অনাথ আশ্রম থেকে পালানো কিশোর আজ ভারতের অন্যতম সফল আইএএস অফিসার

এসটিডি বুথে পার্টটাইম কাজ করতে শুরু করেছিলেন আব্দুল। সকালে খবরের কাগজের হকারিও করতেন। পড়াশুনা শেষ করার আর আগ্রহ ছিল না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মা হাঁটা শুরু করেছিলেন অনাথ আশ্রমের গেটের দিকে। যাওয়ার সময় বার বার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন। বেদী দিয়ে ঘেরা ঝাঁকড়া মাথা গাছটার নিচে বসেছিল পাঁচ বছরের আব্দুল নাসের। মা যখনই পিছন ফিরছিলেন, তখনই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল আব্দুল। মায়ের ওপর তীব্র অভিমানে চোখে ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছিল আব্দুলের।

    তবুও ক্রমশ দূরে চলে যাওয়া মা’কে দেখছিল সে। একসময় মা হারিয়ে গিয়েছিলেন গেটের ওপারে। ছুটে গিয়ে দোতলার ছাদে উঠেছিল ছোট্ট আব্দুল নাসের। গলা অবধি পাঁচিলের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই হুশ করে মাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল বাস। ছাদের পাঁচিলে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আব্দুল।

    আব্দুলের পৃথিবীটা কেমন যেন বদলে গিয়েছিল

    বাবা মারা গিয়েছিলেন কয়েক মাস আগে। মৃত্যু কী সেটা আব্দুল জানত। সে জানত বাবা আর ফিরবেন না। তাদের ছ’ভাই-বোনকে নিয়ে পড়াতে বসবেন না। গল্প করবেন না। ছুটির দিনে বেড়াতে নিয়ে যাবেন না। তার মাকে কোনও দিন ঘরের বাইরে যেতে দেখেননি আব্দুল।

    কিন্তু সেই মা, খুব ভোরে বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন সন্ধ্যা বেলা। বাজারের থলি হাতে। এসেই উনুনে রান্না চাপিয়ে আব্দুলকে পড়াতে বসতেন। কারণ আব্দুল ভাইবোনেদের মধ্যে সব চেয়ে মেধাবী ছিল। আব্দুল বুঝত বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে কিছু একটা ঘটেছে। ভালো খাওয়া হত না। ভালো জামা কাপড় পরা হত না। মা মানহাম্মা তখন অন্য এক লড়াই লড়ছিলেন।
    নিজেকে নিংড়ে দিয়ে সংসার বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন ছোটখাটো কাজ করে।

    কিন্তু সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকতেন মানহাম্মা। রাস্তায় রাস্তায় ছেলে মেয়েরা ঘুরে বেড়াত অনাথের মত, পড়াশুনা না করে। তবুও আব্দুলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন মানহাম্মা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আব্দুলকে পড়বার সুযোগ দিলে ও বড় হবেই। কিন্তু আব্দুল খুব ছোট। তাকে কাছ ছাড়া করতে মন চায় না তাঁর। কিন্তু বাড়িতে থাকলে তার দেখভাল করবে কে! আকাশ ভেঙে পড়া সংসারে সেই যে একমাত্র আশার প্রদীপ।

    ঠাঁই দিয়েছিল ভাতানাপাল্লি অনাথ আশ্রম

    এক আত্মীয়র পরামর্শে মানহাম্মা থালাসসেরির ভাতানাপাল্লি অনাথ আশ্রমে দিয়ে গিয়েছিলেন আব্দুলকে। আশ্রমের পাশেই আছে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল ছিল। যদি আব্দুল আশ্রম কতৃপক্ষের দয়ায় লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে পারে। সাথে দু’বেলা খাওয়াও জুটবে। ছুটির দিনে মানহাম্মা দেখা করতে আসতেন আব্দুলের সাথে। অভিমানে, রাগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইত না আব্দুল। আশ্রমের লোকেরা বুঝিয়ে শুনিয়ে মায়ের কাছে আব্দুলকে পাঠাতেন।

    এই অনাথ আশ্রমে ১২ বছর ছিলেন আব্দুল।

    মায়ের কাছে বাড়ির খবর পেত আব্দুল। বড় দাদা দিনমজুরের কাজ করছে। চার বোন বিড়ি বাঁধার কাজ করছে। মা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, “তোমায় ভালো করে পড়াশুনো করতেই হবে। আমাদের জীবন তোমার হাতে।” তখন কিছু না বুঝলেও, একটু বড় হয়ে সব বুঝতে পেরেছিল আব্দুল। জীবন সমুদ্রে ভেসে থাকার জন্য পড়াশুনাকেই আঁকড়ে ধরেছিল সে। শিক্ষকরাও আপ্রাণ সাহায্য করতেন মেধাবী এই ছাত্রটিকে। অনাথ আশ্রমে এসে আব্দুল বুঝেছিল কাকে বলে জীবনযুদ্ধ।

    স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক তরুণ আইএএস অফিসার

    বর্তমানে ভারত সরকারের নীতি আয়োগের ‘সিইও’ পদে আছেন আইএএস অমিতাভ কান্ত। ১৯৮০ সালের ব্যাচের আইএএস। যিনি একার হাতে বদলে দিয়েছিলেন ভারতের পর্যটন মানচিত্র। ভারতের পর্যটন মন্ত্রকের বিখ্যাত বিজ্ঞাপন, যেমন, ‘অতিথি দেব ভব’, ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’, ‘গডস ওন কান্ট্রি’ এই অফিসারের মস্তিস্কপ্রসূত।

    অমিতাভ কান্ত তখন যুবক। একদিন তিনি গিয়েছিলেন আব্দুলদের অনাথ আশ্রমে। আব্দুলের বয়স তখন দশ। আশ্রমের অনান্য ছেলেদের মধ্যে অমিতাভ কান্তের চোখ পড়েছিল আব্দুলের ওপর। অমিতাভ কান্ত আব্দুলকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছিলেন। আব্দুল তরুণ আইএওএস অফিসারের সমস্ত প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিয়েছিল। আব্দুলের মেধার প্রশংসা করেছিলেন অমিতাভ কান্ত। আব্দুলের পারিবারিক অবস্থা জেনে, তিনি আব্দুলকে আলাদা ভাবে ডেকে নিয়ে প্রচুর উৎসাহও দিয়েছিলেন।

    বালক আব্দুল তার দশ বছরের ছোট্ট জীবনে এরকম এরকম সপ্রতিভ মানুষ দেখেনি। তরুণ আইএএস অফিসারের হাঁটা চলা, বাচনভঙ্গি, আব্দুলকে মুগ্ধ করেছিল। নিজের প্রতি অসীম আস্থা যেন ঝরে পড়ছিল অমিতাভ কান্তের প্রতিটি অভিব্যক্তিতে। আব্দুল তাঁর দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিল। সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল তাকে আইএএস অফিসার হতেই হবে।

    আইএএস অমিতাভ কান্ত।
    স্বপ্ন ফিকে করে দিয়েছিল অভাব

    আব্দুল নাসের অনাথ আশ্রমে ছিলেন ১৭ বছর বয়েস পর্যন্ত। অনাথ আশ্রমে থাকাকালীন ১২ বছরে অনাথ আশ্রম থেকে দু’বার পালিয়ে ছিলেন আব্দুল। কারণ, বাড়ির অভাব আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। অনাথ আশ্রম থেকে পালিয়ে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরের কান্নুরে চলে গিয়েছিলেন। হোটেলের বয়ের চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিলেন। কয়েক মাস কাজের পর হোটেলের মালিক আব্দুলকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য। যা টাকাপয়সা পেয়েছিলেন তা বাড়িতে দিয়ে আবার অনাথ আশ্রমে ফিরে গিয়েছিলেন। আইএএস হবার স্বপ্ন তখন ফিকে হতে শুরু করেছিল।

    অনাথ আশ্রম কতৃপক্ষ মেধাবী আব্দুলকে খুব ভালোবাসত। তাই তাঁরা আব্দুলের অবস্থা বিচার করে প্রতিবারই ফিরিয়ে নিয়েছিলেন আব্দুলকে। ১৭ বছর বয়েসে অনাথ আশ্রম ছেড়েছিলেন আব্দুল। চার বোনের বিয়ে দিতে হবে। মা আর দাদা সংসার টানতে পারছেন না। সংসারে অর্থের যোগান দিতেই হবে।

    এসটিডি বুথে পার্টটাইম কাজ করতে শুরু করেছিলেন আব্দুল। সকালে খবরের কাগজের হকারিও করতেন। পড়াশুনা শেষ করার আর আগ্রহ ছিল না। কিন্তু মা মানহাম্মা ছিলেন নাছোড়বান্দা। মাথায় হাত দিয়ে ‘কসম’ খাইয়েছিলেন আব্দুলকে। আব্দুলের রোজগার করা পয়সা সংসারে খরচ না করে সেই টাকায় পাঠ্যপুস্তক কিনে দিতেন আব্দুলকে। এভাবেই ইংরেজিতে মাস্টার ডিগ্রি করে ফেলেছিলেন আব্দুল ১৯৯৫ সালে। কেরল সরকারের হেলথ ডিপার্টমেন্টে, জুনিয়র হেলথ ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পেয়ে গিয়েছিলেন। আব্দুলের চাকরি পাওয়ার খবর পেয়ে মা মানহাম্মা আব্দুলের বাবার ছবি বুকে জড়িয়ে কেঁদেছিলেন সারা রাত। মাকে জড়িয়ে সেদিন কেঁদেছিলেন যুবক আব্দুলও।

    পরিবারের সবাইকে নিয়ে বস্তির খুপরি ঘর ছেড়ে সরকারি আবাসনে চলে এসেছিলেন আব্দুল। মা বোনেদের আর বিড়ি বাঁধার কাজ করতে হয়নি। এক এক করে সব বোনের বিয়ে দিয়েছিলেন আব্দুল। দাদাকে দোকান করে দিয়েছিলেন। এর পর, আব্দুলের জীবনে এসেছিলেন রুকসানা। আব্দুলের স্ত্রী। মা মানহাম্মা আর রুকসানা মিলে আব্দুলকে উৎসাহ দিয়ে যেতেন। বলতেন, এখানে থামলে চলবে না। ছোট্ট বেলার স্বপ্ন ছুঁতেই হবে আব্দুলকে। আইএএস হতেই হবে।

    ঝুপড়ি থেকে সরকারি আবাসনে, মা মানহাম্মার সঙ্গে আব্দুল নাসের।
    সফল হয়েছিল মা মানহাম্মার স্বপ্ন

    কেরলের স্টেট সিভিল সার্ভিস এক্সিকিউটিভের পক্ষ থেকে ১৯৯৬ সালে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল ডেপুটি কালেক্টর পদের জন্য। হাজার হাজার দরখাস্ত পড়েছিল। তার মধ্যে ছিল আব্দুলের দরখাস্তটিও। অফিস থেকে ফিরে রাত জেগে পড়তেন আব্দুল। পাশে ঠায় বসে থাকতেন মা মানহাম্মা। যদিও আব্দুল নিশ্চিত ছিলেন তিনি এই চাকরি পাবেন না। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। ডেপুটি কালেক্টরের চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিলেন আব্দুল।

    ট্রেনিং ও প্রবেশনাল পিরিয়ড পেরিয়ে ডেপুটি কালেক্টর পদে বসতে সময় লেগেছিল ১০ বছর। ২০০৬ সালে ডেপুটি কালেক্টর হয়ে গিয়েছিলেন আব্দুল। ডেপুটি কালেক্টর হওয়ার ১১ বছর পর, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে আইএএস অফিসারের এর মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছিল। আব্দুল নাসের আজ কোল্লাম জেলার কালেক্টর সাহেব। যাঁর কর্মদক্ষতার কথা পৌঁছে গিয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।

    স্ত্রী ও পুত্রের সঙ্গে আইএএস আব্দুল নাসের।

    সফল হয়েছিল মা মানহাম্মার স্বপ্ন, সার্থক হয়েছিল লড়াই।  কিন্তু ছেলের আইএএস হওয়া দেখে যেতে পারেননি মানহাম্মা। ২০১৪ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। “আমার মা আমার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ ছিলেন। আজ আমি এই জায়গায় এসেছি, কেবলমাত্র তাঁর লড়াই ও অনুপ্রেরণার জন্য”, কালেক্টরের সিটে বসে গলা ধরে আসে, ৪৭ বছর বয়েসে আইএএস হওয়া আব্দুল নাসেরের।

    এখনও মাঝে মাঝে সেই অনাথ আশ্রমে চলে যান আব্দুল নাসের। গিয়ে আনমনা হয়ে বসে থাকেন, সেই ঝাঁকড়া মাথা গাছটার নীচে। সেই যেখানে এক অভাগী মা তাঁর আদরের ছোট খোকাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন ৪৪ বছর আগে। বুকে পাথর চেপে রেখে। তাঁর খোকা, স্বপ্নের ডানা মেলবে বলে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More