ব্লগ: রোড হেড / ২ অদৃশ্য সিগন্যাল ধরতেন নিমা তাসি স্যার

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ভরুকা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রাস্টে ছোট্ট কিন্তু সুন্দর একটা লাইব্রেরি ছিলো এখনও হয়ত আছে।সেখানে পর্বতারোহন,ট্রেকিং,নেচার স্টাডি,মাউন্টেন মেডিসিন, মাউন্টেন ফটোগ্রাফি,জিওগ্রাফি,জিওলজি,রক ক্লাইম্বিং,আর্টিফিশিয়াল ওয়াল ক্লাইম্বিং-য়ের ওপর লেখা বই থেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক,ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ার,হিমালয়ান জার্নাল পাওয়া যেত। পাওয়া যেত কনট্যুর ম্যাপ। বিকেলে সেখানে গিয়ে পাহাড় নিয়ে লেখা বই ম্যাগাজিন ও ম্যাপ ঘাঁটতাম। মানে সব বুঝতামনা,ছবি দেখতাম আর কি। কখনও সখনও প্রাণেশদা,নীহারদা,ত্রিদিবদারা কি বলছেন কান খাড়া করে শুনতাম।বিভিন্ন ধরণের ট্যেকনিকাল কথাবার্তা,মাথার ওপর দিয়ে যেতো। ভরুকায় খুবই কম দিন গেছি।কিন্তু সেখান থেকেই প্রাণেশদার অনুচ্চ স্বরের দাবড়ানিতে একদিন পৌঁছে গেলাম এইচএমআই-দার্জিলিং।আর কোনও দিন ভরুকা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রাস্টে ফেরা হয়নি(নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই কম বয়েসে চাকরি পেয়ে গিয়ে)। সময়টা আশির দশকের শেষ দিক।এইচ এম আই-তে তখন প্রিন্সিপাল কর্ণেল অমিত রায়ের যুগ চলছে।নিজে উচ্চমানের ক্লাইম্বার ছিলেন কর্ণেল রায়।দেশে বিদেশে ক্লাইম্ব করেছেন। এইচএমআই-তে ইন্সট্রাক্টরদের,মানে চোঙতাসি স্যার,পাসাং স্যার,নরবু স্যার,ওয়াংদি স্যার,লাপাজ স্যারের রগড়ানি চললেও ফিদা হয়ে গেছিলাম চিফ ফিল্ড ইন্সট্রাক্টর নিমা তাসি স্যারের। আমার জীবনে এরকম মানুষ খুব কম পেয়েছি যিনি পাহাড়কে নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন।

    পরবর্তীকালে আমার সেই অর্থে মাউন্টেনিয়ারিং-এর ‘ম’ও হয়নি।কিন্তু হিমালয়ে দশকের পর দশক যাবার সুযোগ হয়েছে। কারণ নিমা তাসি স্যারই হিমালয়কে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে শিখিয়েছিলেন।তাঁরই জন্য হিমালয়কে নতুন ভাবে আবিস্কার করতে শিখেছি।বুঝেছি হিমালয় মানে কেবল মাউন্টেনিয়ারিং নয়।তার চেয়েও কোটি কোটি গুন বড় কিছু।
    সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘হীরকরাজার দেশে’র সেই মগজধোলাইয়ের ঘর ‘যন্তরমন্তর’কে মনে আছে ? হিমালয় হচ্ছে প্রকৃতির কোলে সগৌরবে মাথা তুলে থাকা প্রকৃতিরই তৈরি মগজধোলাই যন্ত্র। হিমালয়, তার কাছে আসা বাউন্ডুলে মানুষদের নিখুঁতভাবে মগজধোলাই করে।যে একবার হিমালয়ে আসে সে যেন কোনও অদৃশ্য গুনীনের মন্ত্রের টানে বার বার আসতে থাকে। আসতেই হয়,না এসে উপায় নেই।
    হিমালয় কখন হাসে,কখন কাঁদে, কখন গুম মেরে থাকে,কখন রাগে, এটা বুঝতে শিখিয়ে ছিলেন নিমা তাসি স্যার। হিমালয়কে মানুষ ভাবতেন স্যার। ওঁর একটা ঢাউস স্কুটার ছিলো,ঠিক মনে পড়ছেনা সম্ভবত ‘ল্যামব্রেডা’, ওটা চড়ে তখন এইচএমআইতে আসতেন। উনি আসতেই এইচএমআই-এর ঝিমধরা মেঘলা পরিবেশে রোদ্দুর হেসে উঠতো। সদাহাস্য সৌম্যদর্শন মানুষটার হিমালয় ও পর্বতারোহন সম্পর্কে পান্ডিত্য আমাকে পাগল করে দিতো। আমি আং-কামি স্যার , লাটু-দরজি স্যার, নওয়াং-গম্বু স্যারকে দেখিনি। এইচএমআইতে ও পরবর্তী কালে ওঁদের অনেক গল্প শুনেছি নিমা তাসি স্যারের কাছ থেকে। নিমা তাসি স্যার পরবর্তী জীবনে ডেপুটি ডিরেক্টর ইন ফিল্ড ট্রেনিং-ও হয়েছিলেন। সাফল্যের মুকুটে ছিলো রংবেরঙের পালক। কাবরু, রাতং,ত্রিশুলি,সাসের কাংগ্রি,থেলু,থারকোট,খাংগিয়া খাং,কোকতাং,পায়ুং সহ অনেক অনামি শৃঙ্গ।সাফল্যের ঝুলিতে নেই এভারেস্ট,কে-টু, কাঞ্চনজঙ্ঘা।তার জন্য সামান্যতম আক্ষেপও দেখিনি।আটহাজারি পিকের মোহ দেখিনি।কথাবার্তায় ঝাঁঝ বা বাগাড়ম্বর বা দম্ভ দেখিনি। কারোর সঙ্গে কথাবার্তায় সামান্যতম বিরক্তির ছোঁয়া দেখিনি। প্রত্যেক ছাত্রর কাছে আজও উনি পাহাড়ে থাকা একজন পিতা।

    তাসি স্যারকে ফিল্ড ট্রেনিংয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নস্ট্রাদামুস মনে হতো। যা বলতেন তাই হতো। ঝলমল দিনের শুরুতেই বলতেন দেড় থেকে দু ঘন্টার মধ্যে ওয়েদার খারাপ হবে। দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য, এমন সকালে একা একা চৌরিখাং -এর চারপাশ পায়চারি করে এসে বলতেন ইকুইপমেন্ট গোছাতে । ওয়েদার নাকি কিছুক্ষণের মধ্যেই ভালো হয়ে যাবে। আমাদের চোখ সপ্তম আশমানে তুলে দিয়ে হতোও তাই। পরে জিগেস করেছি সবাই।উনি বলতেন পাহাড় কে শুধু ফিল করলেই হবেনা পাহাড় সংলগ্ন সব কিছু ফিল করতে হবে,ওদের ভাষা বুঝতে হবে।আকাশ , বাতাস, নদী, ঝর্না, পাথর,গাছ পালা,পশু পাখী থেকে পোকা মাকড় পর্যন্ত।তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে সব কিছু। ওরাই দেবে সিগন্যাল।আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সিগন্যাল। কিন্তু তোমাদের সেই সিগন্যাল ধরার মতো রাডার লাগাতে হবে চোখে, কানে এমন কি নাকেও।

    আরও পড়ুন: ব্লগ: রোড হেড / ১ হাঁড়কাপানো রাতে বিচার বসায় হিমালয়

    শুনতে আজগুবি লাগলেও এটাই সত্যি।সারা হিমালয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হ্যামলেট গুলোর মানুষদের তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ করুন।শয়ে শয়ে বছর ধরে, বংশপরম্পরায় , ঠেকে ঠেকে শিখে শিখে ওঁরা নিজেরাই এক একজন আবহাওয়া অফিস। ওঁরা জানেন সিগন্যাল দেবে আকাশে মেঘের ফরমেশন, গাছগাছালি, পশু পাখী।
    ছোটো ছোটো পাখিরা, পতঙ্গরা যেদিন বেশ উঁচুতে ওড়ে সেদিন নাকি দিনটার আবহাওয়া ভালো যায়। যদি উজ্বল পরিস্কার দিনে সকাল বেলা বা দুপুর বেলায় পাখিদের ঝাঁকে উড়তে বা পশ্চিমে ফিরতে দেখা যায় বুঝতে হবে দুর্যোগ আসছে। দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়া আসার আগে গাছেদের, ফুলের গন্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।পশ্চিমে রামধনু দেখা গেলে দুর্যোগ আসছে পুবে দেখা গেলে দুর্যোগ কাটছে।পাহাড়ের গায়ে ঘুরে বেড়ানো পাহাড়ি ছাগলের পালকে যদি হটাৎ বসে পড়তে দেখা যায়, বুঝতে হবে ঝোড়ো হাওয়া আসছে। উচুঁ আকাশে ওড়া পাখির দল এলোমেলো ভাবে উড়তে উড়তে হটাৎ যদি মিসাইলের মতো নীচে নামতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে দ্রুত আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করবে। মানুষের কোঁকড়া চুলকে যদি সামান্য সোজা লাগে তাহলে বুঝতে হবে পরিবেশে জলীয় বাস্প বাড়বে। দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়া শুরু হওয়ার কিছু আগে পাহাড়ি টিউলিপ জাতীয় বিভিন্ন ফুল পাপড়ি গোটাতে শুরু করে।আগুনের ধোঁয়া যদি উপরে না উঠে নীচে নামতে থাকে ,কুকুররা যদি চঞ্চল হয়ে ওঠে,মৌচাকে যদি মৌমাছি ফিরতে শুরু করে বুঝতে হবে দুর্যোগ আসন্ন। হিমালয়ে পায়ে হেঁটে ঘুরতে ঘুরতে কতো কি শুনেছি, শিখেছি গ্রামবাসীদের কাছ থেকে। তার আগে তাসি স্যারের কথা বিশ্বাসই হতোনা যৌবনের ঔদ্ধত্যে। কিন্তু যে শিক্ষা হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির কোলে বসে, প্রকৃতির কাছে শেখা, তা বিফল হয়না। আমাদের পুঁথিগত শিক্ষার অহংকার নিমেষে ধুলায় মিশতো যখন তাসি স্যারের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেতো। মিটি মিটি হাসতেন নিমা তাসি স্যার। কিছু বলতেন না। বুঝতেন পাহাড়ই ঠিক সময়ে এই সব ঘমন্ড-বান্দাদের সবক শিখিয়ে দেবে।

    রূপকুন্ড ট্রেকে বৈদিনী বুগিয়াল থেকে ছয় কিমি দূরের রহস্যময়ী পাথরনাচুনিতে এসে পৌঁছেছি।স্থানীয় লোকগাথায় বলে একবার গাড়ওয়ালের রাজা নন্দাদেবীর বার্ষিক তীর্থযাত্রায় চলেছেন। রাজা এখানে এসে রাজনর্তকীদের নৃত্যকলা আস্বাদনে এতো ডুবে গেলেন যে নন্দাদেবীর নিত্যপূজা ভুলে গেলেন।রুষ্ট হলেন নন্দাদেবী। রাজা ক্ষমা পেলেও দৈব শাপে পাথরে পরিনত হলেন নর্তকীরা।সেই থেকে জায়গাটার নাম হয়ে গেলো পাথরনাচুনি। এখনও পাথর নাচুনিতে দেখতে পাওয়া যাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকগাথার নর্তকীদের প্রস্তরিভূত দেহ বা বিভিন্ন আকৃতির বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পড়ে থাকা পাথরগুলি।যাঁরা হয়ত হাজার হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করছেন অহল্যার মতো।শাপমুক্তির অপেক্ষা।

    পাথরনাচুনিতে এসে আমার রূপকুন্ড ট্রেকের সঙ্গী কবীরের টেন্ট পাততে ইচ্ছা হলোনা। প্রাকৃতিক শোভা নষ্ট করতে তার মন চায়না।আর ঠান্ডাও খুব একটা নেই। টেন্টের ভেতরে সে আকাশ দেখতে পায়না,মিল্কিওয়ে দেখতে পায়না।তার প্রিয় তারাদের দেখতে পায়না। যাদের জন্য প্রচুর টাকা দিয়ে জার্মানি থেকে টেলিস্কোপ আনিয়েছে।রাতে সে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখবে এবং বুঝি না বুঝি আমাকে শুনতেই হবে তার ধারাবিবরণী। শুধু এই নয় টেন্টে শুয়ে কবীর নাকি রাতের বাতাসের সিম্ফনি শুনতে পায়না। হিমালয়ের বাতাসে নাকি রাগ ভেসে বেড়ায়, গুর্জরি টোড়ি, নাগনন্দিনী, আরও কতো কি।কবীরের হিমালয়ে আসার মূল উদ্যেশ্য দুটি যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য দড়ি আর স্বচ্ছ ইম্পোর্টেড প্ল্যাস্টিক শিট দিয়ে একটা অদ্ভুতদর্শন মেকশিফট শেল্টার বানালো কবীর।বর্তমানে যেখানে পাথরনাচুনি ক্যাম্প সাইট, তার থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে। কালু বিনায়ক যাবার পথে একটা বড় পাথরকে পিছনে রেখে।একজন অস্ট্রেলিয়ান স্কাইওয়াচার ওকে নাকি এই কৌশল শিখিয়েছে।আমি ক্যারিম্যাট বিছিয়ে, তিনটে ছোটোছোটো পাথর দিয়ে বানানো উনুনে ডালপালা গুঁজছিলাম। কোনও সহৃদয় ট্রেকার দল উদ্বৃত্ত কিছু শুকনো ডালপালা পাথরের ফাঁকে যত্নে গুঁজে দিয়ে গেছিল।যতটা পারি বুকে জড়িয়ে নিয়ে এসেছি দুজনে। জ্বলল উনুন, ফুটল জল,হলো কড়া কফি। আজকেই একটু কষ্ট, কাল সকালেই চলে আসবে আমাদের এপথের গাইড কাম কুক কাম পোর্টার হীরা সিং। হীরা আমাদের সঙ্গেই ছিলো,বৈদিনী বুগিয়ালে রয়ে গেছে। কারণ ফেরার পথ ধরা একটা টিমের কাছে কিছু টিনবন্দী খাবার উদ্বৃত্ত হয়েছে।সেগুলি ন্যায্য দামে কিনে কাল সকালে আমরা কৈল বিনায়ক ওঠার আগেই আবার ধরে নেবে বলেছে।

    দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামবো নামবো করছে।ঝলমলে আবহাওয়া। কয়েকটা ভেড়া নিয়ে এক বৃদ্ধা নীচে নামতে নামতে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যান। ভেড়া গুলো একটু থমকে গিয়ে পরক্ষনেই চেনা পথে নামতে থাকে মালকিনকে ছেড়ে। বৃদ্ধা মিটি মিটি হাসেন শেল্টার ও প্রেসার কুকারের দিকে তাকিয়ে । কবীর একটু বিরক্ত হয়ে বলে “মানি ব্যাগ তো স্যাকের ভেতরে রে,তোর?”।মহিলা কবীরের কথা শুনে একটু লজ্জিত হলেন। ‘মানি ব্যাগ’ শব্দটা হয়ত স্কুলে পড়া নাতি নাতনির কাছে শুনেছেন। বুঝতে পেরেছেন যে কবীর কি বলতে চাইছে। নিজের সম্মান নিজে রাখতে দ্রুত হাঁটা লাগলেন ‘তাম্বু লাগালে,ভিগ জায়েগা’ বলে।

    নিঃশব্দ অথচ জোরদার চড় খেয়ে দুজনেই হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম দ্রুত পদে নামতে থাকা বুড়িমার দিকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন আপন কাজে মন দিলাম। স্ট্যান্ডে টেলিস্কোপ লাগিয়ে ফেলল কবীর । রাতে নক্ষত্র চেনাবে, ওর প্রিয় নক্ষত্র ভেগা। সেটার গপ্প শুনতে শুনতে বিনিদ্ররাত কাটবে বেশ বুঝতে পারছি। আমিও দুই লিটারের প্রেশার কুকারে চাল, ডাল, নিউট্রেলা, গরম মশলা, নূন ও খানিকটা কাঁচা তেল ঢেলে চাপিয়ে দিলাম উনুনে।কিছু একটা ঘ্যাঁট তো হবে , সেটাই গিলে নেবো।

    রান্না শেষ, আগুনের শেষ আঁচের মতোই লালচে আভায় ভাসছে পাথরনাচুনি উপত্যকা। পাথরনাচুনিকে মোহিনী নর্তকীদের মতোই মায়াবী লাগছে। বিকেল এসেছে, ঠান্ডা লাগছে বেশ, আরও ঠান্ডা পড়বে রাতে।আড়াল আবডালহীন কবীরের শেল্টার হিমালয়ে আদৌ কার্যকর হবে কিনা কে জানে। যদিও আকাশ পরিস্কার, ঝড় বাদলের কোনও চিহ্ন নেই। তবুও মাথার মধ্যে খচ খচ করছে বৃদ্ধার কথা। ‘তাম্বু লাগালে,ভিগ জায়েগা’। আমি নিখুঁত ভাবে মশারি ও টেন্ট লাগাতে পারিনা কোনও দিন। তবুও লেগে পড়লাম টেন্ট লাগাতে সাতপাঁচ ভেবে।ওর শেল্টারকে পাত্তা দিচ্ছিনা দেখে কবীর একটু রাগলো। দূরে গিয়ে একটা সিগারেট খেয়ে এসে , ব্যাজার মুখে টেন্ট লাগানোর দ্বায়িত্ব নিলো। এবং শুনিয়ে রাখলো,’তুই কিন্তু একা শুবি টেন্টে’।টেন্ট খাটানো শেষ হয়েছি কি হয়নি।আচমকা, কান ফাটানো গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজে কাঁপতে লাগলো পাথরনাচুনি। অবাক চোখে পেছনে তাকিয়ে দেখি, দুঘন্টা আগে দেখা একটা নির্বিষ হালকাফুলকা মেঘ এখন পুবদিকের পুরো আকাশ জুড়ে কালকেউটের ফণা তুলেছে। যেন আমাদের টেন্ট খাটানোর জন্যই অপেক্ষা করছিলো। কবীরের মুখচুন,খুলতে শুরু করলো তার সখের শেল্টার।স্কাইওয়াচিং-এর দফারফা হয়ে গেছে বুঝতে পারছে। আমরা দৌড়ে মালপত্র, টেলিস্কোপ,খিচুড়ি জাতীয় কিছু একটা ভর্তি প্রেশার কুকার নিয়ে টেন্টে ঢুকলাম।ঢোকার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো। পিছনে পাথরটা থাকায় কিছুটা রক্ষে, নাহলে তাঁবুর পেগ গুলো উপড়ে এতক্ষনে তাঁবু লন্ডভন্ড করে দিতো।মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই শিল পড়ার মতো আওয়াজ করে শুরু হলো আকাশ থেকে বড় দানার জল ছোঁড়া। তারপর হটাৎ মেঘটা প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার করতে লাগলো তাঁবুর ওপরে। প্রকৃতির কাছে অসহায় যৌবনের ঔদ্ধত্য। থরথর করে কাঁপছে টেন্ট। বৃষ্টি-বুলেটের আঘাতে টেন্ট ফুটো হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।এই দুর্যোগের মধ্যে কবীরকে আবার গানে পেয়েছে।তারস্বরে গান ধরেছে ‘ঝিরি ঝিরি বাতাস বহে তোমায় মনে পড়ে।” ভয়ে কিনা কে জানে। পকেটে লিউকোপ্লাস্ট আছে কবীরের মুখে লাগিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমার সেদিকে মন ছিলোনা। ছিলোনা দুর্যোগের দিকেও। আমি খালি ভাবছিলাম, আসার সময়েই লোহাজং-য়ে শুনেছিলাম গত সাতদিন এই দিকে বৃষ্টি হয়নি ।খটখটে শুকনো, মেঘমুক্ত পরিস্কার দিনে কিসের সিগন্যাল দেখে বুড়িমার রাডার ডিকোড করলো যে দুর্যোগ আসতে চলেছে ! তখন তো আকাশে ওই হালকা ফুলকা মেঘটা ছিলইনা। খুঁজেই চলছিলাম উত্তরটা, রুদ্রমূর্তি ধরা হিমালয়ের ঘটনাবহুল রাতে। পেলামওনা যথারীতি। তবে আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত। উত্তরটা নিমা তাসি স্যার দিতে পারতেন।

    (লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী  এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More