সোমবার, মার্চ ২৫

কাঁটাতারের চেয়ে জীবন বড়! পাকিস্তান থেকে দুর্গাপুরে এসে নবজন্ম ছোট্ট রিধার

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

একেই বোধ হয় বলে হৃদয়ের বন্ধন। সৌজন্য, রিধা আসিফ। যার বয়স মাত্র দুই। সুদূর কোয়েটা থেকে দুর্গাপুর এসে যে ফিরে গেল এক রকম পুনর্জন্ম গ্রহণ করে।

ভৌগোলিক ভাবে তারা প্রতিবেশী দুই দেশ। কিন্তু ইতিহাস বলছে, তারা চিরশত্রু। আর এই দূরত্বের মাঝেই অপূর্ব এক রক্তের সম্পর্ক তৈরি করল ছোট্ট এক প্রাণ। আর এই সম্পর্কের যোগসূত্র হিসেবে রয়ে গেল দুর্গাপুর মিশন হাসপাতাল।

বছর দুয়েক আগে মহম্মদ আসিফ এবং তানি আসিফের কোলে এসেছিল তাদের চতুর্থ সন্তান, রিধা আসিফা। তবে জন্মের সময় থেকেই জটিল এক হৃদরোগের কারণে তার সারা শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অসুখের নাম ‘কমপ্লেক্স কনজেনিটাল সায়ানেটিক্যাল হার্ট ডিজ়িজ়’। অর্থাৎ জটিল ধরনের এক জিনের অসুখ, যার কারণে রক্ত চলাচলের সমস্যায় বাচ্চার শরীর সায়ান অর্থাৎ নীল রঙের হয়ে যায়। হার্টের বড় অস্ত্রোপচার ছাড়া সারা সম্ভব নয়।

সপরিবার।

তবে সে অস্ত্রোপচার তার জন্মভূমিতে হওয়া কার্যত অসম্ভব। কারণ সে দেশের নাম পাকিস্তান। সে দেশেরই বালুচিস্তান প্রদেশের কোয়েটা শহরের বাসিন্দা মহম্মদ ও তানি এমন সমস্যায় পড়েছিল ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। তবে এই প্রথম নয়। রিধার দাদা, ন’বছরের আবদুল-ও একই অসুখ নিয়ে জন্মেছিল। তার পরেই, আজ থেকে সাত বছর আগে তাঁরা যোগাযোগ করেছিলেন ভারতে, এই অসুখের চিকিৎসার বিষয়ে। কারণ হামলা-বিধ্বস্ত সে ছোট্ট দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটাও উন্নত নয় এখনও। তাই মহম্মদ বা তানি একা নয়, বহু পাকিস্তানিকেই চিকিৎসার জন্য শরণাপন্ন হতে হয় এ দেশের। এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যতই জটিল হোক, এই ধরনের চিকিৎসার জন্য ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত সরকারের তরফে যথেষ্ট মানবিক ভূমিকা পালন করা হয় বলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তা জানালেন।

সেই সময়েই মহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় রোটারি ক্লাবের। এবং তাদের মাধ্যমেই মহম্মদ জানতে পারেন, দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে শিশুদের এই ধরনের জটিল হার্টের অস্ত্রোপচার করা হয়। তার পরে ছেলেকে নিয়ে এ দেশে আসতে দেরি করেননি মহম্মদ। দুর্গাপুরে এসে, মাসখানেক থেকে, ছেলের অস্ত্রোপচার করিয়ে তাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে নিয়ে যান তাঁরা।

এই অবধি সব ঠিকই ছিল। কিন্তু সাত বছর পরে চতুর্থ সন্তান যে ফের একই অসুখ নিয়ে জন্মাবে, তা ভাবতেও পারেননি তানি-মহম্মদ। তবে দ্বিতীয় বার মেয়ের এমন অসুখ ধরা পড়ার পরে, তাঁদের বেশি সময় লাগেনি সিদ্ধান্ত নিতে। তাঁরা সরাসরি যোগাযোগ করেন দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে। চিকিৎসক শ্রীরূপ চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা এবং অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়। আবদুলের ক্ষেত্রেও তিনিই করেছিলেন অস্ত্রোপচার।

চিকিৎসক শ্রীরূপ চট্টোপাধ্যায়

মিশন হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রীরূপ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, এই সমস্যাটির নাম টেট্রালজি অফ ফ্যালো। খুবই জটিল এবং কঠিন সার্জারির মাধ্যমে ‘হার্ট কারেকশন’ করা হলে অসুখ সারে। রিধার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তাঁর কথায়, “রিধার দাদার কেসটি আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল। আমরা পেরেছিলাম বাচ্চাটিকে সুস্থ করে দেশে পাঠাতে। রিধার ক্ষেত্রে জটিলতা আরও বেশি হওয়ায়, দিল্লির হাসপাতালে একটা চেষ্টা করা হয় প্রাথমিক ভাবে। কিন্তু নানা কারণে তা সফল হয়নি। শেষমেশ দুর্গাপুরেই সুস্থ হল আমাদের ছোট্ট এঞ্জেল।”

শ্রীরূপ বাবু আশা করছেন, বাকি জীবন কোনও রকম অসুস্থতা ছাড়াই কাটাবে রিধা। তিনি অত্যন্ত খুশি এই সাফল্যে। এ সাফল্য শুধু অস্ত্রোপচারের নয়, প্রতিবেশী দেশের পরিবারটিকে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরাতে পারারও। তাঁর কথায়, “ওঁরা আমাদের অতিথি। ওঁদের ভাল রাখার দায়িত্বও আমাদের।”

সত্যজিৎ বসুর সঙ্গে রিধা।

শুধু তা-ই নয়। মিশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র কার্ডিয়াক সার্জেন সত্যজিৎ বসু জানাচ্ছেন, অস্ত্রোপচারের সময়ে রিধার শরীরে রক্তের প্রয়োজন হয়। সেই রক্তও জোগাড় করা হয় স্থানীয় ভাবে। “পাকিস্তানের কোয়েটার মতো একটা শহর থেকে যে মানুষ আমাদের হাসপাতালে ভরসা করে এই চিকিৎসা করাতে আসছেন, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। তার উপর এক ভারতীয় মানুষের রক্ত শরীরে নিয়ে পাকিস্তানে ফিরল মেয়েটি।”– পরিতৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট সত্যজিৎ বাবুর গলায়। এই পরিতৃপ্তি মনে করিয়ে দেয়, দেশ-জাতি-ধর্ম-সীমানার ঊর্ধ্বে যদি কিছু থাকে, তা হল এক ও একমাত্র মনুষ্যত্ব। থাকে স্নেহ, থাকে মায়া। যে স্নেহের বন্ধনে জড়িয়েছেন চিকিৎসকেরাও। তাঁদের সকলের চোখে রিধা এখন ‘এঞ্জেল’!

রিধার বাবা মহম্মদ আসিফের গলায় উপচে পড়ছে কৃতজ্ঞতা। বলছেন, “দু’-দু’বার আমার দুই সন্তান জীবন ফিরে পেল এখানে। আমি জানি না কী বলে ধন্যবাদ দেব সকলকে। এই দেশের কাছে, দেশের মানুষের কাছে চিরঋণী রয়ে গেলাম আমরা।” রিধার মা তানি আবার বলছেন, “একটা বারের জন্যও আমাদের মনেই হয়নি আমরা অন্য দেশে আছি! শুধু অন্য দেশ নয়, বলতে গেলে শত্রু-দেশ! কিন্তু চিকিৎসকদের যে সহযোগিতা পেলাম, চিকিৎসাকর্মীদের যে সুন্দর ব্যবহার পেলাম, হাসপাতালের বাইরেও প্রতিটা মানুষের যে সহানুভূতি পেলাম, তাতে আমি অভিভূত! একটি বারের জন্যও কেউ বুঝতে দেননি, আমরা তাঁদের ‘শত্রু দেশের’ বাসিন্দা।”

খেলায় মেতেছে ভাই-বোন।

আর এই সমস্ত ‘শত্রুতা’ ফিকে হয়ে যাচ্ছে ছোট্ট রিধার খিলখিল হাসিতে। সে হাসছে, খেলছে, টলমল পায়ে ছুটছে, আধো-আধো স্বরে কথা বলছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে, জীবনের চেয়ে বড় কোনও কিছু নয়। সমস্ত রাজনীতি, কূটনীতি, রাষ্ট্রনীতিকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে সে। সে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ করে পরস্পরের একাধিক প্রাণ নেওয়ার থেকে অনেক বড় হল একটা ছোট্ট প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারা।

আজ, বুধবার সপরিবার হাসিমুখে দেশে ফিরছেন মহম্মদ আসিফ। তার আগে কথায় কথায় মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন, “দেশের সঙ্গে দেশের লড়াই কখনও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে না। কৃতজ্ঞতা রইল ভারতের কাছে।”

আর কী কী বলছেন তিনি, জেনে নিন ভিডিও-য়।

Shares

Comments are closed.