শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮

সুকুমার রায়ের হাতিমি না হোক, সত্যি হতে পারে হ্যামথী

অভিজিৎ বেরা

জিরাফের গলা লম্বা। সেটাই দস্তুর। প্রতিযোগিতার বাজারে গাছপাতা খেয়ে টিকে থাকতে হবে তো। হাঙর যেমন। পেটের দিকে সাদা আর পিঠের দিকে নীল বা ছাই রঙের। ওতে জলে মিশে থাকার সুবিধে। এমন উদাহরণ অনেক আছে। এ সবই প্রকৃতির নির্বাচন। মানুষ কত ভেবেছে। এর বাইরে কিছু কি হয় না? হাতিমি জাতীয়। অর্থ্যাৎ দুটি প্রাণীর মিশ্রণে কিছু। আদিম গুহায় সিংহী-মানবীর মূর্তি তো আমরা দেখেছি, যার মুখ সিংহীর, শরীর মানবীর। ভাবুন সেই ৩২,০০০ বছর আগের কথা। মানুষ কবে থেকেই ভাবছে।

২০০০ সালে ব্রাজিলীয় বায়ো- শিল্পী এডুয়ারদো ক্যাক ভাবলেন তাঁর গ্যালারিতে একটি নতুন শিল্পকর্ম  বসালে কেমন হয়?  ফ্লুরোসেন্ট খরগোশ। অর্থাৎ অন্ধকারে জেলিফিশ যেমন সবুজ ফ্লুরোসেন্ট আলো দেয়, তেমনই একটি খরগোশকে যদি আলোকময় বানানো যায়! তিনি একটি ফরাসি ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁর পরিকল্পনা বিশদে জানালেন। তাঁদের দাবি মতো মোটা অঙ্কের ডলারও দিতেও সম্মত হলেন। ফরাসি বৈজ্ঞানিকরা খুঁজে খুঁজে একটি শক্ত সমর্থ সাদা ধবধবে খরগোশ আনালেন। সবাই মিলে তার ডি এন এ তে সবুজ ফ্লুরোসেন্ট জেলিফিসের জিন প্রতিস্থাপন করা হল। মাত্র কয়েক মাস। আর তারপর? আহা! একটি সবুজ ফ্লুরোসেন্ট খরগোশ ! ক্যাক তার নাম দিলেন অ্যালবা।

ভাবছেন এসব কী ! ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনতত্ত্ব কি তবে ভুল? চার হাজার বছর ধরে আমরা তবে ভুল জেনে এসেছি?

এই ঘটনার বছর চারেক আগে। একটি ইঁদুরের ছবি টেলিভিশনের পর্দায় এবং খবরের কাগজে দেখে সারা পৃথিবী চমকে উঠল। একটি ইঁদুর, তার পিঠে আস্ত একটি  মানুষের কান! এবং সেই কানটি পিঠে নিয়ে ইঁদুরটি দিব্যি হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। হ্যাঁ। বিজ্ঞানীরা মানব কানের কার্টিলেজ কোষ ইঁদুরটির পিঠে প্রতিস্থাপন করেছেন। সেই কোষ বেড়ে নতুন কোষ হয়েছে। ফলে পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরটির পিঠে তৈরি হয়েছে একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের গোটা একটি কান। এমন কানোহারি ইঁদুর ! আগে তো কেউ ভাবেনি।

তাতে কী। থামুন তো মশায়। বুক ভরে শ্বাস নিন দেখি। এবার যা বলব— তাতে আপনার মাথা ঘুরে যাবার জোগাড় হতে পারে।

ধরুন একদিন গরম খুব। রাতের বেলা আপনি আপনার বিশ তলার ফ্ল্যাটের জানালা খুলে দেখলেন সামনের লনে একটি বিশাল ম্যামথ দাঁড়িয়ে! তার খুদে খুদে কালো কালো চোখ স্ট্রেট আপনার জানলার বাইরে। কী সে দৃষ্টি। যেন দুটি কালাসনিকভ থেকে একনাগাড়ে আগুন ঝরছে। আপনি ভয়ে জানালা বন্ধ করে বেডরুমে ফিরে এলেন।

যেসব প্রাণীরা কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অথচ তাদের শরীরের কোনও অংশ কোনও আদিম গুহা বা বরফের তলা থেকে উদ্ধার হয়েছে, সেই অংশের ডিকোড করে বিজ্ঞানীরা  আস্ত সেই প্রাণীটিকে ল্যাবে হ্যাঁ  ল্যাবেই গোটাটাই বানিয়ে ফেলতে পারেন। যেমন ম্যামথ। সাইবেরিয়ায় বরফের তলায় চাপা পড়া ম্যামথের চুয়াল্লিশটি জিন পাওয়া গেছে। তাদের কোনও একটির ডিএনএ পুনর্গঠন করে সেই ডিম্বাণুটি  যদি একটি হাতির গর্ভে প্রতিস্থাপন করা যায়, বাইশ মাস পরে, হতে পারে, পাঁচ বছরে প্রথম একটি ম্যামথী শাবক জন্ম নেবে। থুড়ি ম্যামথী নয়, হ্যামথী ! হাতি প্লাস ম্যামথী। হতে পারে তার ম্যামথের মত বিপুল গজদন্ত থাকবে না। আবার সাইবেরিয়ার মত শীতলতম আবহাওয়াতেও সে দিব্যি মানিয়ে নিয়ে হেঁটে চলে বেড়াবে। কারণ মৃত ম্যামথের  রক্ত নাকি তুন্দ্রার হাঁড় কাঁপানো ঠান্ডাতেও জমে না। অর্থ্যাৎ সেটি অ্যান্টিফ্রিজ। ভাবুন কী কান্ড, মৃত শরীরেও থাকে তরল রক্ত! অবশ্য গায়ে থাকবে সেই আদি ম্যামথের মতই তুলতুলে কালো বা সাদা পশম। আসলে বিজ্ঞানীরা পড়েছেন অন্য ধন্দে। হাতির গর্ভটি স্বাভাবিক হবে না কৃত্রিম? বেশির ভাগই অবশ্য কৃত্রিম গর্ভের পক্ষে, তাহলে প্রথম থেকেই নতুন শিশুটির বৃদ্ধি তাঁদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে, এই আর কী।

তবে এই কৃত্রিম গর্ভ তৈরির পদ্ধতিটি অবশ্য খুবই জটিল। যে কারণে জীবজন্তুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এখনও ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায়নি। কিন্তু গত মাসেই বিজ্ঞানীদের দাবি তাঁরা এর সমাধান করে ফেলেছেন। খুব শীঘ্রই ইঁদুর হ্যাঁ সেই চিরপরিচিত নেংটি ইঁদুরের ওপরেই পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হবে। বেচারা ইঁদুর! আসলে একটি ইঁদুর-মা অন্তঃসত্বা হওয়ার মাত্র কুড়ি দিনের মধ্যেই সন্তান প্রসব করে। সেখানে হাতির লাগে বাইশ মাস। ইঁদুরে সফল হলে তবে না হাতি! থুড়ি হ্যামথী। আসলে বিজ্ঞানীরা ভয় পাচ্ছেন হিতে বিপরীত না হয়ে যায়। ম্যামথের জিন বানাতে গিয়ে যদি কোনও বিপত্তি ঘটে! কী হবে হ্যামথী র চেয়েও ভয়ানক কিছু সৃষ্টি হয়ে গেলে? ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনা অত সহজ  নয়।

আচ্ছা, মানুষের আরেক জেঠু নিয়ান্ডারথালের জিনও তো পাওয়া গেছে। একই ভাবে কোনও মানবীর শরীরে কৃত্রিম গর্ভ বানিয়ে সেই ডিএনএ যদি ওখানে প্রতিস্থাপন করা যায়? তাহলে তিরিশ হাজার বছর পরে প্রথম কোনও নিয়েনডার্থাল শিশুর জন্ম হবে কি? হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ চার্চ বলেছেন কেউ তিনশ লক্ষ ডলার দিতে রাজি থাকলে তিনি  সত্যিই এমনটি করে দেখাতে পারেন! ভাবুন এক বলিষ্ঠ পুরুষ নিয়েনডার্থাল কত কত শ্রমিকের কাজ একা করে দিতে পারে?

যদি সত্যি কোনওদিন এমনটি হয়, তাহলে কি মানুষ সেখানেই থেমে থাকবে? সে কী চেষ্টা করবে না আরো আরো উন্নত মানব জিন তৈরী করতে যে রূপে গুণে বুদ্ধিতে দক্ষতায় সর্বশ্রেষ্ঠ। এ যাবত মানুষ সমস্ত ধরনের অসুখের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই করতে পারলেও বার্ধক্য ও মৃত্যুর কোনও টিকা আজ অবধি আবিষ্কার করতে পারেনি। পারবে মানুষ তেমন কিছু করতে? ২০৫০ সালে কিছু ধনকুবের কি অমরত্ব লাভ করে ফেলবেন না? এমন অনন্ত যৌবন যা কখনই ফুরোবে না? মানব মনের, মানব চেতনার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কি সে নিজেই নিয়ে নেবে না? মনের ভেতরে কম্পিউটার বা কম্পিউটারের ভেতরে মনের বসত গড়ার কাজ তো শুরু হয়ে গিয়েছে কবেই। মানুষ নিজেই কি তবে একদিন স্বয়ং ভগবান হয়ে যাবে? যে  নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করবে, নিয়ন্ত্রণ করবে। আমরা কী তবে সেই শেষ প্রজন্মের মানুষ? এরপরেই শুরু হয়ে যাবে না প্রথম প্রজন্মের ভগবানের যুগ?

সে প্রশ্ন থাক। আপাতত আমরা পাঁচ হাজার বছরের প্রথম হ্যামথী টির জন্মের অপেক্ষায় রইলাম। শুভেচ্ছা প্রফেসর চার্চ। অগ্রিম শুভ জন্মদিন।হ্যামথী  !

অভিজিৎ বেরা পেশায় প্রশাসনিক আধিকারিক। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই – ‘নিহত অন্ত্যেষ্টি’ (কৃত্তিবাস, ২০১২), ‘কার্নিভালের পাখিগুলি’ (আনন্দ, ২০১৬) এবং ‘গডজিলার নিজস্ব ইতিহাস’ (আনন্দ, ২০১৭)। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার (২০১৭) ও বনলতা পুরস্কার (২০১৮)। তুর্কি ও ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়েছে তাঁর কবিতা।মুম্বাইতে কালা ঘোড়া আর্ট ফেস্টিভ্যালে (২০১৫) আমন্ত্রিত। স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র “পাইপ ড্রিমজ” (২০১৪) দেশে বিদেশে প্রদর্শিত হয়েছে।

Shares

Comments are closed.