প্রথাভাঙার যুদ্ধে তুলিকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন তির হিসেবে, তাঁর ছবি মানেই কাব্যময় নগ্নতা

তাঁর মৃত্যুর ছাব্বিশ বছর পর, ১৯৭৪ সালে তাঁর একটি ছবি নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১৫ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে চিত্রচর্চা মানেই ছিল দেবদেবী ও নৈসর্গিক দৃশ্যের ছবি আঁকা। নয়তো সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তি, দেশের নেতা বা রাজ-মহারাজাদের পোট্রেট আঁকা। যদিও প্রাচীন কাল থেকেই, ভারতের সব ধরনের নান্দনিক শিল্পকলার প্রিয় বিষয় ছিল নারীর নগ্নতা। মন্দিরের দেওয়াল ও রাজারাজড়াদের প্রাসাদের অলিন্দে টাঙানো ফ্রেমে, নগ্ন নারীর শারীরিক বিভঙ্গে মুগ্ধ হয়েছে ভারতবাসী। তবে চিত্রকরের ক্যানভাসে নারীর নগ্নতা তখনও আসেনি। তবে   পাশ্চাত্যের হাত ধরে বাংলার কমদামি ক্যানভাসে নিরাবরণ নারীর দেহাবয়ব ফুটে ওঠার একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তখনই সহসা বাংলার চিত্রশিল্প ও সাহিত্যে হানা দিয়েছিল ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধ।

    চিত্রশিল্পের নন্দনতত্বে নগ্নতা হয়ে গিয়েছিল ব্রাত্য

    এই  ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের জন্য বঙ্কিমের লেখায় শেলি বায়রনসূলভ কোটেশন আসবার সম্ভাবনা জাগিয়েও আসেনি। শরৎচন্দ্রের লেখা ‘চরিত্রহীন’, ফরাসি লেখক ভলতেয়ারের ‘ক্যান্ডিড’ হতে হতে হয়নি। রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘চোখের বালি’, ফরাসি ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের ‘মাদাম বোভারী’র পথে হাঁটতে হাঁটতে দিক বদল করেছিল।

    শিল্পীদের ক্যানভাসে নারী শরীর ফুটে উঠছিল, কিন্তু নগ্নতা হয়ে গিয়েছিল ব্রাত্য। কারণ অবনীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে এঁকে ফেলেছিলেন ‘ভারতমাতা’ ছবিটি। নব্যভারতীয় শিল্পবাদের অঙ্গনে, নারী শরীর এক অর্থে হয়ে উঠেছিল, মন্দিরের মতোই পবিত্র। শিল্পীদের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা নারী শরীরের মুখটি ছাড়া, পুরোটাই ঢাকা থাকত পোশাকের আড়ালে। অথচ, সেই সময়ে ভারতের বেশিরভাগ নারীই ইউরোপীয় মেয়েদের মতো ব্লাউজ, সেমিজ, বডিস, পেটিকোট পড়তে শেখেননি। ফলে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল আঙ্গিকে আঙ্গিকে ছায়া যুদ্ধ।

    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতা

    ১৮৯৬ সালের ৬ জুলাই, কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ই বি হ্যাভেল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলার নান্দনিক চিন্তাধারার গতিপথ পাল্টে গিয়েছিল। চিত্রশিক্ষার নতুন মডেল হাজির করেছিলেন হ্যাভেল সাহেব। যে মডেলে নারীর নগ্নতা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। হ্যাভেলের পাশে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্পের ধারাগুলির অবলুপ্তি মেনে নিতে পারেননি গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলেরই কিছু ছাত্র। তাঁরা বলেছিলেন পাশ্চাত্যের শিল্পকলা যে উচ্চতায় উঠেছে, তার স্পর্শ ছাড়া ভারতে চিত্রচর্চা অর্থহীন। বিক্ষোভের ফলশ্রুতি হিসেবে ১৮৯৭ সালে কলকাতায় তৈরি হয়েছিল গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলের বিপরীত ঘরানার একটি আর্ট স্কুল। নাম ছিল ‘জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমি’। অ্যাকাডেমি তৈরির নেতৃত্বে ছিলেন রণদাপ্রসাদ গুপ্ত।

    গচিহাটার মজুমদার বাড়ি ছেড়েছিলেন চিরবিদ্রোহী হেম

    বাংলার চিত্রচর্চার অঙ্গনে যখন দুটি মতবাদের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ চলছিল। ঠিক সেই সময় ময়মনসিংহের গচিহাটার মজুমদারবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার। কারণ তাঁর হাত থেকে তুলি কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন পরিবারের গুরুজনেরা। কলকাতায় পালিয়ে এসে হেমেন্দ্রনাথ উঠেছিলেন অখিল মিস্ত্রি লেনে। দিদি হৈমলতার বাড়িতে। তাঁর জামাইবাবু রমেশ সোম, কিশোর হেমেন্দ্রনাথের মধ্যে শিল্পী হওয়ার অসীম আগ্রহ লক্ষ করেছিলেন। তিনি হেমেন্দ্রনাথকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথের গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে। সালটা ছিল ১৯১০।

    কিন্তু গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে যাওয়ার পর, দ্রুতই হেমেন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ হয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে চিত্রকলার মুখে লাগাম পরিয়ে রাখা আছে। মনের ঘোড়া ক্যানভাসের প্রান্তরে ইচ্ছেমতো ছোটানোর স্বাধীনতা নেই। ১৯১১ সালে, প্রিয় বন্ধু অতুল বসুর পরামর্শে হেমেন্দ্রনাথ ভর্তি হয়েছিলেন রণদাপ্রসাদ গুপ্তের জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমিতে। জুবিলি অ্যাকাডেমিতে  হেমেন্দ্রনাথ শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ১৯১৫ সাল পর্যন্ত। সেখানে হেমেন্দ্রনাথ শিখেছিলেন তেলরঙের কাজ।

    হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার

    তখনও ভারতে জীবন্ত মডেল নিয়ে ন্যুড স্টাডি শুরু হয়নি। তবে জুবিলি অ্যাকাডেমিতে ন্যাচারালিস্ট পদ্ধতিতে আঁকা শেখাতেন শিক্ষকেরা। চিন্তার স্বাধীনতা ছিল সেখানে। ১৯১৯ সালে প্রথাগত শিক্ষা শেষ করে, যোগেন্দ্রনাথ শীল, অতুল বসু, যামিনী রায় ও, ভবানীচরণ লাহার সঙ্গে কলকাতার বিডন স্ট্রিটে হেমেন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’। কারণ তাঁরা চেয়েছিলেন, ছবি হোক সর্বসাধারণের। ক্যানভাস শুধু ধনীর প্রাসাদে আটকে থাকলে শিল্পের উন্নতি হবে না। যদিও তা কোনওদিনই বাস্তবায়িত হয়নি। আজও বেশিরভাগ  চিত্রকরদের ছবি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থেকে গিয়েছে।

    হেমেন্দ্রনাথ হয়ে গিয়েছিলেন হেমেন মজুমদার

    গতানুগতিকতার স্রোতের বিরুদ্ধে ভাসা বোহেমিয়ান চিত্রকর হেমেন্দ্রনাথ কালের স্রোতে হয়ে গিয়েছিলেন পেশাদার চিত্রকর হেমেন মজুমদার। তিনি প্রথম আর্থিক সাফল্য পেয়েছিলেন ১৯২৬ সালে। মুম্বাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হেমেন মজুমদারের আঁকা একটি ছবির স্বত্ব উচ্চমূল্যে কিনে নিয়েছিল তাদের ক্যালেন্ডারের জন্য। প্রকাশিত হওয়ার পর অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল ক্যালেন্ডারটি। হেমেন মজুমদারকে ভারত চিনেছিল ইরোটিক চিত্রকর হিসেবে। যাঁর দর্শন ছিল ‘ভয়েরিস্টিক ইরোটিজম’।

    হেমেন মজুমদারের আঁকা ছবিতে মজে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন ভারতীয় স্টেটের রাজন্যবর্গ। কাশ্মীর, পাতিয়ালা, ঢোলকপুর, ময়ূরভঞ্জ-সহ ভারতের অগণিত রাজদরবারের রাজচিত্রকর হয়ে একের পর এক কালজয়ী ছবি এঁকে গিয়েছিলেন হেমেন মজুমদার। রাজদরবার থেকে উপার্জনের টাকায় কলকাতায় বানিয়েছিলেন নিজস্ব স্টুডিও।

    হেমেন মজুমদারের ছবিতে ছিল কাব্যময় নগ্নতা

    রক্ষণশীল চিত্রকরদের নীতিশাস্ত্র মেনে তিনি ক্যানভাসে তুলি ছোঁয়াতেন না। তিনি আঁকতেন তাঁর মর্জিমাফিক। তুলিতে মাখিয়ে নিয়েছিলেন তেলরঙ। আঁচড় পড়েছিল বড় ক্যানভাসে। না, ক্যানভাসে ফুটে ওঠেনি কোনও নিসর্গচিত্র বা দেবদেবীর অবয়ব। হেমেন মজুমদারের ক্যানভাস জুড়ে ফুটে উঠেছিল অর্ধনগ্ন নারী। কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে, অবনীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার প্রতি সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন হেমেন মজুমদার।

    সে কালের গ্রাম-বাংলায় বউ-ঝি’রা পুকুরে নদীতে স্নান সেরে ভিজে কাপড় জড়িয়েই ঘরে ফিরে যেতেন। তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন জমিদারের লম্পট নায়েব বা গ্রামের মোড়ল। এমন দৃশ্যের কথা আমরা গ্রাম বাংলা নিয়ে লেখা গল্প ও উপন্যাসে পড়েছি। সাহিত্যিকদের নজর সিক্তবসনা নারীর গ্রাম্য যৌবনের ওপর পড়লেও চিত্রশিল্পীদের নজর সেভাবে তখনও পড়েনি। এই বিষয় নিয়ে ছবি আঁকার কথা কেউ তখনও তেমন করে ভাবেননি। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রকর রবি ভার্মার ভাই রাজা ভার্মা প্রথম এই বিষয় নিয়ে এঁকেছিলেন। একই বিষয় নিয়ে এঁকেছিলেন বামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কিন্তু তাঁরা রক্ষণশীলদের দাপটে সেই অর্থে প্রচার পাননি। তাই হেমেন মজুমদারের অঙ্কনশৈলী একই ধারার হয়েও নিজস্ব ধারার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।

    প্রথাভাঙার যুদ্ধে তুলিকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন তির হিসেবে

    তাঁর ক্যানভাসে উঠে আসা নারীরা, কেউই বালিকা কিশোরী বা সদ্যযৌবনা নন। তাঁরা সবাই পরিণত বয়স্কা। সম্ভবত বিবাহিতা। কারণ তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল গ্রাম্য মধ্যবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারের স্বাস্থ্যবতী বিবাহিতা নারী। সেই সব নারীদের সাংসারিক জীবনের অসতর্ক মুহূর্তগুলি ফুটে উঠত তাঁর ছবিতে। স্বাস্থ্যবতী বিবাহিতা রমণীর শরীরের পিছন দিকটাই ছিল হেমেন মজুমদারের পছন্দের বিষয়। এর ফলে ছবিগুলি দর্শকের ইন্দ্রিয়কে সহজেই প্রভাবিত করত। হেমেন মজুমদারের আঁকা ‘দ্য উন্ডেড ভ্যানিটি’, ব্লু শাড়ি, হারমনি, ‘আ ইয়ং ওম্যান উইথ আ ওয়াটার জার’ ছবিগুলি যার অকাট্য প্রমাণ।

    সমসাময়িক শিল্পীরাও একে একে ক্যানভাসে আনা শুরু করেছিলেন সম্পুর্ণ নগ্ন নারীমূর্তি। কিন্তু সেগুলির চেয়েও হেমেন মজুমদারের আঁকা ছবিগুলি বেশি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। কারণ, সম্পূর্ণ নগ্ন নারীকে দেখে যতটা কামোত্তেজনা জাগে, আলো-আঁধারের আলিঙ্গনে, পাতলা ভিজে শাড়িতে কোনও মতে শরীর ঢাকা নারী আরও অনেক বেশি উত্তেজক। এই চিরসত্যটা ধরে ফেলেছিলেন হেমেন মজুমদার। না, পেশাদার চিত্রকর হয়েও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তিনি ছবিগুলি আঁকেননি। এঁকেছিলেন তৎকালীন নব্যভারতীয় শিল্পবাদের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করার জন্য। এ ছিল তাঁর এক অসামান্য নির্বাক আন্দোলন।

    হেমেন মজুমদারের ‘মনসুন’ ছবিটিতে আমরা দেখেছি, নদীর ঘাটে বসে এক যুবতীকে পা পরিষ্কার করতে। আকাশে বর্ষার মেঘ। ভিজে কাপড়ের ভেতর দিয়ে যুবতীর মাংসল পিঠ ও নিতম্বের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। ‘আফটার বাথ’ নামের ছবিটিতে এক যুবতী স্নান সেরে নদী থেকে জল নিয়ে উঠে আসছেন। তাঁর বাম স্তন সাদা শাড়ির ভেতর দিয়ে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু স্তনবৃন্ত অদৃশ্য। এই জন্যই দর্শক তাঁর ছবি ফিরে ফিরে দেখতে বাধ্য হন। যদিও দর্শক জানেন এই রহস্য কোনও দিনই উন্মোচিত হবে না।

    হেমেন মজুমদারের একটি ছবিতে দেখতে পাই, সিল্কের শাড়ি পরিহিত এক নারীকে। কানে দামি দুল, হাতে বাজুবন্ধ। নারীটি বসে আছেন তাঁর স্বপ্নের জগতে। ছবিটি আঁকা হয়েছে একটি গোলাপকে পটভূমিকায় রেখে। ছবিতে গোলাপটিকে এনে ভালোবাসার সুগন্ধ ও কাঁটাকে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৩৬ সালে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এবং ১৯৫২ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে ‘গ্রেট বিউটিজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শকদের মোহিত করেছিল। হেমেন মজুমদারের পল্লিপ্রাণ, স্নানান্তে, সিক্তবসনা, সজ্জা সমাপন, পরিত্যক্তা, তন্ময় ,স্মৃতি, মানসকমল, পরিণাম, অনন্তের সুর, সাকী, কমল না কন্টক নামের ছবিগুলি সারা বিশ্বের চিত্রচর্চায় আজও সমাদৃত।

     ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ফোটোগ্রাফের সহায়তা নেওয়া শুরু করেছিলেন

    একবার হেমেন মজুমদার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী সুধারাণীকে নিয়ে। এক সকালে তিনি তাঁর স্ত্রীকে দেখেছিলেন, স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে কলসি কাঁখে উঠে আসতে। হেমেন মজুমদারের সঙ্গে ছিল ক্যামেরা। তুলে ফেলেছিলেন স্ত্রীয়ের কয়েকটি ছবি। তবে তিনি জানতেন, ফোটোগ্রাফকে হুবহু নকল করে ছবি আঁকা কারিগরের কাজ, একজন শিল্পীর নয়। কয়েকদিন ধরেই গ্রামের বাড়িতে হেমেন মজুমদার পড়ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল। উপন্যাসটির নায়িকা রোহিণী তাঁর অন্যতম প্রিয় চরিত্র ছিল। উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র রোহিণী, মালতী নামে এক আত্মীয়ার মুখ এবং স্ত্রী সুধারাণীর ফোটোগ্রাফ মিলিয়ে হেমেন মজুমদার এঁকে ফেলেছিলেন তাঁর মানসপ্রতিমার ছবি।

    একই কৌশল ব্যবহার করে পরেও বহু ছবি এঁকেছেন তিনি। এভাবেই তৈরি হয়েছিল হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের বিখ্যাত ছবি তন্ময়। কোনও বিষয়কে ক্যানভাসে ধরার জন্য, রেফারেন্স হিসাবে তিনি তাঁর ক্যামেরায় তোলা ছবি এবং মডেলকে সামনে রেখে করা ‘লাইভ ড্রয়িং’এর সাহায্য নিতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর মডেল ছিলেন তাঁর স্ত্রী সুধারাণী। কিন্তু ছবিতে তাঁকে চেনা যেত না। কারণ ক্যানভাসে ফুটে ওঠা নারীটির মুখ তিনি পালটে দিতেন।

    শেষ জীবন কেটেছিল শৈশবের গচিহাটাতেই। ১৯৪৮ সালের ২২ জুলাই, ময়মনসিংহের গচিহাটাতে প্রয়াত হয়েছিলেন ভারতের ‘ভ্যান গগ’ হেমেন মজুমদার। তারপরেও কমেনি তাঁর ছবিগুলি নিয়ে উন্মাদনা। ১৯৭৪ সালে তাঁর একটি ছবি নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১৫ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকায়।

    হেমেন মজুমদার এত বিতর্কিত ও বিখ্যাত হয়ে ওঠাটা অনিবার্য ছিলই। প্রথাভাঙার যুগে হেমেন মজুমদারের ছবিতেই প্রথম এসেছিল একধরনের অস্বস্তিকর ও নিষিদ্ধ আহ্বান। যা ঝড় তুলেছিল বাঙালি মনে ও মননে।  তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি বাঙালি বিবাহিতা রমণীর লুকিয়ে রাখা সম্পদে, রঙতুলি নিয়ে অবৈধ অথচ সাহসী উঁকি দিয়েছিলেন। তিনিই সে যুগের একমাত্র চিত্রকর, যাঁর তাঁর সে যুগে হজম করা সহজ ছিল না, আবার না দেখেও উপায় ছিল না। এভাবেই চিত্রশিল্পের নন্দনতত্বে অমোঘ এবং প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন, সময়ের আগে আসা, প্রথাভাঙার শিল্পী হেমেন মজুমদার। মৃত্যুর বাহাত্তর বছর পরেও যাঁকে ভোলা সম্ভব হয়নি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More