সঞ্চালনাও বড় পেশা হতে পারে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 

প্রায় ২৮ বছর আঁকড়ে থেকে শুধুমাত্র সঞ্চালিকার ভূমিকায় নিজেকে যোগ্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন মধুমিতা বসু। আমজাদ আলি খান থেকে তরুণ মজুমদার কে না তাঁর ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়েছেন। কিন্তু সাফল্য পেতে পেরোতে হয়েছে প্রচুর বাধা । নিজের পেশা নিয়ে অনেক খোলামেলা কথা বললেন বিপ্লবকুমার ঘোষকে।

 দু’যুগেরও বেশি হয়ে গেল মহিলা উপস্থাপক ও সঞ্চালিকার ভূমিকায় আপনার কদর একটুও কমেনি বরং বেড়েছে। আয়োজক ও শিল্পী – দু’পক্ষেরই বড় ভরসা আপনি।

হ্যাঁ, মহিলা উপস্থাপিকা হিসেবে আমি কিছু করতে পেরেছি এটা বুঝতে পারি শুধু এ দেশে নয়, বিদেশেও যখন ডাক পড়ে আমার। উপস্থাপনাও যে একটা শিল্প তা প্রতি মূহুর্তেই উপলব্ধি করেছি। সঙ্গে শিক্ষা ও চর্চা থাকলে অনেকটা পথ পেরনো যায় যা এখন বুঝতে পারি। অথচ একটা সময়ে এটাকে অবলম্বন করে বাঁচব, এটাই হবে পেশা এমন কথা শুনলে অনেকেই হেসে উঠতেন। তাচ্ছিল্য ছিল বরাবরই।

এত তাচ্ছিল্য, অবহেলা তবুও নাটক ছেড়ে এ পথেই পা বাড়ালেন। সাহস ও জেদ না থাকলে এটা হয় না।

শুধু সাহস নয়, জেদ আমাকে এই পথে পা বাড়াবার সাহস জুগিয়েছে। আমি অন্তত দশ থেকে বারোটি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছি। বড় পর্দাতে অভিনয় করেছি যার সংখ্যা দশেরও বেশি। আমি যখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করছি তখনই রেডিওর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। বাংলা ভাষা, সুন্দর উপস্থাপনা এই ব্যাপারটা রেডিও থেকেই পুরোপুরি পেয়েছি। মনের ভেতর উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়েছিল রেডিওর নানা অনুষ্ঠান।

উৎসাহ কি তবে সেই রেডিও থেকেই?

এক দিনের একটি ছোট্ট ঘটনা আমার মধ্যে প্রথম উৎসাহের আগুন জ্বালিয়েছিল। তখন আমার কত আর বয়স! আমার বোনের নাচের স্কুলের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেটা হয়েছিল রবীন্দ্রসদনে। অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি হওয়ায় এবং অন্যান্য কিছু কারণে দর্শকদের চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। আমি মাইক্রোফোন হাতে কিছু কথা বলতে শুরু করলাম। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর লক্ষ্য করলাম, আমার এই সব কথা শুনে বেশিরভাগ দর্শকই চুপ করে গেলেন। উত্তেজনা বা হট্টগোল নিমেষে থেমে গেল। ওঁরা যে বেশ মজা পেতে শুরু করেছেন তা কয়েকজনের কথাতেই বুঝতে পারলাম। শুধু কথা বলা তো নয়, উপস্থাপনায় নিশ্চয়ই আমার কোনও বাড়তি আকর্ষণ ওঁনাদের মুগ্ধ করেছে– এই উপলব্ধিতে আমার নিজেরই গর্ব হচ্ছিল। এই ঘটনা ধরুন আজ থেকে ২৮ বছর আগের। সেই থেকে এই শিল্পটি নিয়ে কিছু একটা করার জেদ মনে মনে চেপে বসছিল।

কিন্তু মনে তো দ্বিধাও ছিল, চালচুলোহীন এই শিল্পে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে কি?

একদম ঠিক কথা। ই-টিভির প্রথম টেলিফিল্মে অভিনয় করে আর ও দিকে পা বাড়ালাম না। প্রায় ১২টি ধারাবাহিকে অভিনয় করার পরে আর কারও ডাকে সাড়া দিলাম না। অথচ হঠাৎ ভালো লেগে গেল উপস্থাপিকার ভূমিকা। কিন্তু মনে মনে একটা সংশয় দিন রাত তাড়া করছিল – উপস্থাপিকার ভবিষ্যৎ কী? স্বাবলম্বী হতে পারব তো? কিন্তু একটি ঘটনা আমার মনে দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করে দিল। যে কাজ করলে আনন্দ পাওয়া যাবে, সম্মান বাড়বে, দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে চলার প্রেরণা পাওয়া যাবে সেটাই হবে সাফল্যের মূল কারিগর। যে ঘটনা শুনে এত কথা বলা তাই তো বলা হল না। শুনেছিলাম সুমিত্রা সেন একাই আকাশবাণীর একটি বা দুটি নয়, ৯টি বিষয়ে “এ” গ্রেড শিল্পী ছিলেন। অথচ তিনি শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই পথ চলা– যা কোনদিনও থেমে যায়নি। রবীন্দ্রসঙ্গীতেই তিনি প্রতিষ্ঠার শীর্ষে পৌঁছেছেন। এই ঘটনাটি জেনে আমি এতটাই উৎসাহ পেয়েছিলাম যে সেটাই আজ আমাকে এতটা পথ পেরোতে প্রতিটি মূহুর্তে সাহায্য করেছে। টেলিফিল্মে অভিনয়, নাটক, বাচিক শিল্পের প্রতি দুর্বলতা – সব ছেড়ে উপস্থাপনায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সুমিত্রা সেনের অনুপ্রেরণা আমাকে নতুন পথ দেখাল।

মঞ্চে ওঠা মানেই অনর্গল কথা বলা এবং তা যথেষ্ট সামঞ্জস্য রেখেই। এত কথার মাঝে ছেদ পড়ে না কখনও?

না। কারণ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে কীভাবে কথার প্যাঁচে এত মানুষকে সন্তুষ্ট করবো। কখনও ভর সন্ধে থেকে রাত ১১টা, কখনও বা রাত ১০টা থেকে ভোর অবধি কথার প্যাঁচে শ্রোতাকে অক্সিজেন জোগানো। মানুষ অনেক আশা নিয়ে আসেন, ভালো কথা শুনতে চান। ঈশ্বর যেন সেই সব কথা আমার মুখ দিয়ে বলিয়ে দিতে চান। এক শিল্পীর অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পরে পরবর্তী শিল্পী তৈরি হতে পারেননি সেখানে আমার দু’চার কথায় সেই ‘গ্যাপ’ কখন যেন পূর্ণ হয়ে যায়। শ্রোতারা ধরতেই পারেন না। এটাও ঈশ্বরের কেরামতি।

বেশ মজার ব্যাপার তো!

তাহলে হাওড়ার একটি অনুষ্ঠানের কথা বলি। শিল্পী ছিলেন নচিকেতা ও ঊষা উত্থুপ। শীতের দুপুরে লোকে লোকারণ্য। তখন প্রথম দিকে বড় কোনও অনুষ্ঠানে বড় শিল্পীদের সামনে একটু সংশয় ও ভয় কাজ করত। আমি মাইক্রোফোন হাতে নানা কথায় শ্রোতাদের মজিয়ে রেখেছি যাতে সেই সময়ের ফাঁকে শিল্পীরা মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি সেরে নিতে পারেন। এমন সময় পাশ থেকে এসে একজন উদ্যোক্তা ফিসফিস করে বললেন, ঊষা উত্থুপ এসেই মঞ্চে উঠতে চাইছেন। আমি তো ভয় পেয়ে ঊষাদির নাম ঘোষণা করে দিলাম। ঊষাদি বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি ঘাবড়ে গেছি। উনি সটান মঞ্চে উঠে এলেন। বললেন, আরে আমি তো তোমার এত সুন্দর সব কথা শুনব বলে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি। তুমি থামলে কেন? চালিয়ে যাও। তোমার কথা শেষ হলে তবেই মঞ্চে শিল্পীকে ডাকবে, তার আগে নয়। ওঁনার এই শিক্ষা আজও প্রতি মূহুর্তে মনে রাখি। ওইদিনও তিনি অপেক্ষা করে তবেই মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। এক শিল্পী অন্য শিল্পীকেও কত মর্যাদা দিতে পারেন তাই দেখালেন। তিনি ছোট বা বড় শিল্পী যেই হোন।

উপস্থাপনাতেও শিক্ষা ও চর্চার দরকার, তাই না?

অবশ্যই। মনে আছে, আমার প্রথম জীবনে একটা বড় দায়িত্ব পড়েছিল গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে যথাযোগ্য মর্যাদায় মঞ্চে তুলে শ্রোতাদের সামনে হাজির করানো। সেই অনুষ্ঠানের অন্য পর্বে ছিলেন শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়। কী কঠিন কাজ বুঝতেই পারছেন। অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে থেকেই প্রেক্ষাগৃহ পরিপূর্ণ। তিলধারণের জায়গা নেই। সত্যি বলছি, আমার নিজেরই বুক দুরদুর করছিল। একটু ভুল হলে তো রক্ষা নেই!

 আমি মুখস্থ বিদ্যা বা চিরাচরিত কিছু সংলাপে বিশ্বাস করি না। আমি আমার নিজস্ব মতামত এবং কিছু নস্টালজিক গানের ইতিবৃত্ত দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করে দিলাম। আমার সেই সব কথা শুনে এত হাততালি পড়বে সেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে গেলে উপস্থাপিকাকেও একাত্ম হতে হবে আবেগকে সঙ্গে নিয়ে। এই শিক্ষা আমার বাকি চলার পথকেও অনেকটাই সহজ সরল করে দিয়েছে।

যেমন?

রবীন্দ্রসদনে বাঙালির প্রিয় পরিচালক তরুণ মজুমদারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। পরে অরুন্ধতী চট্টোপাধ্যায় ‘আলো’ ছবির গান গাইবেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কথার ফাঁকে আমি কেন জানি না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি লাইনের উদ্ধৃতি দিলাম। তরুণ বাবু মঞ্চে এসেই আমাকে ডেকে পাশে দাঁড় করালেন এবং যে ভাবে অত দর্শকের সামনে প্রশংসা করলেন যা মনে পড়লে আজও গর্ববোধ করি।

একজন যোগ্য উপস্থাপিকা বা সঞ্চালিকা হিসেবে তো গর্ববোধ হওয়ারই কথা।

জানি না আমি কতটা যোগ্য বা ভবিষ্যতে এমন ভাবেই নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে আরও বেশি করে ‘উপস্থাপিকা’র মর্যাদা বাড়াতে পারব কিনা। তবে শুধুমাত্র এই ভূমিকাতেই উত্তমকুমার অ্যাওয়ার্ড পাওয়া আমার জীবনে পাওয়া অজস্র পুরষ্কারের মধ্যেও আলাদা মাত্রা এনে দেয়। যেদিন এই অ্যাওয়ার্ড হাতে পেলাম সেদিনই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন দাদা বেঁচে থাকলে তোকে দিয়ে আরও কত কাজ করাতেন। এত মানুষকে শুধু কথার অভিনয়ে ‘বশ’ করানো একজন অভিনেত্রী ছাড়া কখনই সম্ভব নয়। আজও সেই কথা মনে পড়লে অজান্তে কেঁদে ফেলি আনন্দে ও আবেগে।

ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের অনুষ্ঠানে শুনেছি আপনার অন্য অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেটা কি?

শান্তিনিকেতনে গীতাঞ্জলি উৎসব। ভিড়ে ঠাসা প্রেক্ষাগৃহ। ওস্তাদ আমজাদ আলি খান রাগ কিরওয়ানি ধরেছেন। হঠাৎ আলাপ করতে করতেই থেমে গেলেন। আমার দিকে তাকিয়ে অন্যদের বললেন, ‘ওর বলা এত সুন্দর, এত গভীর যেন আমার আলাপের মতোই।

এত সুন্দর একটি পেশাকে বেছে নিতে পরবর্তী প্রজন্মের এত অনীহা কেন?

আগ্রহ সবার যে নেই তা নয়। অনেকেই এখন বেশ নজর কাড়ছেন। তবে আমার মনে হয়, চটজলদি নাম-যশ বা অর্থের কোনও নিশ্চয়তা নেই বলেই সেরকম উদ্দীপনা অনেকের মধ্যেই থাকে না। তবে বলব, এই পেশা ধীরে ধীরে সাফল্যের সিঁড়ি গাঁথে। সেই সিঁড়ি বড় পরিপূর্ণতা এনে দেয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More