আক্ষরিক অর্থে অবিস্মরণীয় কিছু গল্প লিখেছিলেন রেবন্ত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ঋজু গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা সুস্পষ্ট দু’টি ধারা খুঁজে পাই।
এদের মধ্যে একটিকে বলা চলে ক্লার্ক ও আসিমভ ঘরানা— যাতে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে রহস্য বা সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়। সেই কাহিনিতেই মিশে যেতে পারে অ্যাডভেঞ্চার আর রোমাঞ্চ। এই ধারায় সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক নিঃসন্দেহে সত্যজিৎ রায়। তাঁর সৃষ্ট প্রোফেসর শঙ্কু’র কার্যকলাপে ফ্যান্টাসির প্রভাব স্পষ্ট হলেও পাঠকদের মনে বিজ্ঞানের সম্ভাবনা ও এথিক্স নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয়। অদ্রীশ বর্ধনের সৃষ্ট চরিত্র প্রফেসর নাট বল্টু চক্রের কাহিনিদেরও আমরা এই ধারার অনুসারী বলতে পারি।
অন্য ধারাটিকে আমরা হাইনলাইন ও স্টার্জ্যন মতাবলম্বী বলতে পারি— যাতে বিজ্ঞানের বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনৈতিক দিক তথা অপব্যবহারের নানা সম্ভাবনা পাঠকের সামনে আসে। সীমিত সংখ্যক লেখক এই ধারায় লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে সিদ্ধার্থ ঘোষের নাম সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

এই দ্বিতীয় ধারাটি বাংলায় তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। কেন? কারণ খুঁজতে গেলে যে ফ্যাক্টরগুলো পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে অন্যতম হল— বাংলায় কল্পবিজ্ঞানকে শিশুসাহিত্যের অংশ করে দেওয়ার প্রবণতা। ‘সন্দেশ’, ‘আনন্দমেলা’, ‘কিশোর ভারতী’, ‘শুকতারা’, ‘কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান’— এপার বাংলায় শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য নিবেদিত এই পাঁচটি পত্রিকা একসময় কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-নির্ভর লেখা নিয়মিত ছেপেছে। এও বাস্তব যে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্য পরিবেশিত ‘আশ্চর্য!’ ও ‘ফ্যানটাস্টিক’-এর তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে কল্পবিজ্ঞানকে পৌছে দিয়েছে এই পত্রিকাগুলো। হয়তো কিশোর পাঠকদের মনে যাতে ‘খারাপ’ প্রভাব না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই এই পত্রিকায় লেখালেখি করা সাহিত্যিকেরা মূলত আসিমভ ও ক্লার্কের ধারাটিই অনুসরণ করেছেন। ক্রমে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার অমোঘ নিয়মে কিশোরপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান রচনাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তবু, শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্যই লিখেছেন এমন অনেক সাহিত্যিকের লেখা আজও সব-বয়সের পাঠককে মুগ্ধ করে তাঁদের চিন্তার বিস্তার ও সরসতার জন্য। দুর্ভাগ্যের বিষয়, একদা বহু পাঠককে আনন্দ দিলেও সেই লেখাগুলো আজ আর পাওয়া যায় না। কল্পবিশ্ব ওয়েবজিন এবং অধুনা কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন এমন লেখকদের আবার ফিরিয়ে আনছেন আমাদের সামনে। তেমনই এক উজ্জ্বল উদ্ধার হল রেবন্ত গোস্বামী’র ‘কল্পবিজ্ঞান সমগ্র।’

উপরোক্ত শিশু-কিশোর পত্রিকাগুলোতে যে-সব লেখক প্রায় নিয়ম করে বুদ্ধিদীপ্ত, তথ্যনিষ্ঠ, আবার মানবিকতায় সমৃদ্ধ গল্প লিখতেন, তাঁদের মধ্যে রেবন্ত গোস্বামী’র নাম আসবেই। আক্ষরিক অর্থে অবিস্মরণীয় কিছু গল্প লিখেছিলেন রেবন্ত। শুধু গল্প নয়, মজা আর বিস্ময় মেশানো দারুণ-দারুণ ছড়াও তিনি লিখেছিলেন নানা সময়ে। সুদীপ দেব-এর কঠোর পরিশ্রম ও অনুরাগের ফসল এই সুদৃশ্য হার্ডকভারটিতে ধরা পড়েছে তেমন সবক’টি গল্প আর ছড়া। এখানেই আছে ডক্টর সাত্যকি সোম, আছে রোবট নরোত্তম, আর আছে বায়োথ্রিলারের পূর্বসূরি হিসেবে আতঙ্কের নানা রূপ— যে-সব গল্প পড়লে বাগানে বেড়ানোর ইচ্ছে লোপ পেতে পারে চিরতরে!

কী-কী লেখা আছে এই বইয়ে? সূচিপত্রটি পেশ করা যাক। গল্পগুলোর নাম পড়ামাত্র যদি সত্যজিৎ রায় বা বিজন কর্মকারের অলঙ্করণের সঙ্গে মূল গল্পগুলো আপনার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাহলে, জনপ্রিয় মিম-এর ভাষা ধার করে বলব, ‘ইওর চাইল্ডহুড ওয়াজ অসাম!’
গল্পনাম এই রকম: হোমিফাইটা, বৃশ্চিক গ্রাস, রবিদাস কাহিনি, মৃত্যুবাণ, অণুঘ্রাণ যন্ত্র, ভাস্কর মিশ্রর পুঁথি, ড. সাকসেনার ডায়েরি, শ্যামল পালের সমস্যা, লীলাবতীর মুক্তো, দুর্বাসা তরু, নরোত্তম-সংবাদ, নেপোলিয়নের নবজীবন, একটি প্রতিশ্রুতির লিখন, সাত্যকি সোমের সত্যান্বেষ, সাত্যকি সোম ও মহাকালাধার, রিউবেন বুশের মৃত্যুবাণ, নাম তার রুবাই, সুমন, সুবর্ণদ্বীপ রহস্য, কিম্ভূত রহস্য, হ্যাঁকো, চন্দ্রাহত সাত্যকি সোম, কালের কালো পাথর, বাউরি পুকুরের বিভীষিকা, জন্মান্তর, একটি অন্যলৌকিক কাহিনি, লালটু, অঙ্গ ভঙ্গ তরঙ্গ, অদৃশ্য আততায়ী, অন্য শোক, ইনট্রারেড, মালুবাবু, গেছো-মাস্টার, কালো আলো।
ছড়ানাম এই প্রকার: মাছ ধরার কল, হয়নি প্রমাণ, অক্সিদাদার দুইটি ধাঁধা, উত্তর পাচ্ছি না, লিমেরিক, কিনবে যদি আসতে পারো, ভাবীকালের ছড়া, রোবটীয় সংলাপ, সাত্যকি সোমের ব্যাপারস্যাপার এবং পিসি, পুসি আর ওরা।

“সম্ভাব্য পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এই বইয়ের কোন-কোন গল্প সবচেয়ে ভাল? আমি সবক’টিই প্রায় গোগ্রাসে গিলেছি। পড়তে শুরু করলে আপনিও শেষ না করে থামতে পারবেন না। তাও, একান্তই বিশেষ ক’টি গল্পের কথা আলাদা করে লিখি।
ইনট্রারেড: বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা নিজের ওপর করার ফল নিয়ে লেখা হয়েছে এই গল্পটি। কিন্তু এটি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে শুধু রোমাঞ্চকর উপাদানের জোরে নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সাহায্যে– যা কিশোরসাহিত্যে বিরল।
চন্দ্রাহত সাত্যকি সোম: প্রযুক্তির জয়রথের তলায় পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যাওয়া অতীতের জন্য ভাবনা কি শুধুই নস্ট্যালজিয়া? নাকি মনুষ্যত্বের সংজ্ঞাই দাঁড়িয়ে আছে ওই আপাত মূল্যহীন আবেগের ওপর? এই গল্প কল্পবিজ্ঞানের বটে। তবে তার চেয়েও বেশি করে এটি আমাদের প্রযুক্তিপ্রীতির সামনে একটা আয়না তুলে ধরে।
গেছো-মাস্টার: পরিবেশকে নিয়ে আমাদের ভাবনা যদি অ্যাকাডেমিক পরিসর ছাপিয়ে সত্যিই অন্তর্লীন হয়ে ওঠে, তাহলে কী ঘটে? মনকে ভারী অথচ সবুজ করে তোলা এমন গল্পের সন্ধান পেতেই তো আমরা বই পড়ি।
লীলাবতীর মুক্তো: অনেক হিসেব কষে এগোনো পরিকল্পনা যখন তছনছ হয়ে যায়, তখন তাকে আমরা কী বলি? দুর্ঘটনা? নিয়তি? না অন্য কিছু?
ভাস্কর মিশ্রর পুথি: চারশো বছরেরও বেশি আগে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ স্বচক্ষে দেখেছিলেন শনিদেবতাকে। তাঁর সেই অভিজ্ঞতা আর শনিমাহাত্ম্য বর্ণনার কথা লেখা আছে পুথিতে। পুথির পাঠোদ্ধার করতে তার উত্তরাধিকারীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন এক ফরাসি পণ্ডিত। তারপর কী হল?
বৃশ্চিক গ্রাস: বাল্যবন্ধু দিলীপের অসুস্থতার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হলেন ডক্টর সুনীল সেনগুপ্ত। বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারলেন, দিলীপের জীবনদীপ নির্বাপিতপ্রায়। কিন্তু কী হয়েছে তার? আর… ডক্টর সেনগুপ্তের গলাটা এত জ্বালা করছেই বা কেন? এই গল্পটি পড়ার পর আপনি বাগানের ধারেকাছে না গেলে আমি মোটেই অবাক হব না।

দুর্দমনীয় এমন-সব লেখায় ভরা বইয়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে লেখকের একটি অকপট সাক্ষাৎকার, ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখকের একমাত্র কল্পবিজ্ঞান গল্পের সংকলন ‘বৃশ্চিক গ্রাস’-এর গ্রন্থ-পরিচয় এবং নারায়ণ সান্যালের লেখা একটি চিঠি।

এই মুহূর্তে বাংলায় কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশন নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জানবেন যে সহজ ভাষায় একটা মজবুত গল্প বলতে না পারলে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখা যায় না। এই ধারার প্রত্যেক লেখক ও গবেষকের উচিত রেবন্ত গোস্বামী’র লেখা এই গল্পগুলো পড়া— যাতে কুশলী হাতের হালকা আঁচড়ে কীভাবে গল্প ফুটিয়ে তুলতে হয়, সেটা শেখা যায়। যাঁরা শুধুই পাঠক, তাঁদের কাছে এই গল্পগুলো বাপুজির কেক হয়ে আসবে। এতে ছোটবেলার ভাল লাগার স্বাদ যেমন ফিরে পাওয়া যাবে, তেমনই পাওয়া যাবে গল্পপিপাসু মনের খোরাক। তাই দেরি না করে ঝটপট বইটি হস্তগত করুন, তারপর স্রেফ ডুবে যান গল্পগুলোর মধ্যে।

সম্পাদক সুদীপ দেব ও প্রকাশক কল্পবিশ্ব-র উদ্দেশে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা জানালাম এই বইটি প্রকাশের জন্য। আশা রাখি যে ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য, গুরনেক সিং, এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়— এই মহাজনদের লেখাও তাঁরা আমাদের সামনে ফিরিয়ে আনবেন একে-একে।
শুভেচ্ছা রইল।

কল্পবিজ্ঞান সমগ্র

রেবন্ত গোস্বামী

(সম্পাদনা: সুদীপ দেব)

কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন

৪৫০ টাকা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More