উনিশের ভোট আসছে, হয়তো ভয় পেল বিজেপি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শোভন চক্রবর্তী

    যৌন হেনস্থার অভিযোগে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন। কেন্দ্রে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর জমানায় এ বড় বিস্ময়কর ঘটনা বইকি! কারণ, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ শুধু আকবর সাহেবের সরে যাওয়া তো নয়, বরং বলা যেতে সাউথ ব্লকে তাঁর সতীর্থের বিরুদ্ধে #মি টু প্রতিবাদের যে ঢেউ উঠেছিল, শেষমেশ তার সামনে মাথা নিচু করতে বাধ্য হলেন মোদী-অমিত শাহ! যা কিনা তাঁদের রাজনৈতিক ব্যাকরণেই নেই! কিন্তু কী এমন হল এক্কেবারে উলটপুরাণ ঘটে গেল!

    বিজেপি-তে লালকৃষ্ণ আডবাণী-অটলবিহারী বাজপেয়ী জমানা অবশ্য ছিল অন্যরকম! জৈন হাওয়ালা কাণ্ডে তাঁর নাম ওঠার পরেই বিনা বাক্য ব্যয়ে ইস্তফা দিয়েছিলেন আডবাণী! বাজপেয়ীর নিষেধও শুনতে চাননি তিনি। টেলিকম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০০৩ সালের গোড়ায় তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন মন্ত্রী প্রমোদ মহাজনকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাজপেয়ী। টুঁ শব্দও করতে পারনেনি প্রমোদ। ছত্তীসগড়ে ভোটের আগে স্টিং অপারেশনে দুর্নীতি ধরা পড়ার মাশুল দিতে হয়েছিল দিলীপ সিংহ জুদেও-কেও। এমন দৃষ্টান্ত সে সব সময়ে ছিল ভুরি ভুরি। কারণ, বাজপেয়ী এবং আডবাণী উভয়েরই মত ছিল, রাজনীতিতে নৈতিকতা সর্বোপরি।

    মোদী-অমিত শাহ-র বিজেপি-তে গত প্রায় পাঁচ বছরে সে সব ঘটনা অতীতের উপাখ্যান হিসাবেই থেকে গিয়েছিল। তার কারণও রয়েছে। বাজপেয়ী-আডবাণী বরাবরই রাজনীতি করেছেন সর্বভারতীয় স্তরে। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আর পাঁচটা আঞ্চলিক দলের নেতার মতোই মোদী ছিলেন বিজেপি-র আঞ্চলিক নেতা। এবং এ ব্যাপারে মায়াবতী, মুলায়ম, লালু, নীতীশ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনও ফারাক নেই। ‘আমি যা বলব সেটাই শেষ কথা!’। যৌন হেনস্থার অভিযোগ, দুর্নীতি, খুনের অভিযোগ, চিটফাণ্ড মামলায় অভিযুক্ত থেকেও এই সব আঞ্চলিক দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বা মন্ত্রী হিসাবে থাকা যায়। কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করে সেই সংস্কৃতিই শুরু করেছিলেন মোদী-অমিত শাহ।

    তাই আইপিএল কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ললিত মোদীকে ভিসা পাইয়ে দেওয়ার পরেও বহালতবিয়তে বিদেশ মন্ত্রী পদে থেকে গিয়েছেন সুষমা স্বরাজ, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও স্বমহিমায় রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া, মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারির অভিযোগ টলাতে পারেনি শিবরাজ সিংহ চৌহানের গদি, একই ভাবে রেশনে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও ছত্তীসগড়ে মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহের স্বাস্থ্যের উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। মেজাজটা এমনই ছিল যে, আমরা যখন বলছি দুর্নীতি হয়নি, তো হয়নি। আর কোনও কথা হবে না!

    মি টু পর্বে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর প্রসঙ্গেও গোড়ায় একই অবস্থানই নিয়েছিলেন মোদী-অমিত শাহ। আকবর যখন সংবাদপত্রের সম্পাদক, অভিযোগ সে সময়ে সহকর্মীদের যৌন হেনস্থা করেছিলেন তিনি। এতোদিন পরে সেই অভিযোগ যখন উঠছে, তখনও সুষমা স্বরাজ থেকে প্রধানমন্ত্রী সকলেই এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করছিলেন। এবং বিদেশ সফর সেরে দেশে ফেরার পর তাঁর রাজনৈতিক প্রভুর মত নিয়ে আকবরও তাই হম্বিতম্বি করে বলেছিলেন ইস্তফার প্রশ্ন নেই। উল্টে অভিযোগকারী সাংবাদিক প্রিয়া রমানির বিরুদ্ধেই মানহানির মামলা ঠুকেছিলেন। সেই সঙ্গে আইনজীবীদের বাহিনী দেখিয়ে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু যে ভাবে একে একে কুড়ি জন মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন, তাতেই সম্ভবত এ বার সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন মোদী-অমিত শাহ।

    সামগ্রিক ভাবে দেশের অর্থনীতি প্রায় রসাতলে। একে বৃদ্ধির হার আশানুরূপ নয়, নতুন বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। টাকার অবমূল্যায়ন হতে হতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে এখনও ঠাহর করা যাচ্ছে না। উপরি পেট্রলের দাম যে ভাবে বাড়ছে তাতে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অচিরে তা একশো টাকা ছুঁয়ে ফেলবে। এবং তা হলে পেট্রল পাম্পের পুরনো মেশিনগুলিই বদলে ফেলতে হবে।

    সম্ভবত, এই অবস্থায় আর নতুন কোনও ঝুঁকি নিতে চাইলেন না মোদী-অমিত শাহ। উনিশের ভোটের আগেই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন আসছে। যাকে এক প্রকার সেমি ফাইনাল বলা যেতে পারে। সেখানে ভোটের প্রচারে, তিন তালাক প্রথা বন্ধ, উজ্জ্বলা যোজনার বাস্তবায়নকে মহিলাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত বলে যখন তুলে ধরছেন তাঁরা তখন আকবর কাণ্ড পিছন থেকে টেনে ধরছিল বইকি। পরিষ্কার বার্তা যাচ্ছিল, কুড়ি জনেরও বেশি প্রাক্তন সহকর্মী কারও বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করলেও, তাঁকে সম্মানের সঙ্গে মন্ত্রিসভায় রেখে দিতে পারেন নরেন্দ্র মোদী! হতে পারে সেই ঠ্যালায় পড়েই এ বার তাঁদের রাজনৈতিক ব্যাকরণেও ব্যতিক্রম ঘটালেন মোদী-শাহ।

    তা ছাড়া আকবর ছিলেন বিদেশ মন্ত্রী। বিশ্বের কোনও উন্নত দেশে কোনও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ হেন অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে ইস্তফা দিতে বলাই দস্তুর। ফলে এর পরেও আকবরকে সাউথ ব্লকে রেখে দিলে দেশের বাইরেও ভাল বার্তা যেত না।

    অগত্যা মি টু ঢেউয়ের সামনে মাথা ঝোঁকাতেই হল মোদী-শাহকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More