ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার নামই যোগ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রাজীব সাহা

মানবজন্মের উদ্দেশ্য কী?

প্রাচীন ঋষিরা বলেছেন, মানব জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বরকে লাভ করা। যার দ্বারা মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তাকে বলে যোগ। ভারতের সাধকরা প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে যোগের চর্চা করেন। তাতে শরীর ও মন সুস্থ থাকে। অর্থাৎ শারীরিক অসুস্থতা সাধনার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আধুনিক যুগেও যোগব্যায়াম মানুষকে জীবনের লক্ষ্যপূরণে সাহায্য করতে পারে। সেজন্যই ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যোগ একইসঙ্গে শিল্প ও বিজ্ঞান। যোগের মাধ্যমে মানুষ শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করে। আমাদের শরীর যদি অসুস্থ হয়, তাহলে কোনও বিষয়ে মনঃসংযোগ করা সম্ভব হয় না। কারণ শরীরের সঙ্গে মনও দুর্বল হয়ে পড়ে।

যোগ প্রথমে শরীরকে শক্তিশালী করে তোলে। প্রাণায়ামের মাধ্যমে শরীরে শক্তিসঞ্চার হয়। প্রাণ মানে নিঃশ্বাস। প্রাণায়াম শেখায়, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে শরীর ও মন সংহত হয়। যোগের আরও উচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারলে সাধক তাঁর আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগ সাধন করতে পারেন। সর্বোচ্চ স্তরে সাধক ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হন।

ভাগবত পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যোগের উপকারিতা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, যোগী নানা উপায়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারেন। প্রাণায়াম, হঠযোগ ও আরও নানা প্রকার যোগাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করেন। তবে কেবলমাত্র গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী যোগের চর্চা করা যায়।

‘যোগ’শব্দটির প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় ঋগ্বেদে। পরবর্তীকালে ঋষিরা যোগের পদ্ধতিগুলি আরও উন্নত করেন। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে প্রথম যোগ সূত্রগুলি নথিভূক্ত করেন ঋষি পতঞ্জলি। তাঁর প্রদর্শিত পন্থার নাম রাজযোগ। পতঞ্জলির কয়েক শতক পরে সাধকরা যোগের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন লাভ করার পথ আবিষ্কার করেন।

ভারতীয় যোগকে পাশ্চাত্যে জনপ্রিয় করে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হয় উনিশ শতকের শেষদিক থেকে। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্ম মহাসভায় উপস্থিত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর মাধ্যমে বিদেশীরা প্রথমবার ভারতের আধ্যাত্মিক সম্পদের সন্ধান পায়।

ভারতে ‘ফাদার অব মডার্ন ইয়োগা’ বলে যিনি পরিচিত, তাঁর নাম তিরুমালাই কৃষ্ণমাচারিয়া। ১৮৮৮ সালে জন্ম। প্রয়াত হন ১৯৮৯ সালে। অর্থাৎ শতায়ু হয়েছিলেন। তিনি যোগ ব্যায়ামের মাধ্যমে পীড়িত মানুষের চিকিৎসা করতেন। মহীশূরের মহারাজা ছিলেন তাঁর পৃষ্ঠপোষক। মহারাজার সহায়তায় তিরুমালাই কৃষ্ণমাচারিয়া দেশের নানা প্রান্তে ভ্রমণ করে যোগের উপকারিতা বুঝিয়ে বলতেন। কথিত আছে, তিনি নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন।

তাঁর এক শিষ্যের নাম ছিল বি কে এস আয়েঙ্গার। তিরুমালাই কৃষ্ণমাচারিয়া যেমন স্বদেশে যোগকে জনপ্রিয় করেছিলেন, তাঁর এই শিষ্য যোগের প্রসার ঘটিয়েছিলেন বিদেশে। শৈশবে তিনি নানা রোগে ভুগতেন। খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীকালে যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যোদ্ধার করেন। তিনি পতঞ্জলি যোগ সূত্রের পুনর্ব্যাখ্যা করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সেও আধ ঘণ্টা শীর্ষাসন করতে পারতেন। ৯৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

যোগকে বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন মহর্ষি মহেশ যোগী। তাঁর জন্ম ১৯১৮ সালে। আগে নাম ছিল মহেশ প্রসাদ বর্মা। জ্যোতির্মঠের শংকরাচার্য স্বামী ব্রহ্মানন্দ সরস্বতীর শিষ্য ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি যোগ শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণে যান। বিটলস সহ বিভিন্ন সেলিব্রিটিরা তাঁর শিষ্য ছিলেন।

একুশ শতকের শুরুতে রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বীকৃতি লাভ করে যোগ।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় যোগ সম্পর্কে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, যোগ হল ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক মহান অবদান। এর অর্থ শরীর ও মনের যোগসাধন। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে যোগসাধন। চিন্তা ও কর্মের মধ্যে যোগসাধন। যোগ মানে ব্যায়াম নয়। এর অর্থ ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের একাত্মতা আবিষ্কার করা।

২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘ ঘোষণা করে, এখন থেকে প্রতি বছর ২১ জুন দিনটিকে বিশ্ব যোগ দিবস হিসাবে পালন করা হবে।

২১ জুন দিনটিকে কেন বেছে নেওয়া হল?

ওই তারিখে সুর্য নিজের অক্ষরেখার ওপর এমনভাবে হেলে থাকে যাতে উত্তর গোলার্ধে দিবাভাগের দৈর্ঘ্য হয় সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ সেদিন সূর্য ওঠে বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় আগে এবং অস্ত যায় পরে। প্রাচীন কাল থেকে ভারতে ওই দিনটিকে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়।

পুরাণে আছে, আদি যোগী হলেন শিব। বহুকাল আগে ভক্তেরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হন। কিন্তু শিব ছিলেন সাধনায় মগ্ন। তিনি ভক্তদের উপস্থিতি টেরই পাননি। দীর্ঘকাল অপেক্ষা করে ভক্তরা হতাশ হয়ে একে একে ফিরে আসতে লাগলেন।

হতাশ হননি শুধুমাত্র সাতজন। তাঁরা অপেক্ষা করতে লাগলেন, কখন মহাদেবের সাধনা শেষ হয়। এইভাবে কেটে গেল ৮৪ বছর। শিব যখন সাধনা শেষ করে চোখ খুললেন, তখন সূর্যের উত্তরায়ন শেষ হয়ে দক্ষিণায়ন শুরু হতে যাচ্ছে। সেই দিনটি দীর্ঘতম। সাত ভক্তের ধৈর্য দেখে তিনি আর তাঁদের উপেক্ষা করতে পারলেন না। তার ঠিক ২৮ দিন পর ছিল পুর্ণিমা। সেই দিনে আদি যোগী পরিণত হলেন আদি গুরুতে। শিষ্যদের যোগ শেখাতে শুরু করলেন। ওই পুরাণ কাহিনিকে মান্যতা দিয়ে ২১ জুন দিনটিকে যোগ দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

প্রতিবছর বিশ্ব যোগ দিবসের একটি থিম থাকে। গতবছর থিম ছিল ‘ইয়োগা ফোর পিস’। শান্তির জন্য যোগ। ভারতে বিশ্ব যোগ দিবসের প্রধান অনুষ্ঠান হয়েছিল দেরাদুনের ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে যোগব্যায়াম করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে রাজস্থানের কোটায় একসঙ্গে যোগ ব্যায়াম করেছিলেন ১ লক্ষের বেশি মানুষ। এই ঘটনাটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পায়।

২০১৯ সালের থিম ইয়োগা ফোর হার্ট। হৃদয়ের জন্য যোগ। এবারের মূল অনুষ্ঠান হবে রাঁচিতে। শহরের ‘প্রভাত তারা’ ময়দানে ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক যোগ ব্যায়াম করবেন। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান স্থলের আশপাশে থাকছে আটটি মেডিক্যাল ক্যাম্প। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানে চিকিৎসা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে স্পেশ্যাল প্রোটেকশন গ্রুপ। রাজ্য পুলিশ ও আধা সেনার ৪ হাজার নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করা হবে।

ভারত বাদে বিশ্ব যোগ দিবসের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে অন্যান্য দেশেও। বৃহস্পতিবার আবু ধাবির উম অল এমারাত পার্কে হবে অনুষ্ঠান। অংশ নেবেন কয়েক হাজার মানুষ। উদ্যোক্তারা তাঁদের জন্য ফ্রি পার্কিং স্পেস, ইয়োগা ম্যাট ও টি শার্টের ব্যবস্থা রেখেছেন। দুবাইয়ের জাবিল পার্কে শুক্রবার সাড়ে ছ’টায় যোগ দিবসের অনুষ্ঠান হবে। ভারতের কনসাল জেনারেল বিপুল একথা জানিয়েছেন। শারজাতেও যোগ দিবসের অনুষ্ঠান হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More