বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

বাস্তবকে এড়িয়ে জীবন হয় না: নাট্যকার চন্দন সেন

মঞ্চের ঘেরাটোপে ‘অপ্রিয় সত্য’-কেও সামনে এনে দাঁড় করাতে হয়। যা করছেন নাট্যকার চন্দন সেন। তাঁর মুখোমুখি বিপ্লবকুমার ঘোষ

শতাধিক জনপ্রিয় নাটকের নাট্যরূপ দিয়েছেন আপনি। জনমানসে তা আলোড়ন তুলেছে বারবার। বাংলা নাটকে আপনার হাত ধরেই এসেছে বিশ্বখ্যাত সাহিত্যের প্রভাবও। আপনার লেখনী আরও চমক দেবে নিশ্চয়ই।

হাত চলছে। লিখেও যাচ্ছি। চেকভ, টলস্টয় থেকে ব্রেখট  – কেউই বাদ নেই। দর্শকরা   প্রতিটি নাটকই দেখেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন।

আপনার লেখা নাটকগুলি তো বিভিন্ন ভাষাতেও রূপান্তরিত হয়েছে।

হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া, তেলেগু প্রায় সব ভাষাতেই আমার নাটকগুলি রূপান্তরিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, দুই হুজুরের গপ্পো, জ্ঞানবৃক্ষের ফল, ব্রেখটের পাঁচটি ছোট নাটক, সাধুসঙ্গ, দায়বদ্ধ, হিসেবের কড়ি, পঞ্চরঙ্গ, দেওয়াল লিখন, ফিরে এসো প্রেম প্রভৃতি নাটক।

শ্রুতি নাটক সমগ্র তো শুনেছি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে এখনও তার কদর একটুও কমেনি।

শুধু ‘শ্রুতি নাটক সমগ্র’ কেন বিভিন্ন নাটকের সংগ্রহ থেকে ‘নির্বাচিত নাটক’ বইটিও খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘কর্ণাবতী ও অন্ধগলি’ এবং ‘আমাদের থিয়েটার’ আমাকে যেন অনেক পরিণত ও সমৃদ্ধ করেছে।

শুধুমাত্র থিয়েটার প্রেম-ই আজ কি আপনাকে এতটা পথ এগিয়ে দিতে সাহায্য করেছে?

ছোটবেলা থেকে বাবার থিয়েটার প্রেম আমাকে প্রেরণা দিয়েছে। বাবাও আমাকে এই ব্যাপারে ভীষণ উৎসাহ দিতেন। থিয়েটারের প্রতি প্রেম আমার সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা ছিলেন মেডিক্যাল অফিসার। গ্রামবাংলাতেই থাকতে হোত। এ জেলা, ও জেলা ঘুরতে হোত। সেই থেকেই বিভিন্ন মানুষের দেখা পাওয়া ও সেই সময়কার সামাজিক পটচিত্র আমাকে অনেক কিছু চিনতে শিখিয়েছে। নতুন ভাবনা চিন্তারও পথ খুলে দিয়েছে।

আপনার দেখা প্রথম নাটক কোনটি?

কলকাতায় মামার বাড়ি থেকে প্রথম নাটক দেখতে গিয়েছিলাম অহীন্দ্র চৌধুরীর ‘সাজাহান’। নাটক কী ভাবে এবং কতটা মনের গভীরে আলোড়ন তোলে তা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কী, নাটকের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। একটা নেশা মনের মধ্যে তাড়িয়ে বেড়াতো। সেই সময় সেই নেশায় দেখে ফেললাম পরপর ‘সেতু’ ‘ক্ষুধা’, ‘চৌরঙ্গী’, উৎপল দত্তের ‘অঙ্গার’ থেকে ‘তীর’। আরও প্রায় ডজনখানেক নাটক। সত্যি বলছি,  সেই সময়েই শপথ নিয়েছিলাম, আমি ভবিষ্যতে নাট্যজগতেই পা রাখব।

শুধু পা রাখা কেন, একের পর এক পুরস্কারের তালিকাও তো আপনার জীবনের ইচ্ছেকে অপূর্ণ রাখেনি। নেশা একদিন পেশা হয়ে পুরো জীবনটাকেই বদলে দিয়েছে আপনার।

এ সবই মানুষের শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। বড় সম্মান দীনবন্ধু অ্যাওয়ার্ড, নাট্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, নাট্য-সঙ্গীত-নৃত্য-দৃশ্য কলা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, সত্যেন মিত্র অ্যাওয়ার্ড, পার্থপ্রতীম চৌধুরী অ্যাওয়ার্ড আমাকে যেন আরও যোগ্য নাট্য ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছে। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন থিয়েটারের ওপর বিশেষ ক্লাস নিতে আমন্ত্রণ পাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, বা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এখনও নাটকের ওপর বিশেষ সেমিনার-এ ডাক পাই দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। দেশের বাইরেও এ দেশের নাটকের কত কদর এবং সেই সব দেশে নাটক নিয়ে কত কৌতূহল দেখেছি যা মনে পড়লে বড় গর্বিত হই। বাংলার নাটক নিয়ে বিভিন্ন দেশে এখনও চর্চা চলে।

আপনার কয়েকটি নাটক তো এখনও অবধি জনপ্রিয়তার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

অসংখ্য নাটকের মধ্যে বেশ কিছু নাটক মানুষের মনে আলোড়ন তুলেছে। এর মধ্যে  দুই হুজুরের গপ্পো, দায়বদ্ধ, অনিকেত সন্ধ্যা, ঈপ্সা, জাহানারা-জাহানারা প্রভৃতি নাটকগুলি তো অবশ্যই রয়েছে। এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়েছে এই নাটকগুলি।

প্রতিটি নাটকেই আপনি মানুষের মনের পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাও তো বড় সাফল্য।

প্রতি মুহূর্তেই সব কিছু বদলাচ্ছে। মানুষও বদলাচ্ছে। মানুষের মনও বদলাচ্ছে। জীবনের প্রতিটি ধাপেই পরিবর্তনের ছায়া।

আপনার লেখা ও নির্দেশনায় ‘অনিকেত সন্ধ্যা’ নাটকটি এই কলকাতা শহরের বিভিন্ন মঞ্চে ‘৩০০ সন্ধ্যা’ অতিক্রান্ত করেছে। ভাবা যায় না।

এই সময়ের থিয়েটার নিশ্চয়ই আশার আলো জাগায়। ‘হ-য-ব-র-ল’ মফসসলে তিলে তিলে গড়ে উঠলেও এখন সব নাটকে তারাই এই শহরকে বারবার চমকে দিয়েছে। শুধু ‘অনিকেত সন্ধ্যা’ কেন, ‘নির্বাসন’ নাটকেও মানুষের মনের চাহিদা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে মঞ্চে। ‘হ-য-ব-র-ল’-তে আমি পুরোপুরি পূর্ণ হয়েছি। নির্দেশক থেকে নাট্যকার কোনও কিছুই অপূর্ণ রাখেনি চাকদার এই সংস্থা। আমার সব সত্তা তো এই দলকে ঘিরেই ছিল।  এই মফসসলের দলই কলকাতার নাট্যমঞ্চে কড়াঘাত করে একের পর এক সফল প্রযোজনা উপহার দিয়েছে যে নাটকগুলি প্রতিবেশী দেশ বাংলা  দেশেও আলোড়ন তুলেছিল। ও দেশের দর্শকরা সত্যিই প্রকৃত নাট্যপ্রেমী।

আপনার নাটক লেখা শুরু বোধহয় সত্তর দশক থেকেই, তাই তো?

আজও মনে পড়ে নদিয়ার প্রয়াত প্রতিভাবান নাট্য নির্দেশক অমল বিশ্বাসের কথা। তিনিই আমাকে নাটক লেখার উৎসাহ দিতেন। মাঝেমধ্যে তাগাদাও দিতেন। আমি পুরোপুরি লেখা শুরু করে দিলাম। নাট্যকার জীবনের শুরুই হল ‘ঝড়ের খেয়া’, ‘নিহত সংলাপ’, ‘অরাজনৈতিক’ সহ বেশ কয়েকটি নাটকের মধ্য দিয়ে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত সকলেই এইসব নাটককে আরও গভীর আলোর দিশা দেখালেন। এখনও মনে পড়ছে কুমারদা মানে কুমার রায় বলেই ফেললেন ‘আরও গভীরে যাও’।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আপনার ‘একটি সুখ’ নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন না?

‘একটু সুখ’ ওনার এতটাই মনে ধরেছিল যে শুধু এদেশ নয়, বিদেশেও নিয়ে গিয়েছিলেন।

শুধু নাট্যকার হিসাবেই আপনি নাট্যজগতে আলোড়ন তুলেছিলেন। এমন কোনও ব্যক্তিত্ব বাকি নেই যাদের সঙ্গে আপনাকে মঞ্চের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। জাভাদক্সি, ফোস্কিনা, শম্ভু মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায় মনোজ মিত্র থেকে আরও অনেকে।

হ্যাঁ, প্রায় সকলেই আমাকে বলতেন তোমার তৈরি চরিত্রগুলি যেন বড় চেনা। আসলে ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরেছি, কত মানুষ দেখেছি, তারাই তো আমার লেখায় এসে ভিড় করে কথা বলে। সুখদুঃখ ভাগ করে নেয়। আমি তো নিমিত্তমাত্র।

শুনেছি কম বয়সে ‘হিরোইজম’ দেখাতে গিয়ে জেলে গিয়েছিলেন?

ওরে বাবা, সে সব কথা ভুলব কী করে! কম বয়স নদিয়ার এক ইংরেজি স্কুলে পড়াই। মাস মাইনে তখন ছিল না। কখনও কিছু পেতাম, কখনও পেতাম না। একদিকে গ্রুপ থিয়েটারের নিয়মিত নাটক, আবার একই সঙ্গে শিক্ষক আন্দোলনে ওই জেলার লিডিং রোলে আমি। তখন ষাটের দশকের শেষ লগ্ন। জেল ভরো আন্দোলন জমে উঠেছে। অনেকের সঙ্গে তখন কলকাতায় এসে আইন ভেঙ্গে জেলে বন্দি হলাম। ভেবেছিলাম এক দিন পরেই মুক্তি পেয়ে যাব, কিন্তু না আমাদের সকলকেই প্রায় তিন সপ্তাহ পরে জেল থেকে ছাড়া হল। এখন সেইসব আন্দোলনের কথা ভাবলে কেমন শিউরে উঠি।

ঘটনাময় আপনার জীবন। সেইজন্যই বোধহয় প্রতিটি লেখায় এত সূক্ষ্ম বাস্তববোধ কাজ করে। তাই না?

হয়তো তাই, আসলে বাস্তবকে এড়িয়ে জীবন হয় না। আর সেই জীবনকে তুলে ধরতেই অপ্রিয় সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করাতে হয়। মঞ্চের ঘেরাটোপে কিছু মানুষের আগমন ও প্রস্থান। যা কখনই নাটক নয়, গোটা একটা জীবন।

Comments are closed.