এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে কৃষক হয়ে যাওয়া যুবক আজ ভারতের গর্ব

বাবা মায়ের ম্লান মুখ আর বৃষ্টিহীন বিষন্ন বিকেল, পালটে দিয়েছিল ২২ বছরের আধিয়াগাই রামেশ্বরনকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    দূরে, পশ্চিম আকাশে, বাদল মেঘের দল আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর উঁচু উঁচু শৃঙ্গগুলিকে ঢেকে দিয়েছিল। সেই দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন রামেশ্বরন দম্পতি। কেরালা ও তামিলনাড়ুর মাঝে থাকা আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর মাথার ওপরে পাক খাওয়া ওই মেঘের দল,পথ ভুলেও এখানে আসে না। অথচ দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু কবে ঢুকে গিয়েছিল তামিলনাড়ুতে।

    রামেশ্বরন দম্পতি যেখানে থাকেন, সেই দিন্দিগাল জেলার, কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রামের ভাগ্যে বৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠার সুযোগ নেই। কারণ এটি বৃষ্টিছায়া অঞ্চলে অবস্থিত। বর্ষাকালে, দু-একবার ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয়। প্রায় ৪০ বছর ধরে তামিলনাড়ুর বিভিন্ন জায়গায় জমি লিজ নিয়ে চাষ করে আসছিলেন রামেশ্বরন দম্পতি। সব জায়গায় লাভের মুখ দেখলেও, এই অঞ্চলে চাষ করে লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না তাঁরা। কারণ এলাকাটি খরা প্রবণ। মাটিতে জলের নিদারুণ অভাব, কাছাকাছি কোনও নদীও নেই।

    কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রাম।

    কৃষক দম্পতির মেধাবী পুত্র আধিয়াগাই নামী কলেজে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। কীভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বকেয়া অর্থ মেটাবেন, সেই চিন্তাই কুরে কুরে খাচ্ছিল রামেশ্বরন দম্পতিকে। টেবিলে বসে পড়তে পড়তে, বাবা মায়ের বিষণ্ণ ও চিন্তিত মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন পুত্র আধিয়াগাই।

    বাবা মায়ের ম্লান মুখ আর বৃষ্টিহীন বিষন্ন বিকেল, পালটে দিয়েছিল ২২ বছরের আধিয়াগাই রামেশ্বরনকে। বহুজাতিক সংস্থায় লোভনীয় চাকরির স্বপ্ন দেখা আধিয়াগাই, ফোর্থ ইয়ারে পড়তে পড়তে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে দিয়েছিলেন। যে জমি থেকে এক মুঠো ধান পেতে তাঁর বাবা মায়ের রক্ত আর ঘাম এক হয়ে যাচ্ছে, সেই জমিতেই সোনা ফলিয়ে দেখিয়ে দেবেন আধিয়াগাই।

    আধিয়াগাই রামেশ্বরণ।
    ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে, চাষ করবেন তিনি

    আধিয়াগাই-এর বাবা মায়ের মাথায় যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। তাঁদের ছেলে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লোভনীয় জীবন ছেড়ে, শেষে তাঁদেরই মতো কাদা মাখবে! চুরমার হয়ে গিয়েছিল তাঁদের সব স্বপ্ন। কিন্তু আধিয়াগাই রামেশ্বরন ছিলেন নাছোড়বান্দা। নিজের সবুজ স্বপ্ন নিয়ে, ছুটে গিয়েছিলেন  কৃষি বিজ্ঞানী ও অর্গানিক ফার্মিং বিশেষজ্ঞ জি নাম্মানভারের কাছে। রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষের ওয়ার্কশপে যোগ দিতে। একজন সপ্রতিভ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াকে কৃষকদের মাঝে দেখে প্রফেসর নাম্মানভারও অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু জহুরীর চোখ আসল রত্নটিকে চিনতে ভুল করেনি।

    আধিয়াগাই তাঁর গুরু বিশেষজ্ঞ জি নাম্মাল্ভারকে বলেছিলেন, তিনি তাঁর বাবা মায়ের মতো ধান চাষ করতে চান না। তিনি সবজি চাষ করতে চান, তবে হাইব্রিড সবজি চাষ করবেন না। চাষ করলে বিশুদ্ধ দেশি ও স্থানীয় সবজি চাষ করবেন।আধিয়াগাইয়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর অর্গানিক ফার্ম সফল হবেই। ভয়ঙ্কর খরাতেও তাঁর ফার্মে ফসল ফলবে। কারণ তিনি কেবলমাত্র ক্ষরাপ্রবণ এলাকাটিতে ফলা ফসলই চাষ করবেন। যেগুলি খুব কম জল পেলেও বেঁচে থাকতে পারে। সেই মতো গুরু শিষ্য এগিয়ে গিয়েছিলেন নতুন এক পথে। ঘন্টার পর ঘন্টা চলেছিল গুরু শিষ্যের রুদ্ধদ্বার আলোচনা।

    আধিয়াগাই হিসেব কষে গুরুকে দেখিয়েছিলেন, বর্ষাকালে এই ক্ষরাপ্রবণ এলাকায় একবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি হলেই, তাঁর ফার্মের গাছগুলি অক্টোবর মাস পর্যন্ত টিকে যাবে। ততদিনে উত্তর পূর্বের মৌসুমী বায়ু আরেক বার ঝিরঝিরে বৃষ্টি এনে দেবর কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রামে। ফলে তাঁর ফার্মে জলের অভাবে সবজি মরবে না। এরকম তুখোড় বুদ্ধির ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রকে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়ে খুশী হয়েছিলেন সবুজ বিপ্লবী প্রফেসর নাম্মানভার। গুরুর  পরামর্শে, ২০১৪ সালে ৬ একর জমি লিজ নিয়েছিলেন ২৪ বছরের শিষ্য আধিয়াগাই। ফার্ম হাউস করার জন্য।

    শুরু হয়েছিল তাঁর সবুজ সংগ্রাম

    উচ্চমানের দেশী ফসল ফলাতে হলে উচ্চমানের ও বিশুদ্ধ দেশী বীজ চাই। আধিয়াগাই উচ্চমানের ও বিশুদ্ধ দেশী বীজ সংগ্রহের জন্য পাঁচ বছর ধরে তামিলনাড়ুর গ্রামে গ্রামে সাইকেলে করে ঘুরেছিলেন। রোদ ঝড় বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছিলেন গ্রামগুলির প্রবীণ কৃষকদের সঙ্গে। আধিয়াগাইয়ের কথায় সেটি ছিল ছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেওয়ার সফর।

    পাঁচ বছর ধরে সংগ্রহ করা দেশী সবজির বীজ আধিয়াগাই নিয়ে এসেছিলেন তাঁর ফার্মে। তারপর, চাতক পাখির আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর প্রভু আয়াপ্পার কাছে প্রার্থনা। বিড়বিড় করে বলেছিলেন, “প্রভু একবার, অন্তত একবার বৃষ্টি দাও বর্ষাকালে। আর চাইব না।” ক্ষরাপ্রবণ কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রামের আকাশ থেকে যেদিন ঝরে পড়েছিল হীরের চেয়েও দামী কয়েক ফোঁটা জল, উর্ধশ্বাসে দৌড়েছিলেন আধিয়াগাই ফার্মের দিকে। ফার্মে পৌঁছে, প্যান্ট গুটিয়ে জমিতে নেমে পড়েছিলেন, এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারি ছেড়ে কৃষক হতে চাওয়া ২৪ বছরের যুবক। তাঁর আত্মবিশ্বাস বলছিল, পারবে আধিয়াগাই, তুমি পারবে।

    গ্রামে গ্রামে ঘুরে বীজ সংগ্রহ করেছিলেন আধিয়াগাই

    আজ আধিয়াগাইয়ের সেই অর্গানিক ফার্ম শুধু তামিলনাড়ুর নয়, ভারতেরও গর্ব। ছয় একর ফার্মের তিন একর জায়গা জুড়ে হয় চিনা বাদামের চাষ। বাকি তিন একর জায়গায় হয়, একদম দেশী প্রজাতির বিভিন্ন সবজি। তার মধ্যে আছে টমাটো,কাঁচা লঙ্কা, ঢ্যাঁড়স, বিনস, লাউ, বেগুন ও প্রায় ৩০০ স্থানীয় সবজি এবং ফল। প্রত্যেক বছর একই ধরনের সবজি চাষ না করেন না আধিয়াগাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। এর ফলে, কীটপতঙ্গের আক্রমণের আশঙ্কা থাকেনা বললেই চলে। আধিয়াগাইকে কীটনাশক কিনতে হয় না, ফলে সবজিগুলি হয় বিষমুক্ত।

    স্থানীয় ও বিশুদ্ধ দেশী প্রজাতির সবজি বেছে নিয়েছিলেন আধিয়াগাই

    একদা এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মেধাবী ছাত্র আধিয়াগাই, মাঠে নামার আগে যথেষ্ট গবেষণা করে নিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাঁদের গ্রামটি খরা কবলিত এলাকায় অবস্থিত। তবুও সেখানে কিছু স্থানীয় সবজি ফলে। এই সবজিগুলির বীজ প্রাকৃতিক ভাবেই উর্বর এবং খরাতেও টিকে থাকতে সক্ষম। একই সঙ্গে রোগ ও জীবাণুর আক্রমণও সামলে দেয়। এছাড়া এই সব স্থানীয় সবজি ফলানোর জন্য অতিরিক্ত যত্ন দরকার নেই। এমনকি গবাদিপশুর মলও দরকার হয় না। একবার সামান্য বৃষ্টি হলেই যথেষ্ট ফলন দেবে। তাই আধিয়াগাই তাঁর ফার্ম হাউসে কেবল মাত্র স্থানীয় সবজি লাগিয়েছিলেন।

    আধিয়াগাই দেখেছিলেন, প্রাকৃতিক কারণ, কৃষকদের অনিচ্ছা ও মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের জন্য অনেক সবজি হারিয়ে গিয়েছে বাজার থেকে। অথচ সেই সবজিগুলি সামান্য জল পেলেও বাঁচতে পারে। তাই অবলুপ্ত হতে বসা, দেশী প্রজাতি সবজিগুলিকে বাঁচাতে আধিয়াগাই তৈরি করেছিলেন বীজ ব্যাঙ্ক। বর্তমানে তাঁর বীজ ব্যাঙ্কে ১৩ প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, ৩০ প্রজাতির বেগুন, ৩০ প্রজাতির লাউ, ১০ প্রজাতির ভুট্টা ও  দুর্লভ প্রজাতির ২০০ সবজির বীজ জমা আছে।

    আধিয়াগাইয়ের ফার্মে হওয়া বিভিন্ন প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, আছে দুর্লভ গোলাপী ঢ্যাঁড়সও।

    আধিয়াগাই জানিয়েছেন, “হাইব্রিড প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছের আয়ু মাত্র ১০০ থেকে ১২০ দিন। কিন্তু স্থানীয় প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছগুলির আয়ু, ছয় মাস থেকে তিন বছর। ফলে স্থানীয় প্রজাতির ঢ্যাঁড়স চাষে লাভও প্রচুর।”  তামিলনাড়ুর গ্রামে গ্রামে ঘুরে কয়েকশো প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছ খুঁজে বার করেছেন আধিয়াগাই। যেগুলি বাজার থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। প্রায় অবলুপ্ত হতে বসা গোলাপী ঢ্যাঁড়সকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন, ‘কঙ্গু’ নামের একটি জায়গা থেকে। তামিলনাড়ুতে পাঁচশ প্রজাতির বেগুন আছে জেনে অবাক হয়েছিলেন আধিয়াগাই ।

    অর্গানিক ফার্ম খুলে স্থানীয় সবজি চাষ করে একা বড়লোক হবেন, এই ধরনের মানসিকতার যুবক আধিয়াগাই নন। ফার্মের জন্য সময় দেওয়ার পর, বাকি সময় তিনি ব্যয় করেন স্থানীয় চাষীদের পিছনে। স্থানীয় চাষিদের রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষ ও লুপ্তপ্রায় দেশি সবজির চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কম পরিশ্রম করতে হয়নি আধিয়াগাইকে। স্থানীয় কৃষকদের অল্প জায়গায় দেশী ও স্থানীয় সবজিগুলি লাগাবার জন্য দিনের পর দিন অনুরোধ করে যেতেন আধিয়াগাই। বাড়িতে খাবার জন্য হলেও অন্তত একবার চাষ করে দেখতে বলতেন।

    ফার্মে হয় নানান জাতের দেশী বেগুন।

    সাফল্য পেয়েছিলেন আধিয়াগাই। স্থানীয় কৃষকরা ব্যাবসায়িক ভাবে উৎপাদন করতে শুরু করেছিলেন মানুষের পাত থেকে হারিয়ে যাওয়া সবজিগুলি। অভাবের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলে কয়েকশো স্থানীয় কৃষকের পরিবার। বন্ধ্যা এলাকার দিগন্তবিস্তৃত  ধুসর জমিতে পড়েছিল সবুজের প্রলেপ। হাসি ফুটে উঠেছিল প্রায় অনাহারে থাকা মুখগুলিতে।

    আধিয়াগাইয়ের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। ভারতের এমন কোনও বিখ্যাত পত্রিকা নেই যেখানে তাঁর সাক্ষাতকার ছাপা হয়নি। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশেও। তাঁকে দেখে উদবুদ্ধ হয়েছেন বৃষ্টিচ্ছায়া ও খরা প্রবণ অঞ্চলে থাকা ভিনদেশী কৃষকেরাও। বাবা মায়ের হতাশাকে নিজের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছেন আধিয়াগাই। তাঁরা এখন আধিয়াগাইকে নিয়ে গর্বিত। আজ আধিয়াগাই কোটিপতি কৃষক, তবুও স্বপ্ন দেখেন গরীব চাষীদের জন্য। একটা বড় ‘বীজ ব্যাঙ্ক’ করে যেতে চান। যে ব্যাঙ্কটি থেকে গরীব চাষীদের বিনামূল্যে বীজ দেওয়ার হবে। যে ব্যাঙ্কটি বাঁচিয়ে দেবে লুপ্ত হতে বসা বেশ কিছু দেশী সবজিকে।

    ধুসর মাটি আজ সবুজ ।
    বাস্তবের মাটিতে নেমে এসো যুবসমাজ

    আধিয়াগাইয়ের মতে ভারত এখন ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রো ব্রেন-ড্রেন‘ নামক অসুখে ভুগছে। রোজ ২০০০ ভারতীয় কৃষক চাষ-আবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই আধিয়াগাই যুবসমাজকে কৃষিমুখী করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ হিসেবে আধিয়াগাই বলেছিলেন,

    “আমরা যেদিন কৃষিকে আমাদের শিক্ষার মূলস্রোতে আনতে পারব, সেদিন নিজেদের আর ভারতের ভবিষ্যতের জন্য  আর চিন্তিত হতে হবে না। আমার জিনে থাকা এক কৃষক, আমার পরিবেশ ও আমার প্যাশন আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কিন্তু দেশের আগামী প্রজন্মকে হয়ত বাঁচার তাগিদেই মাঠে নামতে হবে। তবে আমি খুশী, কারণ আমি তাদের হাতে টিকে থাকার অস্ত্র তুলে দিয়ে যেতে পারবো।”

    দূরে আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর মাথায় জমা বাদল মেঘের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসেছিলেন ৩০ বছরের কৃষক রামেশ্বরন আধিয়াগাই। স্বপ্নকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে। মেঘেদের অবহেলা এখন তাঁর ও তাঁর কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রামের মানুষদের মনে দাগই কাটে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More