সৌভাগ্যের সাত জাপানি দেবতার মধ্যে আছেন ভারতের মা সরস্বতী!

পশ্চিম টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে আছে জাপানের সবচেয়ে বিখ্যাত সরস্বতী মন্দিরটি। রোজ প্রচুর মানুষ উপাসনা করতে আসেন এই মন্দিরে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    আজ থেকে কুড়ি তিরিশ বছর আগে, সরস্বতী পূজার সময় বুদ্ধমূর্তি সরস্বতীর খু্ব চাহিদা ছিল। মা সরস্বতীর মুখটা ভারতীদের মতো হলে হবেনা, হতে হবে গৌতম বুদ্ধের মতো। গ্রামে গঞ্জের প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মঙ্গোলয়েড মুখের সরস্বতী দেখতে পাওয়া যেত। তখন ভাবতাম, প্রথা ভাঙার অপচেষ্টায়, পাড়ার ছেলে ছোকরার দল জোর করে প্রতিমাশিল্পীদের দিয়ে নতুন ঘরানার প্রতিমা বানিয়ে নিচ্ছে। তখন জানতামও না, প্রায় ১২০০ বছর ধরে মা সরস্বতীর আরাধনা করে আসছে উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপান। আর জাপানের সরস্বতীর মুখের আদল ভারতীয়দের মতো হবে, এটা আশা করা অন্যায়।কিন্তু গ্রামবাংলার ছেলেপুলেরা কী করে বুদ্ধমুর্তি সরস্বতীর খোঁজ পেয়েছিল, সেটাও একটা রহস্য।

    বুদ্ধমুর্তি সরস্বতী

    জাপানের সাতজন সৌভাগ্যের দেবতার মধ্যে অন্যতমা হলেন দেবী সরস্বতী। জাপানে তাঁর নাম ‘বেঞ্জাইতেন’। তিনি পাতালের দেবী এম্মাতেনের দিদি। তাঁর স্বামী হলেন বনতেন (ব্রহ্মা)। মা সরস্বতী ভারতে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী। জাপানে দেবী সরস্বতী বিদ্যা ও জ্ঞানের সঙ্গে, জল, সময়, সৌন্দর্য্য, সঙ্গীত ও শক্তিরও দেবী। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মা সরস্বতী চতুর্ভুজা হলেও, জাপানে কিন্তু তিনি বাংলার সরস্বতী প্রতিমার মতোই দ্বিভুজা।

    আবার কখনও কখনও জাপানে চতুর্ভুজা সরস্বতী ও অষ্টভুজা সরস্বতীও দেখতে পাওয়া যায়। অষ্টভুজা শক্তিরুপিনী সরস্বতী, তাঁর আটটি হাতে ধরে থাকেন বিভিন্ন অস্ত্রও ও তিন মাথা যুক্ত সাপ। তিনি জাপানের জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের রক্ষয়িত্রীও। শক্তিরুপিনী সরস্বতীর সঙ্গে নীলমাতা পুরাণে বর্ণিত নীল সরস্বতীর মিল আছে। যদিও নীল সরস্বতী চতুর্ভুজা।

    জাপানের সরস্বতী বেঞ্জাইতেন

    ভারতে মা সরস্বতীর হাতে যেমন বীণা থাকে, তেমনই জাপানের সরস্বতী, দেবী বেঞ্জাইতেনের হাতে আছে বিওয়া (বীণা) নামের এক ঐতিহ্যবাহী জাপানি বাদ্যযন্ত্র। ভারতে মা সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস হলেও, জাপানের বেশিরভাগ বিগ্রহে, মা সরস্বতীর কোনও বাহন নেই। কোনও কোনও বিগ্রহে তাঁর সঙ্গে ড্রাগন অথবা সাপ দেখতে পাওয়া যায়। পুরাণে বলে, মা সরস্বতী ত্রিমুণ্ডধারী বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন। সেই বৃত্রাসুরের অপর নাম ছিল “অহি” বা সাপ (ঋগ্বেদ -৬.৬১.৭)। তাই কি জাপানে মা সরস্বতী বা বেঞ্জাইতেনের বাহন সাপ!

    মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মা সরস্বতী ভারতবর্ষ থেকে সুদূর জাপানে কী ভাবে গিয়ে পৌঁছলেন? ইতিহাসবিদেরা বলছেন, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত, প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ স্থলভাগ জুড়ে শাসন করতেন চম্পা সাম্রাজ্যের হিন্দু সম্রাটেরা। বর্তমান ভিয়েতনামের মধ্য ও দক্ষিণ অংশ জুড়ে ছিল সেই চম্পা সাম্রাজ্য। যে সাম্রাজ্যটির প্রথম রাজধানী ছিল ইন্দ্রপুরা। প্রথম সম্রাট ছিলেন ভদ্রবর্মন। এই চম্পা সাম্রাজ্য হয়েই হিন্দু ধর্ম পৌঁছে গিয়েছিল জাপানে। জাপানে বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছবার বহু শতাব্দী আগেই। জাপানে মা সরস্বতী বা বেঞ্জাইতেনের পুজো শুরু হয়েছিল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে।

    শক্তিরুপিনী বেঞ্জাইতেন’

    তবে জাপানের মা সরস্বতী, আজ আর হিন্দু দেবতা নন। আজ তিনি বৌদ্ধ ও শিন্টো ধর্মের দেবী। জাপানের অন্যতম বৃহৎ শিন্টো ধর্মে দেবতাকে বলা হয় কামি বা জিনগি। মা সরস্বতী ‘বেঞ্জাইতেন’কে দেবতা বা ‘কামি’র নারীরূপ হিসেবে আরাধনা করা হয়। শিন্টো ধর্মের উপাসকদের কাছে মা সরস্বতীর নাম ‘উগা বেনতেন’।

    বৌদ্ধ ধর্মের মহায়ন শাখার পদ্মসূত্র এবং সুবর্ণপ্রভাসা সূত্রে মা সরস্বতী ‘বেঞ্জাইতেনের উল্লেখ আছে। আদিতে সূত্রদুটি লেখা হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। পরবর্তীকালে সুত্রদুটি পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত করা হয়। কারণ, পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আজও আছেন মা সরস্বতী ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন ভিন্ন বিগ্রহে। চিনে মা সরস্বতীর নাম ‘বিয়ানসাই চাই তিয়ান’, কোরিয়ায় ‘বাইএওঞ্জাই চেয়ন’, থাইল্যান্ডে ‘সুরাটস্বোয়াদি’, তিব্বতে ‘ইয়ানচেংমা’, ভিয়েতনামে ‘বয়েন তাই থিয়েন’, মায়ানমারে ‘থুরাথাদি’।


    টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত সরস্বতী মন্দির।

    জাপানে আজও প্রায় একশোটিরও বেশি মন্দিরে পুজো করা হয় মা সরস্বতী বা বেঞ্জাইতেনকে। ১০৪৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ‘কোওকেই’, জাপানের বুকে গড়ে ওঠা দেবী সরস্বতীর মন্দিরগুলিকে নিয়ে একটি অসামান্য ইতিহাসও লিখে গিয়েছিলেন। জাপানের সরস্বতী মন্দিরগুলির মধ্যে বেশিরভাগই  অবস্থিত সাগামি উপসাগরের এনোশিমা দ্বীপ, বিওয়া হ্রদের চিকুবু দ্বীপ এবং ইৎসুকুশিমা দ্বীপগুলিতে। পশ্চিম টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে আছে জাপানের সবচেয়ে বিখ্যাত সরস্বতী মন্দিরটি। রোজ প্রচুর মানুষ উপাসনা করতে আসেন এই মন্দিরে।

    জাপানের বিভিন্ন জলাশয়ের ধারেই গড়ে উঠেছে বেঞ্জাইতেনের মন্দিরগুলি। অনেক মন্দিরে কোনও বিগ্রহই নেই। জলাশয়ের জলকেই দেবী বেঞ্জাইতেন হিসেবে ভাবা হয়। ভাবতে অবাক লাগে, প্রাচীনকাল থেকেই ভারতের নদীর দেবতা মা সরস্বতী। বেঞ্জাইতেনের পুজোর পদ্ধতিও জাপানের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। মাংস বাদ দিয়ে, অর্ঘ্য হিসাবে মন যা দিতে চাইবে, তাই দেওয়া যেতে পারে। মন্দিরে গিয়ে প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যান করেন ভক্তের দল।

    অপরদিকে, জাপানের শিঙ্গন ও তেন্দাই বৌদ্ধদের মা সরস্বতী আরাধনা পদ্ধতির সঙ্গে হিন্দুধর্মের রীতিনীতির মিল আছে ৷ তাঁরা মা সরস্বতীর পুজো করে আসছেন মন্ত্রোচ্চারণ করে। এমনকি, হোমও করা হয় মা সরস্বতীর পুজায়। জাপানি ভাষায় হোম’কে বলা হয় গোমা৷  শিঙ্গনরা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের একটি শাখা। সংস্কৃত তাঁদের কাছে অতি পবিত্র ভাষা৷ তাঁরা বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করেই যজ্ঞের আগুনে ঘৃতাহুতি দেন৷

    এভাবেই জাপান, বারোশো বছর ধরে, বছরের প্রতিদিন মা সরস্বতীর আরাধনা করে আসছে। নিজেদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য। আর  আমরা মা সরস্বতীর শরণাপন্ন হই পরীক্ষার আগের দিন এবং শুক্লা পঞ্চমীতে।

    আরও পড়ুনধ্বংস হওয়া মন্দিরে বিগ্রহ নেই, তবুও নীলম উপত্যকা জুড়ে আছেন নীল সরস্বতী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More