শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ভাতপুরাণ: ভাইয়ে-ভাইয়ে, জঠরে-জঠরে, ভাতে-ভাতে রেষারেষি

  • 69
  •  
  •  
    69
    Shares

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

ভাতপুরাণ ।। অসিত কর্মকার ।। বটতলা ।। ২০১৭ ।। ১০০ টাকা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মানুষের আর্থিক উন্নতি হয়েছে—এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু আজও বাংলার আনাচ-কানাচে কত কত মানুষ দারিদ্র্যের করাল গ্রাসের শিকার। উন্নয়নের তীব্র ঢক্কানিনাদে সে খবর হয়তো এসে পৌঁছোয় না শহুরে ড্রয়িংরুমে। তারই মধ্যে কখনও কখনও খবরে উঠে আসে হা-অন্নের হাহাকার। এরকম একটি বিষয় নিয়ে অসিত কর্মকারের উপন্যাস ‘ভাতপুরাণ’। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপন্যাসের বিষয়বস্তু।

কাহিনির পটভূমি সুন্দরবন অঞ্চল। সেখানকার মানুষদের প্রতিনিয়ত জল ও জঙ্গলের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই এবং খাদ্য সংগ্রহের জন্য লড়াই একই সঙ্গে চলে। আজও। এই উন্নয়নের ভরা কোটালের সময়েও।

সুন্দরবনের একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে বিন্যস্ত হয়েছে আখ্যান। খড়িডাঙা গ্রামের হরেন আর অষ্টমীর চার ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে একটা কাজে ঢুকেছে। বাপকে একটা পয়সা ঠ্যাকায় না। মেয়ে কুসমি কলকাতায় বাবুর বাড়িতে কাজ করত। শহুরে রঙ লেগেছিল শরীরে। কিন্তু বিয়ের বয়স হতে হরেন মেয়েকে নিয়ে এসে বিয়ে দেয়। কুসমির বরও হত দরিদ্র, অলস। বাকি দুটো ছেলে বড়ই ছোট। জমিজিরেত নেই। জনমজুর খেটে কোনও রকমে দিন গুজরান করত। এখন কোনও কাজই পায় না। কাজ থাকলে তো পাবে।

এক সময় এই সমস্ত অঞ্চলে কত কিছু চাষ হত। বর্ষায় ধান, শীতে লঙ্কা, গরমে তরমুজ। নিজের জমি না থাকলেও হরেনের মতো মানুষেরা সারা বছর কাজ পেত। অন্নের অভাব হত না। কিন্তু প্রাণবল্লভ মণ্ডলের মতো লোকেরা সমুদ্রের নোনা জল ঢুকিয়ে চাষের ক্ষেতগুলিতে বাগদার চাষ করছে। অনেক অনেক বেশি লাভ। বাগদা তোলার সময় সামান্য ক’জন লোক দরকার হয়। যারা বাগদা চাষের জন্য জমি দিয়েছে, তারাই কাজ পায়। গাড়ি করে প্রাণবল্লভ মণ্ডলের আসার খবরে কাজের আশায় হরেনও গিয়েছিল। হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

কাঠা দু’য়েক পতিত জমির উপর হরেনের মাটির দেওয়াল, খড়ের চালা, ছোট একটা ঘর। নোনা বাতাসের বিষাক্ত কামড়ে দেয়ালের মাটি খসে ভেতরের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। সময় মতো চাল ছাওয়া না হওয়ায় জায়গায় জায়গায় গর্ত। বর্ষার জল ঢুকে পড়ে ঘরে। সংসারসুদ্ধ দেওয়ালের গায়ে গা লেপ্টে দিন কাটাতে হয় তখন। সাপখোপ, তক্ষক, পোকামাকড় দোসর হয়।
কাহিনি বিধৃত খরার মরশুমে। ছায়াশূন্য, ধুকোবুক, সুনসান গ্রামখানার মাথার ওপর প্রখর সূর্য। নীচে আদিগন্ত থৈ-থৈ আগুনের ঢেউ। ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে হরেন আর অষ্টমীর সংসার। সকালে উঠে মালঞ্চ বাজারে ছেলের কাছে গিয়েছিল হরেন। এই দুর্দিনে যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়। খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। বাড়িতে যে দশটা মাত্র টাকা ছিল তাও চলে গেছে যাতায়াতের খরচে। সামান্য যেটুকু চাল ছিল তাতে এক মুঠো করে খেয়েছে। আর কচুঘেঁচু, শামুক গেঁড়ি। দুপুরে সকলে খেতে বসেছে। আর তখনই এসে পৌঁছোল কুসমি, সঙ্গে দুটো বাচ্চাকে নিয়ে। কুসমির মেয়েটা বলে—“অ মা, খিদে নেগেচে, ভাত খাব—।” ভাতের গন্ধ যেন এক অমোঘ শিকারি, হাজার মানুষের মধ্যে থেকে সে ঠিক ক্ষুধার্তকে বিদ্ধ করে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পাগল করে ছাড়ে। সূর্যের কঠিনতম তাপও ওই গন্ধকে উদ্বায়ু করে তার নিশানাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে না।

ক্ষুধার্ত সন্তানদের খেতে দিতে না পারার ব্যর্থতায় মিইয়ে থাকে হরেন অষ্টমী। আবার কুসমির বাচ্চাদের জন্য মেজ-ছোট খোকার পাত থেকেও তুলে নিতে হয় ভাত। হরেনকেও না খেয়ে উঠতে হয়। “ভাইয়ে-ভাইয়ে; জঠরে-জঠরে, ভাতে-ভাতে রেষারেষি। আগুনের পোড়া বেয়াড়া হাওয়া শুধু থেকে থেকে ছোবল বসায় ঘরের দাওয়ায়, ওদের হাড়সর্বস্ব চিমসে শরীরগুলোয়। জঠরবহ্নি উস্কে দেয়।”

এখন শাকপাতারও যে আকাল! ছোটছেলের মনে পড়ে রিলিফ ক্যাম্পের স্মৃতি। গেল বার বন্যা হয়েছিল। চারিদিক ভেসে গেছিল। কচুঘেঁচু, শামুক-গেঁড়ি সব জলের তলায়। রিলিফ ক্যাম্প বসেছিল গাঁয়ে। ডালে-চালে খিচুড়ি তিনবেলার বরাদ্দ। হলদে জলে আধফোটা চালডাল। তার ওপর কাঁচা তেল ভাসে। তারই কেমন সুন্দর সোয়াদ ছিল। গরম সুবাসেই পেট ভরে যেত। সেবার বন্যায় এ বার খরায়, না খেয়ে মরার ভয় ঘনিয়ে আসছে আবার। বন্যায় ভেসে মরলে বা আটকে থাকলে রিলিফ জোটে। কিন্তু খরায় বাইরে সব ঠিক থাকে। শুধু ভেতর থেকে শুকিয়ে যায় সব। পৃথিবী শুকিয়ে কাঠ হয়। আকাশ ফেটে জল পড়লে সে আবার প্রাণ পায়।

সাংবাদিকের মতো লেখক খরার সুন্দরবনের দারিদ্র্যের মর্মস্পর্শী বর্ণনা করেছেন। কোথাও কোথাও শৈল্পিক ত্রুটি থাকলেও একটি বিপন্ন এলাকার বিপন্ন সময়ের যে নিবিড় চিত্র তুলে ধরেছেন অসিত কর্মকার তার ডকুমেন্টারি গুরুত্ব অপরিসীম। এত বিপর্জয় দুর্দশার মধ্যেও মানুষদের নৈতিক অধঃপতন হয়নি। হরেনের বাড়ির লাগোয়া বাগদার বিল। চাইলেই কিছুটা বাগদা ধরে বাজারে বিক্রি করতে পারে সে। ভাতের জন্য বাচ্চাদের কান্নায় হরেনের ব্যর্থতাই প্রকট হয়ে ওঠে। তখন হরেন এরকমটাই ভেবেছিল। কী এমন ক্ষতি হবে প্রাণবল্লভের এতো বড় চাষ থেকে সামান্য একটু তুলে নিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। তার বুকের ভিতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মানুষটা বাধা দিয়েছে। আবার ভিন্‌গাঁয়ে তরমুজ খেতের ভিতর দিয়ে কুসমির বরের সন্ধানে যাওয়ার সময় তীব্র খিদের মধ্যেও মাঠ থেকে একটা তরমুজ ছিঁড়ে নিতে পারেনি। সেই ভিতরের মানুষটা, অষ্টপ্রহর চোখ-কান বাগিয়ে বসে থাকা মানুষটা বলেছে—“বরং বিষ খা হরেন। তরমুজ খেলে তুই বেঁচে থাকবি। বেঁচে থাকলে তোর খিদে পাবে। সবারই পায়। পাবেই। পেলে কষ্ট হবে তোর। আর এ কষ্ট তোকে জীবন-ভোর পেতে হবে, হবেই।”

মহৎ মানবিক আদর্শের ব্যঞ্জনা বারবার এসেছে উপন্যাসে। লেখকের বিশ্বাস, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবক্ষয় সর্বদা নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আসে না। হরেন ভেবেছিল হয়তো মেজখোকার বুকের মধ্যে ওই লোকটা বসে নেই। সে হয়তো পারবে। কিন্তু সেও পারেনি। বাগদা চুরির ভাবনায় যে জাল তৈরি করেছিল তা নিয়ে সে দৌড়ে গেছে নয়ানজুলিতে। নয়ানজুলির বুক শুকিয়ে জল নেই বললে চলে। কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় বলে সকলেই মাছ ধরে। মাছ থাক না থাক পাওয়ার আশা ছাড়ে না তারা। তাছাড়া সংসারের দুঃখ-কষ্ট, টানা-পোড়েন সাময়িক ভুলে থাকার এ এক মোক্ষম উপায় গাঁ-গ্রামে।

লেখক দেখাতে চেয়েছেন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যেও এভাবেই মানুষ কষ্ট ভুলতে চায়। আশার প্রদীপটাকে জ্বালিয়ে রাখে। স্বপ্নকে লালন করে। এই বিশ্বাস থেকে তিনি আশ্চর্য করুণ বীভৎস বাস্তব ছবি তুলে ধরেছেন। এই বাস্তবতার স্বরূপ বুঝতে হলে কিছুদিন অন্তত যাপন করতে হবে সুন্দরবন অথবা জঙ্গলমহলে!

সকালে সামান্য জলে-ভাতে খেয়ে সেই নয়ানজুলিতে গেছিল কুসমিরা। রোদের মধ্যে এতোটা পথ হেঁটে আসতে ছোটখোকার বুকের ভেতরটা জ্বলুনি দিয়ে ওঠে। বুক পর্যন্ত এসে থম ধরে থাকা টোকো পান্তা উঠে এসে মুখ ভরিয়ে দেয়। “আঃ, কী সোয়াদ! ফের পান্তা খাওয়ার সুখ হয় ছোটখোকার। এখন অনায়াসে টোকো পান্তা বারবার মুখে উঠতে থাকবে তার। যত উঠবে ততই তার মনটা ফিঙ্গের নাচন লাগবে। এই প্রচণ্ড তাপও তার সয়ে যাবে।”

এখন বমিটুকুও নষ্ট করা যায় না! পেট থেকে উঠে আসা ভাতের কণাটুকুও মহার্ঘ্য! হতবাক হয়ে যেতে হয়। এরকম ঘটনা ও দৃশ্যকল্প ইতি পূর্বে আমাদের চোখে পড়েনি। কোনো রকম আড়ষ্টতা ছাড়াই লেখক যথেষ্ট মুন্সিয়ানার সঙ্গে ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। লেখকের এহেন পর্যবেক্ষণ আমাদের বিস্মিত করে।

ভাত এখানেও। লেখক মুহূর্তের জন্যও পাঠককে ভুলতে দেননি যে প্রকৃত প্রস্তাবে ‘ভাতপুরাণ’ ভাতেরই উপন্যাস। ভাতই যেন নায়ক। চরিত্ররা ভাতকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খেয়েছে। এমনকি চরিত্র এবং কাহিনিতে যে দ্বন্দ্ব এসেছে তাও ভাতের জন্য।

শিশুর পাওয়া উপহারের টাকাও মা জোর করে কেড়ে নেয় ভাতের জন্য। কুসমির বর আসে কুসমিকে নিতে। কাজের সন্ধান করে একমাসের অগ্রিম বেতনও নিয়ে এসেছে। পরদিন সকালে যাওয়ার সময় কুসমি পাঁচটাকার নোটটা ছোটখোকার হাতে তুলে দিয়ে বলে দুই ভাইয়ে সমান ভাগ করে নিতে। ছেলের কাছে অষ্টমী টাকাটা চায় চাল কিনবে বলে। ছোট দিতে না চাইলে সে জোর করে কেড়ে নিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকে। “অষ্টমীর হাতে ধরা টাকাটা যেন টাকা নেই আর, ওটা একটা ভাতের হাঁড়ি হয়ে গেছে। তাতে চাল ফুটছে। চাল ফুটে সাদা ধবধবে পবিত্র ভাত তৈরি হচ্ছে। তারই শরীর-মন-মস্তিষ্ক আলোড়িত করা তীব্র আসক্তি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর প্রান্ত থেকে প্রান্তরে।”

অসিতের এই আখ্যানের পরতে পরতে উদগ্র হয়ে আছে ভাত, ভাতের জন্য হাহাকার। সবমিলিয়ে ভাতেরই এক আশ্চর্য বয়ান হয়ে উঠেছে ‘ভাতপুরাণ’। খুবই ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ। প্রতিদিনের অভ্যেসে আমরা বেমালুম ভুলতে বসেছি ভাতের গুরুত্ব। ভাতও যে কত মহার্ঘ্য একটি বস্তু তা নতুন করে অনুভব করলাম এই উপন্যাসের পাঠক্রিয়ায়।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Comments are closed.