শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

মুম্বইয়ের বস্তি থেকে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়, চব্বিশের জয়কুমারের স্বপ্নের উড়ান

সোহিনী চক্রবর্ত্তী

ছোটবেলা কেটেছে মুম্বইয়ের কুর্লা বস্তিতে। মাসের শেষে সংসারে বেঁচে থাকত মেরেকেটে ১০ টাকা। আধপেটা খাওয়া জুটেছে কখনও। কোনওদিন বা অভুক্তই থাকতে হয়েছে। তবে শত অভাবেও পড়াশোনা ছাড়েনি ছেলেটা। আর তাকে সর্বক্ষণ সাহস জুগিয়েছেন তার মা।

আজ সেই ছেলেই ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট। মাসিক স্টাইপেন্ড ২০০০ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য ১ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকার কিছু বেশি। ৫০০ ডলার নিজের কাছে রেখে বাকিটা পাঠান মায়ের হাতে। খুব তাড়াতাড়িই মাকেও নিয়ে যাবেন আমেরিকায়। তিনি জয়কুমার বৈদ্য। মুম্বইয়ের বস্তি থেকে দু-চোখে স্বপ্ন নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উড়ান ভরেছিলেন তিনি।

এখন জয়কুমার সফল। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছতে গিয়ে হাজারটা লড়াই লড়তে হয়েছে তাঁকে। বহু বাধা এলেও হার মানেননি জয়কুমার। এক সময় স্কুলের মাইনে দিতে না পারায় কর্তৃপক্ষ আটকে দিয়েছিল রেজাল্ট। ছোট্ট ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই লোকের দোরে দোরে ঘুরেছিলেন এক অসহায় মা। যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়। বদলে জুটেছিল চরম অপমান আর লাঞ্ছনা। সঙ্গে বাড়তি উপদেশ, “এ ছেলেকে গাড়ি চালানো শেখাও। বড় হয়ে অন্তত ড্রাইভারি করে পেট চালাবে।”

মুম্বইয়ের সেই ঘরে জয়কুমার

সে সময় কান্না চেপে রেখে মনকে শক্ত করতেন জয়কুমারের মা নলিনী বৈদ্য। কান দেননি কারও কথায়। জানতেন, ছেলের যা মেধা আছে, তাতে একটু সুযোগ পেলেই ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যত কেউ আটকাতে পারবে না। তাই শত কষ্টেও ছেলের পড়া বন্ধ হতে দেননি। নলিনীর কঠিন লড়াইয়ের যোগ্য সম্মান দিয়েছেন জয়কুমারও। মুম্বইয়ের বস্তি থেকে পৌঁছে গিয়েছেন আমেরিকার নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই নলিনীকে ডিভোর্স দিয়ে দেন তাঁর স্বামী। সন্তানের সঙ্গেই শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় তাঁকে। কপাল ভালো যে সে সময় চাকরি করতেন নলিনীর মা। তাই মেয়ে আর নাতিকে নিজের কাছেই এনে রাখেন তিনি। চাকরি সামান্য হলেও তিনজনের কোনওমতে চলে যেত। কিন্তু বাদ সাধল নলিনীর মায়ের অসুখ। ২০০৩ সালে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। তারপরেই শুরু হয় সংগ্রাম। সংসারে দেখা দেয় তীব্র অর্থাভাব। কোনওদিন খাবার জোটেইনি কপালে। তো কোনওদিন একটা বড়াপাও কিংবা শিঙারা অথবা শুধু চা-পাঁউরুটি খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছে।

মায়ের সঙ্গে জয়কুমার

অভাবের তাড়না যে কী জিনিস খুব অল্প বয়সেই তা বুঝে গিয়েছিলেন জয়কুমার। মাঝে মাঝেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ত সে। কিন্তু সে সময় হাল ছাড়েননি নলিনী। ছেলেকে ক্রমাগত শক্তি জোগাতেন তিনি। সফল হওয়ার পর জয়কুমার তাই সবসময়ই বলেন, “আমি আজ যা সেটা মায়ের জন্যই। কারণ মা-ই আমায় শিখিয়েছেন ঘন কালো অন্ধকার দিনের পর, সকলের জন্যই একটা সোনালি দিন অপেক্ষা করে।” যে সময় মুম্বইয়ের একটি বস্তিতে ছেলে এবং মাকে নিয়ে থাকতেন নলিনী, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয় একটি মন্দির কর্তৃপক্ষ। জামা-কাপড় আর রেশন দিয়ে ওই পরিবারকে সাহায্য করত ওই মন্দির।

কিন্তু অর্থাভাব তাতেও কমেনি। জয়কুমারের বয়সী আর পাঁচজন যখন স্কুলের পিকনিকে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খাওয়া-দাওয়া করতে যেত, সে সময় ছেলের মুখে সামান্য খাবারটুকু তুলে দিতেও রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছিল নলিনীকে। তবে এ সবের কোনও কিছুতেই আর ভেঙে পড়তেন না জয়কুমার। কারণ জানতেন, পরিস্থিতি যায় হোক না কেন, মা সবসময় তাঁর পাশেই রয়েছেন। জয়কুমারের কথায়, “ছোটবেলা থেকেই মা আমায় শিখিয়েছিলেন শত বাধা এলেও কী ভাবে মনের জোর বজায় রাখতে হয়।

শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার ফাঁকে

বস্তিতে থাকার সময়েই নলিনী খেয়াল করেন বিজ্ঞানের বিষয়ে অদম্য উৎসাহ রয়েছে ছেলের। জাগতিক সব জিনিসে আর পাঁচজন যে উত্তর পেয়ে খুশি থাকে, তাতে বিশেষ আনন্দ পেত না জয়কুমার। বরং গভীরে গিয়ে যুক্তি দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালাত সে। নলিনী বুঝতে পারেন বিজ্ঞানের প্রতি ছেলের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু পড়ার খরচ জোগাবে কে? একই কলোনিতে থাকা আত্মীয়রাও তখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন নলিনী এবং তাঁর ছেলের থেকে। সে সময়ে খানিকটা বরাত জোরেই মুম্বইয়ের এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘MESCO’-র সংস্পর্ষে আসেন নলিনী। ছেলের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয় ওই সংস্থা। আর পিছনে ফিরে তাকা হয়নি জয়কুমারকে। মেধা আর অদম্য মনের জোরে তরতর করে এগিয়েছে তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ।

তবে ওই সংস্থার উপরে নির্ভরশীল হতে চাননি জয়কুমার। তাই কুর্লাতে যে বস্তিতে তাঁরা থাকতেন তার পাশেই একটি টিভি মেরামতির দোকানে কাজ নেন তিনি। মাসে সে সময় জয়কুমারের হাতে আসত ৪০০০ টাকা। মেধার দৌলতেই সে সময় চান্স পান কে জে সোমানিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে শুরু হয় পড়াশোনা। কলেজ শেষ হওয়ার আগেই রোবটিক্স-এর জন্য জাতীয় স্তরে তিনটি এবং রাজ্য স্তরে চারটি পুরস্কার জিতে নেন জয়কুমার। ইন্টার্নশিপের জন্য ডাক পান বহুজাতিক সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো থেকেও।

বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস্রুমে (একদম বাঁ দিকে) 

কলেজ শেষ করে জয়কুমার যোগ দেন Tata Institute of Fundamental Research-এ। রিসার্চার হিসেবে তাঁর বেতন হয় মাসিক ৩০ হাজার টাকা। সামনে তখন অনেক কাজ। বাড়ি মেরামত করতে হবে। ধার শোধ করতে হবে। তার মধ্যেই GRE and TOEFL-এর জন্যও অ্যাপ্লাই করেছেন জয়কুমার। দু’মাসের মাইনে জমিয়ে কিনেছেন একটা এসি-ও। ফলে পকেটে খানিক টান পড়েছে। তাই রিসার্চের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীকে পড়ানোও শুরু করেন জয়কুমার। দিতে শুরু করেন অনলাইন টিউশনও।

পাশাপাশি চলছিল রিসার্চের কাজও। এরপর ২০১৭-২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ পায় জয়কুমারের থিসিস পেপার। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু পছন্দ হয় ভার্জিনিয়ার ইউনিভার্সিটির। ডাক পান সেখান থেকে। দু চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ২৪ বছরের তরুণ পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়। রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ায় যোগ দেন। তবে রিসার্চ শেষ হলে দেশের মাটিতেই ফিরতে চান জয়কুমার। গড়তে চান নিজের কোম্পানি। যার হাত ধরে টেকনোলজিতে উন্নত হবে তাঁর ভিটেমাটি, তাঁর নিজের দেশ। শুধু তাই নয়, মেয়েদের শিক্ষার উন্নতি এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্যও কাজ করতে চান জয়কুমার।

Comments are closed.