বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

সেলিমগড় : চোখের বাইরে থাকা ঐতিহ্য

অমিতাভ রায়

সেলিমগড় দেখতে  গেলে কেমন হয়? হঠাৎ এমন প্রস্তাব দিলে অধিকাংশ মানুষই প্রশ্ন করবেন,- সেলিমগড়? সেটা আবার কোথায়? সেটাই স্বাভাবিক? সেলিমগড়ের পাশ দিয়ে যাতায়াতকারী লক্ষাধিক নিত্যযাত্রীদের  অধিকাংশই তো  সেলিমগড়ের হদিশ রাখেন না। আচমকা  সেলিমগড়ের ঠিকানা জানতে চাইলে ইতিহাসের ছাত্রদেরও থতমত অবস্থা।

অন্যদের কথা তো কোন ছাড়। দেশের রাজধানীর প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লাল কেল্লার প্রতিবেশী সেলিমগড় দিল্লির অধিকাংশ বাসিন্দাদের কাছেই অপরিচিত। অথচ বয়সের হিসেবে সেলিমগড় লাল কেল্লার থেকেও একশো বছরের বেশি পুরনো। ১৫৪৬ সালে শের শাহ সুরি-র ছেলে সেলিম শাহের উদ্যোগে শুরু হয়  সেলিমগড় গড়ে তোলার কাজ। যমুনার পূর্ব পাড়ে  প্রায় চল্লিশ একর আয়তনের একটি নদী-দ্বীপের উপর গড়ে তোলা হয়েছিল সেলিমগড়। পরে যমুনা নদীর খাত বদলে যাওয়ায় সেলিমগড় হয়ে গেছে লাল কেল্লার প্রতিবেশী। এখন দুই প্রাচীন দুর্গের মধ্যে রয়েছে দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা আউটার রিং রোড, যা একটু এগিয়ে জাতীয় সড়ক হয়ে চলে গেছে সোনিপত-কর্নাল-আম্বালা-লুধিয়ানা-জলন্ধর হয়ে অমৃতসর। ব্যস্ত রাস্তার ওপর ইটের খিলানে তৈরি  একটি সেতু দুই দুর্গের যোগাযোগ রক্ষা করে।

লাল কেল্লা তৈরির সময় নজরদারির জন্যে সম্রাট শাহজাহান যখন দিল্লি আসতেন তখন তাঁর সাময়িক বাসস্থান হত সেলিমগড়। ঔরঙ্গজেব তখতে বসার পরে অবিশ্যি সেলিমগড়ের চরিত্র পালটিয়ে গেল।  সেলিমগড় হয়ে গেল রাজকীয় কারাগার।  প্রথম বন্দি ঔরঙ্গজেবের সহোদর ভ্রাতা মুরাদ বক্স।   অবশ্য  ঔরঙ্গজেবের আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দির নাম জেবউন্নিসা। ঔরঙ্গজেবের বড় মেয়ে জেবউন্নিসাকে পিতার  হুকুমে একুশ বছর সেলিমগড়ে কারাবন্দি হয়ে কাটাতে হয়। বন্দি হিসেবেই সেলিমগড়ে  জেবউন্নিসার মৃত্যু হয়।

জেবউন্নিসা

তারপর থেকেই পাকাপাকি ভাবে কারাগার হয়ে গেল  সেলিমগড়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী অভ্যুত্থানের পরে যে সব ভারতীয় সৈন্যদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন বন্দি করেছিল তাদেরও রাখা হয়েছিল সেলিমগড়ে। সবশেষে আজাদ হিন্দ ফৌজের ষোলো হাজার সৈন্যকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে এই সেলিমগড়েই  বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

দেশভাগের পরে সেলিমগড়কে অতি সন্তর্পণে  ভূতুড়ে বাড়ি আখ্যা দিয়ে দেওয়া হল। লোকমুখে গল্পগাছা ছড়িয়ে দেওয়া হল।  রাতের বেলায় সেলিমগড়ের বারান্দায় নাকি জেবউন্নিসাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।  তিনি নাকি স্বরচিত শায়েরি আবৃত্তি করতে করতে পায়চারি করেন। কবি হিসেবে জেবউন্নিসা বিখ্যাত ছিলেন বলেই বোধ হয় কাব্যচর্চার কাহিনীটি প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছিল। রাতের আঁধারে এখানকার বাতাসে  নাকি সিপাহী অভ্যুত্থানে যুক্ত বন্দি  ভারতীয় সৈন্যদের হাহাকার ভেসে বেড়ায়।  শোনা যায় আজাদ হিন্দ ফৌজের যে সব সদস্য এই কেল্লায় ক্ষুধার জ্বালায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান, রাত্রি ঘনিয়ে এলে নাকি তাঁদের ফিসফিসানি সেলিমগড়ের অলিন্দে ছড়িয়ে পড়ে।  সবমিলিয়ে ভূতুড়ে বাড়ির তকমা পাওয়া সেলিমগড়ে তালা লাগিয়ে ঐতিহাসিক কেল্লাটিকে  সাধারণের নজরের বাইরে রেখে দেওয়া হল।

ঔরঙ্গজেব

আইএনএ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা বলতে গেলে সেলিমগড়কে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।  এখানেই আজাদ হিন্দ ফৌজের ষোলো হাজার সৈন্যকে যুদ্ধবন্দি অর্থাৎ প্রিজনরস অফ ওয়ার সংক্ষেপে পিওডব্লিউ হিসেবে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

নাজি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কথা বহু প্রচারিত।  সময়-সুযোগ হলে অনেকেই সেইসব  ভয়ঙ্কর কারাগার দেখে আসেন। কিন্তু দেশের রাজধানীতে অবস্থিত সেলিমগড় যা আদতে নাজি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের  ভারতীয় সংস্করণ ছাড়া অন্য কিছু নয়, তার খবর কে রাখে?

১৯৯৬-এ কেন্দ্রের  যুক্তফ্রন্ট সরকারে প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা  ইন্দ্রজিত গুপ্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব পাওয়ার পরে সেলিমগড়ে একটু একটু করে খোলা হাওয়া বইতে শুরু করে। ইন্দ্রজিত গুপ্তের ব্যক্তিগত  আগ্রহে এতদিন বাদে সেলিমগড়ের তালা খুলে আরম্ভ হল সংরক্ষণ ও  রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। সেলিমগড়ের স্যাঁতসেঁতে ঝিম ধরা ঘর-বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ল যমুনার দিক থেকে ভেসে আসা  বিশুদ্ধ বাতাস। এই আবহে  ১৯৯৭-এর ২৩ জানুয়ারি  লাল কেল্লায় উদযাপিত হল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের জন্মশতবার্ষিকী। সেদিন সন্ধ্যায় লাল কেল্লার দেওয়ান-ই-আম-এ   অভিনীত হল উৎপল দত্ত রচিত নাটক দিল্লি চলো । সে এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যা। এর আগে বা পরে লাল কেল্লার প্রাঙ্গণে এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি।   সেলিমগড়ের দরজা সেদিন ছিল সর্বসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত। নাটক দেখার পরে যে কয়েকজন  উৎসাহী দর্শক জানুয়ারি মাসের দিল্লির ঠান্ডা উপেক্ষা করে সেলিমগড় পরিক্রমা করেছিলেন তাঁদের কানে কোনও ক্রন্দন-হাহাকার-ফিসফিসানি পৌছিয়েছিল কি ?

যুক্তফ্রন্ট সরকার টেঁকেনি।  ইন্দ্রজিত গুপ্ত প্রয়াত। স্বাভাবিক কারণেই সেলিমগড়  পুনরুদ্ধারের কাজে ঢিলেমি এল।   সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগ থাকলে যে গতিতে কাজ হয় তা স্তিমিত হয়ে পড়ল। তবে  আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন  সদস্যদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক ছোট্ট সংগঠন এবং কয়েকজন সরকারি আধিকারিকের ধারাবাহিক উদ্যমের ফলে  ২০০৭–এর ৩১ ডিসেম্বর সেলিমগড় পেল আন্তর্জাতিক মর্যাদা।  ইউনেস্কো সেলিমগড়কে বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যপূর্ণ স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করার পরে এখন সেখানে একটি সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ব্যাস, ওই পর্যন্ত হয়েই সব থমকে গেছে। সোমবার বাদে সপ্তাহের প্রতিদিন সরকারি নিয়মে সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে সেলিমগড়।  পর্যটক বা দর্শক কতজন ? এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা বৃথা।  এমনভাবে সেলিমগড়ে প্রবেশের ব্যবস্থা হয়েছে যে অত্যুৎসাহী কয়েকজন ছাড়া বাদবাকিরা সেলিমগড়ের দরজা  পর্যন্ত  পৌঁছোতে পারেন না। লাল কেল্লার শেষ প্রান্তের  এক সঙ্কীর্ণ সেতু পেরিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে সেলিমগড়ে প্রবেশের ব্যবস্থা হয়েছে। সারাদিন ধরে লাল কেল্লা পরিক্রমা শেষ করার পরে দর্শক যখন ক্লান্ত ঠিক সেই মুহূর্তে সেলিমগড়ের প্রবেশপথ  নজরে এলেও শরীরে দেয় না।  সময়ও ফুরিয়ে আসে।  কাজেই সেলিমগড়ের ভেতরে যাওয়ার অবকাশ কোথায়!

লাল কেল্লায় খিড়কি দুয়ারে যেখানে স্বতন্ত্রতা সেনানী স্মারক লেখা প্রস্তর ফলক বসানো আছে  সেই পথেই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলে সেলিমগড়ের খিড়কির দরজা দিয়ে ভেতরে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে।  না, সদর দরজা দিয়ে সেলিমগড়ে যাওয়ার রাস্তা এখন পুরোপুরি বন্ধ।  সেলিমগড়কে অন্তরালে রাখার সর্বাঙ্গীন প্রচেষ্টার এও এক নিদর্শন। দিল্লির পর্যটন মানচিত্রেও সেলিমগড়ের নাম উল্লিখিত হয় না। সবমিলিয়ে সেলিমগড় একটি ব্রাত্য স্থাপত্য।

এতকিছু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে  ভেতরে গেলেই নজরে আসবে পাথরের পাঁচিল ঘেরা ত্রিভূজাকৃতি জমির উপর ছড়িয়ে  রয়েছে এক অর্ধ-বৃত্তাকার দুর্গ। অনেক প্রাকৃতিক-রাজনৈতিক-সামরিক ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে প্রায় বিনা রক্ষণাবেক্ষণেই  দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছে বহু ইতিহাসের সাক্ষী সেলিমগড়। ঘন্টা দু-আড়াই ধরে ভালো করে ঘুরে দেখার পরে উপলব্ধি হয় সিপাহী অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অথবা আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের কী অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাতে হত। মূল দুর্গের চারপাশে সাজানো প্রশস্ত বাগিচা দৃষ্টিনন্দন হলেও তা দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধবন্দিদের করুণ অবস্থাকে ঢেকে রাখা যায়!

এককথায় নাজি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলির সমস্ত উপকরণ সেলিমগড়ে উপস্থিত। শুধু গ্যাস চেম্বার অনুপস্থিত। ষোলো হাজার মানুষকে গাদাগাদি করে থাকতে হত। সকলের জন্য সাধারণ শৌচালয়। নাজি ক্যাম্পের মতো এখানেও কোনও দরজার বালাই নেই। সবমিলিয়ে এক গা গুলিয়ে যাওয়া সফর।

নাজি জার্মানিতে ছিল বারোশো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আর জার্মানির অধিকৃত এলাকায় স্থাপিত হয়েছিল ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পনেরো হাজার কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্যোগে অসউইৎজ আর দাসাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প দুটি প্রচারের আলোয় এসেছে। সাবেক পূর্ব জার্মানির দু-একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পও পর্যটকদের জন্য অবারিত ছিল। দুই জার্মানি এক হয়ে যাওয়ার পরে সেই বন্দিশিবিরগুলির এখন আর কোনও খবর পাওয়া যায় না।  আর বাদবাকিগুলিকে এমনভাবে আড়াল করে রাখা হয়েছে যে স্থানীয় মানুষের কাছেও তাদের পরিচয় অজ্ঞাত। সেলিমগড়ও যেন সেই ধারার অনুসারী।  চূড়ান্ত বিচারে ইতিহাসকে কি ঢেকে রাখা যায়!

সেলিমগড় মিউজিয়ামে আজাদ–হিন্দ ফৌজের পোশাক

নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে আবেগমথিত ভাষণ দেওয়ার সময় কোনও বক্তা  একটিবারের জন্যও   সেলিমগড়ের  নাম উচ্চারণ করেন কি? আসলে প্রচলিত ইতিহাসকে মুছে ফেলে স্বরচিত ইতিহাস প্রণয়নে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় সেলিমগড় অনুচ্চারিত। আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিরা  দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত। সেইভাবে বিচার করলে    আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন বা ইতালির গ্যারিবল্ডিকেও তো দেশদ্রোহী আখ্যা দিতে হয়।    জীবন বাজি রেখে যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধাপরাধী, দেশদ্রোহী  তকমা সরিয়ে নেওয়ার কোনও উদ্যোগ নেই। ঝাঁসির শ্রীপিতজীর  মতো প্রাক্তন আইএনএ সৈন্যকে চুরানব্বই বছর বয়সে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে  ঘুরে বেড়াতে হয় । এমন কত প্রাক্তন আজাদি সেনানী দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে চূড়ান্ত দারিদ্রে জীবনযাপন করছেন তাঁদের কথা কে ভাবে? তাঁদের কাছে গিয়ে সেলিমগড়ের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেত।

আজাদ–হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন সেনানী শ্রীপিতজী

স্বরচিত ইতিহাস প্রচারের  আগ্রাসী মানসিকতার দাপটে  আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপনের অবসরে রাসবিহারী বসুর নামও উচ্চারিত হয়  না।  বাদ পড়েন  ক্যাপ্টেন মোহন সিং। ভারতের সর্বজাতি, সর্বধর্ম সমন্বয়ের বিষয়ে   আজাদ হিন্দ ফৌজের  অবদান সম্পর্কেও   কিছুই বলা হয়  না।  আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যান্টিনে তামিল-বাঙালি, হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সকলকেই একই সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতে হত।   আজাদ হিন্দ ফৌজের মূলমন্ত্র ইতমদ (আস্থা), ইত্তেফাক (ঐক্য) এবং কুরবানি (আত্মত্যাগ) সম্পর্কেও কেউ  কিছু বলেন না। সেই ধারাবাহিকতায় সেলিমগড় আজও অনালোচিত। এবং অবহেলিত ।

লেখক ভারত সরকারের প্রাক্তন পরিকল্পনা উপদেষ্টা

Comments are closed.