চার অক্ষরের কাঙাল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃন্ময়ী ঘোষ

আশির দশকের কবি সুমিতাভ ঘোষালের ‘চার অক্ষরের কাঙাল’ বইটির সব কবিতা জুড়েই রয়েছে নতুন ফ্লেবার। সুমিতাভর পাঠক মাত্রেই জানেন কবিতায় তাঁর নিত্য নতুন এক্সপেরিমেন্ট। মেটাফিজিক্যাল, ইমেজিস্ট, রোমান্টিক সময় ও গোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে এসময় নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ একাকীত্ব বোধের যুগ পেরিয়ে তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব ও অস্থির সময়- এ সময় বিপন্নতা ও অস্থির হতাশার সময়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবির কলমে যে বর্তমানের ধূলিধূসর রূপ উঠে আসবে, তা সহজেই অনুমেয়। নামকরণ কবিতায় তা স্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত, ‘চার অক্ষর বললেই/ আসলে যা ভাবো/ আমি তা ভাবি না’( চার অক্ষরের কাঙাল)

আধুনিক যুগে ইউরোপে Modern poetry-র বিষয়ে Mathew Arnold- এর মতে,-

“…This is iron time

of doubt, disputes, destructions, fears.”

আধুনিক সময় পেরিয়ে এখন সময় বলতে নিঃসঙ্গ, একাকীত্বের যন্ত্রণার, মনোজগতের বিষণ্ণ রূপ। আর এক একটি রূপের মুখোশ আলাদা আলাদা ঘটনা ও বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে প্রতিফলিত হয়েছে কবিতায়।

‘অঞ্জলি দিয়ে ফেরার পথে/ সার্জিংয়ে ওলা না পেয়ে মনে হয়/ স্কুটি চড়া দুর্গার পিঠে উঠে বসি/ পিঠে মানে ব্যাক সিট/ আর কানে কানে বলি/ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কিছু একটা করো/ ফ্রি বছর বন্যা থামাও/ শক্তি দাও/ যশোং দেহি হেলমেট যেন খুলে রাখতে পারি।’ কত সহজ সরল উচ্চারণে হেলমেট খুলে রাখার মধ্যে দিয়ে বিপদমুক্ত দিনের আবেদন জানিয়েছেন দেবী দুর্গার কাছে।

কথ্যভাষাকে অগ্রাধিকার দেবার বিষয়ে যেমন, ওয়ার্ডওয়ার্থ, লোরকা বিদেশি থেকে এদেশে বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের নাম করা যায়, তেমনি বর্তমানে যারা এখন যারা কবিতাচর্চা করছেন, তারাও মুখের ভাষাকেই গুরুত্ব দিয়ে লিখে চলেছেন। সে ভাষায় হয়তো বাংলা ভাষার সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে ইংরেজি অথবা অন্য কোনও বিদেশি শব্দ।

রাস্তা কবিতাটির ব্যঞ্জনায় অন্য সুর ধ্বনিত । মানুষের ব্যবহৃত রকমারি রাস্তার মধ্যে নির্ভর করে জীবন, নির্ভর  করে যাপন। তাই তো, ‘হাত ধরার রাস্তা/ চোখ মোছার রাস্তা/ ঘুরে মরার রাস্তা/ পা হড়কানোর রাস্তা’ এছাড়াও আরও অনেক রাস্তা আছে অথচ কবি জানেন সে সব রাস্তায় তিনি পৌঁছতে পারবেন না, আর পারবেন না জেনেই তিনি, ‘সেইসব রাস্তাতে আমি ছুঁড়ে দিই/ আমার পরাভব আর অপমান / যদি ভুল করে কেউও কুড়িয়ে নেয়!’ রাস্তা যে মানুষকে গতিশীল রাখে, পৌঁছে দেয় উন্নতি ও অবনতির দুয়ারে- রাস্তায় গায়ে জড়িয়ে থাকে সমস্ত কাজের ছাপ, তাই তো রাস্তা মানুষের এত প্রিয়। মৃত্যু আগের মুহূর্ত পর্যন্ত জীবনের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন চায় পথিক মন। কবিতাটি পড়তে পড়তে পাঠকও নেমে পড়েন তার চিরচেনা রাস্তায়।

প্রতিবিম্বে ধরা পড়ে, ‘আমি তোমাদেরই ফেলে আসা অবাঞ্ছিত রুমাল/ যা তোমরা খুঁজে এসেছো এতদিন/ কিন্তু পাওনি।’ আবার ‘নির্বাণ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কিভাবে খোদাই করে নিজেরই ঈশ্বর / সেই সত্য জানেন সালভাদর দালি’ অথবা ‘রবীন্দ্রনাথ, আপনাকে’ কবিতায় ছন্দোবদ্ধ পদের মধ্যে ভাবের কি আশ্চর্য সমন্বয়, ‘অমিত রে আপনার সৃষ্টি, সে ছিল স্যুটেবল বয়/ আমাকে জন্ম দিয়ে আপনার কি কোন লজ্জা হয়?’ জীবনের ব্যর্থতা, গ্লানি ও পরাজয়স্বীকার করেও শেষ লাইনে রবীন্দ্রনাথের দিকেই কবিমন প্রশ্ন তুলেছেন, তার অনুরণন ধ্বনিত হয়ে যেন সুমিতাভ ঘোষালের পাঠকের বুকে শেলের আঘাত হানে।

‘যৌথখামার’-এ একসঙ্গে হয়েও যেন, ‘ঠোঁট আর কাপের দূরত্ব বজায় রাখি/ নশ্বরকে আদর করি/ নক্ষত্র খুঁটে খাই’ ব্যাঞ্জনার গভীরতায় হারিয়ে যাবার আগে পাঠককে উপলব্ধি করিয়ে দেন ‘মৃত্যুবোধ’, ‘রমণ পথে রাখলে গমন/ উল্কি গোপন অঙ্গে/ মৃত্যু বোধও করছে খেলা / শীর্ষ সুখের সঙ্গে’ অর্থের শরীরে ছন্দের দোলা কবিতাটিকে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েও কবিমন এখানেই শেষ হতে চান না। একটু আরোগ্য লাভের জন্যে জিগ্যেস করে, ‘কখনও শোনেনি/ ভাঙা ঘর’, ভাঙা ঘর সমস্ত জেনেও নীরব বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত, কিছুটা অসহায়। তাই তো কবি ‘ডবল বেডে একা একা শুয়ে থাকে/ পারদের দাগ লাগা ব্রাইডাল রিং’

শব্দের ব্যবহারে স্মার্টনেস আছে, রয়েছে তরল ব্যঙ্গ। মোচড় দিয়ে অনায়সে তিনি ভাবকে বাঁধতে পারেন, কখন ভাবকে হোঁচট খাইয়ে খাইয়ে বোধের দোড়গোড়ায় নামিয়ে আনেন। মনে হয় মনের ভারী বোঝা নেমে যাচ্ছে একটির পর একটি সিঁড়ি বেয়ে। কবিতার শেষে নীবর অনুভূতি অনুরণন তোলে সুরের, সে সুর কখনও উত্তর আবার কখনও তাড়া করে বেড়ায় একটি প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে। শব্দ ব্যবহারে কোন শুচিবায়ু কবির নেই বরং কবিতায় রয়েছে এক অসাধারণ সপ্রতিভ উচ্চারণ, নিজস্ব বলয় তৈরির আন্তরিক প্রচেষ্টা।

সমিতাভ ঘোষালের সুর ভিন্ন। ফর্মকে বারবার ভেঙে নিজের মত করে গড়ে তোলায় তিনি নিপুণ। তাঁর কবিতার পাঠক মাত্রেই তা জানেন। তবে কোন কোন কবির কলমে সমসময়ের সঙ্গে একটি পাঠক বলয় সৃষ্টি করে নেন। আবার এমন কবির উদাহরণও কম নেই যারা সমসময় থেকে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর পাঠকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা দখল করে আবহকালের দাবী রেখে যান। এই কবির কবিতাকে দ্বিতীয় শ্রেনীর পাঠককূলের বলে মনে হবার কারণ, কবিতার প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙা ও গড়ার খেলা, নিজস্ব স্ট্যাইল ও আত্মমগ্ন ভাব।

নৈরাজ্য কবিতায় তাচ্ছিল্যের মৃদু সুর অথচ কত সহজে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, ‘ভাসাতে পারিস আমাকে আবার?’, পারে না বলেই কি ‘আয়না’-তে নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেযেছেন? ‘আমি আর কিছুই চাই না/ মুখ শুধু মুখ দেখতে চাই’ যার বিচরণ আলোতে তিনি কীভাবে নিজেকে গুটিয়ে মুখ দেখতে পারেন? সে তো অনেকটা ‘মৃত্যু বিনিময়ের মত’। ‘শহর’-এ কবির ‘ক্ষমা চাওয়াটুকু বাকি থেকে গেছে/হাল্কা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছি/ সমস্ত পরাভব’ কারণ কবি জানেন, অন্যান্য অনেক কিছুর মতই ‘সংখ্যা দিয়ে এইসব কবিদের/ কিছুই মাপা যায় না’ তাই হয়তো ‘মনের কথা তখন কেহ ভাবিয়াও দেখে নাই।’

কবির কাব্যগ্রন্থের কবিতা অল্প সময়ে পাঠককে জানিয়ে দেন, তিনি প্রথাগত বা গতাগতিকক থেকেও যেন ভিন্ন, বিচ্ছিন্ন নিজস্ব দ্বীপ। এতে সেতু নির্মাণ করে চলেন প্রকাশভঙ্গীমা তা কখনও ভাষণধর্মী কবিতা, চিত্রককল্প ও রূপকের ছড়াছড়ি, যাকাব্যগ্রন্হের ‘জোনাকি’ ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’ ‘দিকশূন্যপুর’ বেশ কিছু কবিতায় ।

সুমিতাভ ঘোষাল-এর মূল্যায়ন এই সময়ে, ‘জাপানি কালির ব্যবহার/ এখনও শিখিনি/ শুধু প্রেম আর আদিখ্যেতা / দেশদ্রোহ, কালশিটে / এইসব নিয়ে কবিতা লিখছি’ মনে হয় যা তিনি লিখতে চেয়েছেন অথচ লিখতে পারেননি বলেই এমন ভঙ্গিতে নরম আর্তি। কিন্তু এই ভঙ্গিতে লুকিয়ে আছে আনন্দঘন বিষন্নতা, নিভৃতির আর্তি, নিঃসীম বিষাদ প্রান্তর। এক অনাস্বাদিত নিমগ্নতায় আত্মলীন হয়ে কবি দাঁড়িয়েছেন নিজস্ব আয়নার মুখোমুখি; যে আয়নায় ভেসে ওঠবে গহনকথা, অনুভূতির শব্দায়ব। তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠা নাগরিক বিষণ্ণতা, হতাশা, একঘেয়েমি, মূল্যবোধের পতন বোধের ক্ষরণে ক্ষয় হতে হতে ভাবের অতল থেকে তুলে আনবেন শব্দ। শব্দশিল্পে গঠিত হবে বোধের ক্ষরণ প্রাপ্ত নিভৃতমনের নির্জনতার নিজস্ব আঙ্গিক। কবিতায় পাঠক খুঁজবেন কবিভুবনের স্থাপত্য, নিজস্ব সুরের নুপূর যা হয়তো সুতীব্র ইন্দ্রিয় সংবেদনেও ধরা যায় না। অথচ কবি অনায়াসে ভাবের ঘোরে নিমজ্জিত রাখতে পারেন তাঁর পাঠককে। অতৃপ্তির স্ফুলিঙ্গে তৃপ্তিকর শব্দের বিন্যাস, ধ্বনিময়তা ও লাবন্যও পাঠককে বারবার টেনে নিতে সক্ষম তাঁর নিজস্ব নিবিড় সংবেদনের কাছে। সুমিতাভ ঘোষালের কবিতা বর্তমান ও আগামীর প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আদায় করে নেবে কবির নিজস্ব লেখনীর গুণে, তা বলাবাহুল্য।বইটির প্রচ্ছদ করেছেন হিরণ মিত্র, প্রকাশক বর্ণনা প্রকাশনী। বইটির দাম ৪০ টাকা মাত্র।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More