১ জুলাই প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতিতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় তাঁরই বলা একটি গল্প ফের বলছি আমি। তিনি এক শনিবার সন্ধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে তাঁর ঘরে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমার কাজের চাপ ছিল না। আমি তখনই চলে গেলাম। তিনি বললেন, শুনুন, একটা গল্প আমাকে খুব ভাবাচ্ছে।  এটা কোথায় পড়েছি না আমাকে কেউ বলেছিল, কিছুই মনে পড়ছে না। কিন্তু গল্পটা মনে পড়ে গেল। আর তার পর থেকে খুব অস্থির অস্থির লাগছে। দেখুন তো শুনে, এটা কোথাও পড়েছেন কিনা। আমি ওঁর সামনে বসলাম। উনি বলতে লাগলেন।
প্রতিবারের মতো সেবারও ভদ্রলোক  বৌ-মেয়েকে নিয়ে গাঁয়ে এসেছেন। সেবার এসেছিলেন পুজোর সময়। গাঁয়ের পুজো বেশ ভালোই কাটল তাঁদের। ভালো কাটল বিশেষ করে তাঁদের মেয়ের।  ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা, গঙ্গা যমুনা, এক্কা দোক্কা খেলা, ফাঁকা মাঠে দৌড়োদৌড়ি, এমন স্বাধীনতা তো শহরে নেই।  একদিন বিকেলে  মেয়ে ওদের বাড়ির উঠোনে সমবয়সীদের সঙ্গে  লুকোচুরি খেলছে। ভদ্রলোক একটু বেরিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী পাড়ায় একটা বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। মেয়েদের খেলা বেশ জমে উঠেছে। একবার এ চোর হচ্ছে , বাকিরা লুকোচ্ছে। আর একবার আর একজন চোর হচ্ছে, অন্যরা আড়ালে চলে যাচ্ছে। মেয়েটির চোর হওয়া হয়ে গেছে। এখন সে লুকোচ্ছে। এই করতে করতে একটা অন্য মেয়ে চোর হয়েছে। ওই মেয়েটি সমেত সবাই লুকিয়ে পড়েছে। চোর মেয়েটি সবাইকে একে একে ছুঁয়ে ফেলল। কিন্তু ওই মেয়েটিকে বার করতে পারল না। কোথায়  গেল? এখান থেকে গেল কোথায়! ক্রমে ক্রমে ছোটরা থেকে বড়রা জানল, মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়ের মা জানতে পারলেন। ভিন পাড়ায় মেয়ের বাবার কাছেও খবর পৌঁছল।  সবাই, পাড়ার লোকেরাও হাজির হল। এদিক ওদিক এ পাড়ার ও পাড়ার বাড়ি বাড়ি খোঁজ চলল। কোথাও পাওয়া গেল না। বাড়ির উত্তরে খিড়কির দরজা। সেই দরজা দিয়ে বেরোলেই একটা বড় পুকুর।  ওই পুকুরে  যদি —- পরদিন সকালে জেলেরা এল জাল নিয়ে। জাল টানা হল বেশ কয়েকবার। কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না। সবাই স্থির করল, নিশ্চয়ই মেয়েটিকে ছেলেধরায় ধরে নিয়ে গেছে। ভদ্রলোককে সবাই থানায় যেতে পরামর্শ দিল। তিনি গেলেন। দারোগা মেয়েটির ছবি চাইলেন। জিগ্গেস করলেন,মেয়েটির গায়ে কোনও সোনার গয়না ছিল কিনা। ভদ্রলোক বললেন, একটা হার ছিল। হারের লকেটে মেয়ের নাম লেখা আছে। দারোগা বললেন, ধরে ফেলেছি, ওই সোনার লোভেই আপনার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। আমার মনে আর কোনও সন্দেহ নেই। আপনি আপনার নাম , কলকাতার ঠিকানা সব দিয়ে যান।  কোনও সন্ধান পেলে আপনি জেনে যাবেন।
ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে এলেন।  তিনি ও তাঁর স্ত্রী শোকে যেন পাথর হয়ে গেলেন। তবু মনে হল, যদি সে ফিরে আসে। আরও কয়েকদিন  ওঁরা গ্রামের বাড়িতে থেকে গেলেন। কিন্তু  মেয়ের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। অগত্যা দুটি মৃতপ্রায় মানুষ ফিরে গেলেন শহরে। তবু ওঁরা আশা ছাড়েননি। যদি গ্রামের লোকরা  কোনও খবর দেয়। থানা থেকে যদি কোনও খবর আসে। কিন্তু কোনও খবরই এল না। তবু দিন এগিয়ে চলল। সূর্য উঠতে লাগল, রাত্রি  আসতে লাগল। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাটল। কিন্তু ওই দুটি মানুষের দিন আর যেন কাটতে চায় না।  এই করতে করতেই ভদ্রলোকের রিটায়ার করার সময় এসে গেল।  ওঁদের সম্বল তো শুধু মেয়ের স্মৃতি। ভদ্রলোকের স্ত্রীই বললেন, চল,  আমরা শেষজীবনটা দেশে গিয়েই কাটাই। ওর আমাদের সঙ্গে শেষের দিনগুলো তো ওখানেই কেটেছে। ভগবান চাইলে  আমাদের শেষ সময়ে হয়তো তার দেখা পেয়ে যাব। ভদ্রলোক রাজি হলেন।
রিটায়ারমেন্টের পর স্ত্রীসমেত ভদ্রলোক গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলেন। বহুদিন পর গ্রামে ফেরা। বাড়িটা আগে থেকেই একটু বাসযোগ্য করা হয়েছিল। কিন্তু এদিক ওদিক নানা জঞ্জালে ভরা, উঠোনময় নানা গাছও গজিয়ে উঠেছিল। ওঁরাই লোক লাগিয়ে সেগুলো পরিস্কার করাচ্ছিলেন। উঠোনের গাছ আগাছা কাটতে কাটতে দেখা গেল, একেবারে কোণে একটা বড় তোরঙ্গ পড়ে রয়েছে। ভদ্রলোক বললেন, ওটা কী হবে। ওটাকে বিদায় করে দে। মজুরদের একজন এগিয়ে গেল। সে দেখল, তোরঙ্গে তালা লাগানো নেই। শুধু আঙটা লাগানো। সে আঙটা খুলে ঢাকনা তুলেই ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, বাবু!  ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। তাঁর স্ত্রী এলেন। এবং দেখলেন, তোরঙ্গের ভেতরে শুয়ে আছে তাঁদের আদরের মেয়ের কঙ্কাল, গলায় হার। লুকোবার জন্যে ঢুকেছিল খোলা তোরঙ্গে। কিন্তু ডালা পড়ে গিয়ে সে বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। তখন কারও এই তোড়ঙ্গের দিকে নজর পড়েনি। ওঁরা আর গাঁয়ে থাকেননি। থাকতে পারেননি। শহরে ফিরে  এসেছিলেন।
আমি অনেক খুঁজেছি, এই গল্পের হদিশ পাইনি। জানি না, রমাপদবাবু খুঁজেছিলেন কিনা। আমার কিন্তু দৃঢ় বি‌শ্বাস, এই গল্প ওঁর নিজেরই। লিখতে চাইতেন। অথচ লেখেননি। স্বকপোলকল্পিত। আমরা জানি, বর্ধমানের গ্রামে বিখ্যাত যোগাদ্যা মন্দিরের কাছের একটি গ্রামে ওঁদের আসল বাড়ি। কিন্তু তিনি বহুদিন গ্রাম ছেড়েছেন।  খড়গপুরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরে তাঁর দুই মেয়েকে নিয়েও তিনি নিশ্চয়ই দেশের বাড়িতে যাননি। গ্রাম সম্পর্কে তাঁর অন্তর্লীন দুর্বলতা ছিল। কিন্তু গ্রামে নিরাপত্তা সম্পর্কে দূরজাত একটা সংশয়ও ছিল। আপনজনদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য তিনি বড় ব্যাকুল ছিলেন। আমরা যাঁরা তাঁর খুব কাছাকাছি ছিলাম, তাঁদের জন্যও তাঁর উদ্বেগ ছিল। তাঁর গ্রামটিকে তিনি সযতনে  মনের মধ্যে রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর ‘হারানো খাতা’য় তার সেই পরিচয় মেলে। কাছের গ্রাম বনকাপাসীকে করে দিলেন বনপলাশী। তার পদাবলি গাইলেন। জীবনের শেষের দিকে ফোন করলেই তিনি  বলতেন, গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন তো? জমি, পুকুর ইত্যাদির খোঁজ নিতেন।  তাই ওই গল্প আমি মনে করি, তাঁর নিজেরই। সন্তানের জন্য এক উদ্বিগ্ন পিতৃহৃদয়ের সতর্ক উচ্চারণ। অথচ সেই গ্রামের প্রতি মমতায় গভীরভাবে পূর্ণ সেই হৃদয়। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে স্নেহব্যাকুল সদাসতর্ক সেই হৃদয়কে আমি একটু ছুঁতে চাইলাম। তাঁকে আমার বিনম্র প্রণাম।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন  মুখ্য সহ সম্পাদক সমর মিত্র পরবর্তী সময়ে বর্তমান পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদ কর্মের মধ্যে লেখক নিরন্তর সৃজনশীল রয়েছেন।

Comments are closed.