করোনার প্রভাব ও শিশুমন

মহামারীর প্রকোপের সময় ইতিবাচক ভাবতে থাকা খুব একটা সহজ নয়, কিন্তু যেহেতু হাতে শর্ত আর নেই তাই শিশুমনের দিকে চেয়ে এর মধ্যে থেকেই বেছে নিতে হবে কিছু ইতিবাচক দিক।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

    মনে পড়ে গেল সেই বিখ্যাত সিনেমার একটি দৃশ্যের কথা। পৃথিবীর অহংকার সেই জাহাজ, যে সমুদ্র শাসন করে, সে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের অতলে। ঠিক সেই মুহূর্তে সেই মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। লাইফবোটে জায়গা পাবেন না বলে নিজের কেবিনে সন্তানদের তিনি রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন। আর ঠিক তখনই সমুদ্রজল গ্রাস করে নিচ্ছে তাদের। হ্যাঁ, আমি টাইটানিকের কথাই বলছি। যেমন মনে পড়ছে জার্মান শিল্পী ক্যথে কোলভিৎসের আঁকা চিন্তাক্লিষ্ট জননীর ছবি। বিশ্বব্যাপী মহামারীই হয়তো এই নেতিবাদী মনোভাবের জন্য দায়ী। কিন্তু সত্যিই কি আমরা হেরে গেলাম? করোনা গ্রাস করে নিল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে? হয়তো না। এখনও হয়তো খানিকটা সময় আছে হাতে। দেখে নিই।

    করোনা এদেশে যে জনসংখ্যাকে আপাতত বেশি আক্রান্ত করেছে তাদের সিংহভাগেরই বয়স পঞ্চাশের নীচে। আর সেই সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে শিশুমনের একটা বড় অংশ, যারা হয়তো সমীক্ষাগতভাবে এখনও আক্রান্ত নয় কিন্তু তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। সোনায় সোহাগা যোগ করেছে লকডাউন। ঘরবন্দি ছোট ছোট মানুষগুলো এখন স্কুলে যেতে পারছে না, কারও পড়াশুনো চলছে অনলাইনে, বাবা-মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তার উদ্বেগ। এই উদ্বেগে ক্রমশ জন্ম নেবে অবসাদ, তারপর নানা মানসিক অসুস্থতা এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতাও। তাহলে আমাদের সামনে কি রূপকথা শোনানো বা কোলভিৎসের ছবির সেই মায়ের মতো হতাশ হয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই? এক মহামারীর প্রকোপের সময় ইতিবাচক ভাবতে থাকা খুব একটা সহজ নয়, কিন্তু যেহেতু হাতে শর্ত আর নেই তাই শিশুমনের দিকে চেয়ে এর মধ্যে থেকেই বেছে নিতে হবে কিছু ইতিবাচক দিক।

    প্রথমটি যেমন। লকডাউনের দিনগুলোয় শিশুর তার পরিবারের সান্নিধ্যে থাকবার সুবর্ণ সুযোগ। তার প্রয়োজনও রয়েছে বইকি। মনোবিদ ব্রনফেনব্রেনারের ‘ইকোলজিক্যাল থিয়োরি অব মাইন্ড’ জানাচ্ছে শিশুমনস্তত্ত্বের মানচিত্রের কিছু কিছু বিষয়। যেমন, তার বাবা-মা, বাড়ি, প্রিয় বন্ধুরা থাকে তার অনুভূতির একদম কেন্দ্রে। তার বাইরে থাকে তার স্কুল, টিচার, পাড়ার বন্ধু— যাকে বলা হচ্ছে ‘মাইক্রোসিস্টেম’। তার বাইরের জগৎ হল বহির্জগৎ বা ‘ম্যাক্রোসিস্টেম’। যে বাবা-মায়েরা চাকরি করেন তাদের ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রে বসে থাকা উপাদানগুলো পরিবারে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠতে পারে না। ফলত কেন্দ্র টালমাটাল হলে যা অবশ্যম্ভাবী তাই ঘটে। সেই কেন্দ্র দখল করে নেয় ক্রেস, বাড়িতে দেখভাল করার আয়ামাসি। এর ফলে পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার ধারা, দর্শন, ছোটদের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে না।

    লকডাউনের জেরে সেই সম্ভাবনা কিন্তু ইতিবাচক হয়ে দেখা দিয়েছে। লকডাউনে পরিবারের যেসব বাবা ও মা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন তাঁরা নিজেদের ও কচিকাঁচাদের একটা দৈনিক রুটিন বানিয়ে নিন। এই রুটিনে যেমন নিজের জন্য সময় থাকবে তেমনই ছেলেমেয়েদের জন্যও। এই সময়ে তাদের সঙ্গে খেলতে পারেন, পড়াতে পারেন, গল্প পড়ে শোনাতে পারেন। এর ফলে শিশুর সঙ্গে তার অভিভাবকের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনা বাড়বে মনস্তাত্ত্বিক আদানপ্রদানেরও। যেসব বাবা-মা এতদিন বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন তাঁরা হয়তো তাদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া ভুলে ভাল বাবা-মা হয়ে উঠবেন। খানিক শাসন, খানিক আদরের মিশ্রণে তা হয়ে উঠবে আদর্শ অভিভাবকত্ব।

    শিশুমনে লকডাউনের আর একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক দিক হল বয়স্ক মানুষের সান্নিধ্য। আজকের প্রজন্ম দিদা, দাদু, ঠাকুমার সান্নিধ্য পায় না। তাই তারা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের নাম শোনেনি। লালকমল নীলকমলের কথা তাদের অজানা। সত্যজিৎ রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তারা ইংরেজিতে পড়ে। এই সময়ে এই দুই প্রজন্মকে সেতু দিয়ে যুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। এমনিতেই বয়সকালে তাঁদের নানা শারীরিক ব্যাধির পাশাপাশি বেড়ে ওঠে মনের নানা অসুখ। তার মধ্যে অন্যতম হল একাকিত্ব ও অবসাদ। এই লকডাউনের সময় তাদের সঙ্গে শিশুদের যোগ ঘটলে দুটো ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাবে। প্রথমত, শিশুরা হয়ে উঠবে বয়স্ক মানুষের অবসাদ কাটানোর প্রতিরোধ। আর দ্বিতীয়ত, শিশুমনের ক্ষেত্রে বয়স্ক প্রজন্মের সঙ্গ হয়ে উঠবে প্রয়োজনীয় সামাজিক প্রতিরক্ষাবলয়। যেখানে বয়ঃসন্ধির ভ্রুকুটি সেখানে এই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কেন বললাম? ভেবে দেখুন। বয়ঃসন্ধি সেই বয়সের ছেলেমেয়েদের নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে দেয়। সেখানে থাকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও। সেইসব কথা বাবা-মাকে বলতে না পারার কারণে আধুনিক সভ্যতায় প্রয়োজন পড়ে কাউন্সেলিংয়ের। অথচ এই কাজটি বছরের পর বছর করে আসছিলেন আমাদের ঠাকুমা, দিদিমারা।

    স্কুল বন্ধ হওয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তার সুযোগ নেই। দমবন্ধ এই পরিবেশে নিউজিল্যান্ডের শিশুরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে টেডিবিয়ার খুঁজে চলেছে। আমাদের দেশে একটি সম্ভাবনাময় পথ খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি। যে মোবাইল ফোনকে এতদিন যাবতীয় কুপ্রভাবের জন্য শনিঠাকুরের জায়গায় বসাচ্ছিলাম আমরা, তারই ইতিবাচক দিকগুলো চিনে নেবার সময় এই লকডাউন। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খানিকক্ষণের জন্য ভিডিও কল করে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারে কচিকাঁচারা। এমনকি একটি সুস্থ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলতে পারে পড়াশুনোও। ইতিমধ্যেই অনেক স্কুল অ্যাপের মাধ্যমে তাদের সিলেবাস শুরু করে দিয়েছে। প্রযুক্তিকে যে ইতিবাচকভাবেও ব্যবহার করা যায় তার প্রমাণ এই লকডাউন।
    লকডাউনে শারীরিক সুস্থতা কমে আসবে, এই কথা ভাবাও সম্পূর্ণ ঠিক নয়। হ্যাঁ, নিয়মিত খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হয়তো তা খানিক কমছে। কিন্তু এই সময়ে যোগব্যায়ামের অভ্যাসকে নতুন করে দেখা যেতে পারে। চলতে পারে স্কিপিং, ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা ইত্যাদি। শিশুর পাশাপাশি বড়রাও আবার শিশু হয়ে উঠতে পারেন।

    লকডাউনের মাধ্যমে চিনে নেওয়া যাবে শিশুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার কথাও। ইতিমধ্যেই বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, আমরা আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার দশ ভাগের মাত্র এক ভাগ সারাজীবন কাজে লাগাতে পারি। শিশুমনের বিকাশের পথ প্রশস্ত করতে এই লকডাউনে তাকে নানা সৃজনশীল অভ্যাসে বসান পরীক্ষামূলকভাবে। ছবি আঁকা, গান শেখা, আবৃত্তি, গল্প লেখা, ওরিগামি, দাবা বা ক্যারাম খেলা, অভিনয় ইত্যাদি তার মনের ভেতরের সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে পারে এই সময়ে। কে বলতে পারে, যাকে ভাবতেন আইএএস অফিসার হবে, সে আসলে একজন দুনিয়াকাঁপানো ঔপন্যাসিক হবার ক্ষমতা লুকিয়ে রেখেছে মনে।

    শেষমেশ আর একটি দিক এবার তুলে ধরি। আমাদের এই আলোচনা এখন যাঁরা পড়ছেন তাঁদের মধ্যে কতজন কৃষিজীবী বা কয়লার শ্রমিক আমার জানা নেই। তবে মনে হল, এতক্ষণ যেসব ইতিবাচক কথা লিখলাম তার মধ্যে একটা বড় অংশের মানুষের জন্য কথা বলা হয়নি। তাঁদের পরিবারের ছেলেমেয়েদের রোজকার জীবনের একটি অত্যাবশ্যক অঙ্গ ছিল স্কুলে যাওয়া। আমরা যাদের ‘ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার’ বলে পাশে সরিয়ে রাখি। আমরা ভুলে যাই, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যদি আমাদের সমাজের বাহারি ‘চ্যাসিস’ হয়, তা হলে এঁরা হলেন সেই চ্যাসিসের চাকা। এই লকডাউনে সরকারি বা অন্য কোনও উদ্যোগে তাঁরা না হয় বরাদ্দ চাল-ডাল-ডিম পেলেন, কিন্তু তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা? এইসব পরিবারের ছেলেমেয়েদের বাবা কিংবা মা, কেউই হয়তো প্রাইমারির গণ্ডি পেরোননি। সেই ছেলেমেয়েদের জন্য ইতিবাচক দিক হল নিজের শিকড়কে চেনা। গ্রামে যারা রয়েছে তারা এই সময়ে জানতে পারে তাদের পারিবারিক সংস্কৃতির কথা, নিজেদের অঞ্চলের কথা। তাদের বাবা-মায়েরা প্রতিনিয়ত যে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে একরকমের সংযোগও গড়ে উঠতে পারে এই সময়ে। এই কাজে যুক্ত হতে পারেন গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা এবং এমনকি বিদ্বজ্জনেরাও।
    মহামারী একদিন চলে যাবে। কিন্তু তা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। যে ছোটরা আগামীদিনে বড় হয়ে উঠবে— তা সে সমাজের যে অংশেরই হোক না কেন, তাদের জন্য ভাবতে শেখাও এখন সবচেয়ে জরুরি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More