রুমাদি গানবাজনা সম্পর্কে আমার ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কল্যাণ সেন বরাট

    ছোটবেলার থেকে গানবাজনায় ভালোবাসা, গানবাজনা শেখা। বিভিন্ন গানের যে ফর্ম সেগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া। যেহেতু জামাইবাবু ছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, ওই ধরনের গানে একটু বেশি ভালোলাগার দিক তৈরি হয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। পিয়ানো, পিয়ানো অ্যাকোর্ডিয়ান শেখা শুরু হল। সঙ্গে গানও চলছে, একটা সময় বেশ চুটিয়ে অনুষ্ঠান করছি। পিয়ানো অ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়ে মহম্মদ রফির গানও গাইছি আবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানও গাইছি।

    ৭৩ সালে চাকরি পেয়ে যাই ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া–য়। চলে যেতে হয় আসানসোলে। আসানসোলে যাওয়ার পর গানবাজনা একটু থমকে গেছিল। ৭৬ সাল নাগাদ বার্নপুরে রুমাদিদের একটা অনুষ্ঠান শুনি। ওইটা দেখতে গিয়ে বস্তুত গানবাজনা সম্পর্কে আমার ধারণাটাই পাল্টে যায়। মানুষের গান কী, আমাদের স্বাদেশিকতার গান কী, আমাদের গণসঙ্গীত কী সেই অর্থে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। আর তার সঙ্গে নাচ আলো মিলে এমন একটা প্যাকেজ যা দেখে আমি সেই রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। খালি রুমাদির ওই অনুষ্ঠান চোখে ভাসছে। সকালে উঠেই মনস্থির করে ফেলি, যদি গানবাজনার সঙ্গে থাকি তাহলে কয়্যারই করবো।

    কলকাতা থেকে গেছি, বাজনা বাজাই, গান গাই ফলে কিছু গান পাগল ছেলে জুটে গেছিল। তাদের বোনেরা আবার কেউ নাচে, কেউ কবিতা বলে– এই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একমাসের মধ্যেই আসানসোলে একটা কয়্যার তৈরি ফেললাম, নাম ছিল ঐকতান। তাতে যে সমস্ত গান গাইতাম তার প্রায় সবই রুমাদির রেকর্ডের থেকে তোলা গান কারণ তখনও আমার নিজের গান তৈরি হয়নি। তারপর ১৯৭৮ সালে কলকাতায় ফিরে এলাম।

    কলকাতায় ফেরার পর ১৯৭৯ সালে তৈরি হল ক্যালকাটা কয়্যার। ৮০ সালে আমাদের কয়্যারে যোগ দিলেন শম্ভুদা (শম্ভু ভট্টাচার্য)। শম্ভুদা কিন্তু তার আগেই ইউথ কয়্যারে ডান্স ডিরেক্টর ছিলেন। একদিক থেকে ভাবলে সেটা একটু অসুবিধের ব্যাপার বলে মনে হতে পারে। একটা দল ছেড়ে আর একটা দলে এলেন। ঘটনাচক্রে এই সময় আলাপ হল রুমাদির সঙ্গে। যে কোনও কারণেই হোক, প্রথম দিন থেকেই আমাকে উনি স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। এরপর একসঙ্গে কিছু অনুষ্ঠানও করেছি। ওনাদের পুজোর রেকর্ড বেরোবে, আমাকে বললেন, ”কল্যাণ দুটো গানের সুর করে দাও”। শিবদাসদার লেখা। সে গানের সুর করলাম, ওনাদের রিহার্সালে গিয়ে ওনাদের গান তোলাতাম। সেই সময় দেখেছিলাম পারফেকশনের প্রতি রুমাদির কী তীব্র নজর। আমাকে প্রায় মাস্টারমশাইয়ের সম্মান দিয়েছিলেন। উনি তখন কিন্তু ছাত্রী। আমি হয়তো কোনও একটা জায়গা ওকে করে দিয়েছি, রুমাদি বলতেন না না না, আরও ভালো হবে, আরও ভালো হবে। কেন একটা দল ওই উচ্চতায় পৌঁছয় সেটা রুমাদির এই দিকটা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম। আমার কাছে সেটা একটা শিক্ষা।

    ইতিমধ্যে সলিলদা’র সঙ্গেও আমার আলাপ হয়ে গেছে। উনিও আমার শিক্ষাগুরু। আমাদের রেকর্ড বেরিয়ে গেছে। তখন তিন–চারটে কয়্যার একরকম পাশাপাশি ছুটছে। এক অর্থে ভাবলে এই কয়্যারগুলি ছিল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু একটি কথা আমি রুমাদিকে বলেছিলাম, দিদি আমরা কেউ কারওর প্রতিদ্বন্দ্বী নই আমরা একে অপরের পরিপূরক। আমরা একে অপরের কাছে শিখব। এবং এটা যেহেতু একটা মুভমেন্ট, আমরা একসঙ্গে সেই মুভমেন্টে থাকব। কথাটা রুমাদি এত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন যে ওনার প্রতি শ্রদ্ধা আমার অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল।

    আমাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা আস্তে আস্তে মা–ছেলের সম্পর্কের মতো হয়ে গেছিল। বিখ্যাত কীবোর্ড প্লেয়ার বেবিদা সেই সময় বাজাতেন রুমাদির সঙ্গে। আমাদের পাড়ায় থাকার কারণে ছোটবেলা থেকেই ওনার  বাজনা শুনে বড় হয়েছি। একদিন কথায় কথায় বেবিদা বললেন ”চল, আমি তোদের সঙ্গে বাজাব।” আমি বললাম বাজাও, খুব ভালো হয় তাহলে। বেবিদা আমাকে একটাই শর্ত দিলেন। মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর রুমাদি’র অনুষ্ঠান থাকলে ওনাকে ছেড়ে দিতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেছিলাম। সেসময় দিদির সঙ্গে একটু হাল্কা মনোমালিন্য যে হয়নি তা নয়, কিন্তু কদিন বাদেই রুমাদি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওনাদের অনুষ্ঠানে বেবিদাকে ওনারা নিয়মিত পাচ্ছেন। কারণ আমি সেভাবেই তৈরি ছিলাম।

    একটা অদ্ভুত মহত্বের দিক দেখলাম তারপর। একটা নাচের কম্পোজিশন করার জন্য রুমাদি শম্ভুদাকে  প্রস্তাব দিলেন। শম্ভুদা তখন রুমাদিকে বলেছিলেন, ”আপনি একটু কল্যাণের সঙ্গে কথা বলে নিন। আমি তো ওখানে নিয়মিত কাজ করি।” রুমাদি একদিন আমাকে ফোন করলেন, ফোনে উনি জিজ্ঞেস করলেন যে, ”আমি কি চিঠি দিয়ে বিষয়টা জানাব?” আমি বললাম, আপনি বলছেন এটাই তো শেষ কথা। আপনি এমন আলাদা ভাবছেন কেন? আপনি আলাদা ভাববেন না। তারপর থেকে শম্ভুদা ওখানে গেছেন, বেশ কিছু কম্পোজিশনও করেছেন। আমাদের সঙ্গে শেষদিন পর্যন্তই ছিলেন কিন্তু রুমাদির সঙ্গেও আবার নতুন করে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছিল। যদিও ওনার তখন নাচার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু উনি কম্পোজিশন করে দিতেন। এই যে একটা অদ্ভুত এথিক্যাল জায়গা উনি আমাকে শেখালেন সেটা আমি আজও ভুলিনি। আমরা যে আজ ‘আমরা’ হয়ে উঠেছি তার পেছনে এই মানুষগুলোর প্রচুর অবদান রয়েছে।

    ৯২ সালে ‘আমাদের একটাই দেশ’ করলাম। তাতে সমস্ত শিল্পীরা যোগ দিলেন। রুমাদি এসে আমার সুরে গাইলেন। ওনার মেয়ে শ্রমণা আমার সুরে গেয়েছে, অমিত আমার সুরে গেয়েছে। রুমাদি’র সঙ্গে পারিবারিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছিল। পরে অভিভাবক হিসেবে সলিলদা, হেমাঙ্গদাদের পেয়েছি। কিন্তু আমার এই শুরুটাই হত না যদি না সেই সন্ধেতে রুমাদির অনুষ্ঠান না দেখতাম, রুমাদির গানগুলো যদি না শুনতাম। তখন আমি বাজনা বাজিয়ে গান গেয়ে বেশ রোজগার করছি কিন্তু এক কথায় সব ছেড়ে দিয়ে কয়্যার করতে শুরু করেছিলাম। আমি ঠিক করেছিলাম আর অ্যাকোম্প্যানি করব না আমি শুধু কয়্যার করব। এই জায়গাটা তৈরি করে দেওয়ার ব্যাপারে রুমাদির একটা বিরাট ভূমিকা ছিল।

    একটা মজার কথা মনে পড়ছে। মেয়ের বিয়েতে নেমন্তন্ন করেছিলাম অরুপদা, রুমাদিকে। সল্টলেক স্টেডিয়ামের বাইরে একটা বাগান আছে, সেখানে পার্টিটা হয়েছিল। কাকতালীয় ভাবে সেদিন সল্টলেক স্টেডিয়ামের ভেতরে ক্যালকাটা ইউথ কয়্যারের অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষ করে ওরা সবাই, প্রায় ৭০–৮০ জন আমার ওই পার্টিতে এসেছিল। কতটা আপন ভাবলে, কতটা দাবি থাকলে এটা করা যায়! আমি জানি না আমি নিজে এটা পারব কিনা।

    রুমাদির আপাত গাম্ভীর্যের আড়ালে একটা খুব প্লিজিং পার্সোনালিটি ছিল। সবাইকে উনি হঠাৎ করে খুব কাছে পৌঁছতে দিতেন না। আমি সেই আগলটা ভেঙে দিয়েছিলাম। মিশে যাওয়ার পর দেখতে পেয়েছিলাম উনি একেবারে অন্য মানুষ। দোষ কি ছিল না, দোষ নিশ্চয়ই ছিল। দোষ ছাড়া আমরা কেউই নই। কিন্তু একটা কিছু ভুল করে সেটাকে শুধরে নেওয়া এবং পরবর্তী কালে স্বীকার করে নেওয়া, আমি ভুল করেছিলাম– এই বোধের জায়গাটাই এখন বড্ড কমে গেছে। এখন একবার কেউ শত্রু হলে সে শত্রুই হয়ে যায়। ভেবে দেখার কেউ অবকাশ রাখে না কী পরিপ্রেক্ষিত, কী ব্যাপার। এগুলো সত্যি রুমাদির কাছে শেখার ছিল।

    শিল্পীরা সবসময়ই একটু আবেগপ্রবণ হন। নানা রকম সমস্যা থাকে। কিন্তু আপনি যখন একজন সংগঠক তখন আপনাকে এগুলো উপেক্ষা করেই কাজ করতে হবে। রুমাদি সেটা পেরেছিলেন। রুমাদি নিজে প্রচণ্ড ইমোশানাল ছিলেন কিন্তু দলটাকে ধরে রাখার ব্যাপারে ওনার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। উনি একটা কথা বললে সেটাকে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা কারওর ছিল না, এটা আমি একদম পাশ থেকে দেখেছি। উনি জীবন শুরু করেছিলেন উদয়শঙ্করের দলে নাচ শিখে তাছাড়া বাড়িতে ছিল গান– সীতা দেবী, সত্যজিৎ রায় তারপর কিশোর কুমার– ফলে বিভিন্ন রকম গানে রুমাদি সাবলীল ছিলেন। রুমাদি অ্যারেঞ্জমেন্টটা কিন্তু তেমন বুঝতেন না। অর্থাৎ হারমোনাইজেশন কীভাবে তৈরি করতে হয় সেই জ্ঞানটা রুমাদির ছিল না। কিন্তু যেটা দেখিয়ে দেওয়া হত সেটা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে নিতেন। ওনার না–জানা বিষয়গুলির জন্য উনি যাদের সাহায্য নিতেন তারা কিন্তু সব সেরা মানুষ ছিলেন। মধ্য দক্ষতার কাউকে নিয়ে উনি কাজ করতেন না। পরিমল দাশগুপ্ত, ওয়াই এস মুলকি এইরকম উচ্চতার মানুষদের সঙ্গে রাখতেন যাতে যে জিনিস তিনি করছেন সেটা যেন একেবারে সেরা জিনিস হয়। এটাও কিন্তু শেখার ব্যাপার। এবং হয়েছেও তাই, যে কাজগুলো তখন বেরিয়েছে সেগুলো এখনও অমর হয়ে রয়েছে।

    ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’ গানে অভিনয়ের মিশ্রণ অথবা ঠিক তার বিপরীতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আশিতে আসিও না’র গান, ওইরকম একটা কমেডি সিকোয়েন্স যেখানে একটুও বাড়তি নেই– দুটোই কত স্বাভাবিক ভাবে করা যায় সেটা রুমাদি দেখিয়ে দিয়েছেন। অভিনয় একটা বিষয় আর গান আর একটা বিষয়। গানে অভিনয় করা কিন্তু ভীষণ শক্ত। আমি অনেক বড় বড় অভিনেতাকে দিয়ে গান গাওয়াতে গিয়ে দেখেছি, তাদের পুরোপুরি গানে মন চলে যাচ্ছে, গানে অভিনয়টা থাকছে না। এটাতে রুমাদি একশ ভাগ সফল। গঙ্গা তুমি বইছ কেন গাইতে গাইতে উনি নিজেও কাঁদছেন, দর্শকরাও কাঁদছে– এটা আমি আর কারওর কাছে কোনওদিন পাইনি। আর পাব বলেও মনে হয় না।

    অমিতকে সাধুবাদ জানাই শেষের কটা বছর অমিত যে ভাবে মাকে দেখেছে, ও আমাদের সকলের হয়ে দেখেছে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতেই হবে, কিশোর কুমার ও রুমাদি’র মধ্যে কিন্তু কোনওদিন বৈরিতা তৈরি হয়নি। একসঙ্গে থাকতে পারেননি কিন্তু দুজনের প্রতি দুজনের সম্মানবোধ শেষদিন পর্যন্ত ছিল। হয়তো সেই সম্পর্কে অমিত অনুঘটকের কাজ করেছে।

    রুমাদি যাকে ভালোবাসতেন তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন।  রুমাদির মতো মানুষদের মৃত্যু হয় না। যতদিন মানুষ থাকবে, মানুষের আন্দোলন থাকবে, গানবাজনা থাকবে, যতদিন আমরা সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকব ততদিন রুমাদি বেঁচে থাকবেন। ওনার গানগুলো এখনও আমরা গাই।

    আমি এখন একটু একা হয়ে গেলাম কারণ কয়্যার মুভমেন্টটা আমাকে একা হাতেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আমারও তো বয়স হচ্ছে, কিন্তু এই চলাটা তো থেমে থাকতে পারে না। এটা এমন একটা মুভমেন্ট যাতে দুটো কাজ হয়। একটা হল আমরা মানুষের গান গাইছি, আমরা তার সঙ্গে নাচ রাখছি, দ্বিতীয় যেটা হয়, প্রচুর ছেলে মেয়ে গান করে, গানকে আশ্রয় করে বাঁচতে চায় কিন্তু একক ভাবে হয়তো সেরকম কিছু করে উঠতে পারে না। তারা কিন্তু কয়্যারের মাধ্যমে গানের সঙ্গে নিজেদের  সংপৃক্ত রাখতে পারে। আমি যতদিন সক্ষম আছি চেষ্টা চালিয়ে যাব। কারণ আজ যদি সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, রুমা গুহঠাকুরতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাহলে কয়্যারকে থাকতেই হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More