বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

বাগদাদ থেকে ফিয়ার্স লেন: এক ‘পাক’ অভিযানের ইতিহাস

দামু মুখোপাধ্যায়

আগুন পোষ মানানোর পরে প্রথমে শিকার করা মাংস নরম করার তরিকা অভ্যেস করল মানুষ। পেটের জ্বালা জুড়োনোর পর মগজ খোলতাই হতে থাকল, জিভে একে একে জেগে উঠল স্বাদকোরকরা। তাদের তাগাদায় দু-পেয়েরা হয়ে উঠল স্বাদসন্ধানী। যুগ যুগ ধরে আজও সুখাদ্যের খোঁজে তারা হন্যে হয়ে তোলপাড় করে চলেছে গিরি-মরু-কান্তার। রসনাপথের পথিক হয়তো কমবেশি সকলেই, কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ খানিক বাড়াবাড়ি করে ফেলে অভিযাত্রী হয়ে ওঠেন। আর সেই সব দুঃসাহসীদের মধ্যে হাতেগোনা কিছু অতি ডাকাবুকো থাকেন, যাঁরা খাদ্য অ্যাডভেঞ্চারের পরতে পরতে তালাশ করে ফেরেন দুর্লভ জহরতের খাদান। নীলাঞ্জন হাজরা সেই বিরল রসনাপথের অভিলাষী, যিনি ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নীচে, সামনে-পিছনে নজর না ঘুরিয়ে, আলফাল বুলি না কপচিয়ে আর বেফালতু জ্ঞানভাণ্ড উপুড় না করে একটি বিশেষ গোত্রের পদকে বা বলা ভালো রসনাশিল্পকলাকে ধ্রুবতারা ঠাউরে নিষ্ঠাভরে স্বাদ-সমুদ্রে কলম্বাস হওয়ার অসীম হিম্মত দেখিয়েছেন। আর তারই মূল্যবান ফসল সম্প্রতি প্রকাশিত ‘কাবাব কিস্‌সা’ কেতাব, যা দুনিয়ার হরেক কিসিমের কাবাবের স্রেফ রেসিপিনামা না হয়ে এক বিশেষ রসনাশিল্পের আকরগ্রন্থ হয়ে উঠেছে।

বাংলা ভাষায় খাবারদাবার আর রান্নাবান্না নিয়ে বইয়ের সংখ্যা কিছু কম নয়। কিন্তু শুধুমাত্র একটি পদকে সম্বল করে এমন রোমাঞ্চকর আখ্যান অন্তত এই অধমের দৃষ্টিগোচর হয়নি। কিস্‌সা অবশ্যই, তবে মলাটবন্দি ১৫৯ পাতার বিষয়বস্তু একেবারেই হালকা-ফুলকা নয়। ইতিহাসের ধুলোয় চাপা পড়া পাতা ঢুঁড়ে, সাহিত্যের দরিয়ায় ডুবসাঁতার মেরে, দেশ-বিদেশের সংগ্রহশালায় চক্কর কেটে আর অসংখ্য ভোজনশালা ও রসুইঘরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যে অভাবনীয় মণিমুক্ত তিনি সংগ্রহ করেছেন, পাঠকের পাতে সে সব সাজিয়ে দেওয়ার আগে ল্যাবরেটরি, থুড়ি, আপন হেঁশেলে হাতে-কলমে পরখ করে তবেই পুঁথিগত রেসিপিকে ফুল মার্কস দিয়েছেন এই কাবাবসাধক। পরীক্ষা করতে নেমে উপকরণ অথবা প্রণালীতে যেখানে স্থান-কাল-পাত্রের নিরিখে কোনও রদবদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে, সেখানে পাঠকমনের বিভ্রান্তি দূর করতে দস্তুরমতো সটীক ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টি খোলসা করার পরিশ্রমও করেছেন সোৎসাহে। এই যত্নের ছাপ বইয়ের আপাদমস্তকে ছড়িয়ে রয়েছে। নমুনা হিসেবে পেশ করা যায় রামায়ণে বর্ণিত মাংস ঝলসানোর প্রক্রিয়া। আজ্ঞে হ্যাঁ, রামরাজত্বের এই নবজাগরণকালে নব্যপণ্ডিতদের গালে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়ে দলিল-দস্তাবেজ হাঁটকে লেখক প্রমাণ করে ছেড়েছেন, বনবাসে রাম-সীতা-লক্ষ্মণরা কী তরিবত করেই না নিয়মিত বিভিন্ন রকমের মাংস ঝলসে পরম তৃপ্তিতে সাবাড় করতেন। রামায়ণী যুগের সেই সব উপকরণ ও রন্ধন কৌশল প্রয়োগ করে ‘নীলু হাজরার’ পাকশালে তৈরি হয়েছে অমৃতসম চিকেন কাবাব, যার খুঁটিনাটি বিবরণে যুক্ত হয়েছে কাবাবের অনুসঙ্গ চাটনি বানানোর কায়দা পর্যন্ত।

এ হেন কাবাবকোষের গোড়াতেই হোঁচট খেতে হয় চিরাচরিত শিক কাবাব নিয়ে। ফারসি ভাষায় দড় নীলাঞ্জন বাঙালি লব্জে গেঁথে যাওয়া উচ্চারণগত বিকৃতি শুধরে অল্প কথায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘শিশ’ থেকে কোন পথে হয়েছে ‘সিখ’-এর উৎপত্তি। তবে এ স্রেফ হিমশৈলের চূড়ামাত্র! কাবাবের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে ক্রমে পরিচিত হতে হয় Kababu, Kababa ও Kababi শব্দগুচ্ছের সঙ্গে। এবং সেই সূত্রেই জানা যায় এক অশ্রুতপূর্ব তথ্য— কাবাব না কি আদতে নারী এবং তাকে যে বাজারজাত করছে, সেই কাবাবি পুরুষ। শিল্পী ও শিল্প, সাধক ও শক্তি, ভৈরব-ভৈরবীর চিরন্তন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এখানে ফেঁদে বসেননি লেখক। পুরুষের দ্বারা নারীর যুগান্তকারী এক্সপ্লয়টেশনের কচকচিতেও তাঁর সরদর্দ ঘটানোর বিন্দুমাত্র আকাঙক্ষা নেই। বরং পাঠকের মগজে আলতো চিমটি কেটে পরক্ষণেই তিনি ফিরে এসেছেন কাবাব মানচিত্রের চড়াই-উৎরাইয়ে। বস্তুত, রেশমপথ বা মশলাপথের চেয়ে কোনও অংশে কম যায় না তাঁর এই কাবাব অন্বেষণ। লেখনীর আস্তিন ধরে দণ্ডকারণ্যের নিভৃতবাস থেকে কখনও ঝটকায় পৌঁছে যেতে হয় সুদূর গ্রিসের সান্তোরিনি দ্বীপের ঐতিহাসিক ভগ্নস্তূপে, কখনও বা ভুবনজয়ের নেশায় মত্ত সম্রাট আলেকজান্দারের রসুইখনায়, নবম-দশম শতকের বাগদাদের অলিগলি, ষোড়শ শতকের ইউরোপ, ১৪৬০ সাল থেকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা অটোমানি মুৎফাক হয়ে সাবেক ভারতীয় সুলতানি, বাদশাহি, নবাবি ও নিজামি ঘরানার স্বাদু স্রোতে। বাদ যায় না ঔপনিবেশিকদের আমদানি করা বিবিধ কাবাব খাজানা, মায় বাঙালির কাবাব আখ্যানও। অতীত রোমন্থনের ঝরোখা বেয়ে কখনও আবার প্রসঙ্গের দাবিতেই ঢুকে পড়ে হালফিলের খাস ইরানি মাহি ক্যাবব, করাচির বোট বেসিন ফুড স্ট্রিট, লাহোর কেল্লার পাশে ফোর্ট রোড ফুড স্ট্রিট, ইস্তানবুলের তাকসিম স্কোয়ারের অখ্যাত যত দোকান। সঙ্গী হয় পুরানি দিল্লির কাবাবওয়ালি গলি, নিজামউদ্দিনে সুফি সাধকের দরগার পিছনে থাকা বাওলি গেট এলাকা, লখনওয়ের চওক অঞ্চলের জগদ্বিখ্যাত টুন্ডে কাবাবি, পাটনার দরিয়াপুর বা সবজিবাগের শান-এ-হিলাল, হায়দরাবাদের ইউসুফেন দরগা সংলগ্ন নামপল্লি ও শ্রীনগরের হজরতবাল অঞ্চল। এই সব খানদানি ঠিকানার পাশাপাশি তালিকায় জায়গা করে নেয় ঘরের কাছে উত্তর কলকাতায় কলুটোলার বড়বাজার লাগোয়া লাল মসজিদের আশপাশ, ধর্মতলার সাবেক নিজাম রেস্তোরাঁ, নাখোদা মসজিদ মহল্লা ও টেরিটি বাজারের পাশে ফিয়ার্স লেনের কড়চা- যেখানকার শৌখিন সুতা কাবাবের শিকড় যে আদতে পঞ্চদশ শতকে মালোয়া রাজ্যের সুলতান ঘিয়াসউদ্দিন শাহের হেঁশেলজাত, ‘ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ কুকুবুক’ নি’মতনামাহ্-এর পাতা জরিপ করে সে কথা জানাতে পারেন শুধু নীলাঞ্জনই।

কাবাব তো চাখেন, চুলা চেনেন কয়জনা? অবশ্যই তা খুঁটিয়ে দেখেন কাবাবরসিক হাজরামশাই। তাঁর সৌজন্যে পাঠক জানতে পারেন রামায়ণী যুগেরও বহু কাল আগে প্রাচীন গ্রিসের মিনোয়ানি সভ্যতায় ব্যবহৃত ফায়ার ডগের কথা আর তার সঙ্গে আধুনিক সিখ কাবাব সেঁকার উনুনের অনবদ্য তুলনা। ফোটোগ্রাফের সাহায্যে সেই তত্ত্ব প্রাঞ্জল করে দেওয়া হয়েছে কিস্‌সার পাতায়। রয়েছে সে যুগের পোর্টেবল গ্রিল ব্যবহারের মতো চমকপ্রদ তথ্য। কলকাতার যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা লেবানিজ রেস্তোরাঁর দোনের কাবাব তৈরির কৌশল খোদ সম্রাট আলেকজান্দারের খাস পাচককূলের মজ্জাগত ছিল, এমনকি অটোমানি আমলে স্ট্রিট ফুড থেকে রাজকীয় রসুইখানা সর্বত্রই এই বিশেষ rotating spit-এর ব্যবহার চালু ছিল বহাল তবিয়তে, সে সবও সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে এ বইয়ে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হতে হয় তন্দুর পর্বে পৌঁছে।

দিল্লির দরিয়াগঞ্জের সুবিখ্যাত মোতি মহল রেস্তোরাঁর প্রতিষ্ঠাতা কুন্দনলাল গুজরালকে তন্দুরি রসনার আবিষ্কর্তা ঠাওরানোর তত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে লেখক সটান দেগে দিয়েছেন, ‘‘হরি হরি। এই গপ্পের নায়ক কুন্দনলাল গুজরালের জন্মের আনুমানিক এক হাজার বছর আগে, দশম সাধারণাব্দে, আবু মহম্মদ অল-মুজফ্‌ফর ইব্‌ন নাসির ইব্‌ন সইয়ার অল-ওয়াররাক নামক এক কলমচি সে সময়ে বাগদাদি বড়লোকদের খানা-দানার একটা সংকলন লিখেছিলেন…। সংকলনের নাম- কিতাব অল-তবিখ।… আমি পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এক হাজার বছর আগে লেখা প্রথম অল-তবিখ-এর এই অনুবাদে ‘তন্নুর’ (Tannur) শব্দটি ১৪টি জায়গায় উল্লিখিত হয়েছে। মনীষ সাহেব সামান্য, সামান্য পরিশ্রম করে উইকিপিডিয়া দেখলেই জেনে যেতেন তন্দুর শব্দটি এসেছে ফারসি ‘তনুর’ বা আরবি ‘তন্নুর’ থেকে।” শুধু তাই নয়, কিতাব অল-তবিখেই যে তন্দুরে মাংস ঝলসানোর উল্লেখ রয়েছে, তা-ও শামিল করা হয়েছে সওয়ালে। এমনকি, সে আমলে তন্দুরে মিষ্টি রুটি আর মুরগি যে একসঙ্গে তন্দুরে সেঁকার চল ছিল, রেসিপি-সহ সে প্রমাণও দাখিল করেছেন লেখক। শেষে প্রাক-হরপ্পা যুগে প্রচলিত উনুনের সঙ্গে আজকের তন্দুরের হুবহু মিল দাগিয়ে দিয়ে গুজরালীয় থিওরির যথার্থ হদ্দমুদ্দ করে ছেড়েছেন পাক্কা শার্লক-সুলভ যুক্তিবাণ হেনে। এ জন্য তাঁকে কুর্নিশ না জানিয়ে গত্যন্তর নেই।

কাবাবের সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে কিস্‌সার মোড়কে এমন আরও কত যে মিথ চৌপাট হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। টুন্ডে মিয়াঁর বৃত্তান্ত থেকে গলৌটি কাবাবের উৎপত্তি প্রসঙ্গে অওধের ফোকলা নবাবের রূপকথা, প্রেমকাহিনির আতরে চোবানো বাকরখানির ইতিকথা, শাহজাহান বাদশাহের খানদানি পাকপ্রণালী সমৃদ্ধ নুসখা-ই-শাহজাহানি থেকে অবিকল টুকে ‘কালজয়ী’ বাংলা রেসিপিবই রচনার মতো অগুনতি গুলগপ্পোর ভুট্টিনাশ করে ছেড়েছেন লেখক। তবে সবেতেই বহাল রয়েছে তাঁর অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণের পাই-টু-পাই হিসেব— বৈঠকী মেজাজের লেখনীতে কণামাত্র শ্লেষ সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না, উল্টে মাত্রাতিরিক্ত আবেগের ঝুল ঝেড়ে দুঁদে গোয়েন্দার মতোই তার আড়ালে থাকা আসল তথ্যের অনুসন্ধানে মগ্ন হয়েছেন তিনি। শুধু কি তাই? কাবাব কিস্‌সা-তে রয়েছে ইরানের নিশাবুরে জাফরান চাষ ও তেহরানের সড়কে সেই জাফরানে জারানো তাবৎ রসনার সবিস্তার বিবৃতি, সিবাঘ সস্, সুমক সস্, বেশামেল সস্‌ তৈরির গোড়ার কথা, রহস্যময় পোটলি মসালার গুহ্য মন্তর, পত্থর কা গোস্তের সনাতন উপকরণ ও রন্ধন প্রণালী, আবার তা মধ্যবিত্ত বাঙালি রান্নাঘরে সহজে রেঁধে ফেলার যুতসই টিপ্‌স। কাবাব তল্লাশির ভাঁজে ভাঁজে ধরতাই হিসেবে এসেছে দেশ-বিদেশের আরও অজস্র বিচিত্র কিসিমের পদের কথকথা, যাদের বিবরণ পড়ে জিভের জল বাগে আনা দায়। ইতিহাস খুঁড়ে কাবাবের মূল হদিশ করতে গিয়ে হেন কোনও দলিল নেই যা তাঁর শিকারি নজর থেকে রেহাই পেয়েছে। কিস্‌সার পাতায় পাতায় রয়েছে এমনই অসংখ্য শোনা না-শোনা বইয়ের উল্লেখ, প্রাচীন ফ্রেস্কো, পুঁথি, মিনিয়েচার পেন্টিং, অন্যান্য অলংকরণ ও আলোকচিত্রের দুর্লভ সমাবেশ যা নিঃসন্দেহে গূঢ়তর অনুসন্ধিৎসার খোরাক জোগায়। এছাড়া কিস্‌সাগুচ্ছের শেষে তুলে ধরা হয়েছে সুবিস্তৃত ‘সূত্র সমূহ’, যা খুঁটিয়ে পড়লে নিঃসন্দেহে কাজে লাগবে পাক গবেষকদের।

কাবাব কিস্‌সা
নীলাঞ্জন হাজরা
ধানসিড়ি প্রকাশন
৪৫০ টাকা
১৫৯ পৃ

Comments are closed.