জীবাশ্মের মুখ/ মৃণালিনী 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তনিমা ঘোষ

মৃণালিনীর “জীবাশ্মের মুখ” কাব্যগ্রন্থে ফুটে উঠেছে আবহমানের মুখছ্ববি, ‘সভ্যতার মুখ নেই  মুখোশ তো পরের কথা/ জলের তলে স্থিত মানবতার/ শ্যাওলার ব্যক্তিগত অনুভূতি’। শ্যাওলার অনুভূতি নিয়ে কবি খোঁজ করে চলেছেন মানবতার ‘চিন্তিত ইশ্বর চাঁদ ও সূর্য চোখে জেগে আছে/ যেন কারও প্রতীক্ষায়’। চাঁদ ও সূর্যকে ঈশ্বরের চোখে স্থাপিত করে অনুভব করেছেন প্রতীক্ষারত অবস্থা, যে অবস্থায় নাগরিক জীবন অস্থির, বিষণ্ণ, মুমূর্ষু, অর্ধমৃত এবং যন্ত্রচালিত। ‘সেই চোখ’ কবিতাটি একটি সহজ সরল আত্মানুসন্ধানের কবিতা। মহাবিশ্বে মহাকাশ মহাকালে জ্বলে যেতে থাকা একটি চোখ। সৃষ্টিকর্তার চোখে তীব্র চিন্তা, তাঁর অপরিমেয়তা নিয়ে কবি বিস্মিত, ‘নরম সূর্যে পিয়ানোর সাদা শরীর / কালো আঙ্গুল ওঠানামায় হাঁপিয়ে দুপুর/ কার্নিশের ঝোড়ো কাকের চোখে চোখ/ চাপা- আগুন… নিজস্ব মুখে’। দীর্ঘ শলাকা যেন ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন মনের গভীরে।

কিন্ত পরবর্তী কবিতায় সহজ রূপে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে রূপক সাংকেতিক, যেখানে ওপরের ভাসমান অর্থ সরলতার মুখোশে ঢাকা জীবনের বীভৎস দিকের ইঙ্গিত ‘কালো মাথার মধ্যে থেকে উঠে আসছে বিকট দুর্গন্ধ/ ইঁদুরের লেজকাটা গিরগিটির মাথা হাতে ঘা/পচাগলা রক্ত ঝুলন্ত মাংসের ঘোরাঘুরিতে/ মশানাশক ধোঁয়া স্প্রে শহরের অলিগলিতে” অথচ “বিষাক্তদের চিহ্নায়িতকরণ নেই / প্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রশ্ন হাস্যকর।” ব্ল্যাকহোলের মতো সময়হীন ভাবে উঁকি দিচ্ছে তুচ্ছ ও নির্বিষ বিষয়টি।

তিনি বুঝেছেন, বস্তুর গভীরতম ভরকেন্দ্রের ভেতরে ডুব দিয়ে কীভাবে বস্তুকে অতিক্রম করা যায় ‘যা মানবতার কবরের টসটসে ফসল’ বস্তুকে নিয়ে আগামীর সময়ের প্রতি এমন বিস্মিত অদ্ভুত অপ্রাকৃত ধারণা সাধারণত খুব কম চোখে পড়ে। ‘অনাথ শিশুদের কান্না/ হোলিতে রক্তের পিচকারি, দীপাবলি ছাড়াই বিস্ফোরণ / কৃষক গলার দড়ি খুঁজে ফেরে’ গাঢ় ধূসর আর ঘনায়মান কালোর এমন পরত চাপিয়ে আঁকা যেন কবিতাটি। স্পেনীয় কবি হিমেনেথ যাকে বলতেন নগ্ন কবিতা তার প্রতিধ্বনি তুলে যেন বলা যায়, একটি দরজা ‘নগ্ন ভাবনা’ বা ‘বিমূর্তন’-এর আর অন্য দরজাটি ‘নগ্ন বিষয়’ বা ‘বাস্তবায়ন’-এর। ‘সো কলড কোয়ালিফায়েড স্মার্ট এস্কর্ট, হায়ার লিভিং স্টাইলের খিদেয় শরীর বিনিময়’।

মৃণালিনীর কবিতা লেখার মুহূর্ত থেকে শুরু হয় ভাষার শান্ত স্বচ্ছ মুখের সীমানা লঙ্ঘন। তাঁর ভাষা অনেকটা রাতের ঘন অন্ধকারের মত। মুখের কাছে তুলে ধরলেও যা দেখা যায় না, চেনা যায় না। কার্বন মনোক্সাইডের ভাষা মিলে যাচ্ছে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে, ভাষার অনুরণন যেন আমাদের সমস্ত শুভবুদ্ধির চারপাশে একঘেয়ে যান্ত্রিক আওয়াজের মতো বেজে যাচ্ছে দিনরাত। নারীও সেই একই রকম বিপন্নতায় আক্রান্ত ও পর্যদুস্ত। ‘উঁকি দেওয়া দাঁত আটকে রাখে সৎ জিহ্বা/ মঞ্চের কাঠামো এক ও অভিন্ন/ শুরু অভিনেতা বদল ক্যালেন্ডার বদলে’ এই তুচ্ছ মহিমাহীন মৃত্যুর স্রোত জীবনকে, জীবনের অস্তিত্বকে তুচ্ছ ও অবান্তর করে দেয়। ‘গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি তোমার কামের পিপাসা / কম্প্রোমাইজ নয়/ একটুকরো সংবাদে গভীর শোক- কানাকানি, সামাজিক বহিষ্কার / তুমি এখন মর্ডান – পনেরো মিনিটেই তোমার সাধ ও সাধ্য পূরণ।’ আবার , ‘রক্ত কণিকারা ওজনদার / নিঃসঙ্গ সময়ের দাবী কাজ কাম অবদমিত প্রসঙ্গহীন’ কামনা কাঁদবে সে দিনও ‘আমিত্ব’ অসহায়ে’ তাঁর স্ব-চিত্রের মুখে আনন্দ আসক্তি বিযুক্তি বিষাদ। আলোমাখা তুলি নিয়ে অন্ধের মতো তিনি ক্যানভাসে খুঁজছেন একটি মুখ, মানব মনের খনন ‘জীবাশ্মের মুখ’-এ।

রূপক বর্ণিত বস্তুর অস্তিত্বকে স্বীকার করে কিন্ত প্রতীক অনেক বেশি বায়বীয় ধারণা নির্ভর। কিন্তু আইকন বস্তুনিষ্ঠ, জমাট ও স্পর্শযোগ্য। কিন্ত আইকনকে আলাদা ভাবে সনাক্ত করা যায় না। মনে যেকোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে যে প্রতিমা থাকে তা আদিম লক্ষনযুক্ত, অনমনীয়। বস্তুুকে সে তিলমাত্র জায়গা ছেড়ে দেয় না, তার ডান বাঁ ওপর নীচ এমনকি কেন্দ্রবিন্দুও নেই। আইকন যখন কোন বস্তুকে স্পর্শ করে তখন বস্তুটি আইকন হয়ে ওঠে। তার চিহ্ন মূল্য ধ্বংস হয় আইকনের সামনে, তখন বস্তুটি নিছক কাল্পনিক অস্তিত্ব। বস্তুটির সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব কারণ তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন নিশ্চয়তা থাকা সম্ভব নয়। তাই, আইকন জীবন ও শূন্যতাবোধহীন। কবির কল্পনাও মাঝেমধ্যে যেন তারই অনুরূপ, ‘জাতের পাটিতে অসুখ – পাইরিয়া/ নপুংশক মন বারবার খিদে মেটায় বারবনিতার বুকের খাঁজে/একক কন্ঠে নয় কোরাসে জীবন নিঃসঙ্গ / আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষায় প্রশ্নসূচক অব্যয়?/ যদিও, পুরুষতান্ত্রিকের আড়ালে মাতৃতান্ত্রিক; রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিহিংসার ভিত/ ভালোলাগা ভালোবাসা দৃশ্যজাত কালো বেড়াল’ আবার ‘ ভূমিকায় শব্দ তোমায় আজও খুঁজে চলেছে নিঃশব্দে…. ‘

বিশুদ্ধ ধ্যান ও কল্পনায় যে উপাদান কবি পান, তা দিয়ে ড্রয়িং করেন উদ্দাম ছন্নছাড়া বীভৎস অথচ জীবন্ত চিত্র। কল্পনা ও ধ্যানের পৃথিবীতে প্রতীক পরিত্যক্ত ও নির্বীজের মতো গভীর রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। বিমূর্ত প্রকাশের মধ্য দিয়ে কোন শিল্প প্রতীকের দোষগুণ মুক্ত হয়ে ওঠে পূর্ণ বিমূর্ত, যার নিজস্ব মুখ নেই, তাই কোন ছবির প্রতিনিধিত্ব করতে অক্ষম। ‘বেদ উপনিষদ পুরাণ আর্য পুরুষের ফসলের যাঁতাকল!’ মৃণালিনীর কবিতায় তারই আশ্চর্য প্রতিফলন।

মৃণালিনীর কবিতাকে বিশ্লেষণ ব্যাখায় নয়, অর্ন্তদৃষ্টির অনুভব আর সীমাহীন অনুভূতির গাঢ়ত্ব দিয়েই কেবল ছোঁয়া যেতে পারে। একটা অতৃপ্তি জনিত প্রশ্নের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে কবিও যেন অস্তিত্ব মনে খোঁজ করে চলেন পুরনোকে ছেড়ে নতুন শব্দ। কারণ ‘ শব্দ ভান্ডার গুটিয়ে নিচ্ছে অপ্রচলিত অর্থহীন শব্দ/ কবিতার শরীর ভেঙে পড়ছে অবিশ্বাসী প্রেমিকের মতো’। তাই তো, প্রয়োজনে দেশি-বিদেশি শব্দের ব্যবহার।  গাঙচিল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বিপুল গুহের প্রচ্ছদে মৃণালিনীর ‘জীবাশ্মের মুখ’ শব্দ ভাষা প্রতীক রূপকল্প আর স্বকীয়তায় উজ্জ্বল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More