বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

এক জীবনে গান-বাজনা শেখার শেষ নেই, আজও আমি শিক্ষার্থী : বিপ্লব মণ্ডল

সঙ্গীত জীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেও এমনই উপলব্ধি তবলিয়া বিপ্লব মণ্ডলের। দেশ-বিদেশের নানা অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির কথা শুনলেন বিপ্লবকুমার ঘোষ

এখনও সাফল্যের শীর্ষে আপনি। কী ভাবে এমন অসম্ভবকে সম্ভব করলেন?

আমি অত জানি না। বুঝিও না। তবে আমার কাজ আমি করে যাই। কতটা সাফল্যের শীর্ষে উঠেছি তা জানি না। কিন্তু মনের দিক থেকে আজও আমি শিক্ষার্থী। প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখছি। বহু জিনিস আছে যা এখনও জানি না। সাফল্যের শিখরে উঠেছি বললেই তো হবে না। আগে বুঝতে হবে আমি কতটুকু পেরেছি। গান-বাজনা এমন জিনিস যা এক জীবনে শেখা হয় না। এই তো কয়েকদিন আগে একটু অন্য ধরনের একটা বাজনা শুনছিলাম। বারবার শুনেছি। সব শেষে আফসোস হল, কিছুই হল না জীবনে। এখনও প্রতিদিন রাত তিনটে অবধি বিভিন্ন দেশের গান-বাজনা শুনি। এটাই আমার সাধনা।

এই সাফল্য পেতে নিশ্চয়ই অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে। সেইসব মুহূর্তে নিজেকে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন?

বাধা তো আমার সেই ছোটবেলা থেকেই। মাত্র বারো বছর বয়সে যখন লহরা দিয়ে শুরু করেছিলাম তখন থেকেই মনের মধ্যে পরিবর্তনের ইচ্ছে চাগিয়ে উঠত। এমনিতেই সেই সময় গতানুগতিক চিরাচরিত ঘরের বাজনাকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। অন্য কিছু কেউ শুনতেই চাইত না। খুব কঠিন কাজ, কঠিন পরিস্থিতি। আমি ওই বয়স থেকেই সেই ঘরানাকে বদলাবার শপথ নিয়েছিলাম। আমার কাজের মধ্য দিয়েই সেই বদল আনব এমন দৃঢ়তায় মনকে তৈরি করেছিলাম। কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম, সেই সময়ে এটা যে কত বড় ঝুঁকি ছিল তা আজ এতদিন পরে বোঝাতে পারব না কাউকেই।

মনকে দৃঢ় করেছিলাম অন্য একটা কারণে। সেটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তখন তো বয়স বেশি না। একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছি। বাজাতে বসেছি। উদ্যোক্তা এসে বললেন, উঠে যেতে হবে। কারণ একজন সিনিয়ার তবলিয়া এসে গেছেন। লজ্জায়, ঘৃণায় উঠে যেতে হল। তিনি অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন। সেদিনই আমি নিজের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম আমিও কী একদিন নিজেকে এভাবে তৈরি করতে পারব? এই চ্যালেঞ্জ ছিল বড় কঠিন চ্যালেঞ্জ।

সঙ্গীত জীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হল সম্প্রতি। যাঁদের সঙ্গে তবলা সঙ্গতে নজর কেড়েছেন – এমন কয়েকজনের কথা বলুন না।

এখনও অবধি আমার জীবনে যে ঘটনা শিহরন জাগায় তা হল ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তবলা সঙ্গত করা। শুধু তাই নয়, তাঁর জীবনের শেষ রেকর্ডে আমি বাজিয়েছি। এখনও আমার কাছে সব কিছু স্বপ্ন মনে হয়। তখন আমার বয়স ১৬ বছর মাত্র। সি.এল.টি-তে চাকরি করি। হঠাৎ একদিন অনিমেষদা যিনি আমাদের পরিবারের খুবই ঘনিষ্ট ছিলেন, তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন গ্রামাফোন কোম্পানির কমল ঘোষের বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন বাবা। সেই বাড়িতে ঢুকেই দেখি বড় একটি হল ঘরে একজন প্রবীণ শিল্পী গান করছেন। আমি চিনি না উনি কে। অনিমেষদা আমাকে সেখানে বসিয়ে দিলেন। আমি তবলা হাতে নিয়েই তাঁর সঙ্গে যথাযোগ্য সঙ্গত করে গেলাম। আর সেটা চলছে তো চলছেই। গান শেষ হল রাত একটায়। গানটি ছিল ‘ফাগুয়া বীজ বোনে’। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান। ওঁনার পরিচয় যখন পেলাম তখন চমকে উঠে প্রায় কেঁদে ফেলেছি। এই কান্না ছিল অন্য কারণে। আমি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেছি সেটা জানতেই আনন্দে আবেগে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। কমল ঘোষও আমার পারফরম্যান্স দেখে প্রায় বাকরুদ্ধ। তবে আমার বাবার একটা অনুরোধ আর ফেলতে পারেননি। তিনি চেয়েছিলেন, রেকর্ডে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যেন আমার নামটি থাকে। হ্যাঁ, রেকর্ডে আমার নাম রাখা হয়েছিল।

এ তো জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। তাই না?

আরও অনেক অভিজ্ঞতা আছে। গ্রামোফোন কোম্পানিতে দক্ষিণ ভারতীয় সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী শুভলক্ষ্মী একবার মীরার ভজন করতে রাজি হয়েছিলেন আর সেই ভজনে হারমোনিয়াম ধরেছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, তবলায় আমি। ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ কত উঁচু পর্যায়ের শিল্পী ছিলেন তা ওই রেকর্ডিং–এর সময়েই বুঝতে পেরেছিলাম। স্টুডিওতে তিনি এগিয়ে এসে আমার তবলা বেঁধে দিয়েছিলেন। আজও যা আমার কাছে কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। এঁরা কেন এত উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন তা এখন ভীষণভাবে উপলব্ধি করি। বালমুলরীকৃষ্ণ তাঁর গায়নের ফাঁকেও চোখের ইশারায় ভীষণভাবে নানা ইঙ্গিত দিতেন যা অন্য সহশিল্পীদের কাছে বড় আশীর্বাদ।

আমজাদ আলি খানের সঙ্গে তো দেশে-বিদেশে প্রচুর অনুষ্ঠান করেছেন। অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই অনেক?

উস্তাদ আমজাদ আলি খানের সঙ্গে কত যে অনুষ্ঠান করেছি তা গুনে শেষ করতে পারব না। শিল্পীর বড় গুণ, তিনি সবসময়ই সহ শিল্পীদের খুব উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তিনি এতটাই খোলামেলা ব্যবহার করেন যে অন্য শিল্পীদের কাছে তা অন্য মাত্রা পেয়ে যায়। আমার সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা কতটা তা অনেকেই ভাবতে পারবেন না। অনুষ্ঠানের ফাঁকে কত যে মজার সব ঘটনা আছে তা চট করে লিখে  শেষ করা যাবে না।

এমন অন্তরঙ্গতা তো আরও অনেক প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গেই ছিল। সবার সঙ্গে তো এতটা হয় না, তাই না?

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর গানের ফাঁকেও আমাকে ডেকে নানা কথা বলতেন। বুঝলাম, আমাকে তিনি এতটাই বিশ্বাস এবং ভরসা করতেন যে ব্যক্তিগত কথা বলতেও তাঁর মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। বাংলা গান নিয়ে সবসময়ে তিনি আমাকে ডেকে একান্তে কত যে পরামর্শ করেছেন তা এখনও ভাবলে ভীষণ ভাল লাগে। এমনও মনে হয়, স্বর্ণযুগের এই সব কিংবদন্তীদের মনে এক আনা হলেও আমার প্রতি ভরসা ছিল।

শুধু হেমন্তবাবু কেন, সুচিত্রা মিত্র, জর্জদা, সাগর সেন, মায়াদি, মোহরদি, সুবিনয় রায়– অনেকের কাছেই আপনি বড় ভরসা ছিলেন।

মৃত্যুর দিন অবধি সুচিত্রাদির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অটুট। তাঁর ধ্যানধারণা ছিল এতটাই, পরবর্তী প্রজন্মেও যেন রবীন্দ্রনাথের গান আরও বিস্তৃতি লাভ করে এবং তা সঠিক পথে। কোনওরকম অনাচার তিনি পছন্দ করতেন না। রবীন্দ্রগানের যে পবিত্রতা তা তিনি প্রাণপণে ধরে রেখেছিলেন তাঁর জীবন দিয়ে। এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত আলোচনা-পরামর্শ। জীবনের শেষ দিকে কিছু কিছু ঘটনায় তিনি দুঃখ পেয়েছিলেন। একমাত্র আমাকেই বলতেন এই গান নিয়ে যেন কোনও বেলেল্লাপনা না হয়। তুমি একটু দেখো।

জর্জদা গান শেষ হলেই মজার সব গল্প করতেন। বলতেন, রিল্যাক্স করো। প্রত্যেকের কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। এমনকী, বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি কিনা বা কী দিয়ে ভাত খেয়েছি তাও মজা করে জানতে চাইতেন। সাগরদা, সুমিত্রাদি, মোহরদি তাঁদের যতই গানের তাড়া থাকুক, একটু হলেও আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। গানের শেষে আমার কাছেই এসে বলতেন ‘কেমন হল? আজ পেরেছি তো?’ এমনই সব ব্যক্তিত্ব যাঁদের সাহচর্যে আমিও অনেক পরিপূর্ণ হয়েছি। নিজেকে চিনতে শিখেছি।

বিদেশে রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিটি অনুষ্ঠানে এখনও আপনিই মধ্যমণি। সেইসব পরিবেশে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান ছাড়াও বিদেশে ক্লাসিক্যাল প্রোগ্রামেই বেশি বাজাই। তবে দেখেছি, বিদেশের বেশির ভাগ অনুষ্ঠানেই রবীন্দ্রগানের ‘শুদ্ধতা’ যেভাবে বজায় রাখা হয় তা কলকাতাতে বসে ভাবাই যায় না। প্রতি বছর বঙ্গসংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও যাই। ওখানকার মানুষ এখনও বাংলা গানকে যেভাবে অন্তর থেকে ভালোবাসে তা ভাবা যায় না। ক্লাসিক্যাল প্রোগ্রাম-এ বিদেশে ঘনঘন যেতে হয়। তার মধ্যে খুবই মনে ধরেছিল নিউইয়র্কের একটি অনুষ্ঠান। সেতার বাদক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্যের অনুষ্ঠান ছিল। তবলায় আমি। হল ভর্তি শ্রোতা এবং তার বেশির ভাগই বিদেশি। বাঙালিদের এই অনুষ্ঠানে তাদের আগ্রহ এবং প্রতি মুহূর্তে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।

আরও একটি ঘটনা যা জীবনেও ভুলব না। বিশ্ববিখ্যাত জ্যাজ শিল্পী অলমেট কর্নেল চার বছর অন্তর অনুষ্ঠান করেন। শ্রোতার সংখ্যা আনুমানিক দেড় লক্ষ। শিল্পী স্টেজে উঠলে তাঁর সঙ্গে মিউজিশিয়ান থাকেন পঁচিশজন। তাঁর অ্যালবামে সম্ভবত আমিই প্রথম ভারতীয় তবলা বাদক যে সেই শিল্পীর সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেছি।

ছোটবেলা কেমন কেটেছে? কেন ধরেছিলেন তবলা?

আমাদের বাড়িতে গানবাজনার চল ছিল। দিদি চিত্রা সেন নাচতেন, ভাল গান গাইতেন। প্রায় প্রতিদিনই রেওয়াজ হতো। তাঁর কাছেই আমার হাতেখড়ি। ছোটবেলায় গাইতাম গান কিন্তু পরবর্তীতে হয়ে গেলাম তবলা বাদক। ছোটবেলায় আমার টনসিল অপারেশন হয়েছিল। সেজন্য এক বছর গান গাওয়া বন্ধ ছিল। বাবা বললেন, বাজাও তবলা। সেই থেকেই শুরু এবং শেখার গুরুও ছিলেন বাবা।

প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে আপনি তবলা সঙ্গত করেছেন, আর এখন এই প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেও করছেন। কোনও পার্থক্য কী আপনার চোখে ধরা পড়ে?

পার্থক্য অনেক। সহজ করে বলি, অনেক ট্যালেন্টেড শিল্পী অবশ্যই আছেন। গান নিয়ে চেষ্টাও করছেন। কিছুদিন গান শিখতে না শিখতেই স্টেজে ওঠার বাসনায় এখানে ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। শেখার অনেক ফাঁক থেকে যায়। কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই শিল্পীর আর পরিপূর্ণতা আসে না। এমন সব অভিজ্ঞতা দেখে আগে খুব মন খারাপ হতো, এখন আর হয় না। একই ছবি তবলার জগতেও। একটু উঠতে না উঠতেই আকাশে ওড়ার সাধ। ভিত দুর্বল, চর্চারও অভাব। যা হবার তাই হয়। এখনকার অনেক শিল্পীকেই দেখেছি তাঁরা অন্য শিল্পীর গান শোনেন না। অন্য কারও বাজনা শোনেন না। শেখা আর শোনার বড়ই অভাব। প্রকৃত শিল্পী হতে গেলে আমার জীবনের অভিজ্ঞতা বলে, পঞ্চাশ ভাগ হতে হবে শিক্ষায়, আর পঞ্চাশ ভাগ হতে হবে শোনায়। শিক্ষা আর শোনা এই দুই পূর্ণ হলেই তিনি হবেন পরিপূর্ণ। যত দিন যাচ্ছে, এইসব ঘাটতি বড় চোখে পড়ছে। শিল্পী তৈরি হওয়ার এও এক অন্তরায়।

কথায় কথায় মনে পড়ল, একবার মোহরদির সঙ্গে একটি গান নিয়ে দীর্ঘদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চর্চ্চা ও রেওয়াজ করেছি। অধৈর্য বা বিরক্তি হলে হবে না। এখন সেসব কোথায়?

দেশে ও বিদেশে তো প্রচুর পুরষ্কার পেয়েছেন। তার মধ্যে কোন পুরষ্কার আপনাকে গর্বিত  করে?

অগুন্তি পুরষ্কার। তবে সেসব না বলে একটা কথা বলতে চাই যা আমাকে সবসময় গর্বিত করে, তা হোল মানুষের হাততালি ও সমর্থন। এর চেয়ে বড় পুরষ্কার তো আর হয় না।

এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই উপযুক্ত নন – এটা মানছেন?

অনেকেই উপযুক্ত নন এটা অবশ্যই মানি। অনেকেই ভাল গাইছেন, শিক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু তা আপগ্রেড করেন না। শুধু গাইলেই হবে না, রবীন্দ্রনাথকে আরও চিনতে হবে, জানতে হবে। কেন, কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে তিনি গান লিখেছিলেন সেটাও অবগত হতে হবে। না হলে গানের সঙ্গে একাত্মতা আসবে কী করে?

আপনার অভিজ্ঞতার মূল্য তো অনেক। উস্তাদ কেরামতুল্লা খাঁ, সন্তোষকৃষ্ণ বিশ্বাস আপনার গুরু। সেই যোগ্য  শিষ্য এখন নিজেকে নিয়ে নতুন কিছু ভাবছেন কি?

অনেক কিছুই ভাবি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাবনা, অকাল প্রয়াত স্ত্রী রমা মণ্ডলের নামে উৎসর্গীকৃত ‘রমা-রম্যবীণা’ আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক।

Comments are closed.