ছিন্নমূল মানুষদের ঈশ্বর এই নারী, তিয়াত্তর বছর ধরে ভাত মুখে তোলেননি

শরণার্থীদের জন্য তাঁর হিমালয়সম অবদানের জন্য অরুণাদেবী পেয়েছেন ঐতিহ্যমণ্ডিত 'ম্যাগসেসাই' পুরস্কার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ভারত তখন সদ্য ভাগ হয়েছিল। ভারতের পূর্বে ও পশ্চিমে আত্মপ্রকাশ করেছিল পূর্ব (বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। উদ্বাস্তুদের ঢল নেমেছিল ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে। ঢল নেমেছিল আসামেও। গুয়াহাটি স্টেশন হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বহু ছিন্নমূল পরিবারগুলির শেষ আশ্রয়। উদ্বাস্তুদের দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন বেশিরভাগ স্থানীয় মানুষ।

কিন্তু কেঁদে উঠেছিল ৩১ বছরের অরুণা মুখোপাধ্যায়ের মন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিক্রমপুরের কন্যা। স্বামী যদুলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনেক আগেই চলে এসেছিলেন গুয়াহাটিতে। স্বামী ছিলেন গুয়াহাটির কটন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যপক। অরুণাদেবী তাঁর সীমিত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবেন। পায়ের তলার মাটি হারানো পরিবারগুলির শিশুদের জন্য দুধের বালতি হাতে স্টেশনে ছুটেছিলেন অরুণাদেবী। সঙ্গে ছিলেন স্বামী যদুলাল বাবুও।

স্টেশনে গিয়ে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন তাঁরা। স্টেশনে প্ল্যাটফর্মে কাতারে কাতারে মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা না খেয়ে বসে আছেন। শিশুগুলি খিদের জ্বালায় কাঁদছে। নারীরা তাদের সামলাবার চেষ্টা করছেন। পরিবারের পুরুষগুলি হন্যে হয়ে একটু খাবার জোগাড় করা চেষ্টা করছে। বৃদ্ধ বৃদ্ধারা স্থানীয় বাজারে ভিক্ষা করছেন। খেতে না পেয়ে ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে থাকা শিশুগুলিকে, সবার আগে বাটি করে দুধ খাইয়ে দিতে শুরু করেছিলেন অরুণাদেবী। এভাবে পঞ্চাশ ষাটটি শিশুকে দুধ খাওয়াবার পর চার বালতি দুধ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন স্টেশন থেকে ফিরে আসছিলেন, তাঁকে অবাক করে দিয়ে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন শিশুগুলির মায়েরা। কাতর কন্ঠে তাঁরা বলেছিলেন, “মা গো, আমাদেরও খেতে দাও, আমরাও বাঁচতে চাই। আমরা মরে গেলে এদের কে দেখবে মা। আমাদের বাঁচাও।”

বাঁচতে চাওয়া মায়েদের কাতর আর্তি শক্ত করে দিয়েছিল অরুণাদেবীর চোয়াল। স্বামীকে বলেছিলেন তিনি কিছু পরিবারকে স্টেশন থেকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চান। স্বামী যদুলাল বাবু রাজি হননি। কিন্তু অরুণাদেবী স্বামীর কথা শোনেননি। কয়েকটি শরণার্থী পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরেছিলেন। নিজেদের বাড়িতে বেশি ঘর ছিল না। তাই বাড়ির বাগানে ত্রিপল খাটিয়ে পরিবারগুলিকে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। শুধু থাকার ব্যবস্থা করলেই হবে না। খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের জন্য ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য দুধের ব্যবস্থা করতে হবে।

শরণার্থীদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের সেনাপতির ভূমিকা নিতে লাগলেন অরুণাদেবী।  স্বামী, চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে গড়া সুখের সংসার লাটে উঠল। কারণ তিনি এখন ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষগুলোরও মা। শরণার্থীদের জন্য তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা, বাজার করা, বিছানাপত্রর ব্যবস্থা করা, নগ্ন শিশুগুলির জন্য জামা প্যান্ট চটির ব্যবস্থা করা, এ সবই একা হাতে সামলাচ্ছিলেন অরুণাদেবী।

অরুণা মুখোপাধ্যায়।

কিন্তু  একদিন সকালে,অরুণার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। স্বামী যদুলাল অরুণাকে বলেছিলেন, শরণার্থীদের বাড়িতে এনে তোলায় সংসারে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এ বার রাশ টানা দরকার। শরণার্থীদের এবার যথাস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া দরকার। অরুণা সেই মুহুর্তে বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি যুদ্ধে একা হয়ে গেলেন। কিন্তু তবুও লড়াই ছাড়েননি অরুণা। এবারও শোনেননি স্বামীর কথা। শরণার্থীরা কোথাও যাবেন না। তাঁর বাড়ির বাগানেই থাকবেন।

সেদিন থেকে স্বামীর প্রতি অভিমানে অরুণা চা আর বিস্কুট ছাড়া অনান্য সব কিছু খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্বামীকে বলেছিলেন অরুণার খাওয়া খরচাটুকু যেন অরুণার হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। সেটাই তিনি খরচ করবেন শরণার্থীদের জন্য।কিন্তু সেই সামান্য কটা টাকায় কি এতগুলো পেট চলে! স্বামী ও ছেলেমেয়েরা রোজ বাড়ি থেকে নিজেদের কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর, কাগজের ঠোঙা তৈরি করতেন অরুণা দেবী। তারপর সেগুলি গোপনে বিক্রি করে শরণার্থীদের সেবার জন্য টাকা জোগাড় করতেন।

সর্বক্ষণের সঙ্গিনীর সঙ্গে অরুণা দেবী।

কুড়িয়ে নেওয়া কাঠ ও খেজুরপাতা জ্বালিয়ে বাগানের মাটির উনুনে নিজে হাতে রান্না করতেন। চোখ ভরা জল নিয়ে অরুণাদেবীকে সাহায্য করতেন শরণার্থী মহিলারা। তাঁরা বুঝতে পারতেন, তাঁদের জন্যই জীবনযুদ্ধের আগুনে, উনুনের খেজুরপাতার মতই জ্বলছেন অরুণা দেবী। তাঁদের নতুন মা অরুণা দেবী। যিনি জীবনে আর ভাতই মুখে তোলেননি। কেন ভাত ছেড়ে দিয়েছিলেন অরুণা দেবী! তাঁর উত্তর ছিল, “হাজার হাজার লোক না খেয়ে আছে। আমি ভাত খাবো কোন মুখে!”

বেশ কয়েকমাস পরে, সরকারের তরফ থেকে গুয়াহাটির গান্ধী বস্তি এলাকায়, শরণার্থীদের থাকার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অরুণাদেবীর বাড়ি থেকে শরণার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে।এরপরও শেষ হয়নি অরুণাদেবীর যুদ্ধ, বরং বলা যায় নতুন করে শুরু হয়েছিল। শরণার্থী শিবিরে গিয়ে আপন হয়ে যাওয়া শরণার্থীদের নিয়মিত যত্ন ও দেখভাল করতেন অরুণাদেবী। দিনের পর দিন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে অরুণা দেবী একটা কথা বুঝেছিলেন। সর্বহারা মানুষগুলির মুখে শুধু খাদ্য জোগালেই হবে না। তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

মানুষের ভালোবাসা তাঁর সম্বল।

অরুণাদেবী শরণার্থী শিবিরে শুরু করেছিলেন সেলাই, বাটিকের নক্সা তোলা ও রান্না শেখানোর স্কুল। এই অসামান্য প্রচেষ্টাটি বাঁচিয়ে দিয়েছিল অসংখ্য ছিন্নমূল পরিবারকে। যাদের কাছে অরুণাদেবীকে ছিলেন সাক্ষাৎ ‘মা অন্নপূর্ণা’। ভারতের মাটিতে নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেছিল পরিবারগুলির নারীরা, অরুণাদেবীর হাত ধরে। পরবর্তীকালে অরুণাদেবীর একক প্রচেষ্টায় স্থাপিত হয়েছিল জেএলএম মেমোরিয়াল প্রাথমিক স্কুল। কিছু বছর আগে শুরু করেছেন গ্লাস পেন্টিং ও কাপড়ের খেলনা বানানোর স্কুল, আঁকার স্কুল এবং গান শেখানোর স্কুল।

অরুণাদেবীর বয়েস এখন ১০৪। বয়েসের ভারে দৃষ্টি হয়েছে ঝাপসা। কানেও ভালো শুনতে পান না আজকাল। রান্না শেখানোর ও বাটিকের নক্সা তোলার স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে কালের দাবি মেনে। তবুও অদম্য জেদ আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে প্রাথমিক স্কুল, সেলাই শেখানোর স্কুল, আঁকার স্কুল আর গান শেখানোর স্কুলগুলি চালিয়ে যাচ্ছেন অরুণাদেবী। সম্বল বলতে মানুষের ভালোবাসা আর নিজের প্রবল উৎসাহ।

পুরস্কার যাঁর কাছে গিয়ে ধন্য হয়।

১৯৬৮ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন স্বামী যদুলাল। উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরা সকলেই ভারত ছেড়েছিলেন একে একে। তিন ছেলেও প্রবাসে প্রয়াত হয়েছেন। এক ছেলে ও মেয়ে আজ জীবিত। তাঁরা কানাডা থেকে অরুণাদেবীর খবর রাখেন। ছেলেমেয়েরা অরুণাদেবীকে কানাডা নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অরুণাদেবী আজও কম বয়েসের মতোই নিজের ইচ্ছার প্রতি অনড়, ছেলেমেয়েদের বলেছিলেন, “এ দেশ, আর এ দেশের মানুষ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। বাঁচতে হলে এ দেশেই বাঁচবো, মরতে হলে এ দেশেই মরবো।”

অরুণাদেবী আজও নিঃসঙ্গ বা অসহায় নন। পল্টনবাজারের কেবি রোডের বাড়িতে সর্বক্ষণ ব্যস্ততায় কাটে তাঁর। সর্বক্ষণের সঙ্গিনী রূপা দেবনাথকে নিয়ে দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের হাতে তৈরি জেএলএম মেমোরিয়াল প্রাথমিক স্কুল, ঊষা এমব্রয়ডারি স্কুল, শিল্পী মিউজিক কলেজ ও আর্ট স্কুল। মাত্র কয়েক বছর আগে শুরু করেছেন বৃদ্ধাশ্রম। যার নাম দিয়েছেন ‘আনন্দধারা আপনগেহ’। শরণার্থীদের জন্য তাঁর হিমালয়সম অবদানের জন্য অরুণাদেবী পেয়েছেন ঐতিহ্যমণ্ডিত ‘ম্যাগসেসাই’ পুরস্কার।

গরীব মানুষদের ভাত জোটে না বলে তিনি আজও মুখে তোলেন না ভাত। গরীবদের গায়ে গরম পোশাক ওঠে না বলে কড়া শীতেও গায়ে দেন না গরম পোশাক। জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছেও অরুণাদেবীর লড়াই থামেনি, থামবেও না। অক্লান্ত অরুণাদেবী তাই তাঁর শতবর্ষ উদযাপনের সভায় বলিষ্ঠ কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন,”শতবর্ষ গুণে লাভ নেই। যত দিন বাঁচব ,মানুষের ভালবাসা পাথেয় করে আমি আমার কাজ চালিয়ে যাব। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে অরুণাদেবীর জীবনযুদ্ধের কথা শুনলে। সেই অরুণা মুখোপাধ্যায়, যাঁকে এই বয়েসে, আজও, মানবাধিকারের লড়াই চালিয়ে যেতে হয় পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের উঠোনে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More