টুকরো লেখা মন কলম/সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মৃন্ময়ী ঘোষ

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘টুকরো লেখা মন কলম’ গদ্যে টুকরো টুকরো কোলাজ গদ্য অবয়বে অথচ কবিতার ছন্দে। ‘জ্বলতে থাকা মরুভূমির মতো কলকাতায়’ কবি ভাস্করের মত প্রতীক্ষা করেছেন, ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ আর শীতকাল এলে, শব্দে বেজে ওঠে ‘শীতকালে ভেসে আসে রোদের স্যাক্সোফোন।’ আবার  ‘উইকডে-তে এত বৃষ্টি হলে চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়/ সিন্থল সাবান লিরিল সাবানের সঙ্গে মিশে যায় শাওয়ারের তলায়।’

অতীত কলকাতার দ্রুত বদলের ছবি, একঘেয়েমি, আসল্য দুপুর ও দ্রুতময় জীবনযাপনের জীবন্ত ছবি লক্ষ্য করা যায় একাধিক গদ্যে, ‘মেঘের চিলেকোঠায় রোদের দিন মনে পড়ে/ প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, ব্রেকফাস্ট খাই, নামি রাস্তায়, পেরিয়ে যাই পুরোনো বাড়ি ট্রামলাইন শপিং মল; প্রায় প্রতিদিন অফিস যাই; একটা নিস্তব্ধ, ঠাণ্ডা ঘরে একা একা কাজ করি।’

বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ঘটনা চলমান জীবন্ত ছবি। এখানেই থেমে যায় না। শব্দ স্পর্শ উপরিতল বাস্তবতা থেকে দূরে সরে Pointilist শিল্পীর মতো টুকরো কথায় জানায়, ‘জঙ্গলে হলুদ ঘাসের বিছানায় শুয়ে আছে সূর্য।’ বর্তমান জীবনে ভারচ্যুয়াল বা ফেসবুক নিয়ে যখন তিনি বলেন, ‘ট্রামলাইন আর টাইমলাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র বাঙালিই পেরেছে ফেসবুককে একটি জীবন্ত বিশ্ব-পাড়া করে তুলতে।/ যেখানে কথা নেই, অপেক্ষা আছে, শব্দ নেই, ইশারা আছে।’

আবার হারিয়ে যান প্রকৃতির দৃশ্যপটে,’নিসর্গে যে রহস্য মিশে আছে, তাকে আমি খুঁজতে চাই বিষণ্ণ গোয়েন্দার মতো, আর কে যেন অজানা চিরকুট ফেলে যায় জানালার কোণে। রিসর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে দিগন্ত এক মায়াঘাতক, যার লুকোনো পিস্তলে, যার মাটি ও আকাশের কিসিং পয়েন্টে আমরা সবাই নিশানা।’

টুকরো টুকরো জীবনের প্রতি নির্মোহ দৃষ্টিপাত, যা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে ছোঁয়া যায় না। কারণ কোনও একটি ছবির বিশেষত্ব এই যে, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের ভেতরেই আলো ছায়া আর বর্ণসম্পাতে বেধ বা থার্ড ডাইমেনশনের ধারণা দিতে হয়। এই বেধ বা তৃতীয় তল একটি অবাস্তব, ‘দিস নাম্বার ইজ বিজি ফর দা লাস্ট ফাইভ ইয়ার্স… ‘

অবনীন্দ্রনাথের ধোঁয়া ছবির জল রঙের মতো নরম শীতল, স্পষ্ট। কখনও নরমতীর্যক কিন্তু শ্লেষের পরিবর্তে আছে এক মোহময় আচ্ছাদন। রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে শব্দ তুলো বীজের মতো হাওয়ার ভেসে সামনে চলে আসে, আলস্যে ভেসে চলে যায়। শব্দের শরীরে প্রবল হাওয়া, ‘বন্ধ রাখতে রাখতে চালিয়ে দেওয়া ফ্যান/ পরকীয়া বসন্ত/ পরিযায়ী ঘাম, শিগগিরি যা/ সমুদ্র হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে।’


শব্দ ছুঁয়ে ঘুম আর ঘুমের মধ্যে ভেসে চলতে চলতে কখনও পৌঁছে যান রাস্তায়, কখনও গলি পেরিয়ে দরজা ঠেলে বাড়ির ছাদে। দৃশ্যমান জগৎ ও অদৃশ্যমান কল্পজগতে মাঝামাঝি মন কলম বর্ণনা করে চলেন,গদ্য চলনে চলতে চলতে বর্ণিত দৃশ্যাবলী ও ঘটমান ঘটনার নস্টালজিক আবহে পাঠকও হারিয়ে যান নিজস্ব আবেশে।

সমাজের অস্থির সময়ে, ‘সেই একটা সময়/ যখন বাজপাখির প্রকাণ্ড ডানার তলায়/ অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে/ বিষের পাত্র থেকে কবিতা জোনাকি তুলে এনে/কলকাতার ভূতগ্রস্ত কলোনিতে/ আমরা টিকে গিয়েছিলাম কিছুদিন … ’কত সহজে সমসময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। অথচ তিনি জানেন, ‘একদিন মরে যেতে হবে/ ভালোবাসতে বাসতে ভুলে যাই সব ভ্রম।’

কবিতায় পাঠক শব্দকে নয় তার অনুভূতিপুঞ্জকে পড়েন। কিন্তু সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্য জুড়ে অনুভূত, কল্পিত ও দৃশ্য জগৎ – যুক্তিবিন্যাস, শৃঙ্খলা, র‍্যাশনালিটির বাইরে এমন এক গোধূলে যেখানে একই নদীর স্তরে স্তরে বিপরীতমুখী স্রোত। তাই তো কখনো কলকাতা, শান্তিনিকেতন ছাড়িয়ে হেঁটে বেড়ান ‘মাদ্রিদের রাস্তায়’, দার্জিলিং শিমলার নৈসর্গিক প্রকৃতির ক্যানভাসে, তুলির নিখুঁত আঁচড়ে এঁকেছেন সজীব চিত্র।

মিথ ভেঙে শিব কৃষ্ণ ও বুদ্ধকে হাস্য কৌতুকের মধ্যে দিয়ে অনায়াসে আজকের চরিত্র তুলেছেন। বুদ্ধের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের ছলে ব্যক্ত করেন নিজমনের ভাব। ‘ভাগাড় –কাণ্ডের কল্যাণে মুরগি কষা বা কচি পাঁঠার সোনালি ঝোল / ভাইরাসের নাম ‘নিপা’/ সকলে মিলে নীপার আত্মার শান্তি কামনা করি, ও মুক্তি পেলে , আমরা অন্তত শুয়োরটুকু মুখে তুলতে পারি…’ আবার কোথাও বই বিমুখ সমাজের প্রতি হাস্যচ্ছলে সহজ উচ্চারণ, ‘আইনক্স, তিন্ডার, আইফোন এক্স আর ওয়াও মোমো-র মহাজাগতিক বিস্ময়ের বাইরে বেরিয়ে একবার বাড়ির বইয়ের তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে বিভূতিভূষণ-শরদিন্দু-সুকুমার রায় নামিয়ে আনলে, এমন ‘কেন কি’ অবস্থা হত না…’

এমন বাস্তব চিত্র গ্রন্থ জুড়ে, তিনি যেন পাঠককে সরাসরি তাঁর কল্প জগতের মুখোমুখি বসিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। তাঁর কথা ভাব ভাষায় পাঠকও অতি সহজে পৌঁছে যাচ্ছেন তার কল্পিত জগতে। লেখক-পাঠক ব্যবধান তখন অদৃশ্য। যেখানে লায়োনেল রিচি গেয়ে ওঠেন- “হ্যালো… ইজ ইট মি ইউ আর লুকিং ফর…” পড়তে পড়তে পাঠক মনেও একটি প্রশ্ন অনুরণনিত হয়, ওয়াট আর ইউ লুকিং ফর?

প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত সময় অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠেছে, ‘শহরের ফাল্গুনে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ডেকে ওঠে প্রাগৈতিহাসিক দাঁড়কাক, কারণ কোকিলেরা মাইগ্রেট করে চলে যাচ্ছে’ এখানেই সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যান্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র। সৌভিক মূলত কবি, তাঁর গদ্যের চলন ও স্বভাবজাত কবিতার অনুগামী। গদ্যে সুর লালিত্যে, ছন্দের দোলায় কোনও কোনও গদ্য যেন নিটোল কবিতা। কবিতার মত গদ্যে ঝংকার তার নিজস্ব স্ট্যাইল, গদ্য ফর্ম হয়েও যেন কবিতার কাছাকাছি,’হাজার লোকের ভিড়ে একজোড়া চোখ যেন চিরচেনা- কবিতা যা গদ্যের অবয়ব।

নগর জীবনের ব্যস্ততা, সম্পর্কের টানাপোড়ের প্রেম- হতাশাজনিত দুঃখ, সবকিছু তুলে ধরেছেন গদ্যে কিন্তু কোথাও উচ্চকিত শকিং শব্দ ব্যবহার করেননি। নস্টালজিক গদ্যে ব্যবহৃত ইংরাজি শব্দ কোথাও বাধা সৃষ্টি না করে বরং লেখনীকে করে তুলেছে ‘নিজস্ব’ ও ‘স্মার্ট’। সৌভিকের নিজস্ব মন, মনন ও ভাবের ঝকঝকে প্রসাধন। যদিও লেখকের কথায়, ‘প্রথম গদ্যের বই’ কিন্তু ‘পোটেয়িক পোজ’ এবং এক্সপেরিমেন্টাল গদ্যকবিতার টুকরো কোলাজ বললেও হয়তো ভুল হবে না। আগামী সময় নির্ধারণ করবে সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গদ্য ও কবিতার মাঝামাঝি লেখা প্রথম গদ্যবই ‘টুকরো লেখা মন কলম’- এর স্ট্যাইল নিয়ে তা, নিঃসন্দেহে অনুমান করা যেতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More