বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

অজানা রহস্যে মোড়া, সূর্য না ছোঁয়া দক্ষিণ পিঠে কী লুকিয়ে রেখেছে চাঁদ?

অদিতি ভাটনগর

চাঁদ। সাহিত্যে হোক বা প্রেমে, গানে হোক বা স্বপ্নে– এই উজ্জ্বল গোলকটির আনাগোনা সর্বত্র। কখনও সে কোলের সন্তানের কপালে টি দিয়ে যায়, কখনও সে রাতভর ব্যর্থ প্রেমিককে গান শোনায়। কখনও আবার তার বুকে বসে নিরন্তর চরকা কেটে চলে এক বৃদ্ধা। মানুষের এমন আবেগে জারিত সেই উজ্জ্বল গোলক নিয়ে যেমন সাহিত্যরস উপচে পড়ে, আমাদের অর্থাৎ মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছেও তাকে নিয়ে ফ্যাসিনেশনের শেষ নেই। না, চাঁদের বুকে চরকা কাটা বুড়ির রূপকথা আমরা খুঁজি না বটে, তবে চাঁদের গতিবিধি, চাঁদের মাটির আনাচকানাচ, চাঁদের উৎস– আমাদের কাছেও তীব্র এক কৌতূহলের আধার। সেই সঙ্গে উত্তেজনারও। তাই এই সদ্য উড়ে যাওয়া চন্দ্রযান কেবলই একটা অভিযান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক গভীর তত্ত্ব, প্রশ্ন, দর্শন।

চাঁদেই কেন বারবার?

খুব সহজ কথা বলতে গেলে, আমাদের এই গ্রহের অর্থাৎ পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত সৌর জগতের যে সংযোগ রয়েছে, তার আদি ইতিহাস সব চেয়ে অবিকৃত অবস্থায় জানতে গেলে আমাদের অন্যতম বড় ভরসা এই চাঁদই। চাঁদের সৃষ্টি নিয়ে আজ অবধি নানা তত্ত্ব তৈরি করা গেলেও, এই গবেষণা আজও অন্তহীন। চন্দ্রপৃষ্ঠের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করতে পারলে হয়তো আমরা কিছু ধারণা পাব এ বিষয়ে। চাঁদের উৎপত্তি, বিবর্তন ও বিভিন্ন গঠনমূলক উপাদানের একটি বিবরণ পাব।

এর আগে, ২০০৯ সালে চন্দ্রযান-১ অভিযানের মধ্যে দিয়ে চাঁদের মাটিতে জলকণার অস্তিত্ব থাকার কথা আমরা জেনেছিলাম। কিন্তু সেই জলের পরিমাণ কতটা, কোথায় কী ভাবে সে জল রয়েছে, সে বিষয়ে জানার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন আমাদের। সেই কারণেই চন্দ্রযান-২ অভিযান বলে মনে করা যেতে পারে।

আসলে, প্রথম চন্দ্রযান অভিযানেরই পরবর্তী পর্ব হল এই চন্দ্রযান-২ অভিযান।

কোথায় আলাদা এই অভিযান?

গত ১৫ জুলাই ভোর রাতে রওনা দেওয়ার কথা ছিল এই চন্দ্রযান-২-এর। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (জিএসএলভি) মার্ক থ্রি থেকে উৎক্ষেপণ করার কথা ছিল চন্দ্রযানটির। কিন্তু বিশেষ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে, তার এক সপ্তাহ পরে, ২২ জুলাই দুপুরে সফল ভাবে উৎক্ষেপণ করা হল চন্দ্রযানটি।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকটি সরিয়ে রাখলেও আরও যে দিকটি দিয়ে এই অভিযান অনন্য, তা হল গোটা অভিযানটির নেতৃত্বে রয়েছেন মহিলারা। এটিই সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত প্রথম মহাকাশ অভিযান। প্রকল্পটির পরিচালক ডক্টর ভনিতা এবং অভিযানটির পরিচালক ঋতু কারিধাল। সেই সঙ্গে এটাও মাথায় রাখার বিষয়, যে এই প্রথম চাঁদের দক্ষিণ দিকে কোনও মহাকাশযান মসৃণ ভাবে অবতরণ করবে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের এই দক্ষিণ দিক কখনওই দেখা যায় না। কারণ এই অংশে আলো ফেলে না সূর্য। এর আগে কোনও মহাকাশযানও পৌঁছয়নি এই অংশে। টেলিস্কোপের লেন্সে কখনও ধরা দেয়নি চাঁদের দক্ষিণভূমি। তাই অজানা রহস্যে মোড়া এই দক্ষিণ পৃষ্ঠ নিয়ে কৌতূহল ও উত্তেজনা বরাবরই বেশি গবেষকদের মধ্যে। এই দক্ষিণ পৃষ্ঠ যেহেতু স্থায়ী ভাবে ছায়ায় ঢাকা থাকে, সূর্যের আলো এই জায়গাটিতে পড়েই না, তাই সম্ভাবনা আছে, এই অংশে হয়তো জল পাওয়া যেতে পারে। এবং এই অংশে অনেক ফাটল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। এই সব ফাটলের শীতলতায় সৃষ্টির আদি সময়ের বহু জীবাশ্ম অবিকৃত অবস্থায় থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

আসলে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যেহেতু সূর্যরশ্মি সরাসরি এসে পড়ে না, তাই সূর্যের বিকিরণগত পরিবর্তনও সেখানে কম হওয়ার সম্ভাবনা। আর তাতেই ফসিল অবিকৃত থাকবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ এবং তার রোভার (ভিতরে থাকা অভিযাত্রী যান) ‘প্রজ্ঞান’ আধুনিক প্রযুক্তি মারফত খুঁজে বার করবে সেই তথ্যই। অন্তত এমনই আশায় ৮৫১ কোটি টাকার এই প্রকল্প পরিকল্পনা করেছে ইসরো। সেই সঙ্গে চাঁদের মাটিতে যে জলকণার সন্ধান পেয়েছিল চন্দ্রযান-১, তা নিয়ে আরও বিশদ গবেষণা করবে চন্দ্রযান-২।

সেই সঙ্গে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের অস্তিত্ব সন্ধানের চেষ্টা যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে চাঁদের মাটিতে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ ও রাসায়নিক খুঁজে বের করার চেষ্টাও। সেইসঙ্গে চাঁদের মাটিতে বিশেষ গভীরতা পর্যন্ত গর্ত খুঁড়ে তার তাপমাত্রা, কম্পনের প্রক্রিয়াও জানার চেষ্টা করবে ‘বিক্রম’ এবং ‘প্রজ্ঞান’।

খুঁটিনাটি কী কী?

এই ল্যান্ডার ও রোভারের মিলিত ভর ১৪৭১ কেজি। এটি ৬৫০ ওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদন করতে পারবে। বিক্রম ভারতের ‘ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে। অর্থাৎ সহজে সরাসরি ও বিস্তৃত তথ্য পাঠাতে পারবে। সেই সঙ্গে প্রয়োদনীয় নির্দেশও গ্রহণ করতে পারবে পৃথিবী থেকে। রোভার প্রজ্ঞান আসলে একটি ৬ চাকার বিশেষ যান, যার ওজন ২৭ কিলো এবং এটি চালনা করতে ৫০ ওয়াট সৌরশক্তির প্রয়োজন হয়। এই যানটি সেকেন্ডে এক সেন্টিমিটার গতিতে ৫০০ মিটার পর্যন্ত ঘুরে দেখতে পারবে।

আর কী কী থাকবে এই চন্দ্রযান-২-এর পেটে?

ইসরো জানিয়েছে, চন্দ্রযানের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে ‘টেরেন ম্যাপিং ক্যামেরা’, যা দিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠের ডিজিটাল এলিভেশন মডেল তৈরি করা যাবে। আছে ‘এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার’, যা দিয়ে চাঁদের গঠনগত মৌলিক উপাদানগুলি চিহ্নিত করা যাবে। ‘ইমেজিং আইআর স্পেকট্রোমিটার’ দিয়ে জানা যাবে চাঁদে উপস্থিত বিভিন্ন খনিজ পদার্থের বিবরণ। এবং এটা দিয়েই জল এবং বরফের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে। হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা দিয়ে তুলে ধরা হবে চাঁদের মাটির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর খুঁটিনাটি।

কতটা সময় লাগবে, গতিপথই বা কেমন?

পূর্ব নির্ধারিত সময় মতোই সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখে ‘লুনার সারফেস’ বা চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করবে যানটি। তবে সমস্যার কারণে প্রথম বার অর্থাৎ ১৫ জুলাই-র উৎক্ষেপণ বাতিল হয়ে যাওয়ায় সমস্ত প্রক্রিয়ায় কিছু রদবদল করছেন বিজ্ঞানীরা।  সে বার উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত ৫৪ দিন সময় ধার্য করা ছিল। যার মধ্যে ২২ দিন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরপাক খেত চন্দ্রযান। পরবর্তী ২৮ দিন চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার কথা ছিল যানটির। শেষের চার দিন চাঁদের ‘লোয়ার অ্যাটমোস্ফিয়ারে’ গতি কমিয়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর জমিতে অবতরণ করত চন্দ্রযান-২।

কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘লুনার অরবিটের’ সময় কমিয়ে ২০ দিন করা হয়েছে। ফলে এবার সমগ্র অভিযানের সময়সীমা দাঁড়িয়েছে ৪৬ দিন।

সব ঠিক থাকলে, আমেরিকা, রাশিয়া (ইউএসএসআর) ও চিনের পর ভারতই চতুর্থ দেশ হিসেবে সফল চন্দ্র অভিযান করল। সেই সঙ্গে এটি চাঁদের বুকে অবতরণের ইতিহাসে, সব চেয়ে দূরবর্তী অবতরণ হিসেবে গণ্য হয়েছে।

(লেখিকা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (কলকাতা)-এর সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পেস সায়েন্সের এমএস ফিফ্থ ইয়ারের ছাত্রী)

Comments are closed.