কেন স্বামীদের অ্যাকাউন্ট থেকে দশ কোটি টাকা সরিয়েছিলেন ন’জন বান্ধবী, তিরিশ বছর ধরে

শৈশব থেকে একসাথে আছেন অত্যন্ত ঘনিষ্ট ন'জন বান্ধবী। এক স্কুলে পড়া, একই শহরে বিয়ে, একই জায়গায় বাড়ি কেনা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    আমেরিকার পশ্চিম টেনেসির এক সম্ভ্রান্ত এলাকা। শৈশব থেকে একসাথে সেখানেই আছেন অত্যন্ত ঘনিষ্ট ন’জন বান্ধবী। এক স্কুলে পড়া, একই শহরে বিয়ে, একই জায়গায় বাড়ি কেনা। আজও এই ন’জন বান্ধবী, একে অপরকে ‘বোন’ বলে ডাকেন। আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। এক দুপুরে তাস খেলতে খেলতে ন’জন বান্ধবী ঠিক করেছিলেন তাঁরা অসহায়দের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু কাউকে না জানিয়ে। খেলার ছলেই সেইদিনই তৈরি হয়েছিল এক গুপ্ত সংগঠন, নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য নাইন নানাস’।

    অসহায় মানুষের সেবা করতে গেলে প্রয়োজন অর্থের। ন’জন বান্ধবী তাই ঠিক করেছিলেন, নিজেরাই নিজেদের পরিবারের সব কাপড় কাচবেন। লন্ড্রিতে পাঠাবেন না। লন্ড্রির পয়সা জমিয়ে দুঃস্থদের সেবা করবেন। শুরুর দিকে মাসে প্রায় ৪০০ ডলার করে জমিয়ে ফেলতে শুরু করেছিলেন ন’জন বান্ধবী। প্রত্যেকের বয়েস ছিল তিরিশের কোঠায়। স্বামীরা অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর শুরু হতো বান্ধবীদের কাপড় কাচাকাচি। ফলে স্বামীরা জানতেই পারতেন না।

    শুরু হয়েছিল বান্ধবীদের গোপন মিশন

    তহবিল তৈরি হওয়ার পর বান্ধবীরা নেমে পড়েছিলেন আর্তের সেবায়। স্বামীরা অফিসে বা ব্যবসার কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর বান্ধবীরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। বুঝতে চেষ্টা করতেন, কারা অসহায়, কাদের সাহায্য প্রয়োজন। খুবই কঠিন কাজ। কারণ, অনেকেই ইচ্ছা করে অসহায়ের অভিনয় করেন। তাই শোনা কথার চেয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রেখেছিলেন বান্ধবীরা। তাঁরা যাঁকে মনে করবেন, একমাত্র তাঁকেই সাহায্য করবেন। এভাবে দিনের পর দিন ঘুরে, গাড়ির প্রচুর তেল পুড়িয়ে, খুঁজে পেয়েছিলেন এক ভবঘুরে মানুষকে।

    ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাস। টেনেসিতে সে বছর জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল। ২৫ ডিসেম্বর ভোর রাতে,গাড়ি করে বেরিয়ে পড়েছিলেন, বান্ধবীদের দলনেত্রী মিসেস মেরি অ্যালেন। একটি ব্রিজের তলায় দেখতে পেয়েছিলেন মানুষটিকে। প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যেই গুটিশুটি মেরে মানুষটি শুয়ে ছিলেন, রাস্তার ধারে থাকা একটি প্যাকিংবাক্সের মধ্যে। মিসেস অ্যালেন মানুষটির ঘুম না ভাঙিয়ে, পাশে রেখে দিয়েছিলেন একটি ভারী প্যাকেট।

    ঘুম ভাঙার পর, পঁচিশে ডিসেম্বর সকালে মানুষটি বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাঁর পাশে রাখা আছে একটি প্যাকেট। তার ওপর সেলোটেপ দিয়ে মারা আছে একটি চিরকুট। তাতে লেখা ,”কেউ একজন, যে তোমায় ভালোবাসে।” প্যাকেট খুলে গৃহহীন মানুষটি পেয়েছিলেন, এক পাউন্ড কেক, প্রচুর কমলা লেবু,শীতের জ্যাকেট, কম্বল ও কিছু টাকা। বড়দিনে প্রভু যিশুর দেওয়া উপহার পেয়ে ফুটপাথে মাথা ঠেকিয়েছিলেন কয়েকদিন ধরে অভুক্ত থাকা মানুষটি।

    তিন দশক ধরে চলেছে অভিযান, টের পায়নি কাক পক্ষীতেও

    সেই ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, সকলের অজান্তে চলেছিল ন’জন বান্ধবীর গোপন অভিযান। এই তিরিশ বছর ধরে রোজ ভোর চারটের সময় ন’জন বান্ধবী চলে আসতেন এক বান্ধবীর স্বামীর রেস্টুরেন্টের কিচেনে। কেউ মাখতেন ময়দা, কেউ ফেটাতেন ডিম, কেউ ছড়াতেন বাদাম, কেউ আবার ওভেনে বেকিং করতেন। সূর্য ওঠার অনেক আগে কেক তৈরি শেষ। রেস্টুরেন্টের কর্মীরা আসার আগে রেস্টুরেন্টের কিচেন ঝকঝকে করে দিয়ে ন’জন বান্ধবী বেরিয়ে পড়তেন অপারেশনে। তাঁদের স্বামীরা তখন বাড়ির বিছানায় গভীর ঘুমে অচেতন।

    পঞ্চাশ ষাটটি কেক নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বান্ধবীরা। গাড়িতে যেতে যেতে তৈরি হত প্যাকেট। প্রয়োজন মতো প্যাকেটে ঢুকত, জামাকাপড়, ফল, মাছ, মাংস, সব্জি ও বেবিফুড। ন’জোড়া চোখ বাজপাখির দৃষ্টি নিয়ে খুঁজে বেড়াতো আর্ত অসহায়দের। দেখা পাওয়া মাত্রই, অসহায় মানুষটিকে না জানিয়ে, তাঁর পাশে প্যাকেটটা নামিয়ে দিয়েই গাড়ি চালিয়ে একটু দূরে চলে যেতেন। প্যাকেটটি পাওয়ার পর দুঃস্থ মানুষগুলির মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠতো। সেটা দেখার জন্যেই অপেক্ষা করতেন বান্ধবীরা। তারপর নিজেদের চোখের জল মুছে বান্ধবীরা খুঁজতেন পরের টার্গেট। স্বামীরা বিছানা ছাড়ার আগেই বান্ধবীদের অপারেশন শেষ হয়ে যেত।

    এরপর ন’জন বান্ধবীর অপারেশন শুরু হয়েছিল টেনেসির বস্তি এলাকায়। গাড়িতে বসে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দিদারা সেই সমস্ত বাড়িগুলিকে চিহ্নিত করতে শুরু করেছিলেন যেগুলির জানলায় ফ্যান লাগানো ছিল। এটা থেকে বান্ধবীরা বুঝতে পারতেন, মানুষগুলির এয়ারকন্ডিশন মেশিন লাগাবার অর্থ নেই। এছাড়াও তাঁদের কেউ কেউ রাতে বেরিয়ে লক্ষ্য করতেন, কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে না বা খুবই কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে। সেই মতো বাড়িগুলির কারেন্টের বিল নাম্বার গোপনভাবে জেনে নিয়ে বিল মিটিয়ে দিতেন ‘দ্য নাইন নানাস’।

    মুদি খানার দোকানে অথবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কোনও দুঃস্থ পুরুষ বা মহিলাকে সংকুচিত হয়ে ঢুকতে দেখলে, পিছু নিতেন ‘দ্য নাইন নানাস’। দল বেঁধে নয়, দু’জন কি তিনজন। তাঁরা দেখতেন, দুঃস্থ মানুষটি হয়ত কোনও পণ্য খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, কিন্তু দামটা দেখার পর মানুষটির মুখ ম্লান হয়ে উঠত। মানুষটি পণ্যটি যথাস্থানে রেখে দিতেন। মানুষটি সামান্য এগিয়ে গেলে, এক বান্ধবী সেই পণ্যটি আবার তাক থেকে তুলে নিতেন। কাউন্টারে গিয়ে পণ্যটির দাম মেটাতেন। তারপর বিল সমেত পণ্যটি ফেলে দিতেন মানুষটি সঙ্গে থাকা ট্রলিতে। পণ্যের সঙ্গে বিলটি দিয়ে দিতেন, পাছে মানুষটিকে দোকানের কর্মীরা চোর না ভাবেন।

    এভাবেই গত তিরিশ বছরে শয়ে শয়ে অসহায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মায়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ‘দ্য নাইন নানাস’। লুকিয়ে মিটিয়েছেন বিভিন্ন বিলের টাকা। তবে বান্ধবীদের বেশিরভাগের বয়েস এখন ষাটের ওপরে। যুবতী থেকে আজ তাঁরা  হয়ে গিয়েছেন দিদা। তাই ছ’বছর আগে তাঁরা নিয়োগ করেছিলেন এক যুবতীকে। অসহায়দের চিহ্নিত করে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

    যুবতীটির সাংকেতিক নাম ‘সানি’। তাঁদের মিশনে ‘সানি’কে নেওয়ার আগে, মিশনটি গোপন রাখার শপথ নেওয়ানো হয়েছিল। যুবতী সানি তাই তাঁর বাড়িতে বলেছিলেন, তিনি মার্কেটিংয়ের কাজ করেন। ‘দ্য নাইন নানাস’-এর হয়ে যুবতীটি গাড়ি নিয়ে ঘুরতেন, বন্ধুর মতো কথা বলতেন দুঃস্থ ও অসহায়দের সঙ্গে। এভাবেই তাঁদের নাম ঠিকানা জোগাড় করে নিতেন। একদিন সকলের অলক্ষ্যে অসহায়দের দরজায় পৌঁছে যেত দিদাদের সাহায্য।

    আজ থেকে ৫ বছর আগে, সন্দেহটা হয়েছিল ছিয়াত্তর বছরের মিস্টার অ্যালেনের

    তাঁর ও স্ত্রী’র জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে জমা টাকাটা বেশ কম কম ঠেকছিল। তাঁর ষাট বছরের স্ত্রীর গাড়ির মাইলোমিটারের রিডিং অনেক বেশি লাগছিল। বন্ধু স্মিথকে বলেছিলেন ঘটনাটা। চুয়াত্তর বছরের বন্ধুরও একই সমস্যা। বন্ধু স্মিথ হেসে বন্ধু অ্যালেনকে বলেছিলেন ,”দ্যাখো, বুড়ো বয়েসে আমাদের বউরা আবার কচি ছেলেটেলের প্রেমে পড়ল কিনা।” কিন্তু কেবলমাত্র এই দুজন নন, প্রায় সব বান্ধবীর স্বামীরা একই সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন পরস্পরকে। চিন্তিত মিস্টার অ্যালেন এক শনিবার তাঁর বাড়ির ড্রইংরুমে ডেকেছিলেন মিটিং। সেদিন তাঁর স্ত্রীর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল তিরিশ বছর ধরে চেপে রাখা এই অবিশ্বাস্য কাহিনি।

    দিদাদের কয়েকজন, আজও তাঁদের নাম জানাতে চান না।

    ‘দ্য নাইন নানাস’ এর তরফ থেকে মুখ খুলেছিলেন একমাত্র মেরি অ্যালেন। তিনি দাদুদের বলেছিলেন, “তোমাদের অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি টাকা নিইনি আমরা। লন্ড্রির পয়সা বাঁচিয়ে, আমাদের বাড়ির অব্যবহৃত জিনিসপত্র বেচে টাকা জমাতাম। নিজেদের পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে পাওয়া ফ্রি কুপনগুলো জমাতাম। প্রতি বুধবার গোল্ডস্মিথের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বিশাল ছাড় দেয়। বুধবারের সেল থেকে ৭০০ ডলারের জিনিস কিনতাম মাত্র ১০০ ডলারে। আমাদের জন্য নয়। কিছু অসহায় মানুষের জন্য। যাঁদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই।”

    দাদুদের চোখ ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল মাটির দিকে 

    মেরি অ্যালেন বলেছিলেন, “তোমরা ন’জন মানুষ কখনও ভেবেছ, তোমাদের এত এত টাকা কীভাবে খরচা করবে! ঘুরে বেড়িয়ে আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে খরচ করবে, তাইতো! আমরা কিন্তু ভেবেছিলাম, অসহায়দের জীবনযন্ত্রণা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য কমিয়ে দেব। তোমাদের থেকে সামান্য টাকা আমরা নিয়েছি বলে, আজ আমাদের চোর ঠাউরে মিটিং ডেকেছ!”

    মেরি অ্যালেন

    দাদুরা ভাষা হারিয়ে ফেলছিলেন। দিদাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। হলঘর মুখরিত হয়েছিল দাদুদের হাততালিতে। কোনও কথা না বলে চোখের জল মুছতে মুছতে দাদুরা শক্ত করে চেপে ধরেছিলেন দিদাদের হাত। যোগ দিয়েছিলেন দিদাদের মিশনে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দিদাদের গোপন অপারেশন ধীরে ধীরে আন্দোলনের রুপ নিতে চলেছে টেনেসিতে।

    তবে এই তিরিশ বছরে দুঃস্থ ও অসহায়দের সেবায় দিদারা খরচা করে ফেলেছিলেন প্রায় দশ কোটি টাকা। এর সিংহভাগ টাকাই এসেছিল দাদুদের অ্যাকাউন্ট থেকে। দাদু অ্যালেন দিদিমা মেরিকে একটু অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, “একবার বললেই পারতে। আমরা কি দিতাম না?” দিদা মেরি উত্তরে বলেছিলেন, “ঢাকঢোল পিটিয়ে দান করলে অসহায়দের ছোট করা হয়। আমরা সমাজের চোখে, অসহায়দের চোখে বড় হতে চাইনি। আর তোমাদের চোখে তো নয়ই।” দাদু অ্যালেন আর কথা বাড়াননি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More