Latest News

মহালয়ার তর্পণে শাপমুক্ত হন পূর্বপুরুষরা

সুবল সরদার

Mahalaya

পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাপূর্বক প্রভাতী তর্পণ হয় মহালয়ায় (Mahalaya)। সূর্যদেবের দিকে মুখ করে গঙ্গার বক্ষে গঙ্গার জলে নৈবেদ্য দান (Tarpan) করার মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের তুষ্টিকরণ। এই সময় তাঁদের বিদেহী আত্মা নাকি পৃথিবীর কাছাকাছি চলে আসে। হিন্দু মতে মহালয়ার তর্পণের মধ্যে দিয়ে পূর্ব পুরুষগণের শাপ মোচন হয় যদি তারা কখনও পৃথিবীর বায়ুস্তরে আটকে থাকে। ভূত-প্রেত থেকে যমরাজের যমালয় থেকে শাস্তি ভোগ করে এবং পাপের ফল ভোগ করার পর মোক্ষ লাভ করে স্বর্গদ্বারে যায়। তারপর পুনর্জন্ম হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

এমন জন্মান্তরবাদের বিশ্বাস হয় মহালয়ার প্রতিপাদ্য বিষয় হিন্দু মতে। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ দিন হয় মহালয়া, যা পূর্বপুরুষদের তর্পণের মাহেন্দ্রলগ্ন। এই মহালগ্ন শুরু হয় কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে একপক্ষ কাল ধরে। মহালয়ায় পিতৃপক্ষ তর্পণের শেষ মহালগ্নে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে পুন্যার্থীদের তাই এতো মহাসমাবেশ ঘটে। মহালয়া আগমনীর মতো শারদীয়ার বাতাসে নির্মল আনন্দের পূর্বাভাস। আকাশে রাশি রাশি পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, বাতাসে শিউলির গন্ধে আগমনীর মতো মহালয়ার আগমন বার্তা আমাদের হৃদয় হরণ করে।

তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়: আমার স্বাধীনতা

স্মরণাতীত কাল থেকে ধর্মীয় অনুশীলন হয় মহালয়া। আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে গঙ্গা বক্ষে পূর্ব পুরুষদের তর্পণের সঙ্গে ভোরের রেডিওতে আবেগমথিত কণ্ঠে দেবী বন্দনা। ভোরের রেডিওতে চণ্ডীকাপাঠও মহালয়া বলে প্রচলিত হয়। দুই মহালয়া একে অপরের পরিপূরক হয়ে আমাদের কাছে সমার্থক হয়ে ওঠে। বাঙালির নিজস্ব ভাবনা মহালয়ার সঙ্গে কালজয়ী হয়ে ওঠে। একটা বিশুদ্ধ ধর্মীয় আবেগ আর একটা ধর্মীয় আবেগ মিশ্রিত শিহরণময় উন্মাদনা।

১৯৩১ সালে প্রথম চণ্ডীপাঠ শুরু হয় মহিষাসুরমর্দ্দিনী নামে আকাশবাণী কলকাতা থেকে। রেডিওতে দেবদেবীর স্তোত্র-সহ গান শুরু হয় ওই একই মাহেন্দ্রক্ষণে মহালয়ার সঙ্গে। শুরু হয় স্তোত্রের মাধ্যমে দেবীপক্ষের প্রস্তুতি। এই স্তোত্র সহ গান রচনা করেন গীতিকার বাণীকুমার বসু এবং মাতৃ সাধক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমর কণ্ঠে আপামর বাঙালি আপ্লুত হয়। শিহরিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়, তাঁর সুললিত মিষ্টি কণ্ঠের যাদুতে। তাঁর শ্লোকপাঠের যাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয় বাঙালির মননশীলতা।

মহালয়া শারদীয়ার মতো সর্বজনীন হলেও রেডিও-র মহালয়া একান্তভাবে বাঙালির নিজস্ব গর্বিত ঐতিহ্য। আমাদের আবেগ-ভালোবাসা-ঐতিহ্য-ধর্মীয় আবেশের সুখানুভূতি। উত্তেজনা, শিহরণ, নস্ট্যালজিক অনুভূতির নাম মহালয়া। ‘ইনস্ট্যান্ট মেইড ইটারনিটির’ মতো মহালয়ার কয়েক মুহূর্তের মহালগ্ন শাশ্বত জীবনের ঐশ্বলোকের আলোক পথ হয়ে ওঠে। এই তর্পণ নব জীবনের পবিত্রতা দান করে। নশ্বর দেহ তর্পণের মাধ্যমে অবিনশ্বর হয় বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এইভাবে অন্ধকার পিতৃপক্ষের শেষ ক্ষণে সূচনা হয় আলোকময় দেবীপক্ষ। স্বর্গ থেকে মর্ত্যধামে দেবীর আগমন হয়। বোধন ষষ্ঠীতে হয়। তার মল্লভূমি স্বর্গ থেকে মর্ত্যধামে প্রসারিত হয়। মধু-কৈটভ-এর মতো এখানেও তিনি যুদ্ধ করেন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা হয় অশুভ শক্তি বিনাশের মধ্যে দিয়ে। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা পূজনীয়া হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।

শারদীয়া আসলে প্রকৃতি পুজোর এক অনন্যা রূপ যেটাকে বলি নবপত্রিকা বা কলাবউ। কৈলাস থেকে মর্ত্যধামে তার আবির্ভাব হয় কলা বউ স্নানে ষষ্ঠীর ভোরে। তিনি জগৎ জননী জগদ্ধাত্রী আমাদের জগৎমাতা দেবী দুর্গা। কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুক্লপক্ষ, পিতৃপক্ষ থেকে দেবীপক্ষ এইভাবে একটা চক্র পূর্ণ হয়। এই চক্র পথে জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে আসি এই পৃথিবীর পরে, রূপ-রস-গন্ধ-ভালবাসার স্পর্শ নিতে মহালয়ার মহা আলোর পথ ধরে। মহালয়া পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ, রেডিওর মহালয়ায় দেবী বন্দনা, শারদীয়ায় ভয়ঙ্কর সুন্দর মহিমান্বিত দেবী রণচণ্ডিকা রূপের প্রকাশ আমাদের পার্থীব জীবনের পূণ্যতা দান করে।

You might also like