কোনও এক নগদ-শূন্যপুরের সন্ধানে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিতাভ রায়

    সুরখপুর অনেক দূর। মানচিত্র, আদমসুমারির নথি, ভূমি রাজস্বের খতিয়ান অনুসারে সুরখপুর দিল্লির একটি গ্রাম। এমনকী দেশের ডাক বিভাগের দলিলেও সুরখপুরের ঠিকানা দিল্লি।
    তবুও সুরখপুর অনেক দূর। প্রবাসী তো বটেই, দিল্লির প্রাচীন বাসিন্দারাও সুরখপুরের সুলুকসন্ধান দিতে অক্ষম। সুরখপুর এমন কোনও বিখ্যাত জায়গা নয় যে, এ গ্রামের খবর রাখতে হবে। এখানে তেমন কোনও নামজাদা লোকের জন্ম হয়নি। নজরকাড়া সে রকম ঘটনাও সুরখপুরে ঘটেনি। কাজেই সুরখপুর দেশের অন্যান্য অনেক অবহেলিত প্রান্তিক গ্রামের মতই অপরিচিত।

    অথচ রাজধানীর কেন্দ্রস্থল কনট প্লেস থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে সুরখপুরের অবস্থান। দিল্লি দক্ষিণ-পশ্চিম জেলার এক ছোট্ট গ্রাম সুরখপুর থেকে জেলা-সদর কাপাসহেরা-র দূরত্ব আঠারো কিলোমিটার। প্রায় সাড়ে ছ’শো জনসংখ্যার গ্রাম কোন ডাকঘরের অন্তর্গত, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কোনও মতে, ঝড়োরা কালান অর্থাৎ দিল্লি-৭৩ সুরখপুরের ঠিকানা। আবার অন্য নথিতে, দিল্লি-৪৩ বা নজফগড় ডাকঘর থেকেই সুরখপুরের ডাক পরিষেবা পরিচালিত হয়। অবিশ্যি এখানে চিঠিপত্রের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এবং সুরখপুরের বাসিন্দাদের এ নিয়ে কোনও অভিযোগ নেই।

    ।।দুই।।

    হঠাৎ করে খবরের কাগজের পাতায় ছাপা হল সুরখপুরের নাম। গ্রামবাসীদের চোখে সে খবর পড়েছে কি না বলা মুশকিল। তবে দিল্লি এবং হরিয়ানার স্থানীয় টিভি চ্যানেলে খবরটি ফলাও করে দেখানোয় সুরখপুরের বাসিন্দারা যারপরনাই খুশি। জাতীয় স্তরের টিভি চ্যানেলেও খবরটি একেবারে বাদ যায়নি। বিশ্বে অবিশ্বাস্য ঘটনা প্রতিদিন না ঘটলেও কখনও-সখনও ঘটে। সুরখপুরের নাম খবরে আসাটাও বোধ হয় তেমনই একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। সুরখপুরবাসীর অন্তত এমনটাই ধারণা।

    নোটবাতিল নিয়ে জনজীবন যখন জেরবার, সেই পরমলগনে অন্য অনেক নিদানের মতই উচ্চারিত হল, দেশকে নগদ-শূন্য করতে হবে। দেশকে ডিজিটাল করে তোলার এই অভিযানে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাষ্ট্র। নিত্যনতুন প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরে নানান সুরে প্রয়োগ হচ্ছে সেই সব নবলব্ধ যোজনা। বাদ যায়নি সুরখপুর।

    আন্তর্জাল অর্থাৎ ইন্টারনেটের সহায়তা নিয়ে রাজধানীর কেন্দ্রস্থল কনট প্লেস অথবা নতুন দিল্লি স্টেশন থেকে সরাসরি সুরখপুর যাওয়ার চেষ্টা করলে শেষপর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছনো যাবে কি না বলা মুশকিল। রাস্তার হাল মোটেও সুবিধার নয়। সড়কের সঙ্গে লড়াই করে গাত্রে ব্যথা তো বটেই, হাড়গোড় ভেঙে গেলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তার থেকে নতুন দিল্লি থেকে ট্রেনে বাহাদুরগড় রওনা দিলে সাকুল্যে তিরিশ-বত্রিশ কিলোমিটার। প্যাসেঞ্জার ট্রেনে ঘণ্টা-দেড়েকের সফর। সারাদিনে চলাচল করে বত্রিশজোড়া ট্রেন।

    দিল্লির প্রতিবেশী হরিয়ানার এক মহকুমা শহর বাহাদুরগড় থেকে সুরখপুর যেতে সময় লাগে খুব বেশি হলে আধঘণ্টা। কোনও স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে পরিচিতি থাকলে, তাঁর মোটরবাইকের সওয়ারি হলে কাজটি সহজ হবে। বসে চড়লে যেখানে নামতে হবে, সেখান থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার না হাঁটলে সুরখপুর পৌঁছনো যায় না।
    বাহাদুরগড় থেকে রওনা দিয়ে হরিয়ানা রাজ্যসড়ক ধরে চলতে থাকলে একে একে নবীন প্যালেস, গোপালনগর, সুন্দরনগর, কৃষাণ বিহার, বাসকো কলোনি পেরিয়ে গেলেই এসে যাবে সুরখপুর মোড়। এর পরের রাস্তার হাল সারাবছরই বেহাল। সঙ্গী বাইক-চালক স্থানীয় মানুষ হলে সামলে-সুমলে ঠিকমত সুরখপুরে পৌঁছিয়ে দিলেই আন্দাজ করা যায়, উন্নয়ন করে কয়।

    ।।তিন।।

    একশো সত্তর একর জমিতে ছড়িয়ে রয়েছে একশো সতেরোটি বাড়ি। প্রায় সাড়ে ছ’শো বাসিন্দার গ্রাম সুরখপুর দু’হাজার সতেরোর সাতই ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম নগদ-শূন্য ডিজিটাল গ্রাম আখ্যায় ভূষিত হয়েছে।
    উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আড়ম্বরের কোনও অভাব ছিল না। উদ্বোধনের মাসখানেক আগে থেকেই সরকারি আধিকারিকদের এখানে নিয়মিত আগমন। গ্রামের বাসিন্দাদের দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ। সাময়িক শিবির বসিয়ে আধার কার্ড বানানোর বন্দোবস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে থাকার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্কের তরফে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে সকলের জন্যে আধার নম্বর সংযুক্ত ব্যাঙ্কের খাতা খোলার ব্যবস্থা হয়েছিল। বড় বড় এলইডি স্ক্রিন টাঙিয়ে গ্রামবাসীদের শেখানো হয়েছিল, মোবাইল ফোন এবং স্মার্টফোন মারফত কীভাবে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম সহজে সারা যায়। পয়েন্ট-অব-সেলস বা পি-ও-এস মেশিন, যা এখন কার্ড সোয়াইপ মেশিন নামেই বেশি পরিচিত, তা ব্যবহার করে কীভাবে জিনিসের দাম নিতে হবে, হাতে-কলমে গ্রামের দুই দোকানদারকে শিখিয়ে দেওয়া হল। সুরখপুরে তৃতীয় কোনও দোকান না থাকায় আর কোনও দোকানদারকে হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ হয়নি। অবশেষে যন্ত্র দু’টি তাঁদের বিনামূল্যে দিয়ে দেওয়ায় দুই দোকানদারই যারপরনাই খুশি।

    ।।চার।।

    দেখতে দেখতে কেটে গেল অনেকটা সময়। দেশের প্রথম নগদশূন্য গ্রাম দেখার বাসনায় অগস্টের প্রথম রবিবার সকাল সকাল শুরু হল সুরখপুর সফর। ট্রেনে বাহাদুরগড় যাওয়ার পরে সেখানকার বাসিন্দা জনৈক সঙ্গীর মোটরবাইকে সুরখপুর।
    বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার পরে পথপরিক্রমায় কেটে গিয়েছে ঘণ্টা-তিনেক সময়। খিদে পাওয়া আস্বাভাবিক নয়। খিদের থেকে তৃষ্ণা বেশি।
    এদিক-ওদিক তাকাতেই নজরে পড়ল এক দোকানে পসরা সাজিয়ে বসে রয়েছেন বৃদ্ধা দোকানদার। চারপাশে তিনটি বাচ্চা ছেলে-মেয়ে খেলা করছে। লজেন্সের কৌটো, শ্যাম্পুর স্যাসে, সাবান, গুটখার প্যাকেট, বিস্কুট এককথায় নিত্য ব্যবহারের টুকিটাকি সবই পাওয়া যায়। নানান রকমের নরম পানীয়ের সম্ভারের পাশেই ঠাঁই পেয়েছে জলের বোতল।
    দু’বোতল জল আর এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে দাম মেটানোর জন্যে কার্ড এগিয়ে দিতেই বৃদ্ধা ঘরঘরে গলায় বিশুদ্ধ হরিয়ানভি টানে যা বললেন, তা মোটেও বোধগম্য নয়। সঙ্গী সে ভাষায় অভ্যস্ত। অনুবাদে জানা গেল যে, কার্ড ব্যবহারের জন্যে সরকারের দেওয়া যন্ত্রটা কী ভাবে চালাতে হয়, তা তিনি জানেন না। সরকারি লোকেরা বৃদ্ধার স্বামীকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গীর পরামর্শে বৃদ্ধা একটি শিশুকে দিয়ে স্বামীকে তলব করলেন।

    অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কিছু করার নেই। দু’-চারজন স্থানীয় মানুষ নগদ পয়সায় কী সব যেন কিনে নিয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথায় সাদা পাগড়ি জড়াতে জড়াতেই অকুস্থলে উপস্থিত সুরত সিং সোলাঙ্কি। মুখজোড়া হাসি ছড়িয়ে নিজের নামঘোষণা না করলে জানা যেত না তাঁর পরিচয়। হাসিমুখেই একটা আলমারি খুলে বের করে আনলেন একটা ছোট বাক্স। বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল প্লাস্টিকে মোড়ানো একটি কাগজের প্যাকেট। প্লাস্টিকের আবরণ এমন সন্তর্পণে তিনি খুললেন, যেন ভেতরে কোনও ফুলের তোড়া রয়েছে। সামান্য অসতর্কতায় ফুলের পাপড়িতে যেন দাগ না লেগে যায়। আরও সাবধানে খোলা হল কাগজের খোলস। অবশেষে বেরিয়ে এল ঝাঁ-চকচকে একেবারে নতুন এক পি-ও-এস যন্ত্র।
    যন্ত্রটি এগিয়ে দিয়ে তাঁর অনুরোধ, ‘এবার আপনারা চালিয়ে নিন। যা শিখিয়েছিল, সব ভুলে গেছি। এখনও পর্যন্ত একবারও এটা ব্যবহার করিনি।’

    বাহাদুরগড় থেকে আসা সঙ্গীটি এ সব কাজে বেশ দক্ষ। প্যাকেট খুলে যন্ত্রটি দোকানের কাউন্টারের উপর রেখে প্লাগ পয়েন্টের খোঁজ করতেই সুরত সিং সোলাঙ্কি হো-হো করে হেসে উঠলেন। বয়স হলেও ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর যথেষ্ট জোরালো। হাসি থামলে উচ্চনাদের উচ্চারণে জানালেন, ‘এতদূর আসতে আসতে বিজলির দম শেষ হয়ে যায়। সেই জন্যে আমাদের খুব বেশি বিজলির বিল ভরতে হয় না।’ কথা শেষ করেই আবার হাসি।

    তা হলে দোকান-বাজারে বেচা-কেনা হয় কী করে? গোঁফ চুমরিয়ে নিয়ে সুরত সিং সোলাঙ্কি কিছু বলতে শুরু করার আগেই দোকানের সেই বৃদ্ধা কোত্থেকে যেন তিন গেলাস চা নিয়ে হাজির। সুরত সিং সোলাঙ্কি নির্দেশ দিলেন, ‘পি লো জি। এ আমাদের নিজেদের মোষের তাজা দুধে তৈরি চা।’ চায়ের রঙে রাঙানো একগেলাস ঘন দুধে চুমুক না দিয়ে উপায় কী।
    চায়ে চুমুক দিতে দিতেই সুরত সিং সোলাঙ্কি বলতে থাকলেন, ‘সারা-গাঁয়ে তো মোটে দুটো দোকান। পাউরুটি, মাখন, ডিম থেকে শুরু করে এখনকার প্যাকেটের খাবার, আমাদের এই দুটো দোকানেই পাওয়া যায়। আর নগদেই সব বেচা-কেনা চলে।’ নোটবাতিলের পরে যখন চারিদিকে নগদের হাহাকার, তখন কী হয়েছিল জানতে চাওয়ায় সুরত সিং সোলাঙ্কি জানালেন যে, ধারে, মানে খাতায় লিখে রেখেই বিক্রি-বাট্টা করতে হয়েছে। পরে সকলেই অবিশ্যি ধার শোধ করে দিয়েছে।

    ।।পাঁচ।।

    সুরখপুর ছোট গ্রাম। সবাই সবাইকে চেনে। এমন গ্রামে হঠাৎ করে দু’-দু’জন বাইরের লোক দেখলে খোঁজ-খবর নেওয়াই স্বাভাবিক। সঙ্গে আবার একটা বাইক রয়েছে। দিনকাল ভাল নয়। বলা তো যায় না, কে কোন মতলবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
    বহিরাগতদের সুরখপুরে আসার কারণ শুনে একসঙ্গে সকলে হো-হো করে হেসে উঠল। বাদ গেলেন না সুরত সিং সোলাঙ্কিও। তিনিও সমবেত ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে একমত। এবার সবাই একসঙ্গে বলতে শুরু করলেন, ‘সুরখপুরে বিজলি কখন থাকে আর কখন থাকে না, তার খবর এখন আর কেউ রাখে না। মোবাইল টাওয়ারই নেই। ইন্টারনেট চলবে কী করে?’

    প্রাঞ্জল সোলাঙ্কি নামের একটি অল্পবয়সী ছেলে জানাল, ‘গতবছর আমরা একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার কিনেছিলাম, যাতে বিজলি না থাকলে ব্যাটারি দিয়ে কাজ করা যায়। সরকার থেকে বিনা পয়সায় ওয়াই-ফাই দিয়েছিল। ওই পর্যন্তই। সেই ওয়াই-ফাই একদিনও চালানো যায়নি। গতমাসে চণ্ডীগড়ে আমার কাকার কাছে ল্যাপটপটা পাঠিয়ে দিয়েছি। এত খরচ করে কেনা যন্ত্রটা অন্তত ওদের কাজে লাগুক।’
    ভিড়ের পেছন দিকে দাঁড়িয়ে থাকা জনৈক যুবক জানাল, ‘জানেন স্যার, মোবাইলে ঠিকমত কথা বলার জন্যে মাঝেমধ্যেই কোম্পানি বদলাতে হয়। আজ ভোডাফোন, তো কাল এয়ারটেল বা পরশু এমটিএনএল। এমনকী জিও পর্যন্ত নিয়ে দেখেছি। সবই এক। কানেকশন নেওয়ার পরে হপ্তাখানেক ভাল চলে, তার পর যে কে সেই। আসলে, ঘোড়াটাই তো নেই, গাড়ি চলবে কী করে। মোবাইল টাওয়ার না বসিয়ে হাতে হাতে হাজারটা ফোন তুলে দিয়ে কোনও লাভ নেই।’

    একলহমায় কঠিন সমস্যাটির এমন সহজ সমাধান দিয়ে যুবকটি কথা থামানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘোমটায় মুখ ঢাকা এক মহিলা বলতে শুরু করলেন, ‘শুরুর সেদিন মেয়েদের জন্যে কত ভাল ভাল কথা শুনলাম। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের নামে ব্যাঙ্কে আলাদা খাতা খুলে যাবে। খাতা খুলে গেলেই বাড়িতে চলে আসবে প্লাস্টিক কার্ড। সেই কার্ড চালিয়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা যাবে। এমনকী কার্ড নিয়ে ব্যাঙ্কে গেলেও টাকা তুলতে অসুবিধা হবে না। সবই শুধু কথার কথা। এ গ্রামে কোনও এটিএম নেই। ব্যাঙ্ক তো বহুদূর। এতদিন পরে আমার স্বামীর নামে একটা কার্ড এসেছে। টাকা তুলতে হলে তো সেই নজফগড় বা বাহাদুরগড় যেতে হবে।’

    নগেন্দ্র সোলাঙ্কি নামের একটি অল্পবয়সী ছেলে বলল, ‘গ্রামে আসার সময় বাস স্টপের ভাঙাচোরা ছাউনিটা নিশ্চয়ই দেখেছেন। আগে সারাদিনে দু’-তিনঘণ্টায় একটা বাস আসত। বছর-দশেক আগে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন নিজের মোটরবাইক না থাকলে স্কুল-কলেজে যাওয়ার উপায় নেই।
    আরেকজন যুবক, দেখে মনে হয় লেখাপড়া শিখেছে, হরিয়ানভি টান থেকে দূরে সরে এসে, হিন্দিতে বেশ গুছিয়ে বলতে শুরু করল, ‘সরকার প্রতিদিন নতুন নতুন যোজনা ঘোষণা করছে। সেই সব যোজনার সুবিধা পাওয়ার জন্যে ফর্ম ভরতে হয়। ছাপানো ফর্ম নেই। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে অনলাইন ভরতে হয়। পরিচয়পত্র বলুন, বা সার্টিফিকেট, মানে, ওই যোজনার জন্যে যে সব নথি লাগবে, সে সব স্ক্যান করে অনলাইনে ভর্তি করা ফর্মের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। এ দিকে এ গ্রামে কারও কাছেই কম্পিউটার নেই। স্ক্যানার তো বহুদূর। আর থাকলেই বা ইন্টারনেটের সুবিধা তো গ্রামে পৌঁছয়নি।’

    এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? সদাহাস্য সুরত সিং সোলাঙ্কি হাসতে হাসতেই আবার বলতে শুরু করলেন, ‘মন্ত্রীদের খুশি করার জন্যে সরকারের কোন বাবু-বিবির মাথা থেকে এই সব মতলব বেরোয় কে জানে। নোটবাতিলের পরে নতুন বছর শুরু হতে না হতেই প্রতিদিন সরকারি লোকজন, ব্যাঙ্কের আনাগোনায় আমরা ভেবেছিলাম, এতদিনে বোধ হয় সুরখপুরে আচ্ছে দিন আসতে চলেছে। এখন দেখছি সুরখপুরের কপালে সে সুখ লেখা নেই।’

    ঘোড়ার আগে গাড়ি, না গাড়ির আগে ঘোড়া, কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম, মানে, কাগজ-কলমে রচিত পরিকল্পনা আর বাস্তবে তার সত্যিকারের হাল-হকিকৎ দেখতে দেখতে অথবা শুনতে শুনতে মাথাটা এতক্ষণে বেশ ভার ভার লাগছে। ঠিক সেই সময় কোত্থেকে এক ভারি চেহারার বলিষ্ঠ পুরুষ এসে উপস্থিত। সমবেত জনতা বেশ সম্মান দেখিয়ে জায়গা করে দেওয়ায় তিনি বহিরাগতদের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালেন। শরীরের তুলনায় কন্ঠস্বর আরও যেন একটু বেশি ভারি। গাঁকগাঁক করে উচ্চারণ করলেন, ‘ম্যায় জগবীর সিং হুঁ। সুরখপুর গাঁওকা ইলেক্টেড পঞ্চায়েত।’ দু’হাত দূরে দাঁড়ানো বিশালদেহী গ্রামপঞ্চায়েতের শরীর থেকে নির্গত ঘামের গন্ধ বুঝিয়ে দিচ্ছে, তিনি এতক্ষণ গো-মাতা না হলেও মহিষ পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন। গ্রামে আগত বহিরাগতদের সামনে নিজেকে জাহির করার জন্যেই বোধ হয় সাত-তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছেন। স্পষ্টভাষায় নেতাসুলভ কায়দায় তিনি বললেন, ‘ওরা ভেবেছিল, ছোট্ট গ্রাম, সাড়ে ছ’শো বাসিন্দা, মাত্র দুটো দোকান। সহজেই একে নগদবিহীন ডিজিটাল গ্রামে পরিণত করা যাবে। দেখতেই পাচ্ছেন, কিছুই হয়নি। তবে হ্যাঁ, বিনা পরিশ্রমে একেবারে নিখরচায় সুরখপুরের নাম সবাই জেনে গেল।’
    শূন্যহাতে প্রথম নগদশূন্য গ্রামকে বিদায় জানিয়ে শেষ হল সুরখপুর সফর।

    চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

    লা জবাব দেহলি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More