রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

আবেগের উপবাস ছেড়ে উচ্ছ্বাসের খোঁজে কবিতার ব্যান্ড

শোভনসুন্দর বসু‘র পরিচালনায় ন্যাসভিওল, ম্যাসাচুয়েটস, মেরিল্যান্ড মেতে উঠল বাংলা কবিতা ব্যান্ডের নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থাপনায়। বিদেশ থেকে ফোনে কথা বললেন বিপ্লবকুমার ঘোষ

কখন যে নিঃশব্দে আপনারা আমেরিকা পাড়ি দিলেন দলবল নিয়ে! তবে কি বাংলা ব্যান্ড-এর চাহিদা বিদেশেও বাড়ছে?

আমেরিকার ন্যাসভিওল, ম্যাসাচুয়েটস এবং সব শেষে আগামিকাল ৭ সেপ্টেম্বর মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে আমাদের অনুষ্ঠান। প্রথমটির আয়োজক ‘বেঙ্গলি পারফরমিং আর্টস কনফারেন্স’। বিদেশে ব্যান্ড চিরকালই জনপ্রিয় ছিল। বরং এ দেশে আমরা খুবই পিছিয়ে ছিলাম এতকাল ধরে। ইতিহাস তো বলছে তরুণ প্রজন্মই আজ অবধি শিল্পের সবরকম ধারার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিশ্বের শিল্প–সংস্কৃতির ইতিহাসের দিকে তাকালেই তার ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। সেইসব মুভমেন্ট আপামোর জনসাধারণের কাছে পৌঁছেছে এবং জনপ্রিয় হয়েছে।

বিদেশে বাংলা গানের জনপ্রিয়তা আগেও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু বাংলা ব্যান্ডের যে আলাদা কদর বা জনপ্রিয়তা একটা ছিল তা বোঝা যায়নি।

আমরাই তো প্রথম নয়, এর আগেও অনেকে গেছেন। বিদেশে এখানকার ব্যান্ড নিয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণাও তৈরি হয়েছে। সেখানকার দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ততা বিভিন্ন সময়ে বিদেশি কাগজগুলোতেও ছাপা হয়েছে। এটুকু বলতে পারি, বাংলা ব্যান্ড এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। বরং দিনকে দিন সব মানুষের মনেই জায়গা করে নিচ্ছে।

পারফরমিং আর্টস-এর ধারাটাই বদলে যাচ্ছে। তাই না?

অবশ্যই। ঠিক এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়ায় উপস্থাপন বা পারফরমিং আর্টস-এর ধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাংলাতেও আমরা বিশ্বসংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতির অভিযোজনে বিশ্বাসী। যুগ যুগ ধরে অভিরুচির সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবর্তনও সংস্কৃতির প্রবাহমাণতাকেই ধরে রাখে। অতীতকে অস্বীকার করার মতো নির্বোধ দম্ভ বা বিনা প্রশ্নে আত্মসমর্পণের অন্ধ আনুগত্য কোনওটাই আমাদের একদমই নেই।

এখনও অনেকে বলেন বা সমালোচনা করেন যে আবৃত্তির আবার ব্যান্ড কেন?

অতীতে সমবেত আবৃত্তি বা সম্মেলক আবৃত্তি’র ধারার পর দলগত আবৃত্তি চর্চার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আমরা দেখেছিলাম নীলাদ্রিশেখর বসুর নির্দেশনায়। অনেকেরই হয়তো মনে আছে আবৃত্তি অ্যাকাডেমি সংস্থার ‘কয়ার’ প্রযোজনাটি। বা মনে থাকবে উৎপল কুণ্ডুর পরিচালনায় ‘ছন্দনীড়’ সংস্থার কয়েকটি সমবেত আবৃত্তির কথা। তারপর বহুদিন কেটে গেছে সেরকম দলগত চর্চার আর কোনও বড় নিদর্শন আমরা দেখতে পাইনি। বেশ কিছুদিন ধরে বাংলা কবিতার সঙ্গে মিউজিক বা আবৃত্তির সঙ্গে মিউজিক সবটাই কিন্তু রেকর্ড করা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 মনে রাখতে হবে কবিতার উপস্থাপনা বা আবৃত্তি কিন্তু পরিবেশ অনুযায়ী বদলে যায়। সেটাই এই শিল্পের বৈশিষ্ঠ্য এবং আকর্ষণ। কিন্তু স্টুডিও রেকর্ডেড মিউজিক ব্যবহার করলে মিউজিক–এর উপস্থাপনা বদলাবে না। কারণ শিল্পীর আবেগ ও অনুভূতি ও পরিবেশনার সঙ্গে তা অনেকটাই বাঁধাধরা। যেমন বিশেষ বিশেষ পরিবেশ অনুযায়ী কবিতার উপস্থাপনাও বদলে যেতে বাধ্য। উদাহরণ দিয়ে বলছি, জীবনানন্দ সভাঘরে একটি আবৃত্তি বা উপস্থাপনা যে ভাবে হবে রবীন্দ্রসদনে সেই আবেগ ও অনুভূতি বদলে কণ্ঠে অন্য স্কেল ব্যবহৃত হবে। আবার নজরুল মঞ্চ বা নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামের মতো বড় জায়গাগুলিতে যখন সেই একই কবিতার উপস্থাপনা হবে তখন তা আবার বদলে যাবে। সবটাই পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। এত কথা বলছি একটাই কারণে, স্টুডিওর ছোট্ট পরিবেশে রেকর্ড করা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক-এর অনুভূতির সঙ্গে শিল্পীর লাইভ পারফরম্যান্স-এর মুডকে ধরা বা মেলানো যায় না।

সে জন্যই কি আবৃত্তির সঙ্গে লাইভ মিউজিক্যাল ব্যান্ড-এর ব্যবহার?

হ্যাঁ, অবশ্যই। এই ভাবনা থেকেই আমরা প্রথমে তা শুরু করি। দেখুন অস্বীকার করার উপায় নেই, এখনকার ছেলে মেয়েরা বাংলাটাই শিখতে চাইছে না। তার ওপর বাংলা কবিতার ভাবগম্ভীর পাঠ, গুরুগম্ভীর ভাষা, কণ্ঠস্বরের সংযম আর আবেগের উপবাস ছেড়ে একটু উচ্ছ্বাসের সন্ধান করছিল তারা। এই জন্যই মনে হয়েছিল ওদের এই উচ্ছ্বাস, স্বপ্ন, লজ্জা, রাগ, ঘৃণা, পছন্দকে ধরা যায় এমন সরাসরি জোরালো, সাহসী ও স্পষ্ট ভাষার কবিতাকে মিউজিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ সহ পারফর্ম করা যা তাদের ভালো লাগবে। এতে দুটো লাভ হবে। প্রথমত, বাংলা আবৃত্তি বা বাংলা কবিতার জয় হবে। দ্বিতীয়ত, তারা ফিরে আসবে বাংলা কবিতার কাছেই। আর ওরা মুখ ঘোরাবে না এবং সেটাই কিন্তু হচ্ছে।

বাংলা গানের ব্যান্ড তো আগেও ছিল এখনও আছে। কিন্তু আবৃত্তির ব্যান্ড ঠিক আসলে কি?

দলগত চর্চার সাম্প্রতিকতম সংযোজন আবৃত্তির ব্যান্ড। এক সঙ্গে অনেকে মিলে সৃজনমূলক কাজ করার ইচ্ছে থেকেই এর জন্ম। যেখানে থাকে যন্ত্রসংগীত শিল্পী ও কণ্ঠশিল্পীদের যৌথ প্রয়াস। এর মধ্যে একটু নতুনত্ব আছে। যেখানে কবিতার সঙ্গে যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের যন্ত্রানুষঙ্গ এবং সমবেত কণ্ঠশিল্পীদের কিছু আবেগ ও ব্যঞ্জনা। যা যুক্ত হয়ে সাঙ্গীতিক আবৃত্তির রূপ পায় বা সেই আবৃত্তি অন্য মাত্রা পায়।

পশ্চিমি দেশগুলিতে তো এই ব্যান্ড এখন এক রেওয়াজ। এর ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ।

পাশ্চাত্য জগতের পারফরম্যান্স পোয়েট্রি, পারফরম্যান্স পোয়েট, ডাব পোয়েট্রি, ওরাল পোয়েট্রি এইসব ধারার মধ্য দিয়েই কবিতার বিভিন্ন উপস্থাপনার বিষয়টি অন্যরূপ পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে আবৃত্তির ব্যান্ড বা পারফরমিং পোয়েট্রি ব্যান্ড ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

পারফরমিং পোয়েট্রি-ব্যান্ড প্রথম তো আমেরিকাতেই তৈরি হয়। তাই না?

হ্যাঁ। ১৯৮০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘ইস্ট অব ইডেন ব্যান্ড’ তৈরি করেছিলেন হেডউইগ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা সেই সময় জনপ্রিয় কবি বব হলম্যান তাঁদের ব্যান্ড-এর অ্যালবাম শুনে এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে তাঁর ভবিষ্যৎবাণীতে বলেছিলেন, আগামী প্রজন্ম এ ভাবেই কবিতা শুনবে। পৃথিবী জুড়ে কবিতার প্রতি আকর্ষণ বাড়বে। অনেকেই জানেন না, আমি যখন ২০১১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম সেই সময় এই হেডউইগ আমাকে নিজের হাতে তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ অ্যালবাম ‘সেন্ড ইন দ্য ক্লাউন’ উপহার দিয়েছিলেন ।

বাংলাতে তো প্রথম ‘পোয়েট্রি পারফরমেন্স ব্যান্ড’ বৃষ্টি – ঠিক বলছি তো?

হ্যাঁ। ইংল্যান্ড বার্মিংহামের বিখ্যাত শিল্পী বেঞ্জামিন-এর অনুপ্রেরণায় কলকাতায় প্রথম আবৃত্তির ব্যান্ড ‘বৃষ্টি’ তৈরি করি আমরা। যা প্রকাশিত হয় এইচ.এম.ভি. থেকে। শুরুতেই এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে আবারও এইচ.এম.ভি থেকে প্রকাশিত হয় ‘কবিতার ফেরিওয়ালা’। পরিচালনায় ছিলেন রাজা সেন। একই সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ইন্দ্রানী হালদার অংশ নিয়েছিলেন গ্রন্থনা ও ভিডিও কোরিওগ্রাফিতে।

শুরুতেই তো সমালোচনার ঝড় উঠেছিল?

হ্যাঁ। অনেক কবি এবং কিছু বুদ্ধিজীবী’র সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল। তবে আমরা কৃতজ্ঞ কবি শঙ্খ ঘোষ-এর কাছে। আমাদের আমন্ত্রণে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন এবং রেকর্ডিং-এ এসেছিলেন। তাঁকে মাথায় ছাতা ধরে নিয়ে এসেছিলেন কবি শ্রীজাত। তাঁর ‘বাবুমশাই’ কবিতার রেকর্ডিং শুনে দারুণ প্রশংসা করেছিলেন।

Comments are closed.