শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

কাশ্মীর সমস্যা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই

সিদ্ধার্থ গুহ রায়

কাশ্মীর: রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতন্ত্র ও জনমত||মিঠুন ভৌমিক|| গুরুচন্ডালী||২০১৮|| ৬০ টাকা

১৯৪৭ সাল পরবর্তীকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় কাশ্মীর সমস্যা। কাশ্মীর সমস্যা ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়। কাশ্মীরের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানেরও স্বার্থ জড়িত। প্রথম থেকেই কাশ্মীর সমস্যা জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে একটি আন্তর্জাতিক সমস্যার রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের শাসকেরা এই সমস্যার সমাধানে চুড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কাশ্মীরের মানুষ। ভারত ও পাকিস্তানের শাসকেরা সঙ্কীর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার তাগিদে কাশ্মীরকে তাদের দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে। এই দুই দেশের শাসকরাই কাশ্মীরের মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্খার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান প্রদর্শন না করে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে উপত্যকার সমস্যাকে জটিল করে তুলেছেন।

ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে কাশ্মীর সমস্যার প্রতি আমার উৎসাহ প্রায় দু’দশক ধরে। সেই সমস্যার প্রতি গভীরভাবে আলোকপাত করে লেখক মিঠুন ভৌমিক অবশ্যই আমাকে উল্লসিত করেছেন। বইটি প্রসঙ্গে আলোচনায় আসার আগে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরী। বইটির ভূমিকায় ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার লিখেছেন – “ইংরেজীতে অজস্র বইয়ের সম্ভার থাকলেও বাংলা ভাষায় আমি অন্তত কাশ্মীর সমস্যার ওপর কোনো বইয়ের খবর জানি না। সেদিক থেকে মিঠুন পথিকৃৎ হতে পারেন”। এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই যে আমার লেখা কাশ্মীর: মুক্তিসংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস – একটি সমকালীন ইতিহাস গ্রন্থটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়েছেল। ইতিমধ্যে বইটির তিনটি সংস্করণ ও তিনটি পুনর্মুদ্রণ হয়ে গেছে। তথাপি একথা বলতে দ্বিধা নেই যে বইটি ইন্দ্রনীল বাবুর অজ্ঞাত থেকে যাওয়ার দায় ও ত্রুটি আমার।

এবার বইটির প্রসঙ্গে আসা যাক। বইটি অত্যন্ত সুলিখিত এবং তার ফলে সহজপাঠ্য। বিভিন্ন ধরণের তথ্যের ব্যবহার কিন্তু বইটিকে তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত করেনি। বইটি পড়লেই বোঝা যায় যে বিগত তিন দশক ধরে কাশ্মীরের ঘটনাবলী মিঠুনকে গভীরভাবে বেদনাহত করেছে। সেই বেদনাবোধ থেকেই তিনি কাশ্মীর সমস্যা বুঝতে চেয়েছেন ও পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছেন। উপত্যকার মানুষ কেন দেশের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন, কেনই বা ভারত রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সুগভীর অভিমান – এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন মিঠুন। উপত্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতা গণতন্ত্র ও জনমতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে কিনা সে বিষয়েও লেখক চমৎকার আলোচনা করেছেন।

লেখক তাৎক্ষণিক ভাবে কাশ্মীর সমস্যায় চলে আসেননি। বর্তমান সমস্যার উৎস অনুসন্ধান তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। খ্রীষ্টপূর্ব কাল থেকে ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনাবলীর কালানুক্রমিক বিবরণ অবশ্যই বইটির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সমস্যার উৎস সন্ধানে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকদের ভূমিকা, ১৯২০ র দশকে সাম্প্রদায়ক দাঙ্গা, ন্যাশনাল কনফারেন্স গঠন ইত্যাদি বিষয়ও লেখক তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে তথ্যের সামান্য ভ্রান্তির কথা উল্লেখ করছি। লেখক লিখেছেন “১৯২৩ এর নাগপুর দাঙ্গার পর কে বি হেগড়েওয়ার নাগপুরে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন” (পৃঃ ২৭)। একথা অনস্বীকার্য যে আরএসএসগঠনের পেছনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার একটা ভূমিকা ছিল। তবে আরএসএস গঠিত হয়েছেল ১৯২৫ সালে।

আলোচ্য গ্রন্থটির দুটি পর্ব গুরুত্বপূর্ণ – পর্ব ৫ ও পর্ব ৭। পর্ব ৫ এ তিনি আর্মড ফোরসেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট অর্থাৎ আফস্পা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আফস্পার অতি বড় সমর্থকও আশা করি অস্বীকার করবেন না যে এই আইনটি সামরিক বাহিনীর হাতে বিপুল ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ১৯৯০ সাল থেকে চালু হওয়া আফস্পা আজও কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। শাসক ও সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী উভয়কেই মনে রাখতে হবে উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এই সংকটের মীমাংসা করতে অক্ষম।

পর্ব ৭ এ লেখক ‘আমজনতার ইতিহাস পাঠ’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিভিন্নধর্মী ইতিহাস চর্চা মিঠুনকে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত করেছে। অন্তত তিনি নিজেই তা স্বীকার করেছেন। কিন্তু, ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে আমি মনে করি ইতিহাস চর্চা কখনোই সমরূপী না একধর্মী হতে পারে না। ইতিহাসের তথ্যকে ঐতিহাসিকরা তাদের মতো করে প্রশ্ন করেন বা বিশ্লেষণ করেন। যে বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে যুক্তিনিষ্ঠ ও তথ্যনিষ্ঠ বলে মনে হয়, সেটাকেই পাঠক গ্রহণ করেন, আর তাছাড়া প্রকৃত ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে বড়ো প্রতিবন্ধকতা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। প্রখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক জাঁ শ্যানো লিখেছেন – “পৃথিবীর ইতিহাসে সেটুকু অংশেরই অস্তিত্ব আছে, যেটুকু অত্যাচারীরা আমাদের জানতে অনুমতি দিয়েছে। Entire sections of the World history have no other existence than what the oppressor permitted us to know of them – Jean Chesneaux ,Past and Futures or What is History For, London, 1978, p.11)। কাশ্মীরের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য।

লেখকের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি সহমত যে বিগত তিন দশক জুড়ে কাশ্মীর এক বধ্যভূমি উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচারে বিপুল সংখ্যক কাশ্মীরী প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯০ এর দশকে অসংখ্য কাশ্মীরি ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান’ এর শিকার। এই হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বাবা মা উপত্যকায় অ্যাসোসিয়েশন অব পেরেন্টস অব ডিসপ্লেসড পারসনস নামে একটি সংগঠন তৈরী করেছেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সংগঠনের সহযোগিতায় ইন্টারন্যাশনাল পিপলস ট্রাইবুনাল অন হিউম্যান রাইটস একটি অসামান্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটির নাম অ্যালেজড পারপিট্রেটরস: স্টোরিস অব ইমপিউনিটিস ইন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর।

উপসংহারে বলা যায় মিঠুন ভৌমিক কাশ্মীরের ওপর একটি সুখপাঠ্য অথচ তথ্যনিষ্ঠ বই আমাদের উপহার দিয়েছেন। সঠিকভাবেই তিনি কাশ্মীরের মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে রাষ্ট্রের আচরণের সমালোচনা করেছেন, অধিকার একই সঙ্গে জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে এশিয়া আন্ডার সিজ নামে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন কর্তৃক প্রকাশিত কাশ্মীর আন্ডার সিজ নামক প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিবেদন উপত্যকায় চালানো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তীব্র নিন্দা করেছে। একই সঙ্গে আবার জঙ্গিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী কার্যকলাপের বিরুদ্ধেও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি সচেতন নাগরিকই কাশ্মীরের ঘটনাবলী নিয়ে উদ্বিগ্ন। নিহত সাংবাদিক সুজার বুখারি লিখেছিলেন – “কাশ্মীর একটি আগ্নেয়গিরি ছিল এবং আছে, যে কোনো সমইয়ে যার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে”

 

Shares

Comments are closed.