বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

আমার নাম রাখা হয়েছিল জগন্নাথ

সমর মিত্র

রথযাত্রা মহা ধুমধাম। জীবনের শুরুতে এই তথ্য বইয়ে পড়েছি। নিজের অভিজ্ঞতায় জানিনি। কারণ আমার একটা গাঁয়ে জন্ম, সেই গাঁয়েই বেড়ে ওঠা। গাঁয়ের নাম আঝাপুর,  পঞ্চায়েত আঝাপুর, থানা জামালপুর, জেলা পূর্ব বর্ধমান। সেই গাঁয়ে টুসুগান আছে,ভাদুগান আছে, গোপার্বণ আছে, রাধাষ্টমী আছে, জন্মাষ্টমী আছে, রামনবমী আছে, বড় করে আছে হাতে গোনা ক’টা  দুর্গাপুজো, তার আগে ঝাপান, ইস্কুলে সরস্বতীপুজো, বাড়ি বাড়ি লক্ষ্মীপুজো, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তিতে পিঠেপার্বণ,  দোল আর আছে বড় করে চড়ক। সেখানে রথযাত্রা কোথায়?

জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম এই ত্রয়ীকে আমার  চোখের সামনে তেমন প্রতিভাত হতে দেখিনি। একটা বাড়িতে শুধু জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ। চাটুজ্জেবাড়ি। মেমারি স্কুলের মাষ্টারমশাই রাখালদাস চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। তাঁরা নিজের মতো করে পুজো করেন। তার রেশ বাইরে পড়ে না। তবে একটা মাঠ, বিশাল তেঁতুলগাছ আর ঠাকরুনপুকুর পেরিয়ে পাশের গাঁ আদমপুরের যোগীন চক্রবর্তীদের বাড়িতে হয় বড় করে রথযাত্রা। এ গাঁয়, সে গাঁয় তাদের যজমান। তো যজমানেরা হয়ত যায়। কিন্তু আমরা তার সৌরভ পাই না। আর দুটো ইস্টিশান পেরিয়ে জৌগ্রাম। সেখান থেকে একটু হেঁটে গেলেই কুলীনগাঁ, মালাধর বসুর জন্মস্থান, বৈষ্ণবদের তীর্থস্থান, মহাপ্রভুর চরণধূলি তার পথে প্রান্তরে। সেখানকার কুকুরও মহাপ্রভুর মান্য। ওখান থেকে শ্রীক্ষেত্রে যায় রশি। সেই রশিতেই রথে লাগে টান। অথচ কিশোরকালেও কুলীনগাঁর রথের রশিতে আমার হাত পড়েনি। বাড়িতে কঠিন শাসন। তাই রথযাত্রা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেকদিন গড়ে ওঠেনি।
অথচ অন্তত আশি বছর আগের কথা। আমার মা যখন তাঁর কনিষ্ঠ সন্তানের আগমনের জন্য অপেক্ষমান, তখন তাঁর শাশুড়িমাতা, ননদিনী এবং ঠাকুরজামাই শ্রীক্ষেত্রে বিরাজ করছিলেন। এবং সেখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে রথের রশিতে টান দিয়ে এবং বেশ কিছু পুণ্যসঞ্চয় করে তাঁরা যখন ফিরে এলেন, তাঁরা দেখলেন, ডাক্তারবাড়ির সদস্যসংখ্যা আরও একটি বেড়েছে। মায়ের কোলের গোড়ায় শুয়ে আছি আমি। জগন্নাথধাম থেকে ফিরে এসে আমাকে দেখেন বলে পিসিমা আমার নাম দেন জগন্নাথ। ওই নামে কিছুদিন ডেকেছেনও। পরে কী করে জানি না নামটি আমাকে পরিত্যাগ করেছে। হয়ত তা হয়েছে প্রভু জগন্নাথেরই কৃপায়।

আমার সঙ্গে আর জগন্নাথদেবের তেমন যোগাযোগ ছিল না।  হয়ত আমি রবীন্দ্রনাথের রথযাত্রায় সেই রাজার বাড়ির ঝাঁটার কাঠি কুড়োনো মানুষটা, যে বলে ঠাকুরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাই তেমন সাধ্যি কী আমার। রাজার পথ কি আমার পথ? মন্ত্রী তখন বলেন, তোর ভাগ্যে কি রথযাত্রা দেখা ঘটবে না?  সে বলে, ঘটবে বৈকি, ঠাকুর তো রথে করেই আমার দুয়ারে আসেন। মন্ত্রী জিগ্গেস করেন, তোর দুয়ারে রথের চিহ্ন কই? সে বলে, সে রথের চিহ্ন পড়ে না। কারণ তিনি আসেন পুষ্পকরথে। কই সেই রথ? সে তার দুয়ারের দুপাশে ফুটে থাকা দুটো সূর্যমুখী ফুলকে দেখিয়ে দিলে। আমার পুণ্যির তেমন জোর নেই। তাই একথা বলার ধৃষ্টতা নেই।

রথযাত্রার বৈশিষ্ট্য খোঁজার চেষ্টা করি অন্যত্র। খুঁজে দেখি বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারানীর পাতাগুলি। বালিকা তো বুনোফুলের মালা গেঁথে চার পয়সায় তা বিক্রির জন্য মাহেশের রথের মেলায় গিয়েছিল। ঘরে শয্যাশায়ী তার মা। ওই মালা বিক্রি করে যে পয়সা পাওয়া যাবে তা দিয়ে জোগাড় হবে তাঁর পথ্য। কিন্তু  মাঝপথে নামল প্রবল বৃষ্টি। মেলা ভেস্তে গেল। রাধারাণীর মালা অবিক্রীত থেকে গেল। ভাঙা মেলা। লেখক বঙ্কিম  তার বর্ণনা দিতেও আর উৎসাহ দেখালেন না। কারণ রাধারাণীকে অনুসরণ করতে হবে তাঁকে। মহেশের মেলা পাঠক এই কিশোরের কাছেও তাই কল্পনাতেই রয়ে গেল।

আরও বড় হয়ে সীতারাম উপন্যাসের পাতায় দেখেছি, শ্রীক্ষেত্রে জয়ন্তী আর শ্রী ভৈরবীবেশে বিভূতি রুদ্রাক্ষাদি শোভিত হয়ে জগন্নাথ সমীপে চলেছেন। লেখকের মনে হয়েছে, সঞ্চারিণী দীপশিখাদ্বয়ের মতো ওই দুইজন পথ আলো করে চলেছেন। সকলে বিস্মিত। কেউ বলল, কি পরি মাইকিনিয়া মানে যাউছন্তি পারা। কেউ বলল, সে মানে দ্যাবতা হ্যাব। কেউ প্রণাম করে ধন দৌলত বর মাঙল।  কেউ বলল, কিছু ব’লো না, এঁরা বোধ হয় রুক্মিণী সত্যভামা, সশরীরে স্বামীর কাছে যাচ্ছেন। অপরে মনে করল, ওঁরা তো শ্রীক্ষেত্রেই আছেন। ওঁরা নন।  এঁরা  নিশ্চয় শ্রীরাধিকা, চন্দ্রাবলী। গোপবালা বলে পদব্রজে যাচ্ছেন। এটাই যখন স্থির হল, তখন এক দুষ্টা স্ত্রী বলল, হউ হউ! যা যা! সেঠিরে তা ভৌঁউড়ি অচ্ছি, তুমানঙ্কো মারি পকাইব।
জগন্নাথদেব, সুভদ্রা ও বলরামের প্রতি ওড়িশাবাসী ও বাঙালির ভক্তি ও আবেগের প্রকাশ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ওপরের অংশটিতে। বঙ্কিমচন্দ্রের মনোধর্মেরও পরিচয় পাওয়া যায় এখান থেকে। এই বঙ্কিম দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলার মানুষও। সেই বাংলায় বাস করে আমি কী করে আর মুখ ফিরিয়ে থাকি।

ইতিমধ্যে আমি যখন চাকরিতে ঢুকেছি, তখন শুনলাম, আমাদের পাশের গাঁ কেন্নার সায়রের পাড়ে নগেন সিংহ রায়ের জায়গায় সিলেট থেকে আসা এক বৈষ্ণব আশ্রম তৈরি করেছেন। একটা রথেরও পত্তন হয়েছে। ব্যস রথযাত্রা শুরু হয়ে গেল। ভক্তজনের বহুদিনের ইচ্ছে পূর্ণ হল। রথযাত্রার মেলা মানে পাঁপড়ভাজা, তেলেভাজা,আরও হরেক কিসিমের দোকান। আর রথযাত্রা যেহেতু বর্ষাকালে তাই কাঁঠালের বিক্রি তো মাস্ট। অন্য মেলার থেকে এখানেই এর পার্থক্য। তাই মেলা দেখে বাড়ি ফেরার সময় অনেকের কাঁধেই থাকে ঢাউস কাঁঠাল। সেই কাঁঠাল মাঝে মধ্যেই কাঁধ থেকে পিছলে পথোপরি পড়ে ফাটে। পাকা কাঁঠালের গন্ধে ম ম করে ওঠে চারদিক। ধামসা মাদল সহযোগে যায় আশপাশের গাঁয়ের বিভিন্ন সাঁওতালি  পল্লির পুরুষ মেয়েরা। কখনও বা তাদের মধ্যে গণ্ডগোল পেকে ওঠে। কোনও তরুণ হয়তো কোনও তরুণীকে পছন্দ করে তার মাথায় সিঁদুর দিয়ে দিল। আর তা নিয়ে শুরু হয়ে গেল অশান্তি, সংঘর্ষ, রক্তারক্তি। শোনা যায়, প্রাচীনকালেও নাকি এই ধরনের ঘটনা ঘটত।  মেয়ের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হত। আর এই রক্ত থেকেই এসেছে সিঁদুর। জানি না, এখনও এই ধরনের ঘটনা ঘটে কিনা।  
একটা ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে।  এক চুড়িওয়ালির কথা।   হিন্দুস্তানি চুড়িওয়ালি। সেবার ওই রথের মেলায় আমার ছোট্ট মেয়ে তিন্নিকে নিয়ে গেছি। আমার সঙ্গে আরও অনেকেই গেছে। অনেকেই চুড়ি পরছে। আমার ছোট্ট মেয়েরও ইচ্ছে, সেও রঙিন চুড়ি পরে। হঠাৎ চুড়িওয়ালি সবাইকে ফেলে তিন্নিকে ডেকে নিল কাছে। তারপর তাকে দু’হাত ভর্তি চুড়ি পরিয়ে দিল। আমি জিগ্গেস করলাম,  কত দাম হল? সে  বলল, দাদার মেয়েকে চুড়ি পরিয়ে দাম নোব? কোনও অনুরোধেই সে টলল না। আরও কয়েকবার সে তিন্নিকে বিনা পয়সায় চুড়ি পরিয়েছে। সে-ই বলেছে, আমাকে দেখতে নাকি তার দাদার মতো। ওকে সবাই বলত পাগলিদিদি। আমি মেমারিতে নেমে চকদিঘির মোড়ে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। পাগলিদিদি বড় ভাঁড়ে গরম চা আর একটা বিস্কুট নিয়ে এসে হাজির। মুখ দেখেই নাকি বোঝা যাচ্ছে, আমি অনেকক্ষণ কিছু খাইনি। তাই চা-টুকু আমাকে খেতেই হবে। কর্ড লাইনে মশাগ্রাম স্টেশনে নেমে মোড়ে এসে বাস ধরেছি। একটু সুস্থির হয়ে টিকিট কাটার জন্যে পয়সা এগিয়ে দিয়েছি। কন্ডাক্টর বলেছে,  আপনার টিকিট কাটা  হয়ে গেছে। অবাক হই। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পাই, বাসের মেঝেতে চুড়ির ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে পাগলিদিদি। আমার দিকে চেয়ে স্মিত হেসেছে। জিগ্গেস করেছে, আমার খবর সব ভালো তো? ওর ওই ভালবাসার দানকে অস্বীকার করতে পারিনি। রথযাত্রার মেলাতেই তো তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা।
সেই রথের মেলার বয়স মনে হয় পঞ্চাশ বছর তো হয়েছেই। কত কী পরিবর্তন হয়েছে তার। কত ঘটনা এখনও চোখে মায়াকাজলের মতো লেগে আছে। মুছতে চেষ্টা করলেও যায় না। মেলা দেখে আমারই গাঁয়ের একজন ফিরছে। ঘোষপাড়ার মোড়ে একজন, মাথায় ঘোমটা দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি কাছে আসতেই মাথায় ঘোমটা এগিয়ে এল। লোকটার হাত ধরে বলল, বাড়িতে একবার চল। কোনও অনুরোধেই কাজ হল না। আকুতি শেষে চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ল। তবু  সে পাষাণ। পরিত্যক্তা স্ত্রীর সব প্রচেষ্টা বিফলে গেল। আমি এই করুণ দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলাম।


রথযাত্রায় না হলেও অন্য সময়ে অনেকবার আমি পুরী গিয়েছি। শেষ যেবার যাই, সেবার স্বর্গদ্বারের কাছে একটা বিরাট হোর্ডিং দেখে চমকে উঠি। সেখানে লেখা, বিখ্যাত পাণ্ডা গদাধর সিঙ্গেরির পুত্র দীনবন্ধুর চালের আড়ত। এই সিঙ্গেরিই আমাদের পরিবারের পাণ্ডা ছিলেন। এর আগেরবার পর্যন্ত আমরা তাঁর হাতেই নিজেদের সঁপে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেবার গিয়েছিলাম দুই মেয়ে জামাইদের তত্ত্বাবধানে। কাজেই ওরাই পাণ্ডা ঠিক করেছিল। সেই পাণ্ডা আবার পরিচিত মেকানিক্যাল পাণ্ডা হিসাবে। মানে খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, দিন এগিয়ে চলেছে। যিনি পাণ্ডা তিনি আবার মেকানিকও।  এই সূত্র ধরেই বলা যায়, রথযাত্রাও এখন নিশ্চয় আগের মতো নেই,  পাল্টেছে। কারণ ভক্তরাও পাল্টেছে।

 

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন  মুখ্য সহ সম্পাদক সমর মিত্র পরবর্তী সময়ে বর্তমান পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদ কর্মের মধ্যে লেখক নিরন্তর সৃজনশীল রয়েছেন।

Comments are closed.