রবিবার, জানুয়ারি ২৬
TheWall
TheWall

যোগ শুধু ব্যায়াম নয়, সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার পদ্ধতি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

প্রেমসুন্দর দাস

যোগ মূলত সুস্থ থাকার বিজ্ঞান বা সায়েন্স অব ফিটনেস। ফিটনেসের তিনটে দিক আছে, শারীরিক, মানসিক আর আধ্যাত্মিক যেটাকে আমরা ‘স্পিরিচুয়াল হেল্থ’ বলে থাকি। আপনি যদি শরীরকে ভালো ভাবে চিনতে শেখেন তাহলে তার বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ বা ফাংশানগুলো সম্পর্কে আপনার একটা সম্যক ধারণা তৈরি হবে। শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া, পরিপাক যন্ত্রের ক্রিয়া, পেশী সংগঠন এই সবকিছুর প্রতি একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যত্ন নেওয়া বা ‘সিস্টেমেটিক কেয়ার’ কে বলে হঠযোগ। যেটা ‘ফিজিক্যাল আসপেক্ট অব যোগা’ বা যোগের শারীরিক দিক।

শুধু শরীর নয়, তার সঙ্গে থাকে ‘মেন্টাল হেল্থ’ বা মানসিক স্বাস্থ্যের দিক। যাকে বলা হচ্ছে ‘সাইকোলজিকাল আসপেক্ট অব যোগা’। শরীর ও মনের সামঞ্জস্যবিধান যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যোগের চমৎকারিত্ব এখানেই। এটাকে শুধুমাত্র ব্যায়াম ভাবলে ভুল হবে। বরং যোগের সঠিক ব্যাখ্যা দিলে বলতে হয় এটা ‘সায়েন্স অব ইন্টিগ্রেশন’ বা যুক্ত হওয়ার বিজ্ঞান। সেখান থেকেই তো যোগ শব্দটি এসেছে।

এখন আমরা জানতে পেরেছি যে, অধিকাংশ রোগই সাইকোসোমাটিক যেমন, ব্লাড প্রেশার, হাইপারটেনশন, ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা এই সবই সাইকোসোমাটিক রোগ। স্ট্রেস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই রোগগুলিরও বৃদ্ধি ঘটে। মন যদি আপনি স্ট্রেস মুক্ত রাখতে পারেন, ৮০ ভাগ সমস্যা আপনি সমাধান করতে পারবেন। এবং যোগ হল শরীর ও মনকে চাপমুক্ত রাখার আদর্শ পদ্ধতি। সুস্থ শরীর, সুস্থ মন।

যোগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল ভালো থাকা। এই ভালো থাকা মানে শুধু শারীরিক ভাবে ভালো থাকা নয়, ভালো থাকা মানে মনের দিক থেকেও ভালো থাকা। একমাত্র তাহলেই আপনি পারিবারিক জীবনেও ভালো থাকতে পারবেন। সুস্থ পারিবারিক জীবন, সুস্থ সামাজিক আচরণ সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন যোগ। ফলে একটি শক্তিশালী দেশ গঠনের জন্য যোগের প্রয়োজন সর্বাধিক।

মনে রাখা দরকার যোগ শুধু নিজের ভালো থাকার উপায় মাত্র নয়। যোগ বহুজন সুখায়চ, বহুজন হিতায়চ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যোগ মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রত্যেকের অধিকার আছে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের অধিকারী হওয়া সে যে ধর্মের বা জাতেরই হোক না কেন। শুধু তাই নয়, মানুষের নৈতিক চরিত্রও এখন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কথাবার্তা, চালচলন, ভদ্রতা সভ্যতা, নম্রতা এগুলো চূড়ান্ত অধঃপতিত হয়েছে। এর ফলে স্ট্রেস তৈরি হচ্ছে। একটা থেকে দশটা স্ট্রেস হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দরকার নৈতিক যোগ। এটাও এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এটা আমাদের শিখতে হবে। মনের প্রশান্তি থাকবে, পরিবেশ দূষিত হবে না, নিজে ভালো থাকবেন, মানুষের মঙ্গল চিন্তা করবেন, অমঙ্গল চিন্তা করবেন না। যতগুলো রিপু আছে, সেই রিপুগুলোকে দমন করার চেষ্টা করবেন।

যোগ করতে করতে নৈতিক বোধেরও উন্নতি ঘটে। যোগের মধ্যে দিয়ে নৈতিক শক্তির বৃদ্ধি ঘটে। যোগের প্রথম ভিত্তিই হল যম, নিয়ম। ‘কন্ট্রোল অ্যান্ড ডিসিপ্লিন।’ সংযমে মন চলবে, নিয়মে শরীর চলবে। অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় মানুষকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে আয়ত্বে রাখা যায় এই যোগের মাধ্যমে। প্রাণায়াম ও ধ্যানের মাধ্যমে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা যায়। সুতরাং যোগ করুন, সুস্থ থাকুন সবাইকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন।

শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় রাখার এই সংস্কৃতি ভারতে চলে আসছে পাঁচ হাজার বছর ধরে। আজ সারা পৃথিবী এর মূল্য বুঝতে পেরেছে। বিশ্ব যোগ দিবসে ভারতবাসী হয়ে আমরা বলতে পারি বিশ্বজন হিতায়চ বিশ্বজন সুখায়চ। এটা আমরা সামাজিক সেবা হিসেবে দেখি। যোগ মানবতার জন্য, যোগ মানব সভ্যতার জন্য।

 

যোগা রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবলিটেশন সেন্টর–এর ডিরেক্টর লেখক কলকাতার একাধিক যোগ চর্চা ও চিকিৎসা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত।

Share.

Comments are closed.