অংশুমান করের WALL লিখন– একটি রিভিউ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সায়ন্তন গোস্বামী

কবিতার মানুষ গদ্য লিখলে কেমন হয়? সেই গদ্যের অলিগলিতে প্রচ্ছন্নভাবে কবিতার আধখোলা দরজা-জানলা, হেলানো সাইকেল, ফুলের টুকরি, চকের আলপনা থাকে? না কি কোনও কবির গদ্যভাষার চরাচরে কবিতা তরঙ্গিত হয় না? সম্প্রতি পড়লাম অংশুমান করের, প্রিয় অংশুমানের, WALL লিখন। অংশুমানের বিভিন্ন ছোট-ছোট গদ্যের সংকলন। সংবাদ পোর্টাল ‘দ্য ওয়াল’-এ অংশুমান এই রচনাগুলো লিখেছিলেন। সেই লেখাগুলোই একত্রিত করে একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে দে’জ পাবলিশিং।

ওয়েবজিন, পত্র-পত্রিকা আর ফেসবুকে অংশুমানের কবিতার সঙ্গেই মূলত আমার পরিচিতি। এই প্রথমবার আমি ওঁর গদ্য পড়লাম। প্রথম গদ্যের কন্টেন্টের মতই মায়াবী লেখাটার টাইটেল (সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে উঠে)। নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে ফেরার পথে হরিণের মৃতদেহ ক্রমশ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন; তখন অংশুমানের লেখায় আমেরিকা আর ভারতবর্ষ একই কেন্দ্রবিন্দুতে এসে মিশে যাচ্ছে ওতপ্রোত। আমি ভেবে নিই মানুষে-মানুষে প্রান্ত জেগে ওঠে প্রতীকে গাঁথা। এর কারণ আমেরিকারই কন্টেম্পরারি কবি ডেভিড গ্রফের ‘Dead Deer’ কবিতা, সেখানে গ্রফও মর্মাহত এবং গাড়ি-রাস্তায় হরিণের মৃতদেহ দেখে চাপা হিংস্রতার কথা ভেবে বিষন্ন। কিন্তু অংশুমানের লেখায় সেই বিষন্নতার উত্তরণ ঘটে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে।

সেই উত্তরণ যেন ঘনীভূত হয় পরের লেখায়। এবং সেখানেও, পেয়ে যাই আরেক কবিকে। সুনীল গাঙ্গুলির পঙক্তি ‘ঐরাবতের মতন উঠে আসে আমার পরাজয়’ থেকেই নামকরণ (গ্রন্থের শেষতম গদ্যে সুনীল গাঙ্গুলি আছেন প্রত্যক্ষভাবে)। তখনও প্রায় পুরো বইটাই পড়া বাকি, কিন্তু পড়তে-পড়তে ভাবছিলাম, কবিতার মানুষের গদ্যভাষার চরাচরে কবিতার তরঙ্গ যদি না-ও বা থাকে, কবিতার দু’-একটা বেশ বড়সড় শস্যদানা কিন্তু পেয়েই যাব। তরঙ্গও পাব, যেমন এই লাইনে ‘আমার মনে হচ্ছিল, গরিব মানুষের খাবারের কুড়িটা ডিশ কি কখনও হতে পারে?’, যেখানে অংশুমান ম্যানহাটানের ব্যালকনিতে বসে প্রশ্নটা ওঁর সুহৃদ কাজলকে নয়, নিজেকেই করেন, আর মনে-মনে বহুদূর চলে যাওয়ার মতন অনায়াসে এক অদৃশ্য সেতু বেঁধে চলে যান ম্যানহাটান থেকে পুরুলিয়ায়, সেখানে ভেসে ওঠে একটি ডিগডিগে রোগা অভুক্ত ছাত্রের অশ্রু-উজ্জ্বল মুখ।

পড়তে-পড়তে যত এগিয়েছি, ততই মনে হয়েছে, এই বইটার নিজস্ব চলন ছাড়াও আছে একটি চৌম্বকীয় স্ট্রাকচার, যা, সত্যি কথা বলতে, বুঝতে আমার দেরি হয়েছে। এখানে আবার কাঠামো বললে অনেক কিছুই বলা হয় না। গদ্যের স্ট্রাকচারকে ঠিক কাঠামো বলতে আমার বাধে। এই স্ট্রাকচারে ব্যক্তিগতভাবে পেয়ে যাই হ্যামলেটের সেই লাইন, যা এখন প্রবাদবাক্য– Brevity is the soul of wit. সংক্ষিপ্তকরণ এবং ব্রেভিটির মধ্যে কী পার্থক্য, তা Wall-লিখন পড়ে আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে চেখভের উক্তি ‘ব্রেভিটি হলো ট্যালেন্টের ভগিনী’, বেশি প্রযোজ্য। এখানে একটা কথা না বললেই নয়। অংশুমানের কবিতায় আমি, অনেস্টলি, এমন ব্রেভিটি পাইনি। কবিতায় ওঁর উচ্চারণ অনেক সজোরে, যেখানে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ক্ষতের মতন প্রকাশ পায়, আর সেই বক্তব্যকে মনে হয়, উঁচু মঞ্চের মাইক থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নিভৃতি পেয়েছি ওঁর গদ্যে। অংশুমানের নিজস্ব কিছু কথা ছিল, এবং সেই কথাগুলো উনি লিখেছেন, এতটাই মেদুরভাবে, যে, লিখেছেনের পরিবর্তে বলা উচিত আলতোভাবে পেতে দিয়েছেন, আর পাঠকের পাশে এসে বসেছেন।

গদ্যভাষার মাঠেঘাটে কবিতার কয়েকটি চিরস্থায়ী পতাকা যখন আছেই, গানও কি থাকবে না পাখির রঙিন ডানার মতন? বেশ কয়েকটা গদ্যের টাইটেলের নামকরণ রবীন্দ্রনাথের গানের পঙক্তি, যেমন ‘নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল’, ‘ঝড়কে পেলেম সাথী’, ‘আমায় ডাক দিলে কি’, ইত্যাদি। আছেন নজরুলও– ‘প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম’। কোথাও গিয়ে আমাদের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের দিনগুলো, গল্পগুলো, গানেরই অংশ, পরতে-পরতে সুরের বাঁক, রাগের মূর্ছনা, অংশুমান বুঝেছেন, আমি বুঝেছি অংশুমানের গদ্যের মাধ্যমে।

‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’ গদ্যে আমি স্পষ্ট দেখি একটা অনুচ্চারিত এথিকাল টানাপোড়েন, যেখান থেকে অংশুমান নিজেকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হন ব্যক্তিগত অনুভবে। এই ক্ষেত্রে বিবলিকাল রেফেরেন্স মাথায় টোকা মারে– Deuteronomy-র verse রবীন্দ্রনাথের পঙক্তিরই প্রতিচ্ছবি হয়ে জেগে ওঠে, সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঈশ্বরের সান্নিধ্যে তুমি নিখুঁত হবে’।

শঙ্খ ঘোষকে বাতাসের মতন পেয়েছি দু’টি গদ্যে। একটির শিরোনাম ‘এত বেশি কথা বলো কেন?…’, আরেকটি ‘তোমাকে বকব, ভীষণ বকব আড়ালে’। গ্রন্থে দু’টি গদ্যের মধ্যে ফারাক নয়টি গদ্যের। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি দেখতে পাই, এই দু’টি গদ্য হাত ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে গাছপালা-ঘেরা এমন এক আঙিনায়, যেখানে শব্দহীনতা আর আড়াল মিলেমিশে তৈরি করেছে এক পৃথক যাপন। প্রথম গদ্যে অংশুমান একমাত্র (শিশু) পুরুষ অভিনেতা হয়ে গ্রামের বাড়ির উল্টোদিকে ইলেকট্রিক অফিসের চত্বরে মাচায় ‘পূজারিণী’ নাটকের মহাত্মা বুদ্ধ। অন্যান্য শিল্পীরা সংলাপ ভুলে গেছেন, মনে আছে তার, কিন্তু সে নিরুপায়, সে তখন নাটকের প্রস্তরমূর্তি, সে মৌন এবং আয়ুষ্মান। সেই আয়ু প্রবাহিত হয় অন্য গদ্যে, সেখানে সদ্যকিশোর নিজের অভিভাবক জেঠুকে এড়িয়ে পড়ে নেয় ‘শ্রীকান্ত’, ‘গোরা’, আর ক্রমশ বুঝতে থাকে আড়ালের পরিবর্তনশীল সংজ্ঞা, যা আরও অনেকগুলোর বছর পার করে কখনওসখনও ফুটে ওঠে ব্রহ্মপুরের কোনও অজ্ঞাত বাড়ির কারশেডে টাঙানো নোটিসে।

বিনয় মজুমদারের ‘আমরা দুজনে মিলে’ কবিতাটির দু’টি লাইন উজ্জ্বল করেছে অন্য একটি গদ্যের শিরোনাম। ‘আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে, তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে’। গদ্যটি রবীন্দ্রমাথময়। অংশুমানের কাছে কবিগুরু কখনও শিক্ষক, কখনও কমরেড, আবার ম্যাজিশিয়ন, ডাক্তারও, বন্ধু, এবং সব কিছু ছাপিয়ে একটি inconceivable enigma through multiple roles সহকারে বেঁচে থাকার সর্বোত্তম পাথেয়।

ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতার সঙ্গে কিঞ্চিৎ মোলাকাত করান অংশুমান, অন্য এক গদ্যে, এক কোরিয়ান ট্যাক্সিচালকের অভিমানের গল্প বলে, এবং সেখানেও গৌতম বুদ্ধ বিরাজমান। ‘সাদা কাগজের একটা পাখি…’ এবং অন্যান্য কয়েকটি গদ্যে মোবাইল ফোন ঘুরেফিরে আসে, কখনও পরিত্রাতা হয়ে, কখনও শেকলের আংটা হয়ে। বেশ কিছু লেখায় মোবাইলের উল্লেখ কোথাও গিয়ে একটা kinematic সূত্র স্থাপন করে, যেখানে স্মৃতি আর দিনাতিপাতে মানুষের প্রবল উপস্থিতির মতই আছে টেকনলোজির ambiguity.

‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’ লেখাটির পার্ফেকশনের স্পিরিট অন্যরূপে এসে কয়েকটা হিসেবি চক্কর কাটে ‘ওয়ার্ডরোবের মাথায় এখনও তাঁর চশমা’ গদ্যটিতে। টাইটেলটা সমর রায়চৌধুরীর কবিতার লাইন, যার উল্লেখ গদ্যে আছে। সব কিছু রেখে দেওয়ার প্রবণতা কি ‘দিনযাপনের নিশান…’ (উদাসীনা, শঙ্খ ঘোষ)? এটাও কি একপ্রকার আঁকড়ে ধরে নিখুঁত হওয়ার প্রচেষ্টা নয়? হয়তো ভাবুকতা, অথবা নিজস্ব শৃঙ্খল, যা অংশুমান সহজভাবেই আত্মীকরণ করেন, করেছেন নিজের দৈনন্দিন জীবনে। তা বলে কি বর্জনেও নিখুঁত হওয়ার প্রচেষ্টা নেই? আছে, যার উল্লেখ পাই অংশুমানের লেখার গভীরে।

গোটা বইয়ে যতগুলো শব্দ আছে, আছে ততোধিক নিঃশব্দ বিচরণ। ২০১১ সালে একটি মার্কিন তথ্যচিত্র রিলিজ করে, নাম– Fragments: Surviving Pieces of Lost Films. নির্বাক যুগের বহু বিস্মৃত ফিল্মের ফুটেজ বুনে-বুনে ফিল্মটি তৈরি করা হয়েছে। অংশুমানের জীবনে অনেক ঘটনা, অনেক মানুষ, বিভিন্ন অনুভূতি যেন সেই সব surviving pieces, উজ্জ্বল কোষসমূহ, যা বিগত দিনের মফস্বলের কেটে ফেলা আমগাছের বাকল থেকে অংশুমান যত্নে তুলে এনে সাজিয়েছেন এই বইয়ে। বইটা পড়েছি দু’বার। প্রথমবার পড়ে একটা জিনিস ভাল লাগেনি। প্রত্যেক লেখার টাইটেল কেন কবিতা বা গানের লাইন? এবং গদ্যের শেষে এসে সেই লাইনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে একটা পূর্ণ বৃত্ত আঁকার চেষ্টা কি লেখাটাকেই একটা কর্কশ predictability-র গণ্ডির মধ্যে সঙ্কুচিত করা নয়? কিন্তু যে ফিল্মটার ব্যাপারে লিখলাম, সেটার কথা মনে পড়তেই টাইটেলগুলোর নামকরণের একটা কংক্রিট জাস্টিফিকেশন আমার নিজের কাছেই লজিকালি ঠিক মনে হল। নির্বাক যুগের বেশিরভাগ ফিল্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল intertile– বিভিন্ন সিনের মাঝে প্ল্যাকার্ডে লেখা বিবরণ বা ডায়লগ– সেটা দেখে দর্শক বুঝতেন ফিল্মের গতিপ্রকৃতি। কবিতার আর গানের লাইনগুলোও সেরকমই intertile, যা অংশুমানের কবিসত্ত্বা আর রবীন্দ্রপ্রীতিকে একই ফ্রেমে সাজিয়ে গদ্যের আকারে এই গ্রন্থের জন্ম দিয়েছে।

বইটিতে মুদ্রণপ্রমাদ আমার দৃষ্টিগোচরে খুব একটা আসেনি। শুধু ৮৯ পৃষ্ঠায় ‘জোরদার’ হয়ে গেছে ‘জোরতার’, আর ১০৯ পৃষ্ঠায় ‘কঙ্কাল’ হয়েছে ‘কংঙ্কাল’। বইটির প্রচ্ছদ সাদামাটা লেগেছে। আমি শিল্পী হলে হয়তো মিনিমালিস্ট ডিজাইন করতাম, বইটির এসেন্সের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নির্মেদ করতাম।

এটা বলাই বাহুল্য যে, বন্ধুদের বইটা রেকমেন্ড করব। দ্বিতীয়বার যখন বইটা পড়লাম, তখন সাদাকালো রঙের নির্ভেজাল শান্ত রোড মুভির মত মনে হল। সবচেয়ে বড় ভুল হবে, যদি কেউ ভাবেন বইটার মূলে আছে নস্টালজিয়া। আমার মতে, বইটার অনেক কিছুই অংশুমানের জীবনে আজও প্রবাহিত হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতেও হবে। একটা খুঁত যদি ধরতে হয়, তা হলে বলব, অভিভাবকসম জেঠু, যাঁর উপস্থিতি অনেক গদ্যেই আছে, এবং যাঁর সঙ্গে অংশুমানের হয়তো দেখা হয় রোজ, আয়নার কাচে, সেই জেঠুর নামের উল্লেখ হলে ভাল লাগত। বইটা মাঝের যেকোনও গদ্য ধরে পড়া যায়। তবে আমি উৎসাহী পাঠককে অনুরোধ করব, শুরু থেকেই একের পর এক গদ্য ধরে-ধরে পড়তে, তাতে রসের আস্বাদন অনেক ভাল হবে। প্রথম গদ্যটির প্রথম দু’টি শব্দ আর শেষ গদ্যের শেষ দু’টি শব্দ পরপর সাজালে দাঁড়ায়– হরিণের কথা কে বলবে। হরিণের কথা বলা হয়েছে, মায়াবর্ণে। বলেছেন অংশুমান।

WALL লিখন
অংশুমান কর
দে’জ পাবলিশিং
মূল্য– ১৮০ টাকা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More