পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলিংয়ের দিকে তাঁর কবিতার ভাষা ঝুঁকে থাকে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অর্পণ চক্রবর্তী

‘জর্দা বসন্ত’ অগ্নি রায়ের সাম্প্রতিকতম কবিতার বই। সিগনেট থেকে এই বইমেলায় প্রকাশিত ৪৮ পাতার সুদৃশ্য বইটির দু’মলাটের ভেতরে ২৬টি কবিতা এমন দু’-একটি পুরনো প্রশ্নকে জাগিয়ে তুলল, যার উত্তর স্বতই গভীর সন্নিধি।
প্রথম প্রশ্নটি অতিপরিচিত। মহাভারতে যক্ষ করেছিল যুধিষ্ঠিরকে: কে সুখী? যুধিষ্ঠির সুখীর যে ক’টি গুণ নির্দেশ করেছিলেন, তার একটি এই যে,  সে অপ্রবাসী। আর যে প্রবাসী, তাকে তো তার একান্তই নিজের দেশকাল থেকে বিচ্ছেদজনিত অসুখকে চুপচাপ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। ফেরা আর হয় না কখনও। দুষ্প্রাপ্যতার বোধ থেকে গদ্য আখ্যান সম্ভব হয়, কিন্তু অপ্রাপ্যতার বোধে দৃঢ়মূল না হলে কবিতার পঙক্তি ম্রিয়মাণ হতে-হতে অর্থহীন শব্দের ব্যবহারমাত্র।

কর্মসূত্রে অগ্নি প্রবাসী। দিল্লিতে। সেখানে ‘গরম বাতাস সেঁক দিচ্ছে চাকরি যাপনের সেলাইয়ে’। ওই সেলাইটা বারবার অগ্নি তাঁর কবিতায় খুলে খুলে দেখেন আর অপ্রবাস যে অপ্রাপ্য, তা বুঝে নিতে থাকেন। শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের অধিকাংশই জুড়েই একটি ‘দেশ’ কলকাতা নানা রূপে-মোহে-মদে-মাৎসর্যে-প্রেমে-অপ্রেমে-অপমানে-স্নেহে-বাৎসল্যে-যৌনতায়-বন্ধুত্বে-শত্রুতায় নানা ঋতুতে নানাভাবে অগ্নির পোষক; কবির খাদ্য ও পানীয়। ‘ডেটলাইন কলকাতা’ কবিতায়, যে ট্যাক্সির ‘পেছনের সিটে সংসার পাতা সাবেক পাড়া অবদি’, সে বস্তুত ‘অমৃতসন্ধানী ধুলোপথযান’ আর ওই সাবেক পাড়াও এতদূর সময়ের মধ্যে প্রলম্বিত, যেখানে ‘বেলজিয়াম আয়নার কাতরানির শব্দে বুঝি বা পূর্ব শতকের বাবুরা আজও ফিরে ফিরে আসেন’। আর এখন এই বইয়ের কবিতার পঙক্তিতে-পঙক্তিতে একদিকে কলকাতা খেয়ে ফেলছে, প্রেমিকের মতো গ্রাস করছে তাকে, যে-লোকটি কথা বলছে তার হাত-পা-মাথা সমস্ত শরীর। অন্যদিকে, যেই কবি লিখে ফেলছেন এক-একটি লাইন, তখনই জেনে ফেলছেন যে, তিনি এখন ‘গ্লোসাইন এই যমুনা-শহরে’, বাকিটা অধ্যাস। তিনি জানেন ‘কৃষ্ণার শাড়ির মতো লুঠতরাজ বৃষ্টি’ এ শহরে ঝরে যাবে অবিরাম।

মহাভারতীয় আখ্যানের নৈতিক প্রেক্ষিত থেকে ছিন্ন করে দুঃশাসনের নিষ্ফল প্রয়াস আর ব্যর্থতার এই চমকপ্রদ তির্যক ব্যবহার ঘটে যায়, কারণ তিনি জানেন, আবরণের পর আবরণের স্তরে উন্মোচনের থেকে ক্রমে দূরে সরে যাওয়ার ভবিতব্য। এই জানার, এই জ্ঞানের ফলপরিণাম, এমনকী স্মৃতির যোগ্যতাতেও অনাস্থা। তাই কয়েক পঙক্তি পরে এ-রকম উচ্চারণ অনিবার্য হয়ে ওঠে– ‘অবসন্ন মেমারি কার্ডের আয়ু/ যতদিন ভার নিতে পারে/ তাহার গায়ে, মরমি পদাবলীটির/ কাছে পূজারী পাঠকের মতো ফিরে ফিরে এসো’।

স্মৃতিরও স্থানাভাবের সম্ভাবনা ও তজ্জনিত বিপন্নতা অগ্নির কবিতায় অন্তর্লীন, সে একাকীত্ব তখন আক্রমণাত্মক, নিজেকেই গিলে খেতে চায়। কয়েকটি কবিতার দু’-একটি লাইনের উল্লেখে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাবে:
১. কুমিরের একাকিত্বের কাছে জলের দাঁত বসে গ্যাছে।
২. লালমণি কাঁকড়া, তোমার কথা প্রসন্নকাকিমাকে বলেছিলাম। …প্রতিশোধপ্রমত্ত আমি ওঁর ছেড়ে যাওয়া শূন্যতায় তোমার একটি দাঁড়া গেঁথে দিতে থাকি।
৩. তোমার বাগান উপচে যাচ্ছে কুইজ কনটেস্টের ব্যস্ততায়। …তথ্যের সংঘবদ্ধ পিকনিকের মাঝে একের পর এক যুদ্ধের সন তারিখ পরাজয়ের মরশুম এসে বসে।
৪. স্মৃতিকে আর পেনাল্টিবক্স পর্যন্ত টানা যাচ্ছে না। তার আগেই ড্রপ খেতে খেতে সে ফিরে যাচ্ছে কাঁটাতারের ওপারে।
৫. বাঘের আতঙ্ক তাকে ঘুম কেড়ে নেওয়া স্বপ্ন দিয়েছে। জঙ্গলের সব দাগ হাতের রেখার মতো সে চেনে, আর স্মৃতিখাওয়া লাশের রক্তদাগ। এমনকী, সে এটাও জানে যে শেষপর্যন্ত বাঘ নয়, বাঘের আতঙ্কই তাকে ছিঁড়ে খাবে।

পেশাগত কারণে বার্তার সন্ধানে নিয়োজিত থাকতে হয় অগ্নিকে। হয়তো সে-জন্য এক পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলিংয়ের দিকে তাঁর কবিতার ভাষা ঝুঁকে থাকে: ‘টমেটোর লাল বিলাস আর সজনেডাঁটার ছিপছিপে সবুজ’-এর পাশে লাইন লাগায় ‘কাটা কুমডোর হলুদ, ডবকা বেগুনের বাসনা-পোকা, মেধাহীন লাউ, প্রভুভক্ত পটলের অনুচ্চারিত কামকথাকলি’। আর নিশি তরকারিওয়ালির একটি ঝাঁকাতেই সব্জিসকল, বিশেষণের/ ক্রিয়ার প্রথাবিরুদ্ধ অথচ অব্যর্থ প্রয়োগে, পার্সোনিফিকেশনের পথে আমাদের সঙ্গে নিজেদের বদলাবদলি করে নিতে থাকে।

যক্ষ আরেকটি প্রশ্ন করেছিল: বার্তা কী? যুধিষ্ঠির বলেছিলেন: এই মহামোহরূপ কড়াইতে কাল সমস্ত প্রাণীকুলকে পাক করছে। সূর্য তার আগুন, দিন আর রাত্রি হল ইন্ধন, ঋতু এবং মাস এই পাকক্রিয়ার দর্বী বা হাতা।
অগ্নির প্রতিবেদনে যুধিষ্ঠিরোক্ত এই বার্তা বোধহয় বারংবার রণিত হতে থাকে: ‘তোমার চশমার দামি লেন্স ঘেঁষে রিপোর্টাজ লিখতে বসি। …ছেলেবেলার ভুলগুলি মেঘ হয়ে নেমে আসে নিউজপ্রিন্টের উপর। …স্থানীয় সংবাদদাতার বদলে লিখে ফেলি মৃত বন্ধুনাম’ (একটি খরার প্রতিবেদন)।
বার্তার এই স্বরূপে অগ্নি স্থিত বলেই তিনি কৈশোরকে এভাবে অনুবাদে সক্ষম হন: ‘নিলডাউনের ক্ষত ভিন্ন ধরনের নির্জনতা এনে দেয়। অন্য উচ্চতা থেকে দেখা সামনের ডেস্ক কোলাহল আর আযুর মতো দীর্ঘ করিডর। কত কাছে অথচ দৃষ্টিকোণের বিচারে অচেনা।’

‘জর্দা বসন্ত’কে বাসন্তিক ভালবাসা।

জর্দা বসন্ত
অগ্নি রায়
সিগনেট প্রেস
মূল্য: ১০০ টাকা

(অর্পণ চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ও কবি।) 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More