দুই সরণীর শেষ অভিযাত্রী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সানফ্রানসিসকো ফেস্টিভ্যালে মঞ্চে গাইছেন হ্যারি বেলাফন্টে। হঠাৎ অনুষ্ঠানের মধ্যে তিনি ঘোষণা করলেন, দর্শকাসনে বসে আছেন এক সুন্দরী অভিনেত্রী যিনি এসেছেন ভারতের শহর কলকাতা থেকে। সেই অভিনেত্রী যেন মঞ্চে উঠে তাঁর সঙ্গে কয়েক লাইন গান গেয়ে দর্শকদের শোনান। মঞ্চে ধীরে ধীরে উঠে আসেন  রুমা গুহঠাকুরতা। সামনে থাকা অসংখ্য শ্রোতাদের সামনে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ান মাইক্রোফোনের সামনে যে শ্রোতাদের হয়তো অনেকেই ভারত বা কলকাতার অস্তিত্ব সম্পর্কেই সম্পূর্ণ অজ্ঞ। বাজারের বিশ্বায়নের অনেক আগে মার্কিনি শ্রোতারা সংগীতের এক বিশ্বায়ন প্রত্যক্ষ করেন। সুদূর বাংলার অভিনেত্রী–গায়িকার সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয় জামাইকান–আমেরিকান অভিনেতা–গায়ক হ্যারি বেলাফন্টে গাইছেন ডাউন দ্য ওয়ে…।

মা সতী দেবী ছিলেন বিখ্যাত গায়িকা। কলকাতার প্রথম গানের স্কুল ‘স্বরবিতান’ খুলে ছাত্র–ছাত্রী তৈরি করতে শুরু করেছেন তিনি। বালিকা রুমা সেই গানের ক্লাসের একপাশে বসে গান শুনত। ছোটবেলা থেকেই গানের মধ্যে বড় হওয়া। প্রথাগত গানের তালিম সেভাবে কারও কাছে না হলেও মুম্বাইতে কিছুদিনের জন্য শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আবদুর রহমান খাঁ–কে কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কিশোর কুমারের জীবনে মধুবালা আসায় চুকে যায় রুমার মুম্বাইয়ের পাট। কিশোর কুমারের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ায় তাঁকে ফিরে আসতে হল কলকাতায়। গুরুজির কাছে গানের তালিম অসম্পুর্ণ থেকে যাওয়ার আক্ষেপ তাঁর মেটেনি কোনওদিন। কিন্তু প্রায় স্বশিক্ষিত এই গায়িকা সত্যজিত রায়ের ‘তিন কন্যা’য় ‘বাজে করুণ সুরে’ গেয়ে বাঙালিকে শিহরিত করে দিয়েছিলেন।

মুম্বাইতে থাকতেই সলিল চৌধুরী রুমাকে প্রস্তাব দেন আইপিটিএ–র গানগুলিকে পুনরজ্জীবিত করার। তৈরি হয় বোম্বে ইউথ কয়্যার। কয়্যারে যোগ দেন মান্না দে, শৈলেন্দ্র’র মতো প্রথিতযশা গায়ক–গীতিকারেরা। সলিল চৌধুরীর সুরে শৈলেন্দ্র’র কথায় তখন বোম্বে ইউথ কয়্যার বাণিজ্যনগরী তথা ভারতকে শোনাচ্ছে গণসঙ্গীতের পেশাদারী সংস্করণ। কিন্তু রুমা’র পারিবারিক বিপর্যয় বোম্বে ইউথ কয়্যারকেও ইতিহাস করে দেয়। আরব সাগরের তীর থেকে কয়্যার সঙ্গীত জায়গা বদল করে থিতু হয় ভাগীরথীর পুব পাড়ে। জন্ম নেয় ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার। বিস্তীর্ণ দু’পাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে উদাসীন গঙ্গা বয়ে যায় এবং রুমা ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রবল জেদকে সম্বল করে বাংলার শ্রোতাকে শুনিয়ে যান আকাশে একখানা মেঘ ভেসে আসার আখ্যান।

গণসঙ্গীতের পাশাপাশি রুমা গাঙ্গুলি থেকে রুমা গুহঠাকুরতা হয়ে ওঠা গায়িকার কণ্ঠে বাংলায় ঢেউ উঠে গেছে ততদিনে। ‘এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়’, ‘মন যে আমার কেমন কেমন করে’ থেকে ‘তোমার আমার ঠিকানা’–র বিস্তৃত পরিসরে শ্রোতাদের কাছে রুমা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন সঙ্গীতের এক স্বতন্ত্র অভিজ্ঞান। একই সঙ্গে সিনেমার দর্শকরাও পেয়েছেন একজন শক্তিশালী অভিনেত্রীকে। গঙ্গা, অভিযান, পলাতক, বালিকা বধু থেকে গণশত্রু– যাঁর সাবলীল চরিত্রায়ন উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তিন প্রজন্মের স্মৃতিতে। পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেও যে নিজেকে মনে রাখানো যায়, রুমা গুহঠাকুরতা অভিনেত্রী হিসেবে বারবার সেটা প্রমাণ করেছেন। সেলুলয়েডে তাঁর উপস্থিতিই ঘোষণা করে দিত চরিত্রটি এমনকী অনেকসময় চলচ্চিত্রটি আর দশটা সাধারণ মাপের চরিত্র বা চলচ্চিত্র নয়। শিল্পী হিসেবে এমন প্রাপ্তি খুব কম অভিনেতা–অভিনেত্রীর জীবনেই ঘটে।

শরীর ভেঙে পড়েছিল, বার্ধক্য স্বাভাবিক নিয়মেই গ্রাস করছিল শিল্পীর দৈনন্দিন যাপনকে। তবু জীবনের অস্তবেলায় টিভির একটি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি সঞ্চালিকাকে বলেছেন আগামীদিনে তাঁর আরও অনেক কাজ করার স্বপ্নের কথা। প্রতিটি দিনই ছিল তাঁর কাছে নতুন সৃষ্টির দিন। বার্ধ্যকে পৌঁছেও তিনি তাঁর তীব্র যৌবন বোধ ত্যাগ করেননি বলেই শেষদিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখেছেন ইউথ কয়্যারকে নিয়ে। ‘শূন্যতা তৈরি হল’ বাক্যটি অতি ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে পড়েছে বহুকাল, তবু কোনও কোনও সময় সত্যিই এমন শূন্যতা রচিত হয় যে তখন ক্লিশে উচ্চারণ এড়ানোর জন্য নীরবতাই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ বাক্যবন্ধ। আজ সেরকমই একটি নীরব থাকার দিন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More