এক আকাশ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন কাওয়ামোতো, সেই গল্পটা আপনাদের শোনাবার জন্য

দেশ বিদেশের দর্শকের সামনে ৭৫ বছর আগেকার এই মর্মান্তিক গল্পটি এখনও বলে শোনান, ৮৬ বছরের শোসো কাওয়ামোতো।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রে থাকা কাকোমাছির একটি স্কুলের গেটে এসে থেমেছিল সরকারি বাস। ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসের এক দুপুরে। ক্লাসরুম থেকে বের করে আনা হয়েছিল শিশুদের। একের পর এক শিশুকে তুলে দেওয়া হয়েছিল বাসে। কিছুটা জোর করেই। বাসটিকে চারদিক থেকে মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরেছিলেন শিশুগুলির বাবা মায়েরা। ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখে একটি বার দেখতে চাইছিলেন নিজের সন্তানকে। হয়তো আর দেখাই হবে না এ জীবনে।  শিশুগুলির পরিত্রাহি চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ, ক্লান্ত দুপুরকে বিষণ্ণ করে তুলেছিল।

    এগারো বছরের কাওয়ামোতো বুঝতে পারছিল না, কেন তাদের বাবা মায়েরা একটি অপরিচিত বাসে তাদের তুলে দিয়ে চলে গেলেন। বাসটা তো তাদের স্কুলের বাস নয়। বাসটা কোথায় যাচ্ছে তাদের নিয়ে? তারা কি বাড়ি ফিরবে না? কী করা হবে তাদের নিয়ে ? আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল কাওয়ামোতো। জ্ঞান ফেরার পর কাওয়ামোতো জানতে পেরেছিল, তারা আছে হিরোশিমা শহর থেকে বেশ দূরে থাকা ছোট্ট একটা গ্রাম মিয়োসিতে। তাদের রাখা হয়েছে মিয়োসির এক বৌদ্ধ মন্দিরে।

    তখনও শিশুরা জানেনা, কেন তাদের বাবা মায়েরা, শিক্ষকরা হঠাৎ এত চুপ হয়ে গেছেন।

    কাওয়ামোতো জানতো না, আসন্ন বিপদের হাত থেকে হিরোশিমার আগামী প্রজন্মকে বাঁচাবার জন্য, ছয় থেকে এগারো বছর বয়সী দু’হাজার শিশুকে হিরোশিমা শহর থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল হিরোশিমা প্রশাসন। শিশুগুলিকে রাখা হয়েছিল মফঃস্বলের বিভিন্ন মন্দিরে। মিয়োসির মন্দিরে রাখা হয়েছিল চল্লিশ জন শিশুকে।

    বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীরা দেখভাল করছিলেন শিশুগুলিকে

    শিশুগুলিকে বুকে জড়িয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীরা। সময় হলেই তারা ফিরে যাবে বাড়িতে। কিন্তু শিশুগুলি জীবনে মা’কে ছেড়ে থাকেনি। সারা রাত জেগে থাকত তারা। থেকে থেকে ‘মা’ ‘মা’ করে ডুকরে কেঁদে উঠত। দিনের পর দিন কাঁদতে কাঁদতে, এক সময় থেমে গিয়েছিল শিশুগুলির কান্না। চিরকালের জন্য মায়ের কোল ছেড়ে চলে আসা শিশুগুলি হঠাৎ যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছিল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত একে অপরের দিকে।

    শিশুগুলির সঙ্গে সন্ন্যাসিনীরা খেলার চেষ্টা করতেন। রাতে পাশে শুয়ে গল্প শোনাবার চেষ্টা করতেন। তবুও শিশুগুলি দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছিল। খেতো না, কথা বলতো না। শুধু মন্দিরের প্রধান দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতো। যদি একবার খুলে যায় ফটকটা। যদি একবার ফটকের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বাবা মায়ের মুখ। রোজ সকাল সন্ধ্যায়, ভগবান বুদ্ধের মূর্তির কাছে প্রার্থনা জানাতেন সন্ন্যাসিনীরা। তাঁরা হাতজোড় করে  তথাগতকে বলতেন, শিশুগুলির কষ্ট আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। হে প্রভু মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও ওদের।

    আর কি হবে ফেরা বাবা মায়ের কোলে।
    ৬ আগস্ট, ১৯৪৫

    বর্ষার ঘনকালো মেঘ বিদায় নিয়েছিল জাপানের আকাশ থেকে। কিন্তু নীল আকাশে জমতে শুরু করেছিল আতঙ্কের মেঘ। মন্দিরের মাঠে কাজ করছিল কাওয়ামোতো। হঠাৎ কাওয়ামোতোর চোখে পড়েছিল, দূরে হিরোশিমার আকাশকে ঘিরে ফেলেছে সাদা ফুলকপির মতো একটা মেঘ। কয়েক মিনিটের মধ্যে কাওয়ামোতোর পায়ের তলার মাটি থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছিল। মন্দিরের চূড়াটা বিকট শব্দ করে  ভেঙে পড়েছিল। শিশুগুলিকে নিয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন সন্ন্যাসিনীরা। ভয়ে শিশুগুলি আবার  চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল ।

    মন্দিরের চাতাল থেকে সবাই তাকিয়ে ছিল হিরোশিমার আকাশের দিকে। তারা কেউ বুঝতেই পারেনি, পারমাণবিক বোমার  মাশরুম মেঘের চারপাশে বইছিল ঘন কালো ধুলোর ঝড়। সেই ঝড়ের মধ্যে ধুলো হয়ে মিশে ছিল তাদের বাবা মা দাদা দিদি আত্মীয়স্বজনরা। আমেরিকার ফেলা পারমাণবিক বোমায় সেদিন সেন্ট্রাল হিরোশিমার নব্বই শতাংশ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। যে দু’হাজার শিশুকে সেন্ট্রাল হিরোশিমা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে পঁচানব্বই শতাংশ শিশু হারিয়েছিল তাদের বাবা মা আত্মীয়স্বজন। অনাথ হয়ে গিয়েছিল শিশুগুলি।

    হিরোশিমার আকাশে মাশরুম মেঘ।
    হিরোশিমায় ফিরেছিল কাওয়ামোতো

    কয়েকদিন পরে অনাথ শিশুগুলিকে নিয়ে আসা হয়েছিল হিরোশিমা শহরে। ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল হিরোশিমা রেলস্টেশনে। ঠিক যেভাবে বিড়াল কুকুরের বাচ্চা হলে ছেড়ে দিয়ে আসা হয় রেল স্টেশনের আশেপাশে। ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বাঁচতে পারবে বলে। হিরোশিমা শহরে ফিরে এসে শিশুগুলি দেখেছিল, তাদের বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন, চেনা পরিচিত কেউ আর বেঁচে নেই। পুরো শহরটা লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। রেলস্টেশনেই কাওয়ামোতোর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল তার  দিদি টোকির। কাওয়ামোতোকে শিশুদের ভিড়ে দেখতে পেয়ে জাপটে ধরেছিল টোকি। দুজনেই ভেঙে পড়েছিল কান্নায়।

    পারমাণবিক বোমার হাত থেকে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে গিয়েছিল ১৬ বছরের টোকি। ভয়ঙ্কর দিনটিতে সে স্টেশনেই এসেছিল ট্রেনের টিকিট কাটতে। স্টেশনের সাবওয়ের কংক্রিটের দেওয়াল টোকিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। সারাদিন স্টেশনে লুকিয়ে থেকে পরের দিন বাড়ি ফিরেছিল টোকি। কিন্তু যেখানে তাদের ছোট্ট একতলা বাড়িটি ছিল, সে জায়গাটি দখল করেছিল কয়েকশো ফুট গভীর একটি গর্ত। দিদির কথায় কাওয়ামতো বুঝতে পেরেছিল বাবা মা’কে চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলেছে সে। এরপর কাওয়ামোতো আর  টোকির ঠিকানা হয়েছিল হিরোশিমার রেল স্টেশনে থাকা একটি কাঠের বাক্স।

    ঠিকানা এখন রেলওয়ে স্টেশন।
    ওদের নাম হিবাকুশা

    হিরোশিমা স্টেশন চত্বরে দল বেঁধে কুকুর বেড়ালের মতো ঘুরে বেড়ানো ১৯০০ অনাথ শিশুর নাম হয়েছিল মিনাশিগো হিবাকুশা (বিস্ফোরণ আক্রান্ত অনাথ)। ছয় থেকে এগারো বছরের শিশুগুলি সারাদিন রাস্তার ডাস্টবিনে খাবার খুঁজে বেড়াতো। খাদ্যভাব চরমে উঠেছিল হিরোশিমা শহরে। সরকারি রিলিফের রুটি অনাথ হিবাকুশা শিশুগুলির হাত থেকে ছিনিয়ে খেয়ে নিতো পূর্ণবয়স্করা।

    তবু বাঁচার জন্য আপ্রাণ লড়াই করে যেতো শিশুগুলি, পশুর শাবকের মতো। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে, ১৯০০ অনাথ হিবাকুশা শিশুর মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই স্রেফ খেতে না পেয়ে মারা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন এত ক্ষুধার্ত ছিল, ক্ষিদের জ্বালায় মুখের ভেতর পাথর ঢুকিয়ে গিলতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। স্টেশন চত্বরের আশে পাশে পড়ে থাকতো, বাবা মায়ের নয়নমণির, কঙ্কালসার নিষ্প্রাণ দেহ। শিশুগুলির শবদেহ দ্রুত সরিয়ে দিতো হিরোশিমা প্রশাসন।

    শেষ হয়ে আসছিল লড়াই।

    ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, অজানা রোগে মারা গিয়েছিল কাওয়ামোতোর দিদি টোকি। সম্ভবত পারমাণবিক বোমার রেডিয়েশন জনিত লিউকোমিয়া হয়ে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কাওয়ামোতোকে, একটি সয়া সস ফ্যাক্টরির মালিক কাওয়ানাকা তাঁর ফ্যাক্টরিতে কাজে নিয়েছিলেন। সেখানে কাওয়ামোতো কাজ করেছিল এগারো বছর। যুবক হওয়ার পর  টোমো গ্রামের এক মিষ্টির মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন কাওয়ামোতো। কিন্তু প্রেমিকার পরিবার বিয়েতে রাজি হয়নি।

    দায়ী ছিল কাওয়ামোতোর কাছে থাকা হিবাকুশা হেলথ সার্টিফিকেট। যাতে লেখা ছিল পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর কাওয়ামোতো হিরোশিমায় ফিরে এসেছিলেন। যাঁরা পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তার আওতায় ছিলেন, তাঁরা জাপানের সমাজে চিরকালের জন্য অচ্ছুত হয়ে গিয়েছিলেন। জাপানের মানুষ তাঁদের ভয় পেতো। কাওয়ামোতোকে কেউ বিয়ে করেননি। কাওয়ামোতো একাই কাটিয়ে দিয়েছেন সারাজীবন। কাছের শহর ওকায়ামাতে বহু পরিশ্রমে দাঁড় করিয়েছেন তাঁর স্ট্রিট ফুডের দোকান।

    শোসো কাওয়ামোতো
    আজ কেমন আছেন হিবাকুশারা!

    বঞ্চনার মেঘ এখনও ঢেকে রেখেছে অল্প কয়েকজন জীবিত  হিবাকুশাদের আকাশ। যে কয়েকজন আশি ছুঁই ছুঁই হিবাকুশা বেঁচে আছেন তাঁরা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। কেউ জেলে, কেউ হসপিটালে, কেউ বা কেয়ার হোমে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছেন। হিরোশিমায় আছে পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম। সেখানে, দেশ বিদেশের দর্শকের সামনে ৭৫ বছর আগেকার এই মর্মান্তিক গল্পটি এখনও বলে শোনান, ৮৬ বছরের শোসো কাওয়ামোতো।

    গল্পটি শেষ হওয়ার আগের মূহুর্তে প্রত্যেকবার কাওয়ামোতোর চোখ জলে ভরে ওঠে। হাত থেকে দূরে সরে যায় মাইক্রোফোন। তবুও অস্ফুট কন্ঠে কাওয়ামোতো বলেন, “আমার স্কুলের সাত বছরের মেয়ে আকিরার নিথর চোখের দৃষ্টি আজও ভুলিনি। বাড়ির গাড়ি করে স্কুলে আসত। সেই  আকিরা ট্রেন লাইনের পাশে, ক্ষিধের জ্বালায়, নুড়ি গিলতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। চলে যাওয়ার আগে, আকিরা তার আশেপাশে কাকে যেন ঘোলাটে চোখে খুঁজছিল। হয়তো তার মাকে।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More