বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

দিল্লি ছয়

অমিতাভ রায়

নতুন দিল্লি স্টেশন থেকে বেরিয়ে আজমেরি গেট পেরিয়ে পায়ে পায়ে  মেরেকেটে  এক  কিলোমিটার।  রাস্তার  দু’ধারে  ইমারতি হার্ডওয়ারের অসংখ্য দোকান। পাইপ, স্টিল রড, স্যানিটারি ফিটিংস থেকে শুরু করে বাড়ি তৈরির যাবতীয় মালপত্র, ইট-বালি-সিমেন্ট বাদ দিয়ে, সবই পাওয়া যায় এখানে, যা চাওরি বাজার নামে পরিচিত। এই পথে একটু সতর্ক ভাবে না চললে যে কোনও মুহূর্তে লোহা-লক্করের খোঁচা খেতে হতে পারে। পায়ের ওপর দিয়ে চলে যেতে পারে সাইকেল রিকশা। আর মানুষের ধাক্কা তো অবশ্যম্ভাবী। সকলেই যে কাঁধে-মাথায় ব্যাগ-বস্তা চড়িয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটছে।

চাওরি বাজার মেট্রো স্টেশনের বাঁ দিকের রাস্তাটা হাউজ কাজি, লাল কুঁয়া, বরফখানা, নয়া বানস হয়ে চলে গিয়েছে খারি বাওলি। নামেই অনেক পাড়া। আসলে দু’ কিলোমিটার। আর ডানদিকে তাকালেই নজরে আসে জামা মসজিদের চূড়া। আর সামনের দিকের নই সড়ক ধরে এক কিলোমিটার এগোলেই এসে যাবে চাঁদনি চক।

চাওরি বাজার, খাড়ি বাওলি, নয়া বানস, বরফখানা, সাকরি কালান, চুড়িওয়ালান, বল্লি মরান, লাল কুঁয়া, হাউজ কাজি, বাজার সীতারাম, ফাটক তেলিয়ান, বুলবুলিখানা, বাতাসিয়া গলি, কুচা ঘাসিরাম, কাটরা নীল, শাহগঞ্জ চক, কুন্দেওয়ালা চক, বালুকি চক, শঙ্কর গলি – এ রকম আরও অনেক ছোট ছোট প্রাচীন পাড়া-মহল্লা দিল্লির কেন্দ্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আদতে এইসব পাড়া-মহল্লা-বাজার নিয়েই গড়ে উঠেছিল মোঘল সম্রাট শাহ্জাহানের শাহ্জাহানাবাদ।

মেয়ের আবদারে শাহ্জাহান লাল কেল্লার সদর দরজার ঠিক উল্টো দিকে গড়ে দিয়েছিলেন এক অভিজাত বাজার। লাল কেল্লার প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে যে রাস্তাটা সরাসরি পশ্চিম দিকে সোজা চলে গেছে, যার দু’ পাশে সেই সূচনা লগ্ন থেকেই শুধু বিতান-বাজার-দোকান, তার নাম চাঁদনি চক।

দু’ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সরল পথটির অন্য প্রান্তে ষোলোশো পঞ্চাশে নির্মিত হল ফতেপুরি মসজিদ।   শাহ্জাহান-পত্নী ফতেপুরি বেগমের আবদারেই নাকি মসজিদটি তৈরি হয়েছিল। সেকালের পাঁচিল ঘেরা শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে অবস্থিত ফতেপুরি মসজিদের অন্য নাম- গরিবের জামা মসজিদ।

ফতেপুরি মসজিদের এখন অবিশ্যি অন্য পরিচয়। মসজিদটির চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মশলাপাতির এত বড় বাজার ভারতে আর আছে কি?

পাশেই রয়েছে আফগানি বাজার। এখানকার ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই আফগানিস্তান থেকে আসেননি। সকলেই ভারতীয়। কোনও এককালে আফগানিস্তান থেকে আসা বিক্রেতারা এখানে হিং, আখরোট, মেওয়া ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন। সেই থেকেই এমন নাম হয়ে গেছে।

পূর্বে লাল কেল্লা, পশ্চিমে ফতেপুরি মসজিদ বা আরও একটু পিছিয়ে লাহোরি গেট, উত্তরে পুরনো দিল্লির রেলপথ আর দক্ষিণে আসফ আলি রোড ও নতুন দিল্লির রেলপথ এই আয়তাকার এলাকার সাবেকি নাম – শাহ্জাহানাবাদ। আর এখন সরকারি ডাক বিভাগের ভাষ্যে এই এলাকার পরিচয় দিল্লি সিক্স অর্থাৎ দিল্লি ছয়।

সপ্তদশ শতাব্দীতে এখান থেকেই পরিচালিত হতো মোঘল প্রশাসন। এই এলাকার প্রশাসনিক দাপট এখন উধাও হলেও বজায় আছে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। উত্তর ভারতের বাণিজ্য ব্যবস্থায় দিল্লি সিক্সের অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

চাওরি বাজার থেকেই পরিক্রমা শুরু করা যাক। কেন? প্রান্ত বা সীমানা বরাবর সফর শুরু করলে ভেতরে যাওয়ার তেমন দরকার পড়ে না। সবকিছুই ওপর ওপর দেখা হয়। হাঁটাহাঁটিও বেশি হয় বলে পদযুগল দ্রুত অবসন্ন হয়ে পড়ে। ফলে খানিকক্ষণ বাদে খুঁটিয়ে দেখার ইচ্ছেটাই হারিয়ে যায়।

সেকালের শাহ্জাহানাবাদের ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু চাওরি বাজারেই রয়েছে দিল্লি মেট্রোর গভীরতম স্টেশন। রাস্তা থেকে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছোতে হলে প্রায় তিরিশ মিটার বা একশো ফুটের থেকেও গভীরে নেমে যেতে হবে।

চাওরি বাজার চক বা মোড় থেকে পূর্ব দিকে জামা মসজিদের দিকে এগিয়ে যাওয়া চওড়া রাস্তাটা, যার দু’ পাশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পর্দার দোকান। জানালা-দরজার জন্যে সুলভ থেকে শুরু করে মহার্ঘ পর্দা সবই পাওয়া যায়। রাস্তাটা কিন্তু খুব বেশি দীর্ঘ নয়। এক কিলোমিটার বা আরেকটু কম। এইটুকু জায়গায় কত পর্দার দোকান রয়েছে বলা মুশকিল। সাদামাটা থেকে শুরু করে শৌখিন পর্দার এত বড় বাজার উত্তর ভারতে আর নেই।

এই এলাকার  মূল সড়ক (তা সে নই সড়ক, চাওরি বাজার বা চাঁদনি চক যাই হোক না কেন)  থেকে প্রতি পঁচিশ-তিরিশ পা অন্তর কত যে গলি ভেতরের দিকে চলে গেছে তার হিসেব রাখা বেশ জটিল। গলি লোহেওয়ালি, চরখেওয়ালান গলি, গলি সত্তেওয়ালি, চুড়িওয়ালান নামের এইসব গলি-কুচা, (উর্দু ভাষায় গলিকে কুচা বলে) ধরে এগোতে থাকলে বোঝা যায় কোনও একটি নির্দিষ্ট পণ্যের বাজারকে কেন্দ্র করেই হয়েছে এদের নামকরণ। আঁকাবাঁকা, স্বল্প প্রস্থের সঙ্কীর্ণ পথগুলি দিয়ে  পাশাপাশি দুটি বিপরীতমুখী সাইকেল রিকশাও ঠিক মতো চলতে পারে না। তার সঙ্গে যদি হঠাৎ করে কোনও মোটরবাইক-স্কুটার বা ই-রিকশা হাজির হয় তাহলে তো নির্ঘাত যানজট। এইসব পথ পরিক্রমার  সময় মনে হতেই পারে এখানে আগুন লাগলে দমকলের ইঞ্জিন কী করে উদ্ধারের কাজ করবে! এখানকার অসুস্থ মানুষকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কে জানে! তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনও অভাব-অভিযোগ নেই। নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে নিশ্চিন্তে কেটে চলে তাদের নিরুদ্বিগ্ন দৈনন্দিন জীবন। বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এইভাবেই এগিয়ে চলেছে এখানকার সমাজ।

চাওরি বাজারের মূল সড়ক ধরে জামা মসজিদ যাওয়ার পথে উত্তরমুখী হয়ে বাঁ দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটা ধরে এক-দেড় কিলোমিটার হাঁটলেই চাঁদনি চক। রাস্তার নাম নই সড়ক। পথের দু’ ধারেই শুধু বই আর বই। স্কুল-কলেজের পাঠ্য পুস্তকের এত বিশাল বাজার ভারতীয় উপ-মহাদেশে আর আছে কি?

লাল কেল্লা, জামা মসজিদ গড়ে ওঠার সময় থেকেই অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই এই জনপদের পত্তন। তবে বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে লেগে গেছে আরও প্রায় দুশো বছর। দোকান-বাজার-বাসস্থান নিয়ে গড়ে ওঠা এই ঘিঞ্জি এলাকায় মানুষের মতো মন্দির-মসজিদেরও অভাব নেই। দু’ পা দূরেই রয়েছে গুরুদোয়ারা শিশগঞ্জ। অন্ততপক্ষে তিন–তিনটে গির্জাও এই চৌহদ্দিতে রয়েছে। জাতপাত নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এখানে নির্বিবাদে কয়েক শতাব্দী ধরে মিলেমিশে পরম শান্তিতে জীবনযাপন করছে।

নই সড়ক থেকে চাঁদনি চক যাওয়ার পথে বাঁ দিকের যে কোনও গলি ধরে চলতে থাকলে আঁকাবাঁকা পথ  আপন গতিতেই বল্লি মারান পৌঁছিয়ে যাবে। চশমা, জুতো আর নিজস্ব বেকারিতে তৈরি নানান রকমের কেক-বিস্কুটের দোকান-বাজার দেখতে দেখতে চোখ জড়িয়ে যায়। একের পর এক দোকান সার বেঁধে সাজিয়ে রেখেছে একই পণ্য। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, ঝগড়াঝাঁটি নেই। সমগ্র উত্তর ভারত তো বটেই পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানেও চলে যায় এখানকার চশমা, জুতো।

বল্লি মারান এলাকায় থাকতেন আসাদউল্লা খান বেগ তথা মির্জা গালিব। মৃত্যুর এত বছর পরেও তিনি এই ধূলিধূসরিত গলির উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। চওরি বাজার, হাউজ কাজি হয়ে লাল কুঁয়ার কাশিম জান গলি ধরে বল্লি মারানে এসে পৌঁছোলেই গালিবের হাভেলি। এই বল্লি মারান সম্পর্কেই গুলজার লিখেছিলেন, ‘বল্লি মারান কে মহল্লে কি ওহ পেচিদা দলিলোঁ কি সি গলিয়াঁ…।’ অর্থাৎ বল্লি মারান মহল্লার গলিঘুঁজির নকশা জটিল দলিল-দস্তাবেজের মতোই প্যাঁচালো। জীৰ্ণ বাড়িটির সদরে একটা পাথরের ফলকে মির্জা গালিব সম্পর্কে দু’-চার কথা লেখা আছে। ব্যস, এর বেশি আর না এগোনোই ভালো। এখনকার  গালিব-এর হাভেলিতে কয়লার আড়ৎ এবং অন্য অনেক কিছুর সমাহার মনের ওপর চাপ ফেলতে পারে।
বল্লি মারান ছিল মোঘল আমলে দাঁড়ি-মাঝিদের স্থায়ী বাসস্থান। মোঘল দরবারের কাজে নিযুক্ত যমুনার মাঝি-মাল্লাদের জন্যেই এই বসতের পত্তন। বল্লি কথাটির অর্থ নৌকোর হাল-দাঁড়। আর হাল-দাঁড় ব্যবহার করে নৌকো চালানোর প্রক্রিয়াকে বলে মারান। দুটি পেশাগত শব্দ জুড়ে গিয়ে হয়ে গেল একটা মহল্লার নাম। আজ আর সেই যমুনা নেই। হারিয়ে গেছে নৌকো। ফুরিয়ে গেছে নৌকোর আমল। তবে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাবে হাজারো পণ্যের পসরা সাজিয়ে সজীব রয়েছে সদাব্যস্ত বল্লি মারান।

গলি কাশিম জান ঘন জনবসতির এক শান্ত মহল্লা। খাবার-দাবার থেকে শুরু করে শাক-সবজি, মাছ-মাংস সবকিছুই এ পাড়ায় পাওয়া যায়। জামা-কাপড়ের দোকানও রয়েছে। তবে পাইকারি বাজার নয়। এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আঁকাবাঁকা গলি কাশিম জান-এ স্কুল-ডাক্তারখানা, মন্দির-মসজিদ দেখতে দেখতে কখনও বাঁয়ে ঘুরে আবার কখনও ডাইনে বেঁকে হঠাৎ করে যে ব্যস্ত রাস্তা এসে যায় তা লাল কুঁয়া বাজার নামে পরিচিত। এই মোড় থেকে বাঁ দিকে আটশো মিটার হাঁটলে আবার সেই চাওরি  বাজার চক তথা মেট্রো স্টেশন। আর ডান দিকে এক কিলোমিটার এগোলেই বরফখানা, ফরাসখানা,  নয়া বানস, বাতাসিয়া গলি ইত্যাদি। আরও একটু এগিয়ে বাঁ দিকে দু’-দশ পা হাঁটলেই লাহোরি গেট। মোঘল আমলের সেই লাহোরি গেটের আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই। এমনকী ধ্বংসাবশেষও নেই।   শাহজাহানের প্রাচীর ঘেরা দিল্লি অর্থাৎ শাহ্জাহানাবাদের কটা দেউড়ি-ই বা আজ টিকে আছে?

শাহ্জাহানাবাদের দক্ষিণ সীমানা বরাবর আজমেরি গেট, তুর্কমান গেট আর দিল্লি গেট এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় কত অনভিজ্ঞ হাতে এই গেটগুলির সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার হওয়া এই গেটগুলি এতটাই কম উঁচু যে এদের ভেতর দিয়ে কোনওমতেই হাতির যাতায়াত সম্ভব নয়। সংস্কার করার সময় বোধহয় এ বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি।

আসলে উনিশশো পঁচাত্তরে জরুরি অবস্থার সময় তুর্কমান গেট এলাকার বস্তি উচ্ছেদের পরে ক্ষোভ প্রশমনের জন্যে সাত তাড়াতাড়ি দরজাটির সংস্কার করা হয়েছিল। আজমেরি গেট, তুর্কমান গেট আর দিল্লি গেট এলাকায় বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত বেশি বলেই বোধ হয় এই তিন দরজার এমন অক্ষম সংস্কার হয়েছে।

সেকালের শাহ্জাহানাবাদের দক্ষিণ-মধ্য প্রান্তের আর এখনকার রামলীলা ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোনায় অবস্থিত তুর্কমান গেট তো এককথায় বিংশ শতাব্দীর এক দু:খচিহ্ন। দেশে তখন জরুরি অবস্থা বিরাজমান। উনিশশো ছিয়াত্তরের আঠারোই এপ্রিল প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হল বস্তি উচ্ছেদ অভিযান।  দিল্লির রাজ্যপাল, পুরসভার কমিশনার, স্থানীয় থানার আধিকারিকদের উদ্যোগে এই এলাকার সমস্ত বস্তিকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তুর্কমান গেটের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। কারণ, শাহ্জাহানাবাদের বাদবাকি দরজাগুলির সঙ্গে কোনও না কোনও জায়গার নাম যুক্ত। এটিই একমাত্র ব্যতিক্রম। হজরত শাহ তুর্কমান সামশুল আরেফিন বায়াবানি সংক্ষেপে শাহ তুর্কমানের সমাধির পাশেই ষোলোশো আটান্নয় এই দরজাটি তৈরি হয়। প্রখ্যাত সুফি সন্ত শাহ তুর্কমান বারোশো চল্লিশে মারা যাওয়ার পরে এখানেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল। কাজেই মোঘল আমলের অনেক আগে থেকেই জায়গাটি তুর্কমান কবর নামে পরিচিত ছিল।

তুর্কমান গেটের কাছেই  কালান মসজিদের পূর্ব দিকে সোয়া তিন বর্গ মিটারের এক চত্বরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে দিল্লির মসনদে আসীন প্রথম নারী প্রশাসক রাজিয়া সুলতানের সমাধি। সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে নারী দিল্লির মসনদে বসে প্রশাসন চালাতেন সময়ের ধারাবাহিকতায় আজ তাঁর সমাধি বেদির এমন দূরাবস্থা দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। স্থানীয় ভাষ্যে জায়গাটির নাম বুলবুলিখানা। ধূলায় ধূসরিত অপ্রশস্ত-অপরিচ্ছন্ন চাতালের মধ্যে নিতান্ত অবহেলায় যে সমাধি বেদিটি পড়ে রয়েছে সেখানেই নাকি বারোশো চল্লিশ খ্রিস্টাব্দে রাজিয়া সুলতানকে কবর দেওয়া হয়েছিল। চারপাশে অসংখ্য দোকান, গ্যারেজ আরও কত কী! আর রয়েছে পুঁতির দোকান। তুর্কমান গেট এলাকার পাইকারি বাজারের প্রধান পণ্য পুঁতি। কাচ, প্লাস্টিক তো বটেই, আরও কত রকমের যে পুঁতি হতে পারে তা এ পাড়ায় ঘোরাঘুরি না করলে জানা সম্ভব নয়।

শাহ্জানাবাদের বাকি দরজাগুলো যেমন লাহোরি গেট, কাশ্মীরি গেট, মোরি গেট এখন শুধু জায়গার নাম, দরজার ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া যায় না। বাদবাকি আটটি দরজা বোধ হয় স্মৃতি তো বটেই ইতিহাসের পাতা থেকেও ক্ৰমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

লাহোরি গেট থেকে বাঁ দিকে ঘুরে গেলেই শাহ্জাহানাবাদের সীমান্তের রাস্তার নাম খাড়ি বাওলি। কোনও এককালে নিশ্চয়ই কোনও একটা বাওলি অর্থাৎ সিঁড়ি সংযুক্ত কুয়ো এখানে ছিল। এইসব কুয়োয় দড়ি-বালতির বালাই নেই। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে জল তুলে আনতে হয়। এই কুয়োটির সিঁড়ি নিশ্চয়ই অতিরিক্ত খাড়া ছিল। তাই খাড়ি বাওলি।

এখন খাড়ি বাওলিতে কুয়ো কোথায়? এখন তো চাল-ডাল-গম-চিনি ইত্যাদির বিশাল বাজার। দিল্লি তো বটেই আশপাশের বহু এলাকার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জোগান দেয় খাড়ি বাওলির পাইকারি বাজার।

খাড়ি বাওলির দোকান-বাজার পরিক্রমা করতে করতে বরফখানার গলি পেরিয়ে আর এক কিলোমিটার এগোলেই রাস্তার বাঁ পাশে আজমেরি গেট আর ডান হাতে নতুন দিল্লি রেল স্টেশন। এই রাস্তার সরকারি নাম গ্যাস্টন ব্যাস্টন রোড হলেও আদতে এই নাম দিল্লিবাসীর কাছে পরিচিত নয়। অথচ সংক্ষেপে জি বি রোড বললে সকলেই চিনতে পারে। উত্তর ভারতের সর্ববৃহৎ লালবাতি এলাকা।

শীত-গ্ৰীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতেই বিদেশি পর্যটকরা সাবেক কালের শাহ্জাহানাবাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বল্পবাস পরিহিত বিদেশি পর্যটকরা নিশ্চিন্তে এই এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। তাদের পোশাক নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। তারা হাতের গাইড বই অথবা মোবাইলের পর্দার সঙ্গে খুঁটিয়ে মিলিয়ে নেয় পুরনো আমলের বাড়িঘরদোর। দেখতে থাকে সংস্কারের প্রভাব। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে নানান রকমের ক্যামেরায় ঘন ঘন ছবি তোলে। আর চলে নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথাবার্তা-হাসাহাসি। কোথাও কোনওদিন কোনও অশান্তি হয় না। কিন্তু দেশি পর্যটক?
মোটামুটি এই পরিসীমার মধ্যে কত হাজার দোকান, কতশত গলিঘুঁজি ছড়িয়ে রয়েছে তা বোধ হয় স্থানীয় পুরসভা নর্থ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনও এক লহমায় বলতে পারবে না। আর জনসংখ্যা? আদমশুমারির খাতা আর বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক ফারাক। বাসিন্দাদের ধর্ম? সবই আছে। হিন্দু-মুসলমান-জৈন তো আছেই, খুঁজে দেখলে শিখ-খ্রিস্টানও পাওয়া যাবে।

চাঁদনি চক, বল্লি মারান, চওড়ি বাজার হয়ে জামা মসজিদ পর্যন্ত হেঁটেও এগোনো মুশকিল, এতটাই ঘিঞ্জি।  তবে এখানকার গলিঘুঁজি থেকে শুরু করে প্রতিটি রাস্তার নিজস্ব নাম আছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারাও রাস্তার নামের বদলে মহল্লার নামে বাড়ির ঠিকানা বলতে অভ্যস্ত। এমনকী ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডেও প্রথমে থাকে মহল্লার নাম।

মোঘল আমলের পাঁচিল ঘেরা দিল্লির ভেতরে অবস্থিত এই প্রাচীন জনপদের বাড়িগুলির আয়তন কত? এক কাঠা জমিতে চার বা তিনটে বাড়ি। তার থেকে বড় বাড়ি অবশ্যই কয়েকটি খুঁজে পাওয়া যাবে। সেগুলি আসলে দুই বা তিনটে বাড়ির যোগফল। তবে প্রতিটি বাড়িই তিনতলা বা চারতলা। পরিবারে লোকসংখ্যা বাড়লেই একেকটা তলা যোগ করা হয়।

আসলে মোঘল আমলে গড়ে ওঠা এই জনপদ ছিল দরবারের পরিষেবায় নিযুক্ত কর্মচারীদের বাসস্থান। তখন তো এখনকার মতো বহুতল বিশিষ্ট সরকারি আবাসন বানানোর রেওয়াজ ও প্রযুক্তি ছিল না, কাজেই একেকজন কর্মচারীকে বেশ খানিকটা নিস্কর জমি দিয়ে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হত। সেই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত এখানকার কোনও জমি বিক্রি করা যায় না। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যবহারের অনুমতি আছে। এর ফলেই পরিবার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে এখন সঙ্কীর্ণ গলির দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ছোট তিন-চার তলার বাড়ি।

সরকারি আবাসনে পদ অনুসারে বসবাসের বন্দোবস্ত হয়। ধর্ম বা সম্প্রদায় বিবেচ্য নয়। মোঘল আমলেও সেই রীতিই মেনে চলা হত। ফলে সেই সময় থেকেই এখানকার জনপদ সর্ব ধর্ম সমন্বয় স্থান। ফলে এখানে মন্দির-মসজিদ পাশাপাশি বিরাজমান।
মোঘল জমানা কবেই শেষ হয়ে গেছে। কাজেই এখানকার প্রাথমিক পর্যায়ের বাসিন্দাদের উত্তরসূরিদের অনেককাল আগে থেকেই অন্য জীবিকা খুঁজে নিতে হয়েছে। প্রথমে হয়তো ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও কোনও ছেদ পড়েনি। বই-খাতা, চশমা, কাঁচের চুড়ি, শাড়ি,  চপ্পল, আর বিয়ের কার্ডের দোকানে ঠাসা এই এলাকায় রয়েছে আরও অনেক পণ্যের সমারোহ।  তেলেভাজা, রুহ আফজা, কাবাব, ভাল্লা পাঁপড়ি— সব মিলিয়ে এক প্রাচীন গন্ধ। ফলে সরকারি নথিতে সড়ক বা গলির নাম যা-ই থাকুক না কেন পণ্যের নামেই মহল্লার পরিচিতি। যেখানে একের পর এক করে কয়েকশো চশমার দোকান রয়েছে সেই সড়কের নাম চশমা বাজার। কাজু-কিসমিস-আখরোট যে এলাকায় বিক্রি হয় কী করে যেন তার নাম হয়ে গিয়েছে আফগানি মার্কেট। খাবারদাবারের দোকানের যে এলাকায় বাহুল্য তার নাম পরন্থাওয়ালে গলি। দারিবা কালান মানে সোনা-রূপার বাজার। এইরকম আর কী! খুচরো বিক্কিরি-বাট্টায় আপত্তি না থাকলেও এখানকার প্রধান ব্যবসা পাইকারি। সমগ্র উত্তর ভারত তো বটেই নিয়ম মেনেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান এমনকী মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এখান থেকে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা হয়।

এমন বিচিত্র মিশ্রণের জনপদ হওয়ার জন্যে চওড়ি বাজার, বল্লি মারান, চাঁদনি চক হয়ে জামা মসজিদ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ও দুই কিলোমিটার প্রশস্ত এই জনপদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনওদিন বিঘ্নিত হয়েছে বলে শোনা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসর বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হতে থাকায় এখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই এখন অন্যান্য অনেক পেশায় নিযুক্ত। অনেককেই জীবিকার প্রয়োজনে এলাকার বাইরে যেতে হয়। কিন্তু দিনের শেষে বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতিবেশীরা ধর্ম-সম্প্রদায় খেয়াল না রেখে দিব্যি গল্পগুজবে মাতেন। আজানের আহ্বানেও কোনও আপত্তি নেই। সান্ধ্য আরতিতেও এই এলাকায় কোনও অসুবিধা হয় না। ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত প্রাণচঞ্চল এই এলাকার মানুষকে নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে হয় না।

ঘিঞ্জি মহল্লায় সারাদিনের যানজট এবং আরও হাজারো সমস্যা নিয়ে বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিন, দিনের চব্বিশ ঘন্টা প্রাণোচ্ছল থাকে দিল্লি ছয়। লাখো মানুষের বাসস্থান, হাজারে হাজারে মানুষের অন্নসংস্থানের ঐতিহ্যশালী এলাকা ‘দিল্লি ছয়’ ভিনদেশি পর্যটকের অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থান। দেশি পর্যটক? হয়তো দিল্লি ছয়–এর খবরই রাখে না।

লেখক ভারত সরকার ও আফগানিস্তান সরকারের প্রাক্তন পরিকল্পনা উপদেষ্টা

Comments are closed.