শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

স্বপ্ন তৈরি হওয়াও মনের বড় জয়: অলকানন্দা রায়

সংশোধানাগারের ঘেরাটোপে হারিয়ে যায়নি প্রতিভা। ‘জেল জননী’ অলকানন্দা রায়ের স্নেহ ভালবাসায় তাঁরাই মেতে উঠেছেন সৃষ্টির লড়াইয়ে। মুখোমুখি বিপ্লবকুমার ঘোষ

লৌহকপাটে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একটাই নামে ঘুরে-ফিরে আসে ‘জেল জননী’। সব বন্দিই আপনাকে ‘মা’–এর আসনে বসিয়েছেন। এত সম্মানে আপনি নিশ্চয়ই খুব গর্বিত তাই না?

ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আমি নিমিত্ত মাত্র। তিনি যা করিয়েছেন আমি তাই করেছি। এখনও করছি। অন্ধকারেও আলো আছে। সেই আলো’র সন্ধানে আমি এখনও দিন-রাত নিজেকে বিলিয়ে দিই।

সবচেয়ে বড় কথা, যে বা যারা ভেবেছিলেন কারাগারের অন্তরালে আর বুঝি সংশোধনের পথ নেই, সুপ্ত প্রতিভাও তলিয়ে যাবে অন্ধকারে– সেখানে এমন আলোর ঝিলিক – যা কেউ কখনও ভাবতে পারেন নি। ‘মা’ না হলে এমন হয় নাকি?

যে যত দোষই করুক তার অনুশোচনায় সে তো একদিন সঠিক পথটাও খুঁজে নিতে চাইবে। মা কি কখনও তার সন্তানকে অবহেলা বা অবাঞ্ছিত করতে পারে? পারে না। সুস্থ সংস্কৃতি, সুস্থ মানসিকতা, সঠিক পথ দেখালে দুষ্টু সন্তানও বাধ্য হয় সুস্থ পরিবেশে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে। অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রমাণ পেয়ে আজ আমি সত্যি-ই গর্বতি। ধন্যও বটে। মনের মধ্যে আরও জেদ ও তেজ বেড়েছে সেই কারণেই। ‘মা’-এর স্বাদ আরও যেন বেশি করে পাই।

আপনার মতো একজন খ্যাতনামা শিল্পী হঠাৎ এমনভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন কীভাবে?

জীবন থেমে থাকে না। দ্রুত এগোয়। ঘটনাও নানা দিকে মোড় নেয়। প্রায় এক যুগ আগে বা তারও একটু কম বেশি হবে একদিন প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়েছিলাম একটি অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে। ওখানে মহিলা বন্দিদের খুবই উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে সেখানে উপস্থিত আই.জি (ইনস্‌পেক্টর অব জেনারেল)-কে না জানিয়ে পারলাম না। তিনি তো আরও উৎসাহিত হলেন এই ভেবে যে যদি আমি ওই সব মহিলা বন্দিদের তালিম দিই। আলোচনার মাঝেই আমি আমার সম্মতি দিয়ে দিলাম। সেই থেকে শুরু। তখন তো মাসে বড় জোর দুদিন বা তিনদিন যেতাম।

শুধু মহিলা বন্দিদের জন্যই যেতেন?

না, পুরুষ বন্দিদের জন্যেও যেতাম। যখন প্রথম প্রথম কয়েকবার ওখানে গেছি, তখন খেয়াল করে দেখেছি, ওদের উৎসাহ দিনকে দিন বাড়ছে। তখনই ভেবেছি, শুধু মহিলা নয়, সংশোধনাগারের পুরুষ বন্দিদেরও তালিম দেব। সংশোধনাগারের কর্তৃপক্ষকে জানাতেই তাঁরা আরও উৎসাহে একদল পুরুষ বন্দিকে আমার সামনে এনে হাজির করালেন। এখনও মনে আছে, তাঁদের মুখে কতটা আত্মবিশ্বাস এবং কতটা উদ্দীপনা কাজ করছিল। সেইদিন থেকেই ওদেরও সদলে টেনে নিলাম। কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ, তাঁরা এইসব কাজে এত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তালিমকক্ষ থেকে বিভিন্ন সাজ সরঞ্জাম সবই চলে এল নিমেষে। আমিও আরও বেশি করে যেন উৎসাহ পেলাম, নতুন উদ্যোগের চ্যালেঞ্জ নিলাম।

নাইজেল আকারা আজ তো বড় দৃষ্টান্ত। মুক্তির পর সে নিজের প্রতিভায় নিজেকে কতটা জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সার্থক তো ‘বাল্মিকী প্রতিভা’। আপনার অবদান কখনও ভোলা যাবে কি?

নাইজেলকে তখন আলাদাভাবে চিনতাম না বা এখনো আদালাভাবে ভাবিনি। খুব ভালো ছেলে। বাধ্য ছেলে। অন্যদের সঙ্গে ও নিজেকে নানাভাবে মেলে ধরার চেষ্টা করত। যে কোনও জিনিস শেখার জন্য ও খুব আগ্রহ দেখাতো। সেই নাইজেল যে ‘বাল্মিকী প্রতিভা’য় এতটা নজর কাড়বে তা ক’জন ভাবতে পেরেছিলেন? আসলে ওর মধ্যে লুকনো প্রতিভা এবং প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনা ছিল ষোল আনা। একটা কথা মনে রাখবেন সবসময়, মানুষ দোষী হয়ে জন্মায় না। নানা ঘটনায়, নানা পরিবেশে বা কয়েক সেকেন্ডের ভুলে যে কেউ অবাঞ্ছিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। এক খুনের আসামী আমাকে কাঁদতে-কাঁদতে বলেছিল, কী করে এমন ঘটনা ঘটালাম যা আজও বুঝে উঠতে পারি না। আমার আর্শীবাদ ও সান্ত্বনা তাঁকে সেই অনুশোচনা থেকে মুক্তি দিয়েছিল সাময়িকভাবে।

নাইজেল আকারার মধ্যেও সুপ্ত প্রতিভা ধিক-ধিক করে জ্বলছিল। সুযোগ পেতেই সেটা আগুনের ফুলকি হয়ে আলোকিত হয়ে ওঠে। ওর নানা কাজে সবাই যখন প্রশংসা করেন তখন আমারও অন্তরের সব আশীর্বাদ ওর মাথা ছুঁয়ে যায়। ভাবি, হে ঈশ্বর, তুমি সবাইকেই আশীর্বাদ দাও যাতে ওরাও এই সমাজের সব স্তরের মানুষের পাশে দাঁড়ায়, এই সমাজেই মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।

প্রথমদিকে আপনি বিভিন্ন সংশোধনাগারে ওয়ার্কশপ করেছিলেন, পরে তা থেরাপির কাজ করেছে?

হ্যাঁ। ওয়ার্কশপটাই থেরাপি হয়ে যায়। মানুষের মনের ক্ষত প্রলেপ দেওয়াই তো থেরাপি। আর সেটারই তো বড় প্রয়োজন ছিল। আরও আগে হলে আরও ভাল হতো।

কতজন বন্দি আপনার তালিমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন?

মনে নেই ঠিক কতজন হবেন, তবে তিনশো ছাড়িয়েছে অনেকদিন আগেই। বিভিন্ন বন্দি বিভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছেন। তাদের সবাইকে ভাগ করে নিয়ে কালচারাল ওয়ার্কশপ বা থেরাপির আওতায় নিয়ে এসে তৈরি করা কম কথা নয়। জানি না, ঈশ্বর আমাকে কখন অজান্তে সেই ক্ষমতাটুকু দিয়েছিলেন যার জন্য এতটা এগোতে পেরেছি। তিনি যতদিন চাইবেন ততদিনই আমি ওদের পাশে থাকব।

শুনেছি, সংশোধনাগারের বন্দিদের নিয়ে এমন ওয়ার্কশপ বা থেরাপি পৃথিবীর কোনও দেশেই আজ অবধি হয়নি। এটা সত্যি?

আমিও তাই শুনেছি। পৃথিবীর কোথাও না হলেও এই বাংলাতে হয়েছে যার কৃতিত্ত্ব পুরোটাই এ রাজ্যের প্রশাসকদের। আমাদের এই সাফল্য পৃথিবীর অনেক দেশেই আলোচিত হয়েছে এটা জানতে পেরে গর্ব তো হয়ই। আরও গর্ব হয় সেখানে আমি যুক্ত আছি বলে।

আপনার হাতে তৈরি এই বন্দি-সন্তানরা ইতিমধ্যেই দু’শোরও বেশি ‘পাবলিক প্রোগ্রাম’ করেছেন। সত্যি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। দু’শোরও বেশি হবে বোধহয়। এদের নিয়ে কোথায় না গেছি। প্রশাসন এত সাহায্য করেছেন যে তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। আমার বাধ্য সন্তানরা জেল থেকে বেরিয়ে আবারও জেলে ফিরে এসেছে। কিন্তু মুক্ত ওই সময়টুকুর মধ্যে মঞ্চের ঘেরাটোপে কত অসাধারণ পারফরম্যান্স ফুটিয়ে তুলেছে, দর্শকদের শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ আদায় করে নিয়েছে যা আমার কাছে এখনও স্বপ্ন মনে হয়। মানুষ ইচ্ছে করলে কী না পারে! তবে এই মুক্তমঞ্চে হয়তো সবাইকে নিতে পারিনি। কারণ কিছু অসুবিধে থাকায় এবং নিরাপত্তার কারণে দু’একজন আগ্রহী বন্দিকে নিরাশ হতেই হয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের সেই বাধা নিশ্চয় দূর হয়ে যাবে। তারাও যেতে পারবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

বন্দিদের কোন প্রযোজনাগুলি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে?

অনেকগুলি প্রযোজনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ‘ধ্রুবজ্যোতি তুমি যীশু’, ‘গাহি সাম্যের গান’, ‘মোক্ষবতী’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ প্রমুখ। বন্দি ছেলেমেয়েদের কাজগুলো এতটাই প্রশংসা পেয়েছে যে ভিনরাজ্য থেকেও আমন্ত্রণ আসছে।

উচুঁ প্রাচীরের বাইরেও যে এত মানুষের শুভেচ্ছা – এটাও তো একটা বড় ‘থেরাপি’ তাই না?

অবশ্যই। মনের সংকোচ, দ্বিধা, লজ্জা সব কিছুই মিলিয়ে যায় যখন দর্শকদের সম্মিলিত উচ্ছাস বুঝিয়ে দেয়, আমরাও তোমাদের পাশে আছি। বন্দি জীবনের গ্লানি ঝেড়ে মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখা। যে আকাশে সবারই অধিকার শুধুই ওড়া মুক্ত পাখির মতো। স্বপ্ন তৈরি হওয়াও তো মনের বড় জয়।

এই জন্যই আপনি ‘প্রকৃত মা’ ওদের চোখে।

শুরুর দিকে ‘ম্যাডাম’ ছিলাম। যতদিন গেল, বছর ঘুরল কবে যেন ‘মা’ হয়ে গেলাম। উচুঁ পাঁচিলের অন্দরে পা রাখলেই দেখি ছুটে আসছে সন্তানের দল। মুখে ‘মা’, ‘মা’ ডাক। এখন আমি মা নিজের ঘরে এবং বাইরেও। শুধুই ‘মা’।

এত প্রাপ্তি, এত সম্মান। আপনি খুব ঈশ্বর বিশ্বাস করেন, তাই না?

ঈশ্বর বিশ্বাস করি কিন্তু পুজো-আচ্ছা করি না। কোনও আচার ধর্ম নিয়ম কিছুই মানি না। ঈশ্বর তো মনে থাকেন। আচার ধর্মের প্রয়োজন নেই।

আশির দশকেও আপনার নামে টিকিট বিক্রি হোত। প্রেক্ষাগৃহে বাড়তি দর্শকদের চাপে হই-হট্টগোল হতো। আপনার অনুষ্ঠান মানেই গেট-ক্র্যাশ। সেই অলকানন্দা রায় আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এমনও হয়?

পরের বছর এই নৃত্যজগতে পা রাখার পঁয়ষট্টি পূর্ণ হচ্ছে। আমি কখনও থেমে থাকিনি। মাত্র চার বছর বয়সে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অনুষ্ঠানে সবাইকে চমকে দিয়েছিলাম। সেই থেকেই একের পর এক সাফল্য আমার জীবনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। বাড়ির প্রত্যেকেরই প্রেরণা ছিল বলেই দ্রুত এগোতে পেরেছি। হোঁচট খেতে হয়নি। স্বামী যতদিন বেঁচে ছিলেন আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন। আমার বাবা, দাদা এমনকি ছেলে-মেয়েও সবসময় আমার সব ব্যাপারে পাশে থাকে।

একের পর এক সাফল্য। শ্যামা, চণ্ডালিকা, আম্রপালি, বন্দেমাতরম থেকে প্রায় এক ডজন প্রযোজনা। যা কিনা এখনও এই প্রজন্মের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভাবলেই কতো ভালো লাগে না?

অতটা ভাবি না। যা ভাবি তা হল, যতদিন বেঁচে আছি যেন আরও কিছু ভাল কাজ করে যেতে পারি। যাতে পরের প্রজন্ম কিছুটা হলেও উৎসাহ পায়। আরও নতুন সব কাজ করতে পারি।

বিদেশেও তো আপনার প্রযোজনা আলোড়ন তুলেছিল?

অনেক দেশে অনেক পারফর্ম করেছি। কিন্তু জাপানের দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ততা আমি এখনও মনে রেখেছি। সেইসব অভিজ্ঞতা আমাকে বড় উৎসাহ দেয় প্রতিনিয়ত। লন্ডন, আমেরিকাতেও অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। এখন থাক।

জীবনে তো অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আপনাকে?

সেইসব বাধাকে কোনও বাধা বলে মানিনি, মানি না। কোনও দুঃখকে গুরুত্ব দিই না। সেই দুঃখ কাউকে শেয়ার করি না। এখনও কারও কোনও নেগেটিভ কথা শুনি না। বরং তা এড়িয়ে অন্যকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করি।

একটা প্রশ্ন না করে পারছি না। গত দু’দশক ধরে ধীরে-ধীরে নাচের জগতে এতটা অবক্ষয় হল কেন?

এক কথায় বলি, চটজলদি কিছু পাওয়া যায় না ভাই। যেদিন থেকে টি.ভি এল সেদিন থেকেই তার পিছনে দৌড়নো শুরু হয়ে গেল। মিডিয়ার পিছনে ছোটা আর নিজেকে তৈরি করা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। আমার মনে হয়, আগে নিজেকে তৈরি করতে হবে। তবে সবকিছুই তো খারাপ হয় না। মন্দের মাঝেও ভালো আসে। এইসব পরিবর্তন আগেও ছিল এখনও আছে। কখনও বা বেনোজলের স্রোত আসে। তা ভেসেও যায়। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে বটগাছ বটগাছই থাকে। তার গুরুত্ব আগেও যা ছিল, এখনও তাই আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।

জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন দেশে ও বিদেশে। দু-একটা বলুন না?

পুরস্কার সে বড় হোক বা ছোট। সব পুরস্কারের অর্থই ভালবাসা। আমি বড় পুরস্কারগুলির নাম বলব, ছোটগুলির নাম বলব না তা হয় না। তাই কখনও কোনওদিনই উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের নামগুলি বলি না। স্টেজের ধারে যিনি একগোছা ফুল নিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানান সেটাও কম কিছু কি? সেটাও তো অনেক বড় পুরস্কার। ভালোবাসাও।

Comments are closed.