শনিবার, নভেম্বর ১৬

পয়লা বৈশাখ বেঁচে থাকবে বইপাড়ায়

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দৈনন্দিন জীবন থেকে বাংলা সন–তারিখ হারিয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগেই। ৩৬৫ দিনের মধ্যে বাঙালি মাত্র তিনদিনের বাংলা তারিখ মনে রাখে। হালফিলের বিশ্বায়নের অনেক আগে থেকেই ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে ওঠার বাসনা বাঙালিকে তাড়িত করেছে। স্বাজাত্য লক্ষণগুলি অস্বীকার করাকেই মান্য করা হয়েছে আধুনিকতা অথবা প্রগতিশীলতা বলে। আত্মঘাতী এই ভ্রান্ত যাত্রার মধ্যে একদিনের জন্য হলেও যে বাংলা নববর্ষ টিকে রয়েছে তার অধিকাংশ কৃতিত্বই ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের প্রাপ্য। অনেকটা ফিকে হলেও এখনও পাড়ার মুদির দোকানে পয়লা বৈশাখ নতুন খাতায় বাৎসরিক হিসেব নিকেশ শুরু হয়। যদিও সরকারের ঘরে ছোট বড় মেজো সব ব্যবসায়ীকেই হিসেব দাখিল করতে হয় সরকার নির্ধারিত আর্থিক বছর অনুযায়ী। তবু যে আর্থিক লেনদেনের এই একান্ত ব্যবস্থা আজও বহাল রয়েছে তার কারণ কিছুটা ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ এবং হয়তো কিছুটা সংস্কার।

সার্বিক ভাবে হালখাতার জৌলুস হারিয়ে গেলেও পয়লা বৈশাখ এখনও জমজমাট করে রাখে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াকে। তার কারণ এই নয় যে, বই ব্যবসার হিসেব দাখিলের ক্ষেত্রে সরকারের তরফে কোনও ভিন্ন নির্দেশনামা রয়েছে। অন্য ব্যবসার মতোই বই ব্যবসায়ীদেরও লাভক্ষতির হিসেবনিকেশ হয় এপ্রিল–মার্চ সময়সীমায়। কিন্তু পয়লা বৈশাখকে ‘auspicious day’ বলে মান্য করার মানসিকতা এখনও কলেজ স্ট্রিটে প্রবল ভাবেই বেঁচে আছে। অতীতে অর্থিক বছরের শুরুও ছিল পয়লা বৈশাখ, বই প্রকাশের অন্যতম দিনও ছিল পয়লা বৈশাখ। বর্তমানে দু্টিরই বদল ঘটেছে। ব্যবসায়িক দিক থেকে এখন নতুন বই প্রকাশের সেরা সময় বইমেলা। তবু কোন মায়াটানে আজও সমান উৎসাহে বইপাড়ায় পালিত হয় পয়লা বৈশাখ, এই প্রশ্ন নিয়ে ‘দ্য ওয়াল’ হাজির হয়েছিল বিখ্যাত কয়েকজন প্রকাশকের কাছে। বাস্তব অবস্থার বদল ঘটেছে মেনে নিয়েও তাঁরা জানালেন পয়লা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে তাঁদের অভিমত।

মণীশ চক্রবর্তী (মিত্র ঘোষ): আগে যেটা হত সমস্ত বড় বড় লেখক পয়লা বৈশাখের দিন আমাদের দোকানে আসতেন। এমন কোনও বড় লেখক নেই রাজশেখর বসু ছাড়া, যিনি আমাদের এখানে আসেননি। তখন তো দুই মালিক গজেন বাবু (গজেন্দ্র কুমার মিত্র) সুমথ বাবু (সুমথ নাথ ঘোষ) থাকতেন। সময় বদলেছে ঠিকই কিন্তু এখনকার লেখকরাও চান পয়লা বৈশাখ পালিত হোক। এইদিন আমরা লেখকদের রয়্যালটি হিসেবে সামান্য কিছু অগ্রিম দিয়ে থাকি। অসুবিধে এখন একটু হচ্ছে জায়গার কারণে কিন্তু সেই ট্র্যাডিশনটা আমরা রেখেছি।

বই প্রকাশের দিক থেকে অবশ্য একথা স্বীকার করতেই হবে যে ভালো বই আমরা বইমেলাতেই প্রকাশ করি। ‘রেসিডিউ’ যা থাকে সেটা পয়লা বৈশাখে বার করি। ফলে বই প্রকাশের দিক থেকে পয়লা বৈশাখ ফিকে হওয়ার কারণ কিছুটা অবশ্যই বইমেলা। আমরা এই পয়লা বৈশাখেই (১৩৮৫) অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের পরমপুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছিলাম। দাম করা হয়েছিল ২০ টাকা। পয়লা বৈশাখের জন্য ছাড় দিয়েছিলাম ১০%। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে দোকানের সামনে লাইন পড়েছিল। ভিড় সামলাতে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। এখন অবশ্য সেরকম কিছু হয় না। যদিও প্রচুর মানুষ এখনও আসেন এবং অন্যদিনের থেকে পয়লা বৈশাখে বিক্রিও হয় অনেকটাই বেশি। অবস্থার যত পরিবর্তনই ঘটুক পয়লা বৈশাখ কলেজ স্ট্রিট বই পাড়ায় এরকম জাঁকজমক নিয়েই থেকে যাবে ভবিষ্যতে।

ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় (পত্রভারতী): পয়লা বৈশাখ এখানে কতটা উদযাপন হয় আমরা জানি না কিন্তু পয়লা বৈশাখ অনেক বড় করে যেখানে পালিত হয় সেই দেশ বাঙালিদের নিয়েই তৈরি। এখানে পয়লা বৈশাখ নিয়ে যে ব্যবসার বিষয়টি ছিল আর্থিক বছর শুরু হওযার কারণে সেটা এখন নেই। কিন্তু তার জন্য আমাদের উৎসব বা ঐতিহ্যের কোথাও কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি। সে সময় যেটা হোত হালখাতা–– লেখকদের কিছু অগ্রিম দেওয়া বা পাওনা টাকা দেওয়া–– এখন সেটা ৩১ মার্চের মধ্যে দেওয়া হয়।

ব্যবসায়িক দিকটা পয়লা বৈশাখ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও ঐতিহ্য বা উৎসবের দিক থেকে কোনও তারতম্য ঘটেনি। এই দিনটিকে আমরা বহন করছি দায় হিসেবে নয়, আমরা উদযাপন করছি উৎসব হিসেবে। এটা ঘটনা যে বাংলাদেশকে দেখে আমাদের রাজ্যে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের ব্যাপারটা অনেকটা বেড়েছে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ধর্ম সম্প্রদায় জড়িতহীন একটি উৎসবকে আমাদের সকলে্রই স্বাগত জানানো উচিৎ।

বইমেলা অবশ্যই বই প্রকাশ বা বইয়ের ব্যবসার ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বইমেলা ছাড়াও আমরা সারা বছরই বই প্রকাশ করে থাকি। বইমেলার আগে থেকে শুরু হয় অর্থাৎ নভেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত, মার্চ মাসে কিছুটা বিরতি থাকে পরীক্ষা ইত্যাদির কারণে। আবার পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে অল্প অল্প করে বই প্রকাশ শুরু হয়। ফলে পয়লা বৈশাখ আদপেই নিয়মরক্ষার কোনও বিষয় নয়। এবারও পয়লা বৈশাখ আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছ’টি বই প্রকাশ করছি যার মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, নচিকেতা–র বই রয়েছে।

সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের প্রকাশনায় পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আগে কোনও অনুষ্ঠান হত না। ২০০৯ সালে আমার স্ত্রী ও আমার অন্যান্য সহকর্মীরা এটা শুরু করেন। বিগত দশ বছর ধরে এই দিনটিতে আমাদের প্রকাশনার আমন্ত্রণে বাংলা সাহিত্যের সমস্ত লেখকরা এসেছেন এবং আসেন। কোনও পুজোআচ্চার অনুষ্ঠান নয়, এই দিনটি আমাদের কাছে লেখকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন হিসেবেই বিবেচিত হয়।

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আমরা একটা বই উৎসব করছি, নববর্ষ বই উৎসব যেটা ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে চলবে ২১ তারিখ পর্যন্ত। এই মেলাটিকে একেবারেই কলেজ স্ট্রিটের সাবেকি বইপাড়ার বর্ষবরণ হিসেবেই আমরা দেখছি। বইমেলার পাশাপাশি এই মেলাটিকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার আর একটি জায়গা তৈরি হবে বলে আমি আশাবাদী।

সমিত সরকার (এম সি সরকার): আর্থিক বছরের বিষয়ে প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো যে আমাদের আর্থিক বছর কখনই বৈশাখ–চৈত্র মেনে চলেনি। ব্যবসার প্রথম থেকেই আমাদের আর্থিক বছর ইংরেজি বছরের সঙ্গে তাল রেখে চলত অর্থাৎ ডিসেম্বরে শেষ হত আমাদের হিসেবনিকেশ। যদিও আমাদের প্রকাশনাতেও কিন্তু পয়লা বৈশাখ পালিত হয়ে এসেছে সরাসরি হিসেবনিকেশের সঙ্গে দিনটি জড়িত না থাকলেও। বর্তমানে আমরা দিনটির উদযাপন করি ঐতিহ্যের কারণেই। তবে এবছর আমরা কোনও বই পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রকাশ করছি না। আর লেখকরাও চান তাঁদের বই বইমেলায় প্রকাশিত হোক।

পয়লা বৈশাখ তো একটা auspicious day। বই প্রকাশ করতে পারলে খুবই ভালো হয় কিন্তু এখন এই দিনটিতে বই প্রকাশ হওয়াটা কমে গেছে। কিশোর–কিশোরীদের জন্য ‘মৌচাক’ নামে আমরা একটা পত্রিকা প্রকাশ করতাম। এই বছর তার শতবর্ষ পূর্ণ হল। এই বৈশাখ থেকে আমরা আবার মৌচাক প্রকাশ করতে শুরু করব। ফলে এক তারিখ না হলেও ১৪২৬ সালের বৈশাখ মাস আমাদের প্রকাশনার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বছর হয়ে থাকবে।

শুভঙ্কর দে (অপু), (দেজ পাবলিশিং): আর্থিক বছরের বদলের কারণে পয়লা বৈশাখ উদযাপনে কোনও বদল ঘটেনি। আমরা আমাদের পুরনো ঐতিহ্য বহন করে চলেছি। এটা সত্যি আমাদের হিসেবের নতুন  খাতা পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু না হয়ে পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হয়। কিন্তু এখনও পয়লা বৈশাখের দিনই আমরা ওই ১৪ দিনের পুরনো খাতাকে পুজো করে বছর শুরু করি। উৎসবের সঙ্গে এটার খুব সম্পর্ক তেমন নেই যদিও। কারণ উৎসবে কোনও খাতা থাকে না মানুষ থাকেন। নতুন বই বেরনো, লেখকদের আসা, পাঠকদের সঙ্গে তাঁদের দেখা হওয়া এই সব মিলিয়ে এখনও বইপাড়াতে সকাল দশটা থেকে এই উৎসব শুরু হয়ে যায়। শুধুমাত্র এই দিনটিকে কেন্দ্র করেও কিন্তু অনেক পাঠক আসেন যাঁরা নতুন বই কেনেন। লেখকদের সঙ্গে দেখা করতেও আসেন অনেকেই। পয়লা বৈশাখের সেই পুরনো আবহ এখনও রয়েছে। আগে নববর্ষ উপলক্ষেই সব থেকে বেশি বই প্রকাশিত হত এখন সেটা বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যদিও নববর্ষ উপলক্ষে এখনও কিন্ত বই প্রকাশিত হয়। সে সংখ্যাটাও নেহাৎ কম নয়। আমাদেরই এবছর পয়লা বৈশাখে পঁচিশটা নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। ইংরেজি নিউ ইয়ার আর বাংলা নববর্ষ দুটো চরিত্রগত দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে এখনও কিছু সাবেকিয়ানা বইপাড়ায় টিকে আছে। শুধু পয়লা বৈশাখ নয়, তার দিন পনের পরই বই পাড়ার অনেকেই অক্ষয় তৃতীয়া পালন করেন। এই সব মিলিয়ে এখনও কলেজ স্ট্রিটে ঐতিহ্যটা বজায় রয়েছে।

প্রচারের জন্য বইমেলার গুরুত্ব অনেক বেশি। একসঙ্গে এত পাঠককে পাওয়া বইমেলা ছাড়া সম্ভব হয় না। পয়লা বৈশাখে আমি যে বইটা বের করব সেটা অতটা প্রচার করতে পারব না যতটা বইমেলায় করে উঠতে পারি। যদিও গত সাত–আট বছর ধরে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে কলেজ স্কোয়ারের গোলদীঘিতে একটা নতুন বইমেলা শুরু হয়েছে। এই বইমেলাটিও যথেষ্ট জমে উঠেছে।

আমাদের প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত নতুন পুরনো সমস্ত লেখকই পয়লা বৈশাখে আমাদের এখানে আসেন। গত বছরই প্রচণ্ড অসুস্থতা নিয়েও দিব্যেন্দু পালিত পয়লা বৈশাখ এসেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য উনি এবছর আর আসবেন না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে বছর মারা গেলেন সে বছরও কিন্তু উনি এই দিনটিতে এসেছিলেন এবং আমাদের হালখাতায় উনি লিখেও গেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল যে বছর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লিখে গেলেন ‘পরের বছর হয়ত আর আসতে পারব না’ সে বছরই উনি প্রয়াত হয়েছিলেন।

প্রদীপ সাহা (সাহিত্যম): বইমেলাতেই বই প্রকাশ করা হয় বলে পয়লা বৈশাখে কিছুটা ভাঁটা লেগেছে। কয়েকদিন আগেও পয়লা বৈশাখে দশ–বারোটা বই বেরতো এখন প্রকাশ করছি দুটো বই। এটাকে আমি নিয়ম রক্ষা বলব না। এই দিনে ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত মানুষেরা আসেন লেখকরা আসেন। বহু দোকানদারই পয়লা বৈশাখের দিন নতুন বই চায়। পয়লা বৈশাখে কিছু বই বিক্রি হয়। এখন বইয়ের বাজারটাই খুব খারাপ হয়ে গেছে। ফলে পয়লা বৈশাখকে পুনরুজ্জীবিত করলে বই বিক্রি খুব বেড়ে যাবে বলে মনে হয় না। যদিও কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াতেই আমরা এখনও পয়লা বৈশাখকে বাঁচিয়ে রেখেছি।

Comments are closed.