সোমবার, এপ্রিল ২২

কল্পনা করতে পারলেই তো শিখবে ওরা, ‘বিশ্বাস’ রেখেছিলেন সম্রাট

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুযোগ পেয়েও নিজের ইচ্ছেয় বটানি অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিল আসানসোলের কলেজে। তখন ২০১২। কিন্তু বাড়ি থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা করতে গিয়ে বহু ছাত্রের যা হয়, তা-ই হল। ‘বন্ধু’দের সঙ্গদোষ, সেই সঙ্গে নানা রকম হতাশা। তাই স্কুল স্তরের পড়াশোনায় যথেষ্ট উজ্জ্বলতার ছাপ রাখার পরেও গ্র্যাজুয়েশন পাশ করতে চারটে সিমেস্টারে হোঁচট খেয়েছিল ছেলে। তখন অবশ্য কেউ জানত না, সেই ছেলের হাত ধরেই এক দিন সাফল্য আসবে তাঁর গ্রামে।

কলকাতা থেকে কালনা যাওয়ার পথে পড়ে গুপ্তিপাড়া স্টেশন। ট্রেন থেকে নেমে আরও আধ ঘণ্টার কাঁকর-পথে পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলে গ্রাম ঘেঁষা মফঃস্বল, পূর্ব সাতগাছিয়া। বাসস্ট্যান্ডের ব্যস্ততাটুকু পার করে ফেললেই আর সুস্থ জীবনের আলো নেই পর্যাপ্ত, বরং খুচরো অপরাধের অন্ধকার আছে চোরাগোপ্তা। এখনও শিক্ষার হাওয়া তেমন জোরদার নয়। কিশোর বয়সেই কিছু একটা করে যে কোনও রকম কাজে ঢুকে পড়াটাই দস্তুর। তা করতে গিয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়াও নতুন নয়।

হবে না-ই বা কেন, এদের কারও মা হয়তো সারা দিন চাউমিনের কারখানায় কাজ করেন, বাবা হয়তো তাঁত বোনেন। কেউ বিক্রি করেন আখের রস। জনমজুরি খাটতে বাইরেও যান কেউ কেউ। অভাবের সংসারে ভাতের পাতে রোজ নুন না থাকুক, ছেঁড়া পকেটে সস্তার স্মার্টফোন আছে। তাতে অবশ্য সংসারে সুরাহা আসেনি, বেড়েছে খানিক অপচয়।

এ হেন সাতগাছিয়ায় হঠাৎ অনেকটা রোশনাই একসঙ্গে উপচে পড়েছে বুধবার সকাল থেকে। সেখানে একসঙ্গে ১৭ জন মাধ্যমিক পাশ করেছে। এলাকাবাসী বলছেন, এদের কারওই পাশ করা দূরের কথা, পরীক্ষা পর্যন্ত এগোনোরই কথা ছিল না। সবটাই সম্ভব করেছেন সম্রাট স্যার। সম্রাট বিশ্বাস, যাঁর কথা প্রতিবেদনের প্রথমেই বলা হয়েছে।

“অনুপ্রেরণা কাকে বলে, বুঝিনি কখনও। না পড়তাম ভাল বই, না দেখতাম ভাল সিনেমা। ফোন হাতে ছিল, কিন্তু সারা দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকতাম নেশার মতো। অন্ধকার নামছিল। কিন্তু বারবার হোঁচট খাওয়াটাই হয়তো আমার নিজের জন্য নিজের অনুপ্রেরণা হয়ে গেল।”—বলছিলেন বছর তেইশের সম্রাট। ২০১৫ সালে এক রকম হেরে যাওয়া মানুষের মতোই আসানসোল থেকে গুপ্তিপাড়ার বাড়িতে ফিরে চলে আসেন সম্রাট। হেরে যাওয়া, কিন্তু হাল ছাড়া নয়। নতুন উদ্যমে শুরু পড়াশোনা। আর একটাই সুযোগ হাতে, পাশ করতেই হবে। পাঁচ বার অকৃতকার্য হলেই ইউনিভার্সিটির ছাত্র হিসেবে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে যে! শেষমেশ তা হয়নি, পাশ করে যায় সম্রাট। ভাল ফলাফল করেই।

“এই সময়টায় বদলে দিল আমায়। জেদ দিল, সাহস দিল, জোর দিল। সব কিছু ভুলে পড়াশোনাকে ভালবাসতে শেখাল। নিজেই বুঝতে পারছিলাম নিজের খামতিগুলো। নিজেই কাটিয়ে উঠছিলাম। আর তখনই প্রথম অনুভব করি, একটু গাইডেন্সের অভাবই আমায় পিছিয়ে দিয়েছিল এতটা।” এ কথা বলে সম্রাট জানালেন, তখনই ঠিক করেন, গ্রামের ছেলেমেয়েদেরকেও এই সুযোগটুকু তৈরি করে দেবেন। টিউশন দেবেন ওদের। “তবে টিউশন মানে আর পাঁচ জনের মতো শুধু পড়াতে চাইনি আমি। চেয়েছিলাম আরও বেশি কিছু। চেয়েছিলাম, নম্বরের স্বপ্ন শুধু নয়, বেঁচে থাকার পথটাও দেখুক ওরা।”—বলে চলেন সম্রাট।

গ্রামে স্কুল-টিউশন এ সব যে ছিল না, তা নয়। কিন্তু সেগুলোকে কাজে লাগানোর মতো মানসিকতা ছিল না বেশির ভাগেরই। সম্রাট পড়াতে শুরু করেন, ক্লাস নাইনের ১৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে। দু’টো ব্যাচে ভাগ করেন তাদের। প্রতিটা ব্যাচের জন্য সপ্তাহে সাত দিন, দু’বেলা, তিন-তিন ছ’ঘণ্টা করে টিউশন। অর্থাৎ সারা দিনের অর্ধেকটা শুধু ওদের জন্যই লাগিয়ে দিলেন সম্রাট। উদ্দেশ্য একটাই, ওদের সাফল্যের স্বাদ চাখানো। সেই সঙ্গে নিজের জেদটাও পরখ করে নেওয়া, শূন্য থেকে শুরু করেও আকাশ ছোঁয়া যায় কি না।

ওরা কারা?

যেমন সীমা (নাম পরিবর্তিত)। অভাবের সংসারে হেলাফেলায় বড় হয়েছিল। অন্তত নাইনে উঠে ভেবেছিল, যে বড় হয়ে গিয়েছে। তাই দ্বিগুণ বয়সি এক ছেলের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালানোর ব্যবস্থা প্রায় পাকা। এই অবস্থায় পড়ল সম্রাট স্যারের খপ্পরে। তার পরে নিজেও বোঝেনি, একটা বছর কী ভাবে কেটেছে। গত কাল মাধ্যমিকে ৩৫২ নম্বর পেয়ে ভাবতে বসেছে, উচ্চমাধ্যমিকের জন্য কোথায় ভর্তি হবে।

তেমনই রয়েছে অপু (নাম পরিবর্তিত)। বছর তিনেক আগেই পড়াশোনা ছেড়ে পাড়ার তাস-আড্ডায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিল। সামান্য টাকার বিনিময়ে ভিড় বাড়াত রাজনৈতিক দলের মিছিলেও। টেনে বার করে আনল সম্রাট। ফের শুরু পড়াশোনা। পরিশ্রম। আর তার ঝকঝকে প্রতিফলন রেজ়াল্টে, যা নিজেও কখনও ভাবতে পারেনি ওই কিশোর। অপুর বাবার কথায়, “স্মার্টফোন কেনার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল ছেলে। এখন বই কিনতে চায়। নিজে নিজেই বই জোগাড় করে পড়াশোনা করে।”

এমনই ১৮ জনকে নিয়ে শুরু করলেও, এক জনকে বাগে আনতে পারেননি। দিন কয়েক পর থেকেই উধাও সে। বাকি ১৭ জন থেকে গেল। সম্রাটের কথায়, “মেধা ছিল না ওদের। থাকার কথা নয়। ইচ্ছেও যে তেমন ছিল বলা যায় না। আমি শুধু চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতাটা তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম। জোর করে হলেও বুঝিয়েছিলাম, মাধ্যমিকটা পাশ করতেই হবে।” সহজ ছিল না এই জার্নি। সম্রাটের কাছের লোকেরা বলছেন, রাত জেগে নোটস তৈরি করেতেন দিনের পর দিন। এক একটা ব্যাচের পরীক্ষার জন্য তিন-চার সেট করে প্রশ্নপত্র বানাতেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে নানা রকম মডেল বার করতেন, পড়া বোঝাতে সুবিধার জন্য। আর এটাই বোধ হয় ছিল সম্রাটের বিশেষত্ব।

টেক্সট বুক তো বটেই, তার সঙ্গে গল্প করে বোঝাতেন বইয়ের বাইরেও নানা প্রসঙ্গ। ইন্টারনেটের তথ্য, ভিডিও কাজে লাগাতেন যতটা সম্ভব। ইউটিউবে সিনেমা দেখা আর গান শোনার অভ্যেস বদলে দিয়েছিলেন নানা রকম শিক্ষামূলক ভিডিও দেখায়। বললেন, “হয়তো জোয়ার-ভাটা চ্যাপ্টার পড়ালাম, সঙ্গে জুড়ে দিলাম একটা থ্রি-ডি গ্রাফিক। বুঝতে তো বাধ্য ওরা! আমি চেষ্টা করতাম, যাতে ওরা কল্পনা করতে শেখে। ভাবতে শেখে। শুধু বই পড়ানো নয়, বইয়ের পড়াটুকু কী ভাবে শিখতে হবে, সেটাই শেখানোর চেষ্টা করতাম।” ফল মিলেছিল হাতেনাতেই। পড়তে আসার জন্য আর কাউকেই জোর করতে হতো না। নিজের আগ্রহেই আসত সবাই। সম্রাটের সেই টিউশন পড়ানোর ছোট্ট ঘরটা যেন শহরের আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুমের এক খুদে সংস্করণ তখন!

হলে কী হবে, সে ঘরের ইলেকট্রিক বিলটুকুও জমা পড়ে না সম্রাটের পকেটে। পড়ুয়াদের মাইনে নির্ধারিত রয়েছে, মাসে ১৫০ টাকা করে। হ্যাঁ, সপ্তাহে সাত দিন দু’বেলা পড়ার জন্য ১৫০ টাকাই। কিন্তু মাস দুয়েক পর থেকে ঘরে আসত না সেটাও। “যে পরিবারের সারা মাসের রোজগার দু-তিন হাজার টাকার বেশি নয়, সে পরিবারের ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার কী করেই বা দেবে টিউশন ফি! দিতে পারলে কি এতটা অনিশ্চিত হতো ওদের পড়াশোনা?”—হেসে বললেন তেইশের তরুণ সম্রাট।

এ হাসিতে ঝিকমিক করছে সাফল্যের আলো। ঝিকমিক করছে, নিজের গ্রামকে এই উপহারটুকু দিতে পারার তৃপ্তি। আক্ষেপও আছে। ফার্স্ট ডিভিশন হল না কারওই। ৩৮৭ থেকে ২৭০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে ১৭ জনের নম্বর। কিন্তু এর পরেও আছে এক অবাক করা প্রাপ্তি। ভূগোলে লেটার মার্ক পেয়েছে সবাই! সম্রাট বললেন, “আমি খুব ভালবাসতাম ভূগোল। কিন্তু পড়া হয়নি। ওরা যেন আমারই সেই না-হওয়াটুকু পুষিয়ে দিল।”

এখন সম্রাটের বাড়িতে বেশ ভিড়। ছাত্রছাত্রীদের, তাদের বাবা-মায়েদেরও। এর পরে ওরা কী পড়বে, কোথায় পড়বে, এ সব নিয়ে রীতিমতো উত্তেজিত তাঁরা। সম্রাটের অবশ্য উত্তেজনার চেয়ে চিন্তাই বেশি। কোথা থেকে আসবে পড়াশোনার খরচ? তাঁর মতো করে টিউশনই বা কে দেবেন? সম্রাট নিজেই এখন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উঁচু ক্লাস পড়ানোর মতো সময় হয়তো দিতে পারবেন না। যদিও তাতেও সম্রাট স্যারকে ছাড়তে রাজি নয় পড়ুয়ারা।

কারণ তারা বেশ জেনেছে, সম্রাট স্যারকে ছাড়া পড়াশোনা হয়তো হবে। কিন্তু ‘শেখা’ হবে না।

Shares

Leave A Reply