দিল্লির বাওলি   

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অমিতাভ রায়

    বাওলি। বাংলায় শব্দটির যথাযথ অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আসলে বিষয়টি তো নদীধৌত সমভূমিতে অপ্রয়োজনীয়। কাজেই গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রর অববাহিকায় বাওলির কোনও অস্তিত্ব নেই। অথচ দিল্লি বা আরও পশ্চিমের রাজ্যগুলোয় বাওলি অত্যন্ত পরিচিত শব্দ। শুধু পরিচিত নয় অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয়। একসময় তো বাওলিই জোগান দিত জীবনধারণের প্রাথমিক ও প্রধান উপাদান,- জল।

    বাওলি হল একরকমের কুয়ো। তবে পরিচিত স্বল্প পরিসরের গোলাকার কুয়ো নয়। আয়তাকার। দৈর্ঘ্য-প্রস্থের কোনও নির্দিষ্ট মাপ নেই। যেখানে যেমন জায়গা পাওয়া যায় সেই অনুযায়ী বাওলির নকশা তৈরি করা হয়। কোথাও হয়তো পঞ্চাশ মিটার দীর্ঘ আর পঁচিশ মিটার প্রশস্ত বাওলির দেখা পাওয়া যায় কোথাও হয়তো আরও বড়। ছোটও হতে পারে। আসলে জায়গা কতখানি পাওয়া যাচ্ছে এবং ভূগর্ভের ভিতরে কতটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে স্থায়ী জলস্তর সেইসব হিসেব করে বাওলির আকার-আয়তন নির্ধারণ করতে হয়।

    দিল্লি এবং আরও পশ্চিমের রাজ্যগুলোর রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নীচে অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকে স্থায়ী  জলস্তর। প্রচলিত কুয়োর মতো বালতিতে দড়ি বেঁধে সেখান থেকে জল তুলে আনা এককথায় অসম্ভব। সেই জন্য জলের কাছাকাছি পৌঁছনোর জন্য মাটির ওপর থেকে তৈরি করতে হয় ধাপেধাপে সিঁড়ি। অবশ্যই পাথরের তৈরি। খালি কলসি নিয়ে নীচে নেমে বাওলির জল ভরে শুরু হয় ওপরে ওঠার পালা। সাধারণত প্রস্থের দিকেই সিঁড়ির অবস্থান। আর দৈর্ঘ্য বরাবর গাঁথা থাকে পাথরের তৈরি পুরু দেওয়াল।

    ভূগর্ভের জল ব্যবহারের জন্য পূর্ব ভারতের মাটিতে খুব বেশি খোঁড়াখুঁড়ির দরকার হয় না। বেশ খানিকটা জায়গা ভালোভাবে খুঁড়লেই ভূগর্ভের জল মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে কোদাল-গাইতি চালিয়ে খুঁড়ে ফেলা গহ্বর ভরিয়ে দেয়। তার সঙ্গে মেশে বৃষ্টির জল। এইভাবেই জন্ম নেয় পুকুর। আয়তন ও গভীরতা বেশি হলে পুকুরের নাম হয়ে যায় দীঘি। আরও বড়ো হলে তাকে সরোবর বলা হয়। আবার যেখানে জায়গার অভাব বা বাড়ির উঠোন থেকেই ভূগর্ভের জল সংগ্রহের প্রয়োজনে সামান্য জায়গা গোলাকার করে খুঁড়তে খুঁড়তে মাটির নীচে চলে গিয়ে বের করে আনা হয় ভূগর্ভের জল। গোলাকার কেন? মাটি খুঁড়ে ফেলার পর চারপাশের মাটি যাতে শূন্য জায়গা ভরাট করতে না পারে তার জন্য বসানো হয় পোড়ামাটির চাকা। একের পর এক চাকা জলস্তর পর্যন্ত সাজানো থাকে। ব্যাস, হয়ে গেল কুয়ো। দড়িতে বালতি বেঁধে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়ে আস্তে আস্তে ওপরে তুলে আনলেই পাওয়া যায় ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছ জল। গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে যত পশ্চিমে যাওয়া যায় ততই বাড়তে থাকে কুয়োর গভীরতা।

    সবমিলিয়ে বাওলি যেন পাথরের দেওয়াল ঘেরা গভীর পুকুর অথবা কুয়ো। তবে প্রযুক্তির পরিভাষায় বাওলি step well নামে পরিচিত। কাজেই বাংলায় সিঁড়ি-গাঁথা কুয়ো বলা গেলেও বাওলি বললে যেন জলাধারের গভীরতার যথার্থ আন্দাজ পাওয়া যায়।

    ঐতিহাসিক-প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে দিল্লিতে একসময় শতাধিক বাওলি ছিল। থাকাটাই স্বাভাবিক। রাজধানী বলে কথা। স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়াও নিত্যনতুন বহিরাগতদের সমাগম। সেখানে নিয়মিত জলের জোগান না দিতে পারলে তো যথাযথভাবে রাজধর্ম পালিত হয় না। সেইসব বাওলির অধিকাংশেরই অস্তিত্ব এখনকার দিল্লিতে নেই বললেই চলে। এমনকি তাদের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। তবে নয় নয় করেও অন্তত বেশ কয়েকটি বাওলি এখনও টিকে আছে। জল আনতে কেউ যায় না। তবে অনেকেই বেড়াতে যায়। এবার তাহলে বাওলি সফর শুরু করা যাক।

    মহারাজা অগ্রসেন কী বাওলি : দিল্লির কেন্দ্র বলে পরিচিত কনট প্লেস থেকে কস্তুরবা গান্ধী মার্গ ধরে শ’ পাঁচেক মিটার এগোলেই রাস্তার বাঁ দিকে পড়ে হেলী রোড। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথি নিবাস এই রাস্তাতেই অবস্থিত। তবে অতদুর যেতে হবে না। তার অনেক আগেই বাঁ পাশে একটা সরু গলি চোখে পড়বে। সামনের বোর্ডে লেখা আছে হেলী লেন। ছোট্ট গলি। এখানেই রয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীর মহারাজা অগ্রসেন কী বাওলি। মোট একশো পাঁচটি সিঁড়ি। বাওলির জলাধারে জল থাকলেও ব্যবহার করা হয় না। কোলাহল মুখর কনট প্লেসের দু’ পা দূরে আজও শান্ত পরিবেশে বেঁচেবর্তে রয়েছে মহারাজা অগ্রসেন কী বাওলি।

    রাজো কী বাওলি : দিল্লি মেট্রোর হলুদ লাইনে কুতব মিনার স্টেশন থেকে একটু এগিয়ে গেলেই মেহেরৌলি প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কে পৌঁছনো যায়। এই পার্কের ভিতরে রয়েছে রাজো কী বাওলি। সিকান্দার লোদীর আমলে নির্মিত এই বাওলিটির বৈশিষ্ট্য হল যে এর একটাই সিঁড়ি। দৈর্ঘ্য ও একপাশের প্রস্থ  বরাবর  গেঁথে তোলা পাথরের দেওয়ালের কারুকাজ বাওলটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে প্রদীপ রাখার ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ এই বাওলি সন্ধ্যার পরেও ব্যবহার করা যেত।

     

    গন্ধক কী বাওলি: মেহেরৌলির দরগা রোডে এই বাওলির অবস্থান। দিল্লির মসনদে বসে ইলতুৎমিস শাসন শুরু করার পর এই বাওলি ব্যবহার উপযোগী হয়। বাওলিটির খনন কাজ চলার সময় এমন একটি পাথরের স্তরে গাইতি আঘাত হানে যার মধ্যে গন্ধক ছিল। ফলে এই বাওলির জল কোনওদিনই পান করার যোগ্য ছিল না। তবে এই বাওলিতে স্নান করলে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ সেরে যেত বলে গন্ধক কী বাওলি তখনকার মতো আজও স্নানের জন্য জনপ্রিয়। গুনে গুনে একশোটি সিঁড়ি পেরিয়ে নীচে নামলেই  গন্ধক কী বাওলির জলে ঝাঁপ দেওয়া যায়।

           

    লাল কেল্লা বাওলি: লোকশ্রুতি রাম জন্মানোর আগেই নাকি রামায়ণ লেখা হয়েছিল। সেই তর্কে না জড়িয়ে স্পষ্ট করে বলা যায় যে লাল কেল্লা তৈরির অন্তত তিনশো বছর আগেই এই বাওলিটি নির্মিত হয়। ফিরোজ শাহ তুঘলকের উদ্যোগে নির্মিত এই বাওলির প্রকৃত অবস্থান দেখতে হলে কিন্তু লাল কেল্লার পূর্বসূরি এবং প্রতিবেশী সেলিমগড়ের ভিতরে যেতে হবে। সেইসময়কার প্রযুক্তি এবং স্থাপত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে বলতেই হবে যে এই বাওলিটির নকশা ছিল অনবদ্য। আজও এই বাওলি সক্রিয়। লাল কেল্লা এবং সেলিমগড়ের লন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে এই বাওলির জল ব্যবহার করা হয়।

    ফিরোজ শাহ কোটলা বাওলি: ক্রিকেট স্টেডিয়াম নয়। অবিশ্যি স্টেডিয়ামের নাম তো সম্প্রতি বদলে গেছে। তবে ফিরোজ শাহ কোটলা বা ফিরোজ শাহ-র দুর্গের নাম পাল্টে যায়নি। এই দুর্গের মধ্যে রয়েছে তৎকালীন প্রযুক্তির সেরা নিদর্শন সমৃদ্ধ বাওলি। অনেকের মতে এই বাওলিটি ছিল দিল্লির সবচেয়ে বড় জলাধার। এবং ভারতের একমাত্র গোলাকার বাওলি হিসেবে পরিচিত। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল এই বাওলি কিন্তু শুধু ভূগর্ভের জলের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি। টেরাকোটা পাইপ দিয়ে পাশের যমুনা নদীর জল আনার বন্দোবস্ত ছিল। এখনকার ফিরোজ শাহ কোটলা দেখতে গেলে বোঝা যায় যে বাওলিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি।।

    খারি বাওলি : শের শাহ-র পুত্র ইসলাম শাহের উদ্যোগে এই বাওলি নির্মিত হয়। নতুন দিল্লি স্টেশনের পশ্চিম দিকে রেলওয়ে ইয়ার্ডের পাশে ছিল এর অবস্থান। বাওলি নেই। তবে খারি বাওলি নামের জায়গাটা রয়েছে। হারিয়ে গেছে জলাধার। আসলে জলাধারের স্হান নির্বাচন বোধ হয় ঠিক ছিল না। কারণ, এখানকার ভূগর্ভের জল ছিল খর জল বা পরিভাষায় hard water. খর অর্থাৎ হিন্দির খারি জলের সুবাদে বহুদিন আগেই জল শুকিয়ে গেছে। কিন্তু জায়গার নাম মুছে যায়নি। এখানকার খারি বাওলি এশিয়ার সবচেয়ে বড় চাল-ডাল অর্থাৎ দানা শস্য এবং মশলার পাইকারি বাজার।

    পরিশেষে যে কথা না বললেই নয় তা হল পূর্ব ভারতের পুকুরপাড় যেমন সামাজিক যোগাযোগের অর্থাৎ আড্ডা-আলোচনা-সমালোচনা-পরনিন্দা-পরচর্চার আদর্শ জায়গা,  বাওলির সিঁড়ির ধাপও স্থানীয় সমাজের বিশেষত মহিলাদের মিলনস্থল। সংসারের জল সংগ্রহের দায়িত্ব আজও বাড়ির মেয়েদেরই যে পালন করতে হয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More