মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

রাজনীতির সময়ক্রমে ইলিয়াসনামা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দেবত্র দে

ত্তর ঔপনিবেশিক বাংলা কথাসাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ভিন্ন ঘরানার এক ব্যতিক্রমী নক্ষত্রের নাম। যিনি ‘লেখকের দায়’ বলতে নির্দ্ধিধায় ঘোষণা করেন ‘দেশের কী জাতির গোড়ায় না গিয়ে যদি নিজের আর বন্ধুদের আর আত্মীয়স্বজনের স্যাঁতসেতে দুঃখবেদনাকেই লালন করি তো তাতে হয়ত মধ্যবিত্ত কী উচ্চবিত্তের সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, কিন্তু তা থেকে তারা নিজেদের জীবনযাপনে যেমন কোনও অস্বস্তি বোধ করবে না, তেমনই পাবে না কোনও প্রেরণাও। তা হলে আমার যাবতীয় সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে মনে হবে নেহাতই তোতলা বাখোয়াজি’। তিনিই  প্রশ্ন তুলতে পারেন “কিন্তু ‘কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ এই জেদ না থাকলে কারও শিল্পচর্চায় হাত দেওয়ার দরকার কি?” আর তাই হয়তো ইলিয়াসের চরিত্রগুলি আমাদের সামনে হাজির হয় তাদের সমস্ত ক্ষুদ্রতা, সীমাবদ্ধতা নিয়েই (যেমন হাড্ডি খিজির মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিলেও সুযোগ বুঝে গন্ডগোলের বাজারে সওয়ারির কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিতে দ্বিধা করে না বা বৈকুন্ঠ মুসলমান ফকিরের গানের একান্ত ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও সেই ফকিরের নাতনির হাতে জলগ্রহণ করে না জাত হারানোর ভয়ে) কিন্তু তার গভীরে লুক্কায়িত থাকে এক গভীর আশাবোধ- আর এখানেই ইলিয়াস অনন্য।

বিশিষ্ট সমালোচক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন ‘ইলিয়াসের অভিপ্রেত পাঠক ও আবেদনের মূল লক্ষ্য বিশেষ এক গোষ্ঠীর লোকজন। সংখ্যায় নগন্য হলেও তাদের রোখ আছে, রোষ আছে, কায়েমি স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যোঝবার জোর আছে’। কিন্তু প্রয়াণের দু’দশক পরে ইলিয়াস আজ বহুপঠিত ও বহুচর্চিত, তাঁর সাহিত্যে যাদু বাস্তবতা বা স্বপ্নের ভূমিকা বহু আলোচিত, তিনি  এখন বহু পিএইচডি–র সাঁকো, কিন্তু তাঁর সাহিত্যের সময়ক্রম যা আসলে দ্রোহকাল তা নিয়ে খুব কমই আলোকপাত হয়েছে।

ইলিয়াস নিজের সময়কে ধরার চেষ্টা করেছেন বহুমাত্রিকতায় ‘তার ক্ষোভ, তার গ্লানি, তার ব্যর্থতা, তার অসহায়ত্ব, তার অসন্তোষ’ সবটা নিয়েই, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আকালের শিকড় ধরে দেশভাগ ও দাঙ্গার মর্মান্তিকতা, ১৯৬৯ এর পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহে সাধারণ শ্রমজীবীর প্রাবল্য অতিক্রম করে পৌঁছয় মুক্তি যুদ্ধোত্তর হতাশায়। তাঁর ভাষায় ‘আমাদের জন্মকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চার বছরে পা দিয়েছে, গোটা বাংলা জুড়ে দুর্ভিক্ষ। যুদ্ধ, দাঙ্গা ও দেশ ভাগের ঘটনা দিয়ে আমাদের শৈশব চিহ্নিত’- এ এক গভীর রাজনৈতিক যাপন। খাদ্যের অভাবে চল্লিশ লক্ষ বাঙালির পরিকল্পিত গণহত্যার সন্ধিক্ষণে ১৯৪৩ সালে ইলিয়াসের জন্ম অবিভক্ত বাংলার উত্তরপ্রান্তের বগুড়াতে যে অঞ্চল ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে তেভাগার শ্রেণী চেতনায় ধৌত।

ইলিয়াসের দুটি উপন্যাসের একটির প্রেক্ষিত দেশভাগ অপরটি পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ঘিরে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেশভাগ নিয়ে লেখা ‘খোয়াবনামা’ প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘চিলেকোঠার সেপাই’ প্রকাশের দশ বছর বাদে ১৯৯৬ সালে, অর্থাৎ ইলিয়াস সময়ের জটিলতাকে  ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মোহভাবে যা কোনওভাবেই ব্যক্তি স্মৃতিনির্ভর নয়। ইলিয়াস তাঁর প্রবন্ধে সরাসরি বলেছেন ‘শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র বহু শতাব্দীর নিদারুণ শোষণের ফল। ইতিহাসের যতদূর দেখা যায়, বাংলার নিম্নবিত্তের স্বচ্ছল ছবি পাই না। এক হাজার বছর আগেকার বাংলা কবিতায় মানুষের নিত্য উপবাস খবর আছে’ তাই ‘কথা সাহিত্যিকের কাজও তাঁর সত্যটিকে প্রকাশ করা। কিন্তু মানুষের জীবনযাপন সেখানে খুব জরুরি বিষয়। এই জীবনযাপন বেশিরভাগ সময়েই একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর। কান টানলে যেমন মাথা আসে, ব্যক্তির জীবন বলতে গেলে চলে আসে সমাজ। সমাজের বাস্তব চেহারা তাঁকে তুলে ধরতে হয় এবং শুধু স্থিরচিত্র নয়, তার ভেতরকার স্পন্দনটিকে বুঝতে পারা কথাসাহিত্যিকের প্রধান লক্ষ্য’। আর সেই লক্ষ্যে স্থিত থেকেই ইলিয়াসের ভূমিহীন তামিজ বা রিক্সা চালক হাড্ডি খিজির শোষণের জাল ছিন্ন করতে রাষ্ট্রের উদ্ধত বন্দুকের মুখোমুখি হতে দ্বিধা করে না জীবনকে বাজি রেখেই।

ইলিয়াস বিশ্বাস করতেন দেশভাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক মর্মান্তিক, শোচনীয় ও অর্থহীন ঘটনা, বর্তমান সময়েও যে বোধ খুব প্রাসঙ্গিক দুই বাংলার মানুষের জীবন যাপনে। সেই বোধ থেকেই মূঢ় সময় তার সব ক্লীবতা নিয়ে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে খোয়াবনামা–য়। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি নিজের স্ত্রীকে বলেছিলেন এই উপন্যাস ভবিষ্যতের ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষকদের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে রিক্ত বাংলার এক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আখ্যান এই মহাকাব্যিক উপন্যাস যা শুরু হচ্ছে অবিভক্ত বাংলার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে আকালজনিত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির করাল ছায়া ভূমিহীন তামিজের তিনজনের পরিবারকেও কিভাবে ছোবল দিচ্ছে তার বর্ণনা দিয়ে।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলায় তৈরি করল এমন এক শ্রেণীর জমিদার যাদের সঙ্গে চাষবাসের কোনও সর্ম্পকই নেই, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িও যার ব্যতিক্রম নয়। উচ্চবর্ণীয় এই নব্য জমিদার ও তাদের সহচরদের বাস মূলত তৎকালীন রাজধানী কলকাতা কেন্দ্রিক। বিপ্রতীপে বিশেষত পুব বাংলার গ্রামে গ্রামে এই জমিদারদের প্রজাদের অধিকাংশই নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলমান (খোয়াবনামায় উল্লিখিত এলাকায় জমিদারের নায়েবের হিসেবে ১০ আনা প্রজাই মুসলমান আর চার আনা নমশুদ্র)। এই প্রসঙ্গে তাঁর অমোঘ উক্তি ‘বাঙালি নিম্নবর্ণের নিম্নমধ্যবিত্তের হিন্দু ও মুসলমানরা কিন্তু অনেক ব্যাপারে অনেক কাছাকাছি আছেন। এটা কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে তুমি চিন্তা করতে পারবেনা’। কিছুদিন পূর্বে ছেড়ে আসা দেশ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মিহির সেনগুপ্তও একই সুরে কথা বলেছেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থে। কিংবা সুনন্দা শিকদারের লেখা ‘দয়াময়ীর কথা’তেও এর প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। বিস্তীর্ণ এই প্রেক্ষাপটে গরীব চাষীদের ওপর নেমে আসে স্থানীয় জমিদার বা সামন্তপ্রভুর শোষণ যা কিনা পরিস্ফুট হয় চাষের পর ফসলের ভাগ নিয়ে জমিদারের কড়া দর কষাকষিতে।

খোয়াবনামা’র কেন্দ্র  চরিত্র তামিজ এক ভুমিহীন চাষি, যে বংশগতভাবে মৎসজীবী, কিন্তু গ্রামের যে বিলে এতদিন অবধি জেলেদের অধিকার ছিল আজ তা স্থানীয় জমিদার শরাফৎ মণ্ডলের দখলে। এই বিলের দখলদারি নিতে মণ্ডলকে অনেক বাঁকাচোরা পথে হিন্দু নায়েবকে রাজি করাতে হয়েছে, ফলে এ বিল আর সাধারণের নয়, জেলের ছেলে তামিজেরও তাই বংশগত পেশা ছেড়ে বর্গার স্বপ্ন ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। উপন্যাসের শুরুতে তামিজ ছিল এক নিষ্ঠাবান প্রজা যে কিনা জমিতে জমিদারের অধিকারকে হক বলেই মনে করত যদিও কৃষিশ্রমিক হিসেবে অন্য এলাকায় সে দেখে এসেছে তেভাগার আপোষহীন লড়াই। জমিদারের প্রতি তার এই আনুগত্য অবশ্য শরাফৎ মণ্ডলের কাছ থেকে এক টুকরো জমি বর্গা পেতে তাকে সাহায্যই করেছে। কিন্তু বুক ভরা আশা নিয়ে তার শ্রম ও স্বপ্নের বিনিময়ে ওঠা সোনার ফসলের বেশিটাই হাতছাড়া হয় জমিদারের হিসেবের ছল চাতুরিতে। আর এই পটভূমিতেই পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের গ্রামে গ্রামে জেগে ওঠে তেভাগার দাবি – ফসলের দু’ভাগ চাষির এক ভাগ জমিদারের।

একদিকে ঔপনিবেশিক শাসন আর অন্যদিকে দেশীয় জমিদারের শোষণ – এই দুই সাঁড়াশি চাপে বাংলার চাষি নিমজ্জিত হয় এক চিরকালীন অভাবের অন্ধকারে। ইলিয়াসের ঝাঁঝালো ভাষা ‘আমাদের গ্যাস্ট্রিক আলসারের উৎস আমাদের দমবন্ধ করা শান্তি নয়– দীর্ঘদিনের অনাহার, অর্ধাহার। হ্যাঁ, অনাহার ও অর্ধাহারই হল আমাদের আলসারের প্রধান কারণ। বহুকাল থেকে আমরা ঠিকমতো খেতে পাই না’– আমাদের জড় চেতনায় তীব্র কষাঘাত করে। ‘খোয়াবনামা’য় ইলিয়াস তেভাগাকে হাজির করেন দেশভাগের বিপ্রতীপে, শ্রেণী স্বার্থ ও কায়েমি স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকটতর হয় সময়ের দাবিতে। মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ছিল মূলত মধ্যবিত্ত ও অভিজাত মুসলমান সম্প্রদায়ের দখলে, যাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক উচ্চাকাঙ্খাই ছিল পাকিস্তানের দাবির ভিত্তি। যে তামিজ ছিল জমিদারের একনিষ্ঠ প্রজা ঘটনার পরম্পরায় তেভাগার স্পর্শে তার জৈবিক রূপান্তর হয়, তার  শ্রেণী সচেতনতা তাকে শেষ অবধি চালিত করে এক আপোষহীন সংগ্রামের পথে।

সমালোচকদের দৃষ্টিতে লেনিনের আরোপিত শ্রেণী চেতনার বদলে রোজা লুক্সেমবার্গের জীবনের অভিজ্ঞতায় জৈবিক রূপান্তরের এক ভাষ্য এই খোয়াবনামা। উপন্যাসের সময়ক্রম যত এগোয়, একদিকে তেভাগার দাবি যত জোরালো হয়ে ওঠে, মুসলিম লীগ তাকে ‘কিডন্যাপ’ করে দেশভাগের কাজে লাগায়। বাধ্য হয় তেভাগার দাবিকে আপাত স্বীকৃতি দিতে তাদের নানা মিছিল ও সভায়। দেখা যায় লোকগায়ক কেরামত আলী যার চেতনায় রয়েছে তেভাগা, যার গানে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মায়েরাও, তাকে দিয়ে জোর করে পাকিস্তানের গান করাবার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এই কেরামত আলীকেও ইলিয়াস এনেছেন চিরাগ আলী্র পাল্টা এক আধুনিক বয়ান হিসেবে যে কিনা নিজেই লেখে নিজেই গায় সময়ের দাবিতে তেভাগার গান। বিপ্রতীপে চিরাগ আলী যে কিনা আবার তামিজের সৎ মায়ের দাদু গাইতেন স্বপ্নে পাওয়া গান ও ব্যাখ্যা করতেন মানুষের দ্যাখা স্বপ্নের যা আসলে বহু যুগ বাহিত সামন্ততান্ত্রিক সংস্কারকেই প্রতিফলিত করে। আবার পাকিস্তানের সমর্থক কালাম মাঝির হাতে কেরামতের খুন যেন কায়েমি স্বার্থের কাছে শ্রেণীস্বার্থ জড়িত  তেভাগার অকাল মৃত্যকেই  দ্যোতনা দেয়।

স্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে এসে হাজির হয় দেশভাগ ও দাঙ্গা আর ক্রমশই বিলীন হয়ে যেতে থাকে তেভাগার দাবি। খোয়াবনামার শেষ পর্যায়ে তেভাগা নিয়ে তামিজের তীব্র উৎকন্ঠা স্পর্শ করে না তাদের যারা এককালে তামিজকে তেভাগার খোয়াব দেখিয়েছিল। প্রতারিত তামিজ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার বাবা, সৎ মা, ছেড়ে আসতে হয় তাঁর গ্রাম যেখানে তাঁর স্ত্রী ও একবারের জন্যও না দেখা কন্যা রয়ে যায়। স্বাধীন দেশে তামিজ আর ফিরতে পারে না তার ছেড়ে আসা গ্রামে বরং মুক্তি খোঁজে যখন নিরক্ষর তামিজ জীবনে প্রথমবারের মত পড়ে ফেলে ‘সান্তাহার’ স্টেশনের নাম এবং পথ চলা শুরু করে তার সারাজীবনের আশা, স্বপ্ন তেভাগার সন্ধানে।

স্বাধীনতার সিকি শতাব্দীর পরের প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’। স্বাধীনতা এলেও তামিজের ‘স্বপ্ন’ থেকে যায় অধরা বরং আবির্ভাব হয় অভিজাত ও মধ্যবিত্তের মিশেলে এক প্রভাবশালী শ্রেণীর যাকে ইলিয়াস অভিধা দেন ‘বেসিক ডেমোক্রাট’ হিসেবে। সময়ের ধারায় পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্তির জন্য হাঁসফাঁস করে পূর্ব পাকিস্তানের আম জনতা, মাতৃভাষার অধিকার আরও বিস্তৃত করে এই ক্ষোভের পরিসর। ধীরে ধীরে তা গণবিদ্রোহের চেহারা নেয় ১৯৬৯ সাল নাগাদ। ইলিয়াসের ভাষ্যে সাধারণ মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে অভূতপুর্ব এই জনআন্দোলন, যার ফলে শুধু রাষ্ট্র নয়, সামাজিক শোষণ পদ্ধতিটিই আক্রান্ত হয়েছিল। এখানেও দেখা যায় যখন বিপুল পরিমাণ সাধারণ মানুষ মুক্তির নেশায় জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে সামিল তখন গ্রাম ও শহরের কায়েমি স্বার্থ সেই আন্দোলনের পিছন থেকে টেনে তাকে দুর্বল করতে চাইছে।

এই উপন্যাসের অন্যতম মূল চরিত্র শিক্ষিত ও নির্ভেজাল ওসমানেরও জৈবিক পরিবর্তন হয় ঢাকা শহরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া  মানুষের অনর্গল আন্দোলনের স্পর্শে এবং ওসমানের রূপান্তরের ক্ষেত্রে অনুঘটক হয় হাড্ডি খিজির যে পেশায় রিক্সাচালক যার মা ও বৌ দুজনেই  আবার মহাজনের সম্পত্তি। খিজির তাঁর সব দ্বিধাদ্বন্দ্বকে জয় করে ঝাঁপায় মুক্তি আন্দোলনে এবং মিলিটারির গুলিতে রাজপথে তার শহীদের মৃত্যু হয়। খিজিরের মৃত্যু ওসমানের মানসিক স্থিরতায় তীব্র আঘাত হানে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় কাহিনীর শেষ অবধি। অন্যদিকে বামপন্থী আনোয়ার ব্যর্থ হয় তার কর্তব্য পালনে, তার দলের কর্মীরা যখন তাকে দায়িত্ব দেয় জমিদারকে পাহারায় রাখতে যাকে কিনা ক্ষিপ্ত গ্রামবাসী তার এতদিনের অত্যাচারের প্রতিশোধে মৃত্যুদণ্ড সাব্যস্ত করে।

শহুরে অধ্যাপক আনোয়ারের ভূত নিয়ে সাময়িক দ্বিধার মাধ্যমে ইলিয়াস সমাজের গভীরে বাস করা দীর্ঘদিনের ব্যাধিকে উন্মুক্ত করে দেন। ইলিয়াসের মতে ওসমান আর আনোয়ার একই মানুষের দুটি অংশ। একই মানুষের দুটি সত্তাকে ভাগ করে দুটি মানুষের মধ্যে দেখানো হয়েছে আর খিজির আসলে একটি চরিত্র নয়, অনেকগুলি চরিত্রের সমাহার। অপরপ্রান্তে সর্বহারা চেংটু কিন্তু দ্বিধাহীন চিত্তে শুধু গ্রামীণ সংস্কারকে অতিক্রম করে বটগাছের ডালপালা পরিষ্কার করতে দ্বিধা করে না। জমিদারের বিচার সভার আয়োজনই করে না, সে প্রস্তুত থাকে অত্যাচারী জমিদারকে নিজে হাতে নিকেশ করতে, কারণ ইলিয়াসের ভাষায় এ ছাড়া এই অংশের মানুষের আর অন্য কোনও উপায়ও ছিল না কারণ না করলে তারা মারা পড়ত।। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন যত জোরদার হয় ততই জেগে ওঠে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, হারিয়ে যেতে থাকে চেংটু বা হাড্ডি খিজিরের শোষণ মুক্তির স্বপ্ন।

এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনি তাঁর অনন্য ভঙ্গিতে প্রশ্ন তুলেছেন ‘কমপ্লিট ইমান্সিপেসান’ এর লক্ষ্যে কি এই আন্দোলন শেষ অবধি দায়বদ্ধ থাকবে?  ইতিহাসের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধকে তিনি চিহ্নিত করেছেন ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে তেভাগা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ মানুষের মুক্তির বিপুল প্রত্যাশার ধারাবাহিকতায়। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কে তিনি চিহ্নিত করেছেন বিপুল স্বপ্নভঙ্গ ও হতাশার কাল হিসেবে, আবারও যেন কায়েমি স্বার্থের কাছে পরাভূত হল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির বিপুল আকাঙ্ক্ষা।

আর এই হতাশাই যেন ইলিয়াসের ছোটগল্পের মূল উপজীব্য। তাঁর মতে ছোটগল্প জন্মলগ্ন থেকেই বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির রোগ ও ক্ষয়কে তীক্ষ্ণভাবে নির্ণয় করে আসছে। বর্তমান কালের বাংলা ছোটগল্পের হাল হকিকত দেখে তার সমাজ সম্পৃক্ত মনের প্রশ্ন, বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে? একদা এক সাক্ষাৎকারে ইলিয়াস বলেছিলেন তার ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ সেভাবে না আসার কারণ তিনি এই নিয়ে একটি উপন্যাস লেখায় ব্রতী।

দেশভাগের পর ছিন্নমূল এক হিন্দু পরিবারের উচ্ছেদের বেদনাই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের (১৯৭৬) প্রথম গল্পটির বিষয়। ছোটগল্পে ইলিয়াসের অন্যতম বিষয় সংখ্যালঘুর চাপা পড়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর। অন্য একটি গল্পে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থবান ও প্রভাবশালী অংশ কৌশলে গ্রাস করে নেয় সমরজিতের বাড়ির এক অংশ, যে বাড়ি এখন শুধু বয়ে বেড়াচ্ছে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন, যা সমরজিতকে ঠেলে দেয় এক অনন্ত হতাশার আঁধারে।

‘অপঘাত’ গল্পে পশ্চিম পাকিস্তানের মিলিটারি আগ্রাসনের প্রতি ইলিয়াস ঘৃণা উগরে দেন এই ভাষ্যে ‘মিলিটারি কলেরার মত আসে, মিলিটারি ম্যালেরিয়ার মত আসে’ আর বন্দুকের গুলিতে বীরের মত মারা যায় গ্রাম থেকে পড়তে যাওয়া কিশোর ছাত্র, দাগ রেখে যায় আপাত সুখে থাকা সমবয়সি মরণাপন্ন আর এক পড়শি কিশোরের মনে।

অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের হতাশা ঠিকরে বেরোয় তার বিখ্যাত গল্প ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পে। গল্পের শেষে কিশোরী মিলি মুক্তিযুদ্ধে ব্যাবহৃত একটি স্টেনগান তুলে দেয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া আব্বাস পাগলার হাতে – নিজের দাদা ও তার বন্ধুদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের প্রভাব ও সম্পদ বৃদ্ধির প্রতি মিলির এ যেন এক প্রতীকী প্রতিবাদ যার উৎস মনের গভীরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গোটা জাতির বিপুল হতাশা। অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের মতে ইলিয়াস আসলে ছোটগল্পে কথা বলেছেন ভবিষ্যতের সঙ্গে। আমাদের ভাবতে বাধ্য করে বর্তমানের হতাশাই কি তাঁকে ঠেলে দেয় সম্ভবনাময় ভবিষ্যতের দিকে!

কারও মতে ইলিয়াসের সাহিত্য আসলে বিদ্রোহাত্মক, যা সমাজের গভীরে গিয়ে সমাজের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমাজের বিভিন্ন চরিত্রের তত্ত্বতালাশ চালায় অসুখের উৎস সন্ধানে। একসময় মনে হয় খোয়াবনামার তামিজ পুঁজিবাদের অগ্রগমনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভিটে মাটি, উৎপাদনের হাতিয়ার হারিয়ে পরিণত হয় শহুরে সর্বহারা খিজির-এ, যার সামনে শোষকের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধে নামা ছাড়া আর কোনও গতি নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্ধশতাব্দী যা ইলিয়াসের সময়কাল, তাতে ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত এই উপমহাদেশের নিম্নবিত্ত মানুষের ক্রমমুক্তির আশা  সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাশায় পরিণত হয়। সেই বিপুল বেদনা ও স্বপ্নভঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইলিয়াসের উপন্যাস, ছোটগল্প ও নানা প্রবন্ধে। নিম্নবিত্তের প্রতিদিনের যাপন জুড়ে থাকে অজস্র সামাজিক ও বৌদ্ধিক প্রতিকুলতা কিন্তু সেই নিরবিচ্ছিন্ন আঁধারেও সন্ধ্যাপ্রদীপ হয়ে বেঁচে থাকে তাঁর অদম্য লড়াই, বেঁচে থাকার আকণ্ঠ ইচ্ছা। তাঁরই ভাষ্যে ‘এতো জুলুম আর শোষণের পর এই জানোয়ার সুলভ জীবনযাপন করেও এরা যে মানুষ রয়ে গেছে তারই নিশান টাঙিয়ে রেখেছে নুয়ে পড়া বেড়ার গায়ে’ –  ইলিয়াসপাঠ আমাদের সামগ্রিক ভাবে সেই বোধে উপনীত করে কারণ তাঁর মতে লেখকের কাজই জীবনকে অর্থবহ করে তোলা।

লেখক বগুলা’র শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক

Share.

Comments are closed.