মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

মহর্ষি কপিলকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখব

শামিম আহমেদ

‘পরিকল্পনা’ শব্দের মূলে যে কথাটি আছে, তা হল কল্পনা; আর সেই ‘কল্পনা’ প্রকৃত বিষয়কে নিয়ে গঠিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় না। সে কার দোষে বা গুণে, তা বলা ভারি দুষ্কর। তবে নিয়তি বা দৈব এবং পুরুষকারের যে সব কথা প্রাচীন নিগম বা আগম সূত্রে পাওয়া যায়; তা তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। গৌরচন্দ্রিকা না করে সরাসরি বলে ফেলা যাক বেশ কিছু কল্পনা, থুড়ি, পরিকল্পনার কথা। নিয়তি বা দৈব যাকে আমরা ফসলের প্রসঙ্গে বীজ ও জমির ক্ষেত্র বলে থাকি; তাকে ধ্রুব ধরে নিয়ে চাষীর স্বপ্ন ও আগাম কল্পনার কথা আওড়াই। যে জমির দোঁয়াশ মাটিতে ভাল ধান ফলে সেখানে কার্পাস চাষের স্বপ্ন দেখতে আপত্তি নেই; কিন্তু পেঁজা পেঁজা সাদা তুলো ফলবে কি সোনালি ধানের পরিবর্তে! মস্তিষ্কে এঁটেল না বেলে মাটি আছে, তা অবশ্য বোঝা যায় না; ঘিলু ল্যাবের লোকজন সে সব জানেন!

বড় উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে। খুব বড়। আদিম তন্ত্র আমাদের এই বঙ্গে এক সময় জন্মেছিল। জন্মেছিল কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়, ছিল। কীভাবে ছিল কেমন ভাবে ছিল; তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; কিছুটা উপাত্ত, খানিকটা ভালবাসা আর বাকিটা অনুমানমিশ্রিত কল্পনা করে এগনো যেতে পারে। দীর্ঘ দিন ধরে এই বঙ্গে যে মৌখিক টেক্সট চলাফেরা করে, সে সব নিয়ে ইদানীং মানুষজন বেশ আগ্রহী। সিলেবাসের লেখাপড়া সূত্রে জেনেছিলাম, ভারতের একটি প্রাচীন দর্শনের নাম সাংখ্য। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এই দর্শনের কথা আছে। পাওয়া যায় মহাভারতেও, তবে একটু অন্য ভঙ্গীতে। মহাভারতের সাংখ্য দর্শন আচার্য পঞ্চশিখের ভাবনা, তিনি সেখানে সিদ্ধান্তী। শান্তিপর্বের মোক্ষধর্মপর্বাধ্যায়ে তিনি পূর্বপক্ষীদের বক্তব্য খণ্ডন করছেন। কিন্তু সেই সাংখ্য কপিল মুনির দর্শনচিন্তা নয়। কপিল মুনি, গঙ্গাসাগরে যাঁর আশ্রম, সেই নিরীশ্বরবাদী দার্শনিককে নিয়ে একটা বড় কাজ, উপন্যাসের ঢঙে করার ইচ্ছে আছে। তিনি প্রাগৈতিহাসিক মানুষ কিনা, বা শ্যাডো গড কিনা, যা বলেছেন অনেক পণ্ডিত; তা নিয়ে এগনো যেতে পারে। তবে তিনি যে ‘তৈর্থিক’ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই তৈর্থিক দার্শনিকদের পণ্ডিতজনেরা বলে থাকেন হেরেটিক বা ধর্মদ্রোহী। কপিল-কণাদ-বুদ্ধদেব-মহাবীর—এই দেশের চার ধর্মদ্রোহী। শেষের দু’জনকে নিয়ে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হলেও প্রথম দু জন বেশ কম আলোচিত। তাঁদের জীবনীমূলক কোনও কাজ এখনও হয় নি। কপিল সাংখ্য দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা যেমন, তেমনই পরমাণুবাদী কণাদ বৈশেষিক দর্শনের মূল প্রবক্তা। এই সব মানুষরা জগতের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল মত থেকে সরে এসেছিলেন। মূল ধারা থেকে তাঁরা বিচ্যুত বলেই তৈর্থিক বা অবতরণবাদী নামে অভিহিত। ফ্লিট নামের এক সাহেব দেখিয়েছেন, মহাভারতের শকুনিপুত্র উলূক নাকি কণাদ! বৈশেষিক দর্শন ঔলূক্য শাস্ত্র হিসাবেও খ্যাত। কণাদ শিবের আদেশে এই দর্শন প্রণয়ন করেন। কৌরবপক্ষের অশ্বত্থামা শিবের অবতার। আবার দুর্যোধনের মন্দির আছে হর-কি-দুন উপত্যকায়, তিনি সেখানে শিবের অবতার হিসাবে পূজা পান। রামায়ণের শিবভক্ত রাবণ বৈশেষিক দর্শনের ভাষ্য রচনা করেন। রাবণভাষ্যের কথা বিভিন্ন শাস্ত্রে পাওয়া যায়। দুই মহাকাব্যের প্রোটাগনিস্ট কীভাবে শৈব তথা বৈশেষিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত, এই কথাটি যেমন চিন্তার ও অনুধ্যানের বিষয়, তেমনি কপিল মুনি আর এক চমকপ্রদ দার্শনিক, যাঁর বাসভূমি এই বঙ্গ বলে ভেবে নেওয়া যায়। প্রকৃতি বা জড় এবং পুরুষ বা প্রযতি দিয়ে যিনি জগতের বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে পারেন; ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই সুপ্রাচীনকালে যে দার্শনিক কার্যকারণতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তিনি তো সাধারণ লোক নন। গঙ্গা নদীর অবতরণে তাঁর যে একটা মুখ্য ভূমিকা আছে, সে কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। কপিল মুনি সাধারণ দার্শনিক ছিলেন না। তাঁর কথা একটু বলা যাক। কেননা তিনিই পরবর্তী উপন্যাসের নায়ক।

সাধারণভাবে কপিল মুনিকে সাংখ্য দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। সাংখ্য দর্শনের প্রাচীনতা নিয়েও কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। মহাভারত, চরক-সংহিতা, মনুস্মৃতি প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থেও সাংখ্যের উল্লেখ আছে। অনেকেই মনে করেন, গৌতম বুদ্ধের গুরু সাংখ্য মতাবলম্বী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধঘোষ অন্যতম। শঙ্করাচার্য সাংখ্য মতকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই মত দ্বৈতবাদ সমর্থন করে বলে তা শ্রুতির দ্বারা সমর্থিত হতে পারে না। সাংখ্য, যোগ এবং লোকায়ত দর্শনকে কৌটিল্য ‘আন্বীক্ষিকী’ নামে অভিহিত করেছেন। লোকায়ত দর্শন বেদ এবং ঈশ্বর কিছুই মানে না। সাংখ্য নিরীশ্বরবাদী। তবে পণ্ডিতেরা অনেকে সাংখ্যকে সেশ্বর প্রমাণ করার বহু চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, মহাভারতে সাংখ্যকে বেদের মতই সনাতন মনে করা হয়েছে। সাংখ্য দর্শনের একটি মূল তত্ত্ব হল, কার্য কারণ সম্পর্কে তাঁদের মতবাদ বা সৎকার্যবাদ। সৎকার্যবাদের দুটি রূপ আছে- পরিণামবাদ ও বিবর্তবাদ। সাংখ্য দার্শনিক পরিণামবাদের সমর্থক। পরিণামবাদ অনুযায়ী কার্য হল কারণের প্রকৃত রূপান্তর। দৃশ্যমান জগত হল আসলে কার্য এবং তা জড়রূপ। অতএব তার কারণ হিসেবে জড়রূপী প্রকৃতিকেই অনুমান করা হয়। এই প্রকৃতির স্বরূপ হল- সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, এই তিনটি গুণের সাম্যাবস্থা। এখানে ‘গুণ’ বলতে উপাদানকে বোঝানো হয়েছে। তিন গুণের সাম্যাবস্থা বিচ্যুত হলে প্রকৃতি থেকে ক্রমশ পরিদৃশ্যমান স্থূল জগতের উদ্ভব হয়। এই ক্রমবিকাশের আলোচনাও সাংখ্য দর্শনে রয়েছে। প্রকৃতি ছাড়াও সাংখ্যের আরেকটি মূলতত্ত্ব হল পুরুষ। এই পুরুষ হল উদাসীন, অপ্রধান এবং বহু। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতো দার্শনিক এমন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছেন যে আদিম তন্ত্রসাধনার অন্তর্নিহিত তত্ত্বগত দিক পরবর্তী সময়ে সুস্পষ্ট দার্শনিকরূপ গ্রহণ করেছিল। কপিল মুনি রচিত কোনও গ্রন্থই আর পাওয়া যায় না। সাংখ্য দর্শনের মূল গ্রন্থ দুটি– ঈশ্বরকৃষ্ণ রচিত সাংখ্যকারিকা এবং কপিলমুনি রচিত বলে প্রচারিত সাংখ্যসূত্র। ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকায় ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাংখ্যসূত্রেও ঈশ্বরকে অসিদ্ধ বলা হয়েছে। সাংখ্য সূত্রকার ঈশ্বরের অস্তিত্বে আস্থাশীল ছিলেন না। যেহেতু মহাভারতের সাংখ্যকে বেদের মতোই সনাতন বলা হয়েছে, তাই কপিল মুনির মতকে আমরা মহাভারতীয় সাংখ্য মতের সঙ্গে অভিন্ন করে দেখব না। বরং যে আদিম তন্ত্রসাধনার অন্তর্নিহিত তত্ত্বগত দিক কালক্রমে সাংখ্য দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছিল সেই তন্ত্রসাধনার তত্ত্বকেই অন্যতম তৈর্থিক বা ধর্মদ্রোহী মত বলে স্বীকার করব।

সাংখ্য ও তন্ত্রের মূল তত্ত্ব হল- প্রকৃতি-পুরুষ। শংকরাচার্য সাংখ্যবাদীদের ‘তন্ত্রান্তরীয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। শঙ্করাচার্য শুধুমাত্র সাংখ্যকে বোঝানোর জন্যই ‘তন্ত্র’ শব্দের উল্লেখ করেছেন। অন্য দর্শন প্রসঙ্গে তিনি তা করেননি। ফলে বুঝতে হবে, তন্ত্র বলতে তত্ত্ব বা বাদকে বোঝানো হয়নি। এছাড়া সাংখ্যকারিকার লেখক ঈশ্বরকৃষ্ণ সাংখ্য দর্শনকে তন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। সাংখ্যের ষাটটি তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। সেই কারণেই ‘ষষ্টিতন্ত্র’ নামে সাংখ্যকে অভিহিত করা যায়। তবে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ষষ্টী এই দেশে সন্তানদায়িনী দেবীর নাম। ‘ষষ্টিকা’ বলতে ধানকে বোঝায়। সেই জন্য তিনি অনুমান করেছেন, ‘ষষ্টিতন্ত্র’ নামের পেছনে কৃষিভিত্তিক ধ্যান ধারণার বা তন্ত্রের আভাস খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। লোকায়ত, তন্ত্র এবং সাংখ্যের ধ্যানধারণার উৎস কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। লোকায়ত মতকে যেমন জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত মনে করা হয়, তেমনি লোকায়ত দেহাত্মবাদও একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। অনুরূপভাবে তন্ত্রের দেহতত্ত্ব ও সাংখ্যের প্রকৃতিবাদ লোকায়ত মত থেকে খুব একটা পৃথক নয়। ফলে কপিল মুনিকে তৈর্থিক মতাবলম্বী হিসেবে স্বীকার করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। তারানাথ তর্কবাচস্পতি কপিলকে যে তৈর্থিক বলেছেন, সে কথার সমর্থন মেলে পণ্ডিত দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী ও পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদ ই. ডব্লিউ হপকিনসের মন্তব্যে। দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী মনে করেন, কপিল যে তার্কিক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কপিল নিজেই বলেছেন, “দৃষ্টবদানুশ্রবিকঃ সহ্যবিশুদ্ধি ক্ষয়াতিশয়যুক্তিঃ”। বৈদিক কর্মকলাপ লৌকিক উপায়ের মতই হিংসা প্রভৃতি দোষে অবিশুদ্ধ এবং তার ফল নশ্বর ও তারতম্যযুক্ত। এতে দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি হতে পারে না। এটা নাস্তিক তাত্ত্বিকেরই কথা। বেদের প্রামাণ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন কপিল মুনি। শঙ্করাচার্যও মনে করেন, আত্মভেদ এবং স্বতন্ত্র প্রকৃতি কল্পনা করে কপিলমুনি বেদবিরুদ্ধ এবং বেদানুসারী মনুবচন-বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন।

হপকিনসও দেখিয়েছেন, মহাভারতে কপিল সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদ তথা আস্তিকতার রোষের মুখে কপিলও পড়েছেন। একটি গরুকে যজ্ঞভূমিতে উৎসর্গের জন্য নিয়ে যাওয়া হলে, কপিল তার তীব্র প্রতিবাদ করেন, বেদের প্রামাণ্য নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। কপিলের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনাও করা হয়েছে। হপকিনস কিন্তু কপিলকে কোন কাল্পনিক চরিত্র ভাবেননি। অথবা তাঁর কাছে কপিল কোনও ছায়াবিশিষ্ট দেবতাও নন। হপকিনস কপিলকে প্রকৃত (মানব) দার্শনিক বলেই মেনেছেন। অহিংসা এবং নাস্তিকতার প্রচারক কপিলের অস্তিত্বের পক্ষে বড় প্রমাণ হল, তিনি অন্যান্য তন্ত্র বা বাদেরও প্রশংসা করেছেন, যেমন অন্যান্য দার্শনিক মতবাদসমূহে কপিল নিজেও প্রশংসিত হয়েছেন। হপকিনস কপিল-দর্শনকে সুনির্দিষ্টভাবে ‘কাপিলম্‌’ বলার পক্ষপাতী।

মহাভারতে যে সাংখ্যের পরিচয় পাওয়া যায় তা ‘কাপিলম্‌’ থেকে ভিন্ন। কপিলের সাক্ষাৎ শিষ্য আসুরির শিষ্য পঞ্চশিখের মতবাদই সেখানে ‘সাংখ্যদর্শন’ নামে খ্যাত। অথচ মহাভারতে যে কপিলমত বর্ণিত হয়েছে, তা পঞ্চশিখের সাংখ্য দর্শন থেকে ভিন্ন। শান্তিপর্বের একটি জায়গায় কপিলকে সাংখ্য দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা বলা হয়েছে। জৈগীষব্য, অসিত, দেবল, পরাশর, যাজ্ঞবল্ক্য , ভৃগু, পঞ্চশিখ, কপিল, শুকদেব, গৌতম, আর্ষ্টিষেণ, গর্গ, আসুরি, পুলস্ত্য, সনৎকুমার, শুক্র, কশ্যপ, জনক, রুদ্র ও বিশ্বরূপকে প্রাচীন সাংখ্যাচার্য বলা হয়েছে। কপিলের শ্রেষ্ঠতাও সেখানে স্বীকৃত নয় কারণ, মহাভারতে এই আচার্যদের মধ্যে যাজ্ঞবল্ক্যকে শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া হয়েছে। মহাভারতে যাজ্ঞবল্ক্যের উপদেশই সঙ্কলিত করা হয়েছে। আচার্য পঞ্চশিখ এই শাস্ত্রকে বেশি পরিমাণে প্রচার করেছেন। বশিষ্ঠ এবং যাজ্ঞবল্ক্যের উপদিষ্ট সাংখ্যবিদ্যা কপিলের সাংখ্যবিদ্যার সঙ্গে অভিন্ন নয়।

কপিল মুনিকে হপকিনস যেমন একজন মানুষ হিসেবেই ভেবেছেন, তেমনটি ভাবেননি সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত বা নিকোলাস সাটন। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত কপিল মুনিকে ‘পৌরাণিক’ বলারই পক্ষপাতী। যেহেতু তাঁর কোনও রচনা খুঁজে পাওয়া যায় না। সাটন ‘ভাগবত পুরাণ’ অনুসরণ করে কপিলকে প্রকৃত মানব বা নিছক দার্শনিক না বলে ‘অবতার’ বলার পক্ষপাতী।

এই নানা ধরনের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, ‘কাপিলম্‌’ যতটা না সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে মেলে, তার চেয়ে বেশি মেলে ‘তন্ত্র’ নামক সুপ্রাচীন সাধন পদ্ধতির সঙ্গে। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ও নানাভাবে তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তন্ত্রের মূল দার্শনিক জায়গা ধরে ‘কাপিলম্‌’-এর সঙ্গে তার সাযুজ্য খোঁজার চেষ্টা করব।

‘তন্ত্র’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, নিরবিচ্ছিন্নতা বা বিধি-পরম্পরা। তন্ত্রে এই জগতকে শক্তি ও শিবের লীলাক্ষেত্র বলে মনে করা হয়। অজ্ঞতা ও পুনর্জন্মের বিনাশ অর্থাৎ ঐকান্তিক ও আত্যন্তিক মুক্তিই তন্ত্রের লক্ষ্য। যেহেতু স্বধা এবং প্রযতির সূক্ষ্ম সঙ্গমকেই জগতের মূল কারণ বলা হয়েছে, তাই বস্তুবাদী তথা জড়বাদী এই সাধন পদ্ধতিকে বেদ-বহির্ভূত বলে স্বীকার করা হয়। এই তত্ত্বই তান্ত্রিকদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রদান করে। উইন্টারনিৎস তন্ত্রসাহিত্যের সমীক্ষায় জানিয়েছেন, যেহেতু তন্ত্রসাহিত্য সদর্থকভাবে বেদ অনুসারী নয়, এমনকি বেদকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দুরূহ ও অর্থহীন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেখানে। তাছাড়া যাঁরা বেদের অনুগামী তাঁরাও তন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এন এন ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন–

পরবর্তী সময়ের তান্ত্রিকেরা তাঁদের মতবাদকে বেদের অনুসারী করার প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বেদ অনুগামীদের প্রবল বিরোধিতায় তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হন।

স্বামী নিখিলানন্দ অবশ্য তন্ত্রের সঙ্গে বেদের নিবিড় সম্বন্ধের কথাই বলেছেন। তিনি তান্ত্রিক চিন্তাধারার সঙ্গে উপনিষদ, পুরাণ এবং যোগের সংযোগের কথা বলেছেন।

নিরীশ্বরবাদী সাংখ্য বা কাপিলম্‌-এর সঙ্গে তন্ত্রের তত্ত্বগত মিল অনেকটাই। ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকায় কপিলের মত বলে যা প্রচারিত অথবা ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে কপিল-প্রতিষ্ঠিত সাংখ্যর যে পরিচয় পাওয়া যায়,  তাতে সম্যকভাবে বোধগম্য হয় যে, জগতের ব্যাখ্যা প্রকৃতি ও পুরুষের সাহায্যেই সম্ভব; সেখানে কপিলের প্রকৃতি তন্ত্রের শক্তির সঙ্গে অভিন্ন, পুরুষও প্রযতি বা শিবের নামান্তর। এমনকি তন্ত্র মতে যা মুক্তি, কপিলের মতেও মোক্ষ সেই প্রকারের। তবে কপিলের দর্শনে তন্ত্রের যে অন্যান্য রীতিনীতি, তা একেবারেই অনুপস্থিত। সেই গৌণ অংশটুকু বাদ দিলে আমরা বলতে পারি, কপিলের মতবাদ আসলে তন্ত্রেরই পরিশীলিত রূপ।

পরবর্তী উপন্যাসের নায়ক এই কপিল মুনি। সেটাই আপাতত পরিকল্পনা। তার তত্ত্বগত জায়গাটি বললাম। বাকি কথা উপন্যাসে মুখোমুখি বলব।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

শামিম আহমেদ দর্শনের অধ্যাপক। উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন।

Shares

Comments are closed.