যমুনাপুলিনে বঙ্গজীবনের  সুলুক সন্ধানে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিতাভ রায়

    ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লি শহরের বর্তমান সংস্করণের আগের পর্বের জন্মলগ্ন কবে? ১৬৩৯ নাকি ১৬৪৮?

    একটানা এগারো বছর আগ্রা থেকে প্রশাসন চালানোর পর ষোলোশো ঊনচল্লিশ নাগাদ শাহ্জাহান স্থির করলেন,  রাজধানীর স্থানান্তর দরকার। তৎক্ষণাৎ পূর্ত বিভাগের প্রধান অর্থাৎ মীর-ই-ইমারতকে আগ্রা থেকে লাহোরের মধ্যে উপযুক্ত স্থান অন্বেষণে পাঠানো হল। অনেক জায়গাই পছন্দ। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশারদদের পরামর্শ অনুসারে সিদ্ধান্ত হল যে যমুনা নদীর তীরে পরিত্যক্ত দিল্লি শহরের আশপাশেই গড়ে উঠবে নতুন রাজধানী।

    দিল্লির সুবেদার খয়রাত খানের  সহায়তায় ফিরোজশা কোটলা, মুবারাকপুর কোটলা ইত্যাদি প্রাচীন এলাকা বাতিল করে বেছে নেওয়া হল রাইসিনা পাহাড় এবং সংলগ্ন তালকাটোরা। তখনকার সেরা দুই ইমারত কারিগর ওস্তাদ হামিদ আর ওস্তাদ হীরা, মতান্তরে ওস্তাদ আহম্মদ অবিশ্যি খয়রাত খানের বাছাই করা জায়গায় দুর্গ ও প্রাসাদ বানানোর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিলেন। কারণ ওই এলাকার মাটিতে নানারকম খনিজ, বিশেষত সোরা রয়েছে যা পাথরের তৈরি স্থাপত্যের পক্ষে ক্ষতিকর। ইমারত কারিগরদের মতে যমুনার উপর যে দ্বীপে  সেলিমগড় অবস্থিত তার ঠিক বিপরীতে নদীর পশ্চিম পাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নতুন রাজধানীর জন্য আদর্শ জায়গা।

    আগ্রা থেকে রাজকীয় অনুমোদন আসার পর এখানেই কাজ শুরু হল। ষোলোশো ঊনচল্লিশের বারোই মে শুক্রবার রাত্রিবেলায় শুরু হয়ে গেল লাল কেল্লা নির্মাণের কাজ। মাঝেমধ্যে কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে আগ্রা থেকে আসেন শাহ্জাহান। যমুনার মধ্যেকার  দ্বীপে অবস্থিত   সেলিমগড়ে অবস্থান করেন। প্রকল্প আধিকারিক মুকারামৎ খানের সুযোগ্য নেতৃত্বে মাত্র ন’ বছরেই গড়ে উঠল লাল কেল্লা। ষোলোশো আটচল্লিশের উনিশে এপ্রিল শাহ্জাহান সদলবলে সাড়ম্বরে লাল কেল্লায় উপস্থিত হলেন। তখন অবিশ্যি এই প্রাসাদদুর্গটির নাম, – উর্দু-ই-মুয়াল্লা।

    আস্তে ধীরে লাল কেল্লাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল নতুন শহর শাহ্জাহানাবাদ। শহরকে সুরক্ষিত রাখার জন্যে শাহ্জাহানাবাদের পরিসীমা বরাবর নির্মিত হয়েছিল ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সাড়ে তিন মিটারেরও বেশি চওড়া এবং সোয়া আট মিটার উঁচু পাথরের পাঁচিল। শহরের পূর্ব দিকে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর দিকে অবিশ্যি পাঁচিল গাঁথার দরকার হয়নি।

    শাহ্জাহানাবাদে প্রবেশ-প্রস্থানের জন্য ছিল তেরোটি দরজা। এগুলির মধ্যে দিল্লি, আজমেরী ও তুর্কমান নামাঙ্কিত দরজাগুলি এখনও বর্তমান। নিগমবোধঘাট, কাশ্মীরি, রাজঘাট, কেলিঘাট, মোরি, কাবুলি, পাত্থরঘাটি এবং লাহোরি নামের দরজাগুলো মূল পাঁচিল গাঁথার সময় তৈরি হলেও আজ আর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। পাঁচিলেরও হদিশ পাওয়া মুশকিল। তবে ওইসব দরজাগুলির নামে জায়গাগুলি চিহ্নিত হয়ে আছে। জিনাত-উল মসজিদ আর ঘাটা মসজিদ নামে বাকি দুটি দরজা আওরঙজেবের আমলে নির্মিত হয় এবং অনেককাল আগেই সময়ের ধারাবাহিকতায় বিলীন হয়ে গেছে।

    লাল কেল্লাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শাহ্জাহানাবাদের স্থাপত্যে ইসলামের প্রভাব ছাড়াও প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। রাজস্থান, পঞ্জাব ইত্যাদি এলাকার হাভেলি ধরনের বাড়ি ছাড়াও খোদ শাহ্জাহানাবাদেই নির্মিত হয়েছিল বেশ কয়েকটি বাংলা বা বাংলো। বাংলার নিজস্ব গৃহনির্মাণ রীতির অনুসরণে তৈরি বাড়িকেই ইংরেজিতে বাংলো বলে। শাহ্জাহানাবাদে বাঙালি ঘরানার স্থাপত্যশৈলী কে বা কারা প্রবর্তন করেছিল? উত্তর খুঁজতে ইতিহাসবিদের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।

    শাহ্জাহানাবাদ সম্প্রসারণ শুরুর আগেই দিল্লি ছাড়িয়ে আরও প্রায় তিনশো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জয়পুর শহর নির্মাণে বাঙালির কৃতিত্ব প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। জয়পুরের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন বিদ্যাধর ভট্টাচার্য। নৈহাটির ভাটপাড়ায় ষোলশো তিরানব্বই-এ তাঁর জন্ম। কবে অথবা কেন তিনি জয়পুরে গিয়েছিলেন জানা না গেলেও এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অল্প বয়সেই তিনি জয়পুর সরকারের অডিটর বা হিসেবরক্ষকের কাজে নিযুক্ত হন। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় দশকে জয়পুরের রাজা দ্বিতীয় সোহাই জয়সিংহ বিদ্যাধর ভট্টাচার্যকে একটি পরিকল্পিত শহরের নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দেন। বিদ্যাধর ভট্টাচার্যর পরিকল্পনা অনুসারে সতেরোশো সাতাশ নাগাদ শুরু হয় ভারতের প্রথম পরিকল্পিত প্রাসাদ নগরী জয়পুর নির্মাণ।

    বিদ্যাধর ভট্টাচার্য সাধারণ বাঙালির কাছে তেমন পরিচিতি না পেলেও এখনকার জয়পুর শহরের অভিজাত এলাকার নাম কিন্তু বিদ্যাধর নগর। অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নেই উত্তর ভারতে শুরু হয়েছিল বাঙালির প্রবাসজীবন।

    পেশাদারি কাজে বাঙালির দক্ষতা বরাবরই উজ্জ্বল। এখনকার মতোই শাহ্জাহানাবাদেও প্রধান শিল্প ছিল গৃহনির্মাণ। স্থাপত্য এবং নির্মাণ শিল্পে বাঙালির তখন যথেষ্ট সুনাম। তবে সেইসব দক্ষ প্রকৌশলী এবং স্থপতির নাম কে মনে রাখে? ইতিহাস এ বিষয়ে বেশ নির্মম। রাজা-বাদশা বিনিয়োগকারীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হলেও বাদ যায় সভ্যতার নির্মাণকারীদের নাম।

    শাহ্জাহানাবাদ গড়ে ওঠার যুগে বাঙালির ভূমিকার বিষয়ে তেমন কিছু খোঁজখবর পাওয়া না গেলেও রাজত্বের জৌলুস ঝরে যাওয়ার জমানায় বাঙালি কিন্তু দাপটের সঙ্গে শাহ্জাহানাবাদে উপস্থিত। চন্দননগরের উমাচরণ বসু আঠারোশো সাঁইত্রিশে দিল্লি পৌঁছে গেলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক বিভাগের কর্মী উমাচরণ এলাহাবাদ, কানপুর হয়ে দিল্লি এলেন। বাংলা, উর্দু, আরবি এবং ফারসি ভাষায় পারদর্শী উমাচরণ কেন প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন তা বলা মুশকিল। তবে আন্দাজ করা হয় যে ভাষাবেত্তা হওয়ার সুবাদে রাজানুগ্রহ পাওয়ার আশায় তাঁর দিল্লি আগমন।

     

    উমাচরণের দিল্লি আসার আগে রাজকাজে দিল্লি দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন এক বিখ্যাত বাঙালি – রাজা রামমোহন রায়। মোঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবরের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য ব্রিটেন যাওয়ার আগে আঠারোশো একত্রিশে তিনি দিল্লি আসেন। সেইসময়ই তাঁকে রাজা উপাধি দেওয়া হয়। তবে তা ছিল একেবারেই স্বল্পকালীন অবস্থান।

    আঠারোশো চল্লিশ নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হল, দিল্লি বেঙ্গলি কালীবাড়ি। চলতি ভাষায় তার নাম তিশহাজারি কালীবাড়ি। কার উদ্যোগে এই কালীবাড়ি গড়ে উঠেছিল? জনশ্রুতি, জনৈক কৃষ্ণানন্দ ব্রহ্মচারী নামের এক বাঙালি সাধক তিশহাজারি এলাকায় অষ্টধাতুর একটি কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিশহাজারি নামকরণ নিয়েও অনেক মত আছে। একটি মতে, শাহ্জাহানের মেয়ে জাহানারার উদ্যোগে যমুনার তীরে তিরিশ হাজার গাছ লাগিয়ে একটা বাগান করা হয়েছিল বলে  জায়গাটার মূল নাম ছিল তিশহাজারি বাগ। শিখ সম্প্রদায়ের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে সতেরোশো আশি নাগাদ সর্দার বাঘেল সিংহ নামক এক শিখ সেনাপতি শাহ্জাহানাবাদ আক্রমণ করার জন্য তিরিশ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে উপস্থিত হন। নগরের কাশ্মীরি গেটের বাইরে যমুনা নদীর তীরে তিরিশ হাজার ঘোড়সওয়ারের ছাউনির পত্তন হয়েছিল বলে নাকি জায়গাটার নাম তিশহাজারি। অন্য একটি মতে বলা হয় যে সিপাহি অভ্যুত্থানের পর তিরিশ হাজার ভারতীয় সৈন্যকে এখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলেই জায়গাটি  তিশহাজারি নামে পরিচিত।

    নানানরকমের মত নিয়ে তর্ক-বিতর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে কৃষ্ণানন্দের কথা যেন হারিয়ে না যায়। কৃষ্ণানন্দের দিল্লি আসার উদ্দেশ্য জানা না গেলেও জনশ্রুতি তিনি নাকি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বত্রিশটি কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আঠারোশো সাতন্নর সিপাহি অভ্যুত্থানের সময় কৃষ্ণানন্দ-র কালীমূর্তিটি নাকি যমুনার জলে গড়িয়ে যায়। ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে দিল্লির অধিকার ফিরে আসার পর কালীমূর্তিটি নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার করে নতুন করে শুরু হয় পূজা-অর্চনা। পরে দিল্লির অনেক জায়গা ঘুরেফিরে উনিশশো ষোলো-সতেরো নাগাদ নিজস্ব জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তিশহাজারি কালীবাড়ি।

    কালীবাড়ি

    ততদিনে দেশের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাজেই সরকারের কাজে নিযুক্ত একঝাঁক বাঙালি দিল্লি আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিশহাজারির আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রশাসনের সদর দপ্তর। তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সরকারি আবাসন। এত বাঙালির যেখানে বসবাস সেখানে কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হওয়াই স্বাভাবিক।

    সিপাহি অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক বাহিনীতে কর্মরত জনৈক দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তথ্যভিত্তিক আত্মজীবনী লিখেছিলেন। সেই আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে,  দুর্গদাসবাবুর সহকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালি ছিলেন। তবে দিল্লির কোন অঞ্চলে তাঁদের বসবাস ছিল বা তাঁরা স্থায়ীভাবে দিল্লিতে থেকে গিয়েছিলেন কিনা তা কিন্তু এই আত্মজীবনীতে অনুল্লেখিত।

    সিপাহি অভ্যুত্থানের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজে নিযুক্ত ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ সেনানী। পদস্থ সেনানায়ক ছাড়া বাদবাকি সবাই ভারতীয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় সদর দপ্তর দেশের রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত। কাজেই অনুমান করা যায় নিয়োগের ক্ষেত্রে বাঙালি হয়তো একটু বাড়তি সুবিধা পেত। দেশের শাসনভার আঠারোশো আটান্নয় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চলে যাওয়ার পর প্রায় এক লক্ষ সৈন্যকে ফৌজ থেকে ছেঁটে ফেললেও সাধারণ প্রশাসনের জন্য প্রচুর নতুন কর্মীর প্রয়োজন হয়। বাঙালি ততদিনে কাজ চালানোর মতো ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছে, তার ওপর নবাব-জমিদারের দরবারে মুন্সীর কাজ করা বাপ-ঠাকুর্দার কাজের ধারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার সুবাদে সাধারণ প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে আশা করা যায় বাঙালি অগ্রাধিকার পেয়েছিল। কাজেই আঠারোশো ষাটের দশক থেকেই সরকারি কাজের সুবাদে দিল্লিতে বাঙালির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

    আঠারোশো তেষট্টি নাগাদ দিল্লির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রেল যোগাযোগ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন পেশার বাঙালি দিল্লিকে কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিলেন। আঠারোশো আশির দশকে দিল্লিতে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শিক্ষকতার দায়িত্ব নিয়ে বহু বাঙালি অধ্যাপক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লি পৌঁছে গেলেন।

    বিদ্যাধর ভট্টাচার্যর সঙ্গে আরও কয়েকজন বাঙালি জয়পুর শহর গড়ে তোলার সময় বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সংসারচন্দ্র সেন ছিলেন জয়পুরের দেওয়ান। দেওয়ান হিসেবে তিনি যথেষ্ট সাফল্য এবং খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। জয়পুর তাঁর অবদান ভুলে যায়নি। আজও জয়পুরের অন্যতম পরিচিত রাস্তার নাম সংসারচন্দ্র সেন মার্গ।

    সংসারচন্দ্রর অনুজ হেমচন্দ্র সেন পেশায় চিকিৎসক। আঠারোশো আশি নাগাদ দিল্লি বেড়াতে এসে এখানেই গড়ে তুললেন স্থায়ী আস্তানা। চাঁদনি চক এলাকার ফাউন্টেন-এর কাছে প্রতিষ্ঠিত হল ডা: এইচ সি সেন অ্যান্ড কোম্পানি। একই ছাদের তলায় ডাক্তারবাবুর চেম্বার এবং ওষুধের দোকান। জনপ্রিয় চিকিৎসক হেমচন্দ্র সেনকে দিল্লি মনে রেখেছে। চাঁদনি চকের একটি রাস্তা তাঁর নামে নামাঙ্কিত। কিছুদিন পর দিল্লি এলেন সংসারচন্দ্র এবং হেমচন্দ্র সেনের ভাগ্নে আশুতোষ রায়। আশুতোষের বাবা নীলমাধব রায় ছিলেন জয়পুরের সামরিক বাহিনীর জোগানদার। আঠারোশো তিরাশি নাগাদ মামার ডাক্তারখানার আশপাশেই একটি ছাপাখানা স্থাপন করলেন আশুতোষ রায়। সংস্থার নাম ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল হল প্রেস, যা পরে আইএমএইচ প্রেস নামে বিখ্যাত হয়। মামার ওষুধের দোকানের বিল, ক্যাশমেমো ইত্যাদি ছাপানোর কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বলেই সম্ভবত সংস্থার কাজের সঙ্গে চিকিৎসা জগতের কোনও সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও এমন বিচিত্র নামকরণ।

    সেযুগে উর্দুতে মুদ্রণ ছিল আইএমএইচ প্রেসের বৈশিষ্ট্য। আরবি, ফারসি ইত্যাদি ভাষার লিপি প্রায়  একইরকম বলে আইএমএইচ প্রেসের কাজের চাপ বাড়তে থাকে। একটা সময় আইএমএইচ প্রেসে ছাব্বিশটি ভাষায় ছাপার কাজ হত। দিল্লি এবং আশপাশের এলাকার বাঙালির জন্য ছাপতে হত বিবাহ-অন্নপ্রাশন-উপনয়ন-শ্রাদ্ধ প্রভৃতির আমন্ত্রণপত্র। অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নেই দিল্লিতে বিভিন্ন পেশার বাঙালি উপস্থিত। হয়তো সেই কারণেই আঠারোশো ঊননব্বই-এ বেঙ্গলি বয়েজ স্কুল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। আঠারোশো চুরানব্বই-এ প্রতিষ্ঠিত হল,- বঙ্গ সাহিত্য সভা।

    বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দেশের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে এক ধাক্কায় অনেক বঙ্গসন্তানকে বাধ্যতামূলকভাবে দিল্লি চলে আসতে হয়। বেশিরভাগই সরকারি কর্মী। চাকুরিরক্ষার তাগিদে শুরু হল প্রবাসজীবন।

    চিত্তরঞ্জন পার্কে দুর্গা পুজোর প্রস্তুতি

    এত বাঙালি যেখানে সমবেত সেখানে বাংলার নিজস্ব ঘরানার মিষ্টি না হলে চলে! উনিশশো ঊনত্রিশে চাঁদনি চক এলাকার ফাউন্টেন চকে স্থাপিত হল,- অন্নপূর্ণা ভান্ডার। লোকমুখে অন্নপূর্ণার মিষ্টি এতই সুখ্যাতি অর্জন করল যে অবাঙালিরাও উৎসব-অনুষ্ঠানে এই দোকান থেকেই মিষ্টি কিনতে পছন্দ করত। একসময় তো রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে শুরু করে সংসদ ভবন পর্যন্ত পৌঁছে যেত অন্নপূর্ণার মিষ্টি।

    নবনির্মিত দেশের রাজধানীর কোন কোন এলাকায় বাঙালি পাড়া গড়ে উঠেছিল? তিমারপুর, চাঁদনি চক, দরিবা কালান, বাজার সীতারাম, ফতেপুরী, নই সড়ক, সদরবাজার, কাশ্মীরি গেট, মোরি গেট, গন্ধানালা, দরিয়াগঞ্জ অর্থাৎ সাবেক শাহ্জাহানাবাদের অধিকাংশ মহল্লায় তখন বাঙালির বসবাস। তিমারপুর, কাশ্মীরি গেট এলাকায় ছিল অধিকাংশ সরকারি দপ্তর। কাছেই দিল্লি রেলস্টেশন। সবমিলিয়ে সাবেক শাহ্জাহানাবাদই ছিল প্রবাসী বাঙালির জন্য আদর্শ।

    কনট প্লেসের পাশের পাড়া মিন্টো রোডে উনিশশো ঊনত্রিশে সরকারি ছাপাখানা চালু হওয়ার সুবাদে আবার একদল বাঙালিকে দিল্লি আসতে হল। ছাপাখানার কাজে বাঙালির দক্ষতা ততদিনে স্বীকৃত। ফলে বহু বাঙালির নতুন ঠিকানা হয়ে গেল এখানকার সরকারি আবাসন। দেশভাগের সময় নাকি মিন্টো রোডের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিল বাঙালি। সত্তর বছর বাদেও মিন্টো রোড এলাকায় বাঙালির দাপট কমেনি। উনিশশো ঊনত্রিশ থেকেই ভারত সরকারের সচিবালয়, ডাক ও তার বিভাগের বিভিন্ন দপ্তর নতুন দিল্লিতে স্থাপিত হওয়া শুরু হলে অনেক বাঙালি সরকারি কর্মী মিন্টো রোডের প্রতিবেশী থমসন রোডের নবনির্মিত সরকারি আবাসনে চলে আসেন। যাঁদের সামর্থ ছিল সম্ভবত এই সময়েই তাঁরা করোলবাগ এলাকায় নিজের বাড়ি তৈরি করে নেন।

    জনপদ সম্প্রসারিত হলে আনুষঙ্গিক কাজকর্ম বেড়ে যায়। দরকার হয় বিভিন্ন পেশার নানানরকমের মানুষ। বসবাসের জন্য দিল্লির যেসব এলাকা বাঙালি বেছে নিয়েছিল সেইসব জায়গায় ডাক্তারখানা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান-বাজার এমনকি খাবারের দোকানেও বাঙালির প্রতিপত্তি বজায় ছিল। এখানেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে স্থাপিত হয়েছিল সেনস নার্সিং হোম। ডা: সন্তোষ সেন প্রতিষ্ঠিত এই বেসরকারি চিকিৎসালয়টি সম্ভবত দিল্লির প্রথম নার্সিং হোম। এখানেই গান্ধীজির মরদেহের ময়না তদন্ত করেন ডা: সন্তোষ সেন।

    দেশভাগের দৌলতে দিল্লিতে পৌঁছে গেলেন আরও একঝাঁক বাঙালি। ছিন্নমূল বাস্তুহারা এইসব মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে কোনওদিনই স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের পরিচয়- পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্থানচ্যুত মানুষ বা ইস্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পার্সন সংক্ষেপে ইপিডিপি। পশ্চিম পাকিস্তানের বাস্তুহারা মানুষ কিন্তু দিল্লি এসে উদ্বাস্তু-র স্বীকৃতি পায়। এবং সরকারি আনুকূল্যে জাঁকিয়ে বসে। ইপিডিপি তকমা পাওয়া বাঙালি অনেক কষ্টের জীবন কাটিয়ে বিভিন্ন পেশায় আস্তে আস্তে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে রাজধানীর নানান অঞ্চলে খুঁজে নিয়েছেন মাথাগোঁজার ছাদ। ফলে এতদিনের পরিচিত নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক বসবাসের ধারণা ক্রমশ পাল্টাতে শুরু করে। তবে উনিশশো ষাটের দশকে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে কমবেশি আড়াই হাজার পরিবারের জন্য জমি বরাদ্দ হলে আবার নতুন করে গড়ে ওঠে পাড়াভিত্তিক বাঙালিয়ানার ঘরানা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাস্তুচ্যূত ছিন্নমূল মানুষ গড়ে তোলেন ইপিডিপি কলোনি। সরকারি নথিতে ইপিডিপি কলোনি লেখা হলেও চিত্তরঞ্জন পার্ক হিসেবেই এই উপনিবেশের বহুল পরিচিতি। সময়ের ধারাবাহিকতায় গৃহনির্মাণ শিল্পের প্রবল দাপটে এই প্রকল্প এখন কি তার বাঙালিয়ানা বজায় রাখতে পারছে?

    বাঙালির মিষ্টির কদর রয়েছে দিল্লিতেও

    সরকারি আবাসনের সুবাদে এখনকার কেন্দ্রীয় দিল্লিতে বাঙালির সংখ্যা খুব একটা কম নয়।

    সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তায় গড়ে ওঠা তথাকথিত অভিজাত কেন্দ্রীয় দিল্লিতে যত বাঙালির বসবাস তার থেকে অনেক বেশি বাঙালি অবশ্যি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন এখনকার দিল্লি এবং তার আশপাশের অঞ্চলে। দিল্লির তিনটি পুরসভার বাইরে অবস্থিত নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা, ফরিদাবাদ, গুরগাঁও, গাজিয়াবাদ তো বটেই দিল্লির অন্তর্গত দোয়ারকা, পশ্চিম বিহার, উত্তমনগর,  হরিনগর,  মহাবীর এনক্লেভ, রোহিণী, বুরারি, ভজনপুরা,  দিলশাদ গার্ডেন, ময়ূর বিহার, অশোকনগর, গোবিন্দপুরি, অলোকনন্দা ইত্যাদি এলাকায় বহু বাঙালির বসবাস। দিল্লির মোট জনসংখ্যার নিরিখে শতকরা হিসেবে হয়তো বা সাবেক আমলের তুলনায় আধুনিক কালের বাঙালির সংখ্যা অনেক বেশি।

    দেশভাগের পর থেকেই আরও একদল শ্রমজীবী বাঙালির  দিল্লিতে নিয়মিত যাতায়াত যাঁরা কোনও স্থায়ী কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। পরিযায়ী হিসেবে তাঁরা কখনও বছরে আট-ন’ মাস এখানে কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পে কাজ করলেন তারপর আবার নিজের নিজের দেশ-গাঁয়ে ফিরে গেলেন। কেউ আবার একটানা দেড়-দু’ বছরের জন্য দিল্লিতে কাজ করলেন। এঁরা দক্ষ শ্রমিক। বাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে অলঙ্কার শিল্পের সঙ্গে এঁরা জড়িয়ে আছেন। সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতার জন্যই এঁদের এত কদর। জরির কাজেও অনেকে যুক্ত। মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের এই কারিগরবৃন্দ নিজের নিজের গোষ্ঠীর মধ্যেই নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণ করতে অভ্যস্ত। বেশি পারিশ্রমিক পেলে এঁরা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে চলে যেতে পারেন। তবুও দেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত অট্টালিকা যেমন সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন ইত্যাদির সংরক্ষণ থেকে শুরু করে পরিবর্ধন-পরিমার্জনের জন্য এঁদেরই ডাক পড়ে। পরিযায়ী হলেও এঁরা কিন্তু নিজেদের মধ্যে বাংলাভাষাই কথাবার্তা বলেন।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টে যাচ্ছে। দোকান-বাজারে, কর্মক্ষেত্রে বাংলায় কথা বলার সুযোগ নেই। স্কুল-কলেজের সহপাঠীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলা যায় না। বাঙালি পরিচালিত আটটি বাংলা স্কুল কবে যেন হিন্দি মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে গেল। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত দিল্লির কয়েক লক্ষ বাঙালির কতজন দিনান্তে বাংলা গান শোনেন বলা মুশকিল। বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে এঁরা সাধারণভাবে উদাসীন। বহুল প্রচারিত বাংলা চলচ্চিত্র না দেখলে মানহানির সম্ভাবনা থাকে বলে পছন্দ না হলেও দেখতে হয়। অধিকাংশ পরিবারের নবীন প্রজন্ম বাংলার থেকে হিন্দি বা ইংরেজিতে বেশি স্বচ্ছন্দ। নিজেদের বাঙালি বলার বদলে ‘বং’ বলা পছন্দ।

    কেন এমন হচ্ছে? কঠিন এবং একইসঙ্গে জটিল প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ হয়তো বলবেন, শুধু বাঙালিয়ানা কেন, হারিয়ে যাচ্ছে প্রচলিত মূল্যবোধ। এই প্রসঙ্গে আরও অনেক যুক্তি-তর্ক-তথ্য এমনকী সংখ্যাতত্ত্বের অবতারণা করা যায়। সেসব আপাতত দূরে সরিয়ে দিয়ে নির্দ্বিধায় বলা যায় দিনের শেষে না হলেও বছর শেষে বাঙালি কিন্তু বাঙালিই থেকে যায়। সারা বছরের ক্লান্তি-দুঃখ-ব্যাথা-বেদনা-যন্ত্রনা-অভাব-অনটন-অভিযোগ ভুলে শারদোৎসবের চিরায়ত ধারাবাহিকতায় ‘শিউলিতলার পাশে পাশে, ঝরা ফুলের রাশে রাশে, শিশির ভেজা ঘাসে ঘাসে’ রাজধানীর পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে চিরকালের বাঙালিয়ানা।

    লেখক ভারত সরকার ও আফগানিস্তান সরকারের প্রাক্তন পরিকল্পনা উপদেষ্টা

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More